জয়বাংলা – আবু বাকার

– 

[post-views]

পাড়াগ্রামের ব্যস্ত বাজারে হঠাৎ গুঞ্জন উঠলো; কালিগংগার ওপারে সেরুখাঁর হাটে বৃষ্টি মাথায় মিলিটারি হেলিকপ্টার নেমেছে। যে যেদিকে পারে দে ছুট। নিমেষে হাটের মানুষ জন উধাও!

বৃষ্টিতে নিচে নামেনি পাক সেনারা। ভিতর থেকেই বুঝতে পেরেছে সিংগাইর থানার বর্ডারে নেমেছে হেলিকপ্টার! এ পারে পাড়াগ্রাম,  নবাবগঞ্জ থানার অধীনে।  পূর্বে কলাতিয়া, পড়েছে কেরানীগঞ্জ থানায়। দক্ষিণে তুলসীখালি, সিরাজদিখান থানার অন্তর্গত। পাকসেনা যেনো রেকি করে চলে গেলো।
কে জানে কি আছে ভাগ্যে!  ধীরে ধীরে তরুণ যুবারা গ্রাম থেকে হালকা হতে লাগলো।
পাড়াগ্রাম বাজারে লিপির বাবা জব্বারের চায়ের দোকানে প্রতি সন্ধ্যায় মানুষের জমায়েত হয় বেতারের খবর শোনার জন্য।
ইতিমধ্যে বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে সরকার গঠনের ঘোষণা শোনা গেলো। দেশের তরুণ যুবক সম্প্রদায়কে যুদ্ধে অংশ নিতে আহবান জানানো হচ্ছে।
পাকসেনারা জিঞ্জিরায় অপারেশন চালিয়ে চারদিকে জাঁলাও পোড়াও তান্ডব করেছে।
অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে!  বাড়িঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
কয়েকদিন ধরে অচেনা অজানা মানুষ পাড়াগ্রামে বিভিন্ন শিবিরে যাত্রা বিরতি করছে।
কয়েকটি নোংগরখানা খোলা হয়েছে। তিনবেলা তৈরি হচ্ছে চালেডালে খিচুড়ি।
গ্রামের মানুষ যে যার মতো সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। মিয়াবাড়ি সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দূরান্তর মানুষগুলো অনেক কিছু হারিয়েও যেনো প্রাণে বেঁচে কিছুটা শান্তি পাচ্ছে।
কলাতিয়া থেকেও কিছু কিছু মানুষ পাড়াগ্রামে এসে ঠাই নিয়েছে। দড়িকান্দা সিদ্দিক চৌধুরীর বাড়ির সব কয়টা ঘর ছেড়ে দিয়েছে অভ্যাগতদের জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসাইটে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক, নজরুলগীতির শিল্পী সুধীন দাশ, নীলিমা দাশ সপরিবারে আছেন এখানে।
হঠাৎ হেলিকপ্টারে মিলিটারি টহল গ্রামগুলোয় নজর দেওয়ায় বাধ্য হয়ে গ্রামের বাইরে চলে যেতে হয় তরুণ যুবকদের!
কলাতিয়ায় শরফুদ্দিন চুন্নুর কিছু ভক্ত আছে। এক সময় লজিং থেকে পড়িয়েছে ওদের।  এক দুপুর বেলা আমাকে নিয়ে চুন্নু হাজির হলো এক ভক্তের বাড়ি। বাড়ি ভর্তি দূর দূরান্তের মানুষ! চুলায় হাড়িতে রান্না চাপানো হচ্ছে আর রান্না শেষে পরিবেশন করা হচ্ছে। কালিগংগার দক্ষিণ পাড় ঘেষে জনগোষ্ঠীর এমন চেহারা খুঁজে মেলা কঠিন।
খাবার খেতে খেতে এমন তুলতুলে ভাত আর মাছের টুকরা দেখে আমি হতবাক হয়ে পড়ি! চুন্নু আশ্বস্ত করে আমাকে! এটা এ বাড়ির বারোমাসি চর্চা! খরা বন্যা যতই আসুক গোলাভরা উন্নত ধান আর পুকুরের  মাছ ঠিকই  সংরক্ষণ করে এবাড়ির মালিক!
জমিদারি প্রথা উঠে গেলেও বিত্তশালীরা পূর্বপুরুষের ধারা বজায় রেখে চলেছে। এ বাড়িতে ভাসমান মানুষের আনাগোনাই বেশি!
কে ঢাকা থেকে খোলামোড়া, আটি হয়ে কলাতিয়ায় এসে বিশ্রাম নিচ্ছে। গন্তব্য হয়তো নবাবগঞ্জ হয়ে পদ্মা পাড়ি দিয়ে ফরিদপুর,  কুষ্টিয়া,  যশোর কিম্বা খুলনা, বাগেরহাট!
সামরিক জান্তাও মাঝে মধ্যে এসে খাসি, মুরগী,  আর গরুর আশ্বাদ গ্রহণ করছে। সবদিক বজায় রেখে বাড়ির মনিব প্রাণের মায়া ভুলে মাটির মায়া ত্যাগ করতে পারেননি!
কলাতিয়ায় এসে জিঞ্জিরা অপারেশনের কিছু তথ্য নিলো চুন্নু।  এখানে প্রাণ দিয়েছেন উন্মেষ সভাপতি জহিরুল ইসলাম! উন্মেষ সদস্য বিক্রমপুরের শাহ আলম আর বক্স নগরের মনিরুল ইসলাম বাদলের উৎসাহে জিঞ্জিরার হোমিও ডাক্তার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের বাড়িতে আতিথ্যিয়তা নিয়েছিলেন!  জহির ভাই পোয়াতি ভাবীকে গেন্ডারিয়া রেখে দাওয়াত খাওয়ার জন্য এসেছিলেন চুনকুটিয়াতে! মিলিটারি অপারেশনের সময় পালাতে গিয়ে সেই যে নিখোঁজ হলেন আর খুঁজে পাওয়া যায়নি তাঁকে!
বারীন মজুমদারের কিশোরী কন্যা মিতুকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সংগীত একাডেমির বাবু ভাই উদ্ভ্রান্তের মত ছুটে বেড়িয়েছেন তুলশী খালি থেকে গালিমপুর, কোথাও পাননি মিতুকে!
আরও নাম না জানা কত মানুষ যে প্রাণ দিয়েছে তার হিসেব নেই।
শেষে আবার ফিরে আসি পাড়াগ্রামে! শরফুদ্দিন চলে যায় কোন্ডায়!
কৈলাইল ইউনিয়নে আজম ডাক্তারকে একবাক্যে মাটির মানুষ বলে জেনে এসেছে এলাকাবাসী!  নবাবগঞ্জ,  দোহার আর শ্রীনগরে অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার জন্য দারস্থ হয় পাড়াগ্রামের ডাক্তার খানায়। এমন কোন ডিগ্রী ধারী ডাক্তার নন তিনি! কিন্ত তাঁর হাতযশের সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে আছে!  সেবা নিতে মানুষ ছুটে আসে তাঁর কাছে! ঘোড়ায় চড়ে  গ্রামের পর গ্রাম রোগীদের সেবা করে চলেছেন!তারউপর আবার আছে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব! সরকারি নির্দেশে শান্তি কমিটির সব কাজও সার্বক্ষণিক তদারকি করতে হয়! নিজের ইউনিয়ন সহ আশেপাশের চেয়ারম্যানদেরও আশ্বস্ত করছেন!
শরফুদ্দিনের সাথে একটা অলিখিত চুক্তি হয়ে গেছে আমার। গ্রামে গ্রামে মানুষকে উদবুদ্ধ করার নেশায় একদল তরুণ দিনে দিনে প্রত্যয়ী হয়ে উঠছে!
আমার চাচাতো বোন রুবী ভালো রবীন্দ্র সংগীত গায়। পঁচিশে মার্চের পর ওরাও সদলবলে ঘর ছাড়া। পাঁচবোন, দুইভাই আর মাকে নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা বাবাও ঢাকার বাড়ি ফেলে শ্বশুরালয় কোন্ডাতে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। রুবী, শোভা, রেবা, জেস্মিন ও মনি এই পাঁচ বোন পিঠাপিঠি!  সবাই মিলে একটা গণসংগীতের দল করলে ভালো হয়। যতটা সম্ভব কাছাকাছি গ্রামে গ্রামে ঘুরে মা বোনদের উদবুদ্ধ করা যাবে।
কালিগংগার পাড়ে বসে একটা আলোকিত দিনের স্বপ্নে যেনো বিভোর হলাম আমরা।
হঠাৎ হেলিকপ্টার নামায় বাধ্য হয়ে আবার আমরা দলছুট হলাম। যে যার মতো একক ভাবে  সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে কাজ করে যেতে লাগলাম। নয়াকান্দা হাই স্কুলে তখনও ছাত্ররা উপস্থিত হতো ক্লাশ করার জন্য। অই গ্রামে অবস্থা কিছু শান্ত থাকায় কাছাকাছি গ্রাম থেকে ছাত্ররা কোন বাঁধা ছাড়াই স্কুলে আসতো।  হেড স্যারের সাথে পাড়াগ্রাম বাজারে কথা বলে দু’দিন ছাত্রদের ক্লাশ নিয়েছিলাম আমি। টগবগে তরুণ কিশোর ছেলেমেয়েরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমার লেকচার শুনে এরপর আর স্কুলমুখি হয়নি। সামরিক জান্তাকে প্রতিরোধ খালি হাতে করা যাবেনা, তাই বলে শিকারে পরিনত হতে হবে কেন?
ডাক্তার আজম বন্দুকে পাখি শিকার করতেন! একটা রাইফেল আর একটা বন্দুক সবসময় সাথে রাখতেন। একে তো ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তার উপর  শান্তি কমিটিরও চেয়ারম্যান।  যে কোন সময় শত্রুর মুখোমুখি হলেই আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করবেন।
কয়েকদিন আগে গালিমপুর থেকে এক চিরকুট পেলেন। মুক্তিকামী ছেলেরা পাঠিয়েছিল। লিখেছে সাহস থাকলে একটা রাইফেল নিয়ে তিন মাথার মোড়ে যেনো উপস্থিত  থাকেন! ডাক্তার আজম মুচকি হাসলেন! একদিন সকালে ঘোড়ায় চড়ে ছুটলেন গালিমপুরের পথে। কারও বাঁধা তাঁকে আটকাতে পারেনি। সময় মতো হাজির হলেন যথাস্থানে!
ছেলেরা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলো। কাছে যেতেই বিনয়ের সাথে রাইফেলটা রেখে দিতে বলার সাথে সাথে সেটা ছুড়ে দিলেন! শুন্য হাতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বললেন, আর কি চাস তোরা? কোন কথা বা বলে মাথা নত করে রাইফেল নিয়ে ছেলেরা সেখান থেকে চলে গেলো।  ডাক্তার আজম বুঝেছিলাম এ সমিয়ে অস্ত্রের খুব প্রয়োজন ওদের। শান্তি কমিটির দায়িত্ব পালন করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিও এগিয়ে আসতে কুণ্ঠাবোধ করেননি!
কৈলাইল ইউনিয়নের সবকয়টি গ্রামজুড়ে ডাক্তার আজমের আশ্বাসবাণী সবার মুখে শোনা যায়। শরীরে একফোঁটা রক্ত থাকতে কোন পাকসেনা গ্রামবাসীর চুলপরিমান ক্ষতি সাধন করতে পারবেনা। সেই সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিও তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁর ইউনিয়নে যেনো কোন অপারেশন চালানো না হয়।  গ্রামে কোন ঘাটি স্থাপন করবেনা  মিলিটারী!
আমার মনে হয়েছে আজম ভাইয়ের নীতিই আসল রাজনীতি!
এরপর একে একে গ্রামে অস্ত্রের যোগান আসে!
প্রতিরোধে জেগে ওঠে মুক্তিসেনারা!
খবর আসে ঢাকায় যৌথ মৈত্রীবাহিনী কমান্ডের কাছে হানাদারবাহিনী আত্ম সমর্পণ করেছে!
জয়বাংলা!  জয়বাংলা!! জয়বাংলা!!!
জয়বাংলা - আবু বাকার
জয়বাংলা – আবু বাকার

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top