চড়ুই পাখিটা ভিজছে

 6 total views

অণুগল্প — চড়ুই পাখিটা ভিজছে

সুব্রত সরকার

বৃষ্টির গান শুনেই ঘুম ভাঙ্গল আজ ব্রতীনের। চুপিসারে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল।

ভোরের বৃষ্টিতে মিষ্টি এক সুবাস। ব্রতীন বড় করে শ্বাস নিয়ে এ আঘ্রাণ নিল।

পূর্বাভাষ ছিল, আগামী দু’একদিন হাল্কা থেকে মাঝারি ধরণের বৃষ্টি হতে পারে। মিলে গেল সে কথা। হাল্কা নয়, বেশ ঝিরিঝিরি বৃষ্টি দিয়েই শুরু হল সকালটা। মেঘ কেমন সাজুগুজু করে আছে, কালো গুমোট মেঘ হুড়মুড়িয়ে নামতেই পারে ইচ্ছেমতন!…

ব্রতীন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভোরের এই বৃষ্টি দেখছে। বৃষ্টির ছাট, রেণুকণাগুলো গায়ে মাখছে। এবছর তেমন কালবৈশাখী হয় নি। গরম ছিল প্রবল। এই এক পশলা বৈশাখী বৃষ্টি মনে-প্রাণে বেশ স্বস্তি এনে দিল। আর কদিন পরই কবির জন্মদিন। সব বাঙ্গালির শ্রেষ্ঠ দিন!

একটা চড়ুই মগডালে বসে দিব্যি ভিজছে। রক্তকরবীর এই গাছটা মুনিয়া রথের মেলা থেকে এনে লাগিয়েছিল। গাছটা এখন কি সুন্দর ডালপালা মেলে যৌবনবতী হয়ে ফুল ফুটিয়ে হাসছে। এই রুদ্রবৈশাখের বৃষ্টিভেজা রক্তকরবীর গুচ্ছগুলো দেখে ব্রতীন কেমন আনমনা হয়ে যায়।

“চড়ুইটার আজ হল কি! বৃষ্টিতে ভিজেই যাচ্ছে। ওরে পাখি, তোর ঠান্ডা লেগে যাবে রে!”… ব্রতীন কবির কল্পনায় হঠাৎ বলে ওঠে মনে মনে। তারপরই ভাবতে শুরু করে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ে মানুষকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। সরকার ল্যাজেগোবরে। ডাক্তারবাবুরা লড়ে যাচ্ছেন। মানুষজনরা ঘরবন্দী জীবনে আবার অভ্যস্ত হতে শুরু করেছে। আংশিক লকডাউনে চারপাশ কেমন প্রাণহীন, নিমর্ম নির্জনতায় ছেয়ে যাচ্ছে।

ব্রতীন আজ অফিস যাবে না। সপ্তাহে তিনদিন করে দিয়েছে ওর অফিস। ভাগ্য করে এমন একটা চাকরী পেয়েছিল, এত বড় একটা বিপর্যয়ে চারপাশে অর্থনৈতিক মন্দা, ও সেভাবে কিছু বুঝতেই পারল না। স্যালারী কাট, হাফ স্যালারী, লেট স্যালারী কিছুই হয় নি!….

“ও চড়ুই, তুই কি জানিস করোনা একটা রোগের
নাম? পাখিদের সংসারে বুঝি করোনা আসে নি! তুই যে এমন করে ভিজছিস, তোর ঠান্ডা লেগে সর্দি হতে পারে, জ্বর হতে পারে, করোনা হতে পারে রে!”…ব্রতীন এমন বিভোর হয়ে কবির ভাবনায় ডুবে যায়। ওর মন চাইছে ছাদে গিয়ে এই বৃষ্টিতে ভিজতে। বৃষ্টি গায়ে মেখে ছাদে হাঁটতে, গুন গুন করে গাইতে! কিন্তু সাহস হচ্ছে না! যদি ঠান্ডা লেগে যায়! সর্দি- জ্বর আসে। করোনাও তখন চলে আসতে পারে পিছু পিছু!…

“একি তুমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছো!” মুনিয়া ঘুম ভাঙ্গা চোখে হঠাৎ উঠে এসে অবাক হয়ে ধমক দেয়,”এক্ষুনি ঘরে ঢোকো। এই বৃষ্টির ঠান্ডা বাতাস লেগে সর্দি – জ্বর হলে কি বিপদ হবে জানো না!… দেখছো তো চারপাশে কি অবস্থা। দু’ডোজ ইনজেকশন নেওয়া লোকেদেরও করোনা হচ্ছে! হসপিটালে বেড নেই, অক্সিজেন নেই!…”

মুনিয়ার ধমক খেয়ে ব্রতীন বাধ্য হয়ে বারান্দা ছেড়ে ঘরের দিকে পা বাড়াল। চড়ুই পাখিটা তখনও দিব্যি ভিজছে।…
“ও চড়ুই, তোকে দেখে খুব হিংসে হচ্ছে রে! বৃষ্টির আদর তুই আমার চোখের সামনেই কেমন লুটেপুটে নিচ্ছিস। আমার বড় হিংসে হচ্ছে রে!…” ব্রতীন আনমনে বিড়বিড় করতে করতে মুনিয়ার পিছু পিছু ঘরের অন্তরালে হারিয়ে গেল!….

।। সমাপ্ত।।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *