জীবনবাদী সময় চেতনার কবি শান্তনু – তৈমুর খান

 

[post-views]

 

[printfriendly]

 

 

ডাক্তার শান্তনু গুড়িয়া(১৯৭৫) ব্যস্ত জীবনের মধ্যেও সাহিত্যকে ভালবেসে দীর্ঘদিন কাব্যচর্চায় রত আছেন। সম্প্রতি তাঁর একগুচ্ছ বই: ‘ঢাক ঢাক গুড় গুড়'(২০২০), ‘গুড়িয়ার অণু-পরমাণু'(২০২০),’প্রেম আসে, প্রেম যায়'(২০২০), ‘তিতির'(২০২০), ‘বাবলু and বাবলু'(২০২০), ‘মার্স অথবা মনে'(২০২০), ‘ভালোবাসার নেই সময় অসময়’ (Love’s not Time’s Fool: বিমান খানের অনুবাদ সহ:২০২০), ‘আগুনে রেখেছি হাত'(২০২০), ‘এক ডজন ছড়া'(২০২০), ‘বয়স বাড়ছে বলে'(২০২০), ‘এই অসময়ে'(২০২০), ‘চার্লাইনে চমৎকার'(২০২০) প্রভৃতি হাতে এসে পৌঁছেছে।

এত কম সময়ের মধ্যে অর্থাৎ নভেম্বর ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই বইগুলি প্রকাশিত হয়েছে। শান্তনুর কবিতা সম্পর্কে অনেক পাঠকেরই ধারণা আছে, তিনি সাহিত্যের নতুন কোনো ধারায় কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে পা বাড়াননি। তিনি তাঁর সময়কে দেখেছেন; জীবনকে দেখেছেন; জীবনের ব্যঙ্গ, অবক্ষয়, কুশ্রিতা, বিপর্যয়কেও দেখেছেন। মূল্যবোধহীন সমাজের অমানবিক রূপ যেমন তাঁর কাব্যে প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি প্রাণান্তকর জীবন সংগ্রামের রূপও ফুটে উঠেছে। আমাদের জীবনে যা আছে, সমাজে যা ঘটছে, রাষ্ট্রীয় অনুশাসনে যে উৎপীড়ন ও শ্রেণিবৈষম্যের সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে তার গভীর পর্যবেক্ষণ আছে।

এতদসত্ত্বেও সাহিত্যকে তিনি তাত্ত্বিক সৃষ্টির গাম্ভীর্য দান করেননি; বরং হালকা চালে এক মেধাবী রসিকতায় ছান্দিক দীপ্তি দান করেছেন। তাই ছড়া এবং কবিতাগুলিতে বিবেকের হালকা চাবুকের ঘা আমরা উপলব্ধি করি। সামান্য জ্বালা হয়, আবার তা শীতলও হয় অসাধারণ কৌতুকে। অণুগল্পগুলিতে জীবনের দ্রবণ ঘনীভূত হয়ে উঠেছে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।  তাঁর দেখার মধ্য দিয়েই আমরা অনেক না দেখাকে দেখতে পেয়েছি। নিজের কথা তিনি এভাবেই লিখেছেন ‘ঢাক ঢাক গুড় গুড়’ কাব্যে:

 “আমি আছি আমার মতো আমি

 নাড়ি-ঘাঁটি কবিতাময় অখণ্ড পাগলামি

 ভাবতে বসে তোমার মতো প্রিয়জনে

 কান্না লিখি ভেতর ঘরে নির্জনে।”

 অর্থাৎ কবিতাময় অখণ্ড পাগলামির মধ্যেও ‘ভেতরঘর’, ‘নির্জন’ এবং ‘কান্না’ যা একজন স্রষ্টার মর্মন্তুদ অভিনিবেশে আত্মোপলব্ধির স্বাক্ষর বহন করে। আমেরিকান বিখ্যাত লেখক ও চাক্ষুষ শিল্পী উইলিয়াম এস  বারোস বলেছেন:“Silence is only frightening to people who are compulsively verbalizing.” ~ William S. Boroughs অর্থাৎ নীরবতা কেবলমাত্র সেই লোকদের জন্যই ভয়ঙ্কর যারা বাধ্যতামূলকভাবে শব্দচালিত হয়।

এই যন্ত্রণার ভার বহন করেই শান্তনু কাব্য চর্চা করেন বলেই মানুষের হাহাকারকে নিজ জীবনের উপলব্ধিতে ধারণ করতে পারেন। বাৎস্যায়ন থেকে কামক্রীড়ার আলিঙ্গন, আনন্দে উদ্বেল নাচ থেকে সংযমের সুতো ছিঁড়ে বাসনার লক্ষ বেলুন উড়ানো তাঁর কাব্যের মধ্যে বসতি করলেও কষ্টগুলি উপেক্ষিত হয়নি। তা মানবীয় বৃত্ত থেকেই ধূসর প্রান্তরে উদ্গত হয়েছে আত্মক্ষরণের নির্বেদ বিবমিষায়:

“হাহাকার বেড়ে গেলে

ডিপ্রেশান পেড়ে ফেলে

অসময়ে ছিঁড়ে নেয় প্রাণ—

চূড়ান্ত স্বার্থপরতার এই যুগে

ভালোবাসা হীনতায় ভুগে

থেমে যায় হৃদয়ের গান।”

   ভালোবাসাহীন জীবন যে কত অসহায় তা কবিও জানেন। তিনি শুধু শরীরের চিকিৎসা করেন না, মনের ব্যারামও অনুধাবন করেন। এই সঙ্কট মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে যখন মৃত্যু মিছিল তখন ডাক্তার হিসেবে তিনি স্বপ্নও দেখান। জীবনের আশ্বাস দেন। ‘ভালোবাসার নেই সময় অসময়’ কাব্যে লেখেন:

 “স্বপ্ন তুমি দ্যাখো,আমিও—

স্বপ্ন ছাড়া কী-ই বা উপহার দিতে পারি

                              একে-অন্যকে!

 একটা সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন

 বুকের ভেতর সযত্নে লালন করা।”

 ইংরেজিতে এর অনুবাদ করেন বিমান খান:

“You dream, me too—

 What can I gift you accept dream

 To each other.

 I dream of a beautiful world

 Which is carefully cherished in my heart.”

এই স্বপ্নই ছড়িয়ে আছে তাঁর সমস্ত কাব্যগুলিতে। ‘বাবলু and বাবলু’ কাব্যে বাবলুর মধ্য দিয়ে জীবনের বাঁকগুলি তিনি চিনিয়ে দেন। রসিকতার সঙ্গে বাস্তবতার গল্প এবং জীবনের সঙ্গে জীবনসংগ্রামের নানা পর্যায় চিহ্নিত করেন। ১ থেকে ৪৪ টি পর্বে গ্রন্থিত হয় তার এই জীবন বৃত্তান্ত। ১-এ দেখতে পাই:

 “বাবলু দেরিতে ঘুমায়

 বাবলু ওঠে না তাড়াতাড়ি।”

            আর শেষ ৪৪-এ দেখতে পাই:

 “বাবলু কবিতা লিখতে জানে না

 বাবলু কবি হতে চায়।”

   বাবলুর সঙ্গে আমাদের অনেকেরই মিল খুঁজে পাই। এই জীবন কাটানো প্রাত্যহিক নানা টানাপোড়েনের দ্বন্দ্ব ও ধন্দে আমরাও বাবলু হয়ে যাই। বাঙালি জীবনের প্রতীক বাবলুই আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে সমুন্নত।

    বর্তমানের করোনা পরিস্থিতি আমাদের জীবনের অবরুদ্ধতা কতখানি মারাত্মক এবং সংক্রামক এই অসুখ থেকে কীভাবে আমরা রক্ষা পাবো কবি সেসব বিষয় নিয়েও ভেবেছেন। শীত, হিন্দু মুসলমান, দাম্পত্য, পরিবেশ দূষণ, নরনারী, ডাক্তার-রোগীর সংলাপ, আত্মহত্যা, উগ্রপন্থী, স্পাইডারম্যান, রাজনৈতিক নেতার বক্তৃতা প্রভৃতি কতকিছু নিয়ে তিনি ভেবেছেন আর পদ্য  গড়েছেন। বাইরের জগৎ আর মরমের জগৎ মিশে গেছে সেইসব পদ্যে:

 “অপরাধীরা বেড়ায় বুক ফুলিয়ে

 নিরপরাধ জেলে,

 নারীর দুঃখ বোঝে না নারী

 সন্তান চায় ছেলে!”

      যাঁরা নাম খ্যাতি ও যশের জন্য সাহিত্য চর্চা করেন না তাঁদের মধ্যেই অন্যতম হলেন কবি শান্তনু গুড়িয়া। তাঁর কাব্যগুলি হয়তো সেই কারণেই নিরীহ আটপৌরে গ্ল্যামারহীন পুস্তিকা। অন্তঃসারশূন্য আভিজাত্যের মোড়ক হয়ে ওঠেনি।

Taimur Khan
TAIMUR KHAN

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top