ছায়া মিথুন – ফজলুল হক

 

এক 

রাত-অন্ধকারের চেনা আতঙ্ক তখন আমার সারা শরীর জুড়ে । আলোকোজ্জ্বল এক শূন্যতার ভিতর তারকাদের সম্মিলন । কারা কতজন জানি না । শুধু পূর্বের মতো সঙ্গীদের শারীরিক আকারকে বিবর্ণ ছায়ায় পরিবর্তিত করে ফেলেছে । চিনতে পারি না । হৃদয়ের দরজাটি খুলেও চিনতে কষ্ট হয় ।

প্রতি রাতে ওর নিশ্বাসের শব্দ অন্য যাবতীয় শব্দকে ছাপিয়ে উঠত, আমি সেই শব্দে ঘুমিয়ে পড়তাম । ওর নিশ্বাসের শব্দে ভরে যেত খাট, বিছানা শহরের রাস্তা আর বিদ্যুতবাহি খুঁটিগুলি । তাদের মাথার উপর আলোগুলি নেচে উঠত । এমন কি গোটা পৃথিবী । ঘুমিয়ে যাবার পর রাতের অন্ধকারে নিজের স্থান খুঁজে নিতেও পরে ওকে জড়িয়ে ধরতে কোনও অসুবিধা হত না । তারপর জানি না সেও কেমন করে কোন অলৌকিক ক্ষমতায় আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরত । আর ঘুমের মধ্যে কিছু অশ্লীল সংলাপ জুড়ে থাকত আমাদের দুই জোড়া ঠোঁটের প্রান্ত সীমা ছুঁয়ে । যৌনতার ছন্দ সম্বন্ধে সহজাত জ্ঞান আর ভঙ্গিমার বিবরণ এক অর্ন্তলীন অশ্লীলতা আমাদেরকে নিবিড় সম্পর্কে বেঁধে দিত । এইভাবে একদিন নয় অনেক অনেক দিনের নিয়মিত মাঝ রাতের গোটাটাই ব্যবহার করে সুখ ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে ভোর রাতের ঝি ঝি পোকার ডাক থামিয়ে ওর নিশ্বাসের শব্দ শুনতাম ।

আজ নিশ্চিত হতে পারি না এই সব আতঙ্ক জড়ানো অদৃশ্য ছায়াগুলি একদিন প্রতরণার দায়ে অভিযুক্ত হবে কি না । অথবা আমি । এমন ও হতে পারে একে অপরকে প্রতারক বলে চিনে নিতে পারি । একা আছি বলেই নিজের সাথে নিজের পাগলামি শুরু হয়ে যাবে ফেলে আসা মৃতরাতগুলির মতো । দেখছি বারবার দেখছি চারপাশের ছায়াগুলিকে যেগুলি বারবার আমার একাকীত্বের সঙ্গী হয়েছে তার অনুপস্থিতিতে । তেমনটাই আজকের রাতটি আমার শরীরে নিবিড় হতে চাইছে । আর প্রতিরাতের মতো ছায়াদের একটির কন্ঠস্বর চেনা বলে মনে হচ্ছে । নিঃসঙ্গ সময়ে নির্জনতার আতঙ্ক আমাকে চেপে ধরল । সে নেই , তাকে ফোন করব তেমন কাজে তার আপত্তি জানিয়ে গেছে । বলেছে , রাতে আমি মেয়ে ও নাতিকে জড়িয়ে থাকবো , ফোন করে আমাকে বিরক্ত করো না ।

আমাদের একমাত্র মেয়ে আর একমাত্র নাতি । থাকে দূর দেশে । সেখানে সে ওদের সাথে নিপুন ভাবে উষ্ণতা ও শীতলতাকে মিশ্রিত করবে তার পছন্দানুযায়ী ।

