ছোটগল্প

 6 total views

আঙুল
শেখ মাফিউজ তামিম আকাশ

 

হেলাল মিয়া ধাঁরালো কাস্তে হাতে নিয়ে ক্ষেতে এসেছে । ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল জ্যৌষ্ঠ মাস আসতে গেল এর মধ্যেই ক্ষেতের সব ধান কেটে গোলায় তোলাও হয়ে গেছে ।

তারপরেও ক্ষেতে অনেক জায়গায় ধান পড়ে আছে,  পাখি এসে খাচ্ছে।এই সময়টা মানুষের সাথে সাথে পশু পাখিদের জন্যও সুখের সময় কারণ পাখিরা ধান খেতে পারে ,ক্ষেত থেকে ঠোঁটে করে একটা একটা খড় নিয়ে নিয়ে ঘর বাঁধতে পারে আবার গলার দড়ি খুলে গরু ছাগলদেরও ক্ষেতে ছেড়ে দেওয়া হয় তারা মনের আনন্দে ক্ষেতের চারপাশের ভেঁড়ির গা বেঁয়ে যে ঘাস থাকে তা খেতে পারে, স্বাধীনভাবে চড়ে বেড়াতে পারে,লাফালাফি ঝাপাঝাপি করতে পারে ।ছোট ছেলেমেয়েরা ঘুড়ি উড়ায় কত রঙবেঙের ঘুড়ি।দারুণ লাগে দেখতে যেন আকাশে এক রঙের মেলা হচ্ছে আর সেই মেলায় ঘুড়ির শব্দ কতই না অপূর্ব লাগে শুনতে!

গ্রামের উঠতি বয়সের মেয়েরা এক সাথে বাতাস খেতে আসে বিলের রাস্তায় তখন ছেলেরা আড়চোখে তাদের দেখে ও হাসি তামাশা করে ,হইহুল্লোড় করে বিলে একটা বিকালের দিকে উৎসব উৎসব ভাব জমে ওঠে চারদিকে সাথে বাতাসের সা সা শব্দে যেন মনের ভেতরও আনন্দের দোলা দেয় ।হেলাল মিয়ার চোখে পানি এসে যায় এইসব ভাবতে ভাবতে।সে দেখে উত্তর দিকের তাল গাছের কয়েকটা পাতা শুকিয়ে নিচের দিকে পড়েছে।গাছটার দিকে সে এগিয়ে যায় পাতাটা গাছ থেকে পাড়ার জন্য।গাছের চারপাশটায় বড় বড় ঘাস হয়েছে,  পা দিতেই ঘাস যেন হেলাল মিয়ার পা দু খানাকে নিজের ভেতর টেনে নেয়।হেলাল মিয়া তাল গাছটার নিচে এসে একটু শান্তি পায় কারণ রোদে চারদিক খা খা করছে।সে তালপাতাটা টান দিতেই মাটিতে পড়ে যায় ও তার চোখে গাছের গুঁড়ো পড়ে।

হেলাল মিয়া কাঁধ উঁচু করে চোখটা মোছে আর তখনই তার তার ডান পায়ের ছোট আঙুলটি অসম্ভব জ্বালা করে।চোখ মেলে দেখতেই সে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় সাপটি দেখে।কালকেউটে খুবই বিষাক্ত সাপ বিষ নিক্ষেপও করে তবে এই শুকনা খটখটে জায়গায় কি করে?
কালকেউটে শামুক খায় বেশি অথচ আশপাশে কোথাও কোনো শামুক হেলাল মিয়া দেখে না তবে এরা ইঁদুরের গর্তে থাকে এখানে নিশ্চয় কোথাও ইঁদুরে গর্ত আছে কিন্তু পাঁচ ছয় হাতের মত লম্বা সাপ ইঁদুরের গর্তে থাকবে কিভাবে?এতকিছু সে ভাবতে ভাবতে    দেখল সবুজ ঘাসের উপর দিয়ে সাপটা চলে গেল অথচ ঘাস তাকে নিজের ভেতর টেনে নিল না।আশ্চর্য কান্ড!হেলাল মিয়া কি করবে বুঝতে পারছে না ।যন্ত্রণায় পাগল হয়ে সে দ্রুত হাতের কাস্তে দিয়ে কোনো কিছু না ভেবেই তার ডান পায়ের  ছোট আঙুলটি কেটে ফেলল।রক্ত গলগল করে বের হতে লাগল।হেলাল মিয়া বসে পড়ল ও  লুঙ্গি  থেকে একটু কাপড় ছিঁড়ে নিল ও ঘাস চাবিয়ে কাটা জায়গাটায় চেপে ধরল।রক্ত বন্ধ হলে সে বাড়ি ফিরে আসল খুব সাবধানে।
শফিকে দেখে বলল –  ডাক্তারের কাছে নিয়ে চল আমার সাপে কেটেছে।
শফি তার আব্বার কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল।সে আব্বার মাথা থেকে পা অব্দি দেখল ।পা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে
অবাক হয়ে বলল -কি বলছ  তুমি?কিভাবে কামড়ালো ,কখন কামড়াল ,কোথায় গেছিলে তুমি আর পা দিয়ে এত রক্ত বের হচ্ছে কেনো?
তারপর সে দম ছাড়ল ।

