তরু- একটি উপকথা

তরু – একটি উপকথা
– ফারজানা ইয়াসমিন এস্পা

এক
প্রায় ১০০ বছর আগের কথা । শিবপুর নামক গ্রামে বাস করতো তরু নামে একটা বোবা মেয়ে । ছোটো কালেই বাবা মাকে হারিয়ে দূর সম্পর্কের কাকা বাসায় মানুষ হয়েছে । ওর বয়স যখন ৬ বছর ঠিক তখনি এক দুর্ঘটনায় বাবা মা দুজনেই মারা যায় । কাকা বাসায় অনেক কষ্টে বড় হয়েছে তরু। সারাদিন কাজের বিনিময়ে একবেলা হয়তো খেতে পেয়েছে । সে কি শুধুই বোবা? না সেতো কানেও শুনতে পায়না ।অভাগির কপালো হয় হুহ।তরু যখন তাকিয়ে থাকতো তখন মনে হতো ওর চোখদুটো কথা বলছে।তরুকে বোঝার মতো কেউ ছিলনা ।তবে বাগানের পাশে দাড়িয়ে থাকা বট গাছটা ছিল তরুর ঘনিষ্ট বন্ধু। সে চোখ দিয়েই মনের সব দুক্ষ কষ্ট গাছটিকে বলতো। আর গাছটিও বোধহয় তরুর মনের আনন্দ বেদনা গুলো ভাগাভাগি করে নিতো। মেয়েটার মন খারাপ হলেই সে গাছটির কাছে গিয়ে বসে থাকতো। সকালে উঠেই থালবাসন ধোয়া থেকে শুরু করে রাত্রে গরুকে বেধে রেখে তবেই ওর কাজ শেষ হয়। প্রতিদিন নানা ধরণের অযৌক্তিক কারণে তাকে অপমানিত হতে হয়। এছাড়া অভাগী, কলঙ্কিনী , পোড়াকপালী এসব বচন তো নিত্যদিন লেগেই আছে । গ্রামের সবারই সে কাজ করে দিত। কারো কথা সে ফিরিয়ে দিত না। তাকে ইশারা করে সব কিছু বুঝিয়ে দিতে হতো। গ্রামের সবাই তাকে ভালোবাসতো , মায়াও করতো। কিন্তু ওর কাকীমা ওকে একদমই সহ্য করতে পারতো না। সবার কাছে ওর দুর্নাম রটে বেড়াত।

তরুর বয়স ১৮ শেষ হয়ে ১৯ এ পড়েছে। গায়ের রঙ একটু চাপা। মিষ্টি চেহারা হলেও আকর্ষণীয় না। সারাদিন কাজ করে যে বেচারী ! নিজের একটুও যত্ন নিতে পারেনা। এখন যেহেতু সে যৌবনে পা রেখেছে, গ্রামের সবাই ওর বিয়ে নিয়ে কথা বার্তা তুলেছিল। বেশ কটা প্রস্তাবও এসেছিল ভালো। কিন্তু ডাইনী কাকীমা উলটাপালটা কথা বলে সবকটা প্রস্তাবই ভেস্তে দিলো। ডাইনী কাকী সবার মনে ছড়িয়ে দিয়েছে যে তরুর সাথে যার বিয়ে হবে সে-ই মারা যাবে। এই ভ্রান্ত ধারণার কারণে আর কেউই তরুকে বিয়ে করতে সম্মত হলো না। কিন্তু বয়স যেহেতু হয়েছে, বিয়ে তো ওকে দিতেই হবে। এটাই যে বিধান ! তখন গ্রামের ময়-মুরব্বীরা মিলে শলা-পরামর্শে বসলো,কার সাথে তরুর বিয়ে দেওয়া যায় । সেসময় এক প্রবীণ বৃদ্ধ বলে উঠলেন,
-‘ঐ যে, পাশের বাগানের বটগাছটার সাথে তরুর বিয়ে দেয়া হোক। কেননা, ছোটবেলা থেকেই ওই বৃক্ষের সাথে ওর দারুণ ভাব। বট গাছটির কাছে গেলেই ওর মন ভালো হয়ে যায়। তোমরা কি এগুলো লক্ষ্য করোনি ?’
তখন সবাই মিলে সিদ্ধান্তে উপনীত হলো, সেই বট বৃক্ষের সাথেই তরুর বিয়ে দেয়া হবে।

অবশেষে একদিন শুভ লগ্নে বৃক্ষের সাথে তরুর বিয়ে সুসম্পন্ন হলো।
***

কিছুদিন পর তাদের গ্রামে পরিতোষ সরকার নামের একটা লজিং মাস্টার এর আগমন ঘটলো। মাস্টারমশাই ২৭-২৮ বয়সের একটা তরুণ ছেলে। দেখতে সুদর্শন, নম্র-ভদ্র আর বিনীত স্বভাবের ছিলো। সবাই তাকে সম্মান করতো। প্রত্যেকেই ভালোবেসে এটা ওটা রান্না-বান্না করে ছেলেটিকে দিতো। অত্র গ্রামের শিক্ষিত বাবু কি না, এজন্য তার কদরটাও ছিলো বেশি। একদিন তরুর কাকীমা পায়েস রান্না করে তরুর হাতে দিলো, মাস্টারমশায়কে দিয়ে আসার জন্য। তরু যখন মাঝপথে, তখন আচমকা খুব জোরে ঝড় বৃষ্টি এলো। তরু ওই অবস্থাতেই ভিজতে ভিজতে মাস্টারমশায়ের বাড়ী অব্দি গেলো। মাস্টারমশায় এর পুরো বাসাতে সে ছাড়া কোন প্রাণী থাকেনা। তরু মাস্টারমশায় এর বাসায় গিয়ে দরজার কড়া নাড়লে , মাস্টার দরজা খুলে দিলেন। পরিতোষ মাস্টার লোলুপ দৃষ্টিতে তরুর দিকে তাকিয়ে দেখলেন, মেয়েটার হলুদ শাড়ী ভিজে সর্বাঙ্গ ফুটে উঠেছে। তরুণ লজিং মাস্টার নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলো না। তরুকে জোরপূর