এখানে আমি দেখতে পাচ্ছি রাতের আক্রমণগুলি আমাকে আমার অবস্থান থেকে সরিয়ে দিচ্ছে । চেনা কন্ঠস্বরটি ক্রমশ আরও আতঙ্কিত করে চলেছে । এবার হয়তো মরেই যাবো । আমার মাংসপেশী দ্রুত উড়বে মহা শূন্যতায় । নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকি যে কোনও স্পর্শনযোগ্য বস্তুর জন্য । শক্ত প্রতিরোধ তৈরি করতে না পারলে ছায়াটি শারীরিক প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হবে ।

পারি না । একাধিক ছায়া । চেনা কন্ঠস্বরটিতে কান দিলাম, পালিয়ে যেতে পারবে না । তোমার এই অন্ধকার সারা জীবন আলোকিত হবে না । এই অন্ধকার গতিময়।
আজ সকালে চায়ের টেবিলে আমার নিজের হাতে বানানো চা আর তার সাথে মুড়ি চানাচুর খাচ্ছিলাম । তখন আচমকা আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো । মাথা ঘুরছিল । চেয়ার ছেড়ে উঠবার ক্ষমতা হরিয়ে ফেলেছি । তবু কীভাবে আমাদের দীর্ঘ যাপনের ছবিগুলি বন্দি এ্যালবামটি নিয়ে এলাম জানি না । ছবিগুলি দেখছিলাম । বয়স অনুসারে পর পর স্মৃতি চাগিয়ে দিচ্ছে । সত্তর বছর ! এতদিন ধরে পৃথিবীতে আছি ? বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে তার কথা মনে পড়ল । সেও আছে । কীভাবে আছে ? সব দিনগুলি কি আলোকোজ্জ্বল ছিল ? অবাঞ্ছিত ভাবনার সাথে অবাঞ্ছিত দিনের কথা মনে পড়ল । শুরুতে কথা দিয়েছিলাম , তাকে ছেড়ে কোনোদিন কোথাও যাবো না । কথা রাখার দায় থেকেই কি এই সহবাস ? কোনও উত্তর পাইনি ।

এখন এই ভয়ংকর ছায়ার আধিপত্য বিস্তারকারী রাত মহান নৈশব্দের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেতে চলেছি । অন্ধকার যত ঘন হচ্ছে চেনা কন্ঠস্বরটি তত নিবিড় হতে থাকে ।

দুই 

অভাব তার প্রিয় সঙ্গী । এটা আছে তো ওটা নেই । মুফত টেপা কলের পানি , সেটাও নেই । কলসির অভাবে জল সঞ্চয় করা হয় না । ঘটি , বদনা, জামবাটিতে যতটুকু জল ধরে রাখা যায় । এমন একটি নিরাভরণ অকৃপণ আলো বাতাসের প্রেমলীলায় শাকিলার আনন্দসংসার । পবিত্র নগ্ন উঠানের এক কোণে একটি অতি পবিত্র নির্দোষ হাসনুহেনার ফুলবাহার । যার সুগন্ধে গোটা গ্রাম মাতোয়ারা। এই ফুলগাছটির প্রতি শাকিলার আদর যত্ন মাত্রাতীত । অনেকটা দিলরুবার মতো । এই তুলনা প্রতিদিন শাকিলার মনের ছায়ামঞ্চে আবির্ভাব ঘটে । তারপর দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে সারাদিনের রঙ্গমঞ্চ । এসব জীবন শুরুর গোড়ার কথা । পরে নদী বয়ে যায় । দারিদ্র টপকাতে অনেকগুলি বছর স্মৃতি হয়ে গেছে । এখন জীবন ধারা বদলেছে । মেয়ে বলে লাইফ স্টাইল । ফিল্পকাট আমাজন থেকে ওন লাইনে কেনা কাটা । শাকিলা পছন্দ করে না । শাসন করে মেয়েকে , এভাবে খরচ করিস না রুবি । মেয়ে কথা শোনে না । শাকিলার যত রাগ ঝড়ের বেগে আছড়ে পড়ে আমার ওপর । তোমার জন্য, কেবল তোমার জন্য মেয়েটা বিগড়ে গেল ।
আমি কি মেয়ের সব কিছু পছন্দ করি ? করি না । তবে মুখে কিছু বলি না । মেয়ে প্রশ্রয় পায় আমাদের শান্তি বিঘ্নিত হয় । পরস্পর মিথ্যাচারের নর্দমা থেকে অবাঞ্ছিত গন্ধ মাখি । ওর ইচ্ছে ছিল , মেয়ে অধ্যাপনা করুক । মেয়েদের উপযুক্ত কাজ । রুবি তর্ক করে , কাজের আবার ছেলে মেয়ে হয় নাকি ? যত সব প্রাচীন ধারণা । আমি করপোরেটে চাকরি করবো । লাইফ আছে । ইচ্ছে মতো খরচ করার অর্থ সরকারি চাকরি দিতে পারে না ।