হেলাল মিয়া বলল -ভ্যান নিয়ে আয় যা।
শফি দৌড়ে গিয়ে পাশের বাড়ি গেকে ইকবাল চাচার ভ্যান নিয়ে এলো ও হেলাল মিয়াকে  ভ্যানে উঠিয়ে তার পা শফি নিজের  উরুর উপরে রাগল।

জয়নাল ডাক্তার সব দেখেশুনে বলল- ভালো করেছেন আঙুল কেটে, বিষ সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে যেতে পারে নি ।যেটুকু গেছিল রক্তের সাথে বের হয়ে গেছে ।ব্যান্ডেজ করে দিয়েছি ।সাবধানে হাটা চলা করবেন।পা টা উঁচু করে ঘুমাবেন ও বেশি নড়াচড়া করবেন না।কিছু অ্যান্টবায়োটিক দিচ্ছি।ঠিক মত খাবেন।

হেলাল মিয়া বিরস মুখে বলল-আচ্ছা।
রক্ত এখন আর বের হচ্ছে না।ব্যান্ডেজ করে দিছে বলে।তবে পা ফেলতে কষ্ট হচ্ছে কেমন যেন দুর্বল দুর্বল লাগছে হেলাল মিয়ার। ইকবালের ভ্যানে আসার সময় পা ঝুলিয়ে বসতে চাইলে শফি বাধা দিয়ে বলল- ডাক্তার তোমাকে  পা উঁচু করে রাখতে বলেছে।তুমি ভ্যানে উঠে আমার কোলের উপর পা দাও।
হেলাল মিয়া বিরক্তি চেপে বাধ্য ছেলের মত ছেলের কথা শুনল।

দিনদুই পরে সে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছে।এই দুদিন শুয়ে থেকে তার দম বন্ধ হবার মত অবস্থা হয়েছে।সে কাজ ছেড়ে মোটেই থাকতে পারে না।ব্যান্ডেজটা খুলে ফেলেছে গত কাল রাতে অসহ্য লাগছিল বলে।সে পায়ের দিকে তাকাতেই তার বুকের মধ্য ধক করে উঠল।একটা আঙুল নেই ।কেমন যেন বিশ্রী দেখাচ্ছে।সে আর ঘরে থাকতে পারছে না যেন ক্ষেতের সেই তালগাছটা তাকে তার কাছে টানছে! তার ডান পায়ে যেখান থেকে কেটে ফেলেছিল সেখানটায় শক্ত করে চেপে ধরে মনে মনে বলল এবার সুন্দর দেখাচ্ছে বাহ, পাঁচটা আঙুল না হলে কি আর পা ভালো দেখায়?
ভাবতে ভাবতেই অল্পক্ষণের মধ্যেই  তার মুখ দিয়ে সাদা ফেনা  বের হতে শুরু করল ,গায়ের বর্ণ নীল হয়ে গেল সে চোখে ঝাপসা দেখতে দেখতে ঘাসের উপর পড়ে গেল………..

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *