চ্যাই চুই – শম্পা সাহা

আমি কোনোদিনই ভালো মানে শান্তশিষ্ট ছিলাম না, এখনো না এবং সেটা আমার বাড়ির লোকজন ভালোই টের পায়। যে এতখানি বুড়ো বয়সেও, “উঠলো বাই কটক যাই”, সে ছোট বয়সে যে কি জিনিস ছিল তা বলাই বাহুল্য।

ঝগড়াতে তো ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, স্কুলে এহেন মেয়ে বা পাড়ায় এ হেন ছেলে বা মেয়ে ছিল না যার সঙ্গে আমার, “দো দো হাত হয়নি”, এমনকি আমার বয়ফ্রেন্ড ও সাক্ষী দিতে পারবে যে মিটারে গন্ডগোল করার জন্য কত ট্যাক্সিওলার কলার আমি চেপে ধরেছি।

বাসে একটু সুড়সুড়ি কাকুদের গুঁতো দেওয়া থেকে, কোনো ছেলে কোনো বাজে কথা বললে, তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে গলিতে ডেকে হাত মুচড়ে দেওয়া , ঢিল মেরে মাথা আলু করে দেওয়া তাতে ও আমি ফার্স্ট। হুঁ হুঁ বাবা, পড়াশোনায় ভালো বলে নেকুপুষুমুনু হতে হবে কে বলেছে?

এখনো আমি বয়েস সেকশন ক্লাস টেন, ছেলেরা বাইরে তাকাবে বলে দরজা বন্ধ করে ক্লাস নিই। আর আমার টিন এজে? কোনো ছেলে আমাকে কিছু বলার প্রস্তুতি নিলে পাশের জন্য বলতো, “বলো, জুতো খাবার ইচ্ছে হলে বলতে পারো”।

এ হেন সাদাসিধে আমি, আমাদের ছোট বেলায় একটা ফিস্ট আমরা প্রায়ই করতাম, চা ফিস্ট। তাতে কেউ একজন বা দুজন বাড়ি থেকে একটু কাগজে করে লুকিয়ে চা পাতা নিয়ে আসতো। সে আনার জায়গা হলো ভেতরে পড়বার প্যান্টের কোমড়ের গার্ডারে মুড়িয়ে। কেউ ফ্রকের ঘেড়ের আড়ালে একটা অ্যালুমিনিয়াম বাটি, আর ঐ রকম ই কারো বাড়ি থেকে একটু চিনি কালেকশন।

পুকুরের মাঠের এক কোণে তিনটে ইট পেতে উনুন, আর কাগজ এদিক ওদিক থেকে কুড়িয়ে এনে জ্বালানি। আমবুড়ো(যাকে নিয়ে আমার একটা গোটা উপন্যাস আছে,” আবলদা”) ও দাদার পকেট ম্যানেজ করে দেশলাই। তখন আমাদের মত প্রায় বস্তির ছেলেপিলেদের কাছে এই জিনিস গুলোও মহার্ঘ্য।

এ তো সব হলো, কিন্তু দুধ? সে তো মূল উপাদান। কারণ তখন থ্রি ফোরে পড়া বাচ্চাদের কাছে চা ছিল নিষিদ্ধ তাই অত্যন্ত লোভনীয়, তাও আবার দুধ চা। মানুষ তখনো এতো হেলথ কনশাস ছিল না, তাই লিকার চা বস্তুটি তখনো অজানা।

দুধের জন্য ওৎ পেতে থাকতাম। যেই একরামুলদের কালো ছাগল টা ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়তো মাঠের চৌহদ্দি তে, আর পায় কে? চার পাঁচজন হেঁইও হেঁইও করে কান টেনে, পেট ঠেলে একটু আড়ালে নিয়ে যাওয়া। সে বাবাজি যতো চ্যাঁচায়, “ব্যা ব্যা ব্যা.. “, আমরাও মুখে ঠেসে গুঁজতে থাকি, কাঁঠাল পাতা, ঘাস, পেয়ারা পাতা, ” খা, খা, খা.. “, ব্যস। কেল্লাফতে! ততক্ষণে আমাদের চ্যাই চুই সারা।

সেই দুধ দিয়ে ট্যালটেলে চা, ছাঁকনি ছাড়া, তাই আছাঁকা, বিস্বাদ, একটু লালচে একটু সাদাটে। আহ্ তার স্বাদ যেন অমৃত। বড়দের মতো সুরুৎ এক বিশাল লম্বা আওয়াজ করে টানতাম, আর এখন যেমন কাউন্টার ঘোরে তখন তেমনি করে কুড়োনো কাগজে ধরে বাটি ঘুরতো এহাত ওহাত।সে স্বাদ…… আহ্ থেকে আহা পর্যন্ত…

 

shampa saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top