শাকিলার অভাবের আনন্দ সংসার হারিয়ে যায় । এত প্রাচুর্য এত অর্থের বৈভব সংসারের সে আনন্দটুকু ফেরত দিতে পারে না । চিন্তা ভাবনায় শত বর্ষ পেছনে আমরা । আমি মেয়ের আধুনিকতাকে প্রশ্রয় দিয়েছি । ওর সময়ের সাথে আমার সময়কে মেলাবার চেষ্টা করেছি । ওর পছন্দ মতো বিয়ে দিয়েছি । এসব করার মধ্যে আমার কোনো মিথ্যাচার ছিল না । এসব গোটাটাই সাদা,মাটা গল্প । এর মধ্যে কোনো বাহবা নেই । ভিন্ন ভিন্ন বর্ণে সংসারের রূপ বদলে যায় । উপভোগের আনন্দোজ্জ্বল দিনগুলি একেবারে ফেলে দেবার নয় । আমারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি । এই দিনগুলিতে শাকিলা নিরাপত্তার অভাব্ বোধ করত । সে জানত, সুখ দুঃখের খুব ই নিকটবর্তী জায়গায় অবস্থান করে । কী ঘটবে নিশ্চিত করে বলা যায় না। শাকিলা বলতো, আমরা যে মাটির উপর দিয়ে হাঁটছি , এটার ওপরের স্তরে রয়েছে লাল- কালো –ধূসর রঙের মাটি , নীচে সাদা বালির স্তর । বোর করলে জলের ফোয়ারা মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে । তবে একথা তুমি কখনোই দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারবে না যে, জলের ধারা নিশ্চত বইছে ।

এই কথাগুলি যখন শাকিলা বলে, তখন তার অদ্ভুত চেহারা দেখে হতবুদ্ধি হয়ে যেতাম ,ওর কাঁচা-পাকা চুল কখনো মনে হতো বাদামী, অথবা কাদাময় জলের মতো । সেখান থেকে হতাশা বেরিয়ে গোটা বাড়িটার চারপাশের হাওয়ার সাথে মিশে যেত । আসলে আমরা শান্তির জন্য বেশি প্রত্যাশা করেছিলাম ।

মেয়ে দূর দেশে চলে যাবার পর আমার ঘরের জানালা দিয়ে আর দক্ষিণ-পূর্ব বাতাস খেলে না । আকাশ বহু অবাঞ্ছিত বর্ণে বর্ণে বিবর্ণ । পৃথিবীর উপরিতলে কোনো প্রবহমান নদীর ধারা দেখতে পাই না, জমি ডাঙা-ডহর,বনভূমি, গ্রাম-শহর, এমনকি আমার প্রতিবেশীরা পেছনের দিকে দ্রুত সরে গিয়ে মাত্রাধিক দূরত্বে পৌঁছে গেছে । বিষাদের অশ্রুজল ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া এক বিরাট নদী । সেই নদীর জলধারায় জল শুধুই জল । এভাবে ভাসতে ভাসতে অবসর যাপনের দিনটিতে পৌঁছে গেলাম । সরকারি দপ্তর থেকে সৌজন্য বিদায় জানাবার দিনটিকে মনে হল একটি শূন্য খোলস, যেখান থেকে জীবনের প্রতিষ্ঠাচিহ্ন সরিয়ে ফেলা হয়েছে । যেন মানব সত্ত্বার উপস্থিতির কোনো চিহ্ন বা গন্ধ থাকে না । তখন আবার মনে হয় পৃথিবীতে আমি এতদিন ধরে আছি ! এই পৃথিবী প্রাচীন দুঃখে ভারাক্রান্ত দুর্গন্ধময় ।

তিন 

ছায়ার লাম্পট্য আতঙ্ক অশরীরী শরীর হতে চাইছে । চিৎকার করে উঠি , দাঁড়াও এসো না , কাছে এসো না । যদিও এই কাছে আসাটা পূর্বে বার বার ঘটেছে আর আমি ডুবে গেছি এক অন্ধকার আলোকময় সমাপ্তিতে । তখন শাকিলার মুখ শুধু তার ই মুখ। এই অবাঞ্ছিত ঘটনাটি যে মনে মনে লালন করি সেটা স্বীকার থ করি । পেছনের ছায়াগুলি হারিয়ে যায় । একমাত্র আমার সম্মুখের ছায়াটি ক্রমে রূপ বদল করতে থাকে । শাকিলাও কি নিঃসঙ্গ রাতগুলিতে আমার ই মতো ছায়াদের আক্রমণ সহ্য করে ? শূন্যতাকে আলিঙ্গন করে ? ওর মুখ স্পষ্ট হয় । লক্ষ্য করি তার চোখের নড়াচড়া ,তার নাসারন্ধের আক্ষেপ বক্র মুখ,ভ্রুর কুঞ্চন আর থুতনির গাম্ভীর্য । এই টুকু দেখার মধ্যে কোনো মিথ্যাচার লুকিয়ে ছিল না । এ কথা ঠিক আমাদের মিথ্যচারের কলাগুলি স্বাধীনতায় বিস্ময়াভিভূত অনুরাগের গোপনতা থেকে হড়পা বানের মতো বেরিয়ে আসে । শূন্যতার এই রাতে অলৌকিক ভাবে পুননির্মত হতে থাকে সুক্ষ্ম ভালোবাসার বিন্যাস আমার ভিতর । এই মুহূর্তটার ভিতরকার সময়টুকু এক আলোকোজ্জ্বল মহাকাশ । পুরুষের চোখের জল উপভোগ করার সৌভাগ্য শাকিলার কোনোদিন হয়নি , এই উদ্ভাসিত মুহূর্ত জ্বলন্ত অশ্রুগ্রন্থি থেকে থেকে ধীর গতিতে নেমে আসা অশ্রুজলের ধারা শাকিলার দৃষ্টির অগোচরে । ক্রম বিবর্তনে শাকিলার অবয়ব ফিরে পেতেই আমি শান্ত হয়ে উঠি, এত ভয় দেখাও কেন ? জিভ শুকিয়ে দম বন্ধ হয়ে যাবে যে একদিন ।

শাকিলা মুখ চেপে ধরে , চুপ ! একটি কবরে দু’জনের লাস থাকবে একথা ভুলে গেলে ? কথা বলো না আর । একটু শান্ত হয়ে ঘুমাও ।

শাকিলার চুম্বনে ঘুম ভাঙল । জানালা দিয়ে রোদ্র কিরণ গোটা বিছানা আলোকিত করে রেখেছে ।

প্রতি রাতে এইভাবে আমি ঘুমিয়ে পড়ি । ছায়াদের আক্রমণ সহ্য করি ।অদৃশ‍্য শাকিলা এসে শান্ত করে ।

তারপর সকালে বাস্তবে র ছবি ফুটে ওঠে , দেখি বিছানা শূন্য । সূর্য কিরণে ঘন ছায়ার আস্তরণ । আবার একাকী দৈনন্দিনের প্রস্তুতি ।

ফজলুল হক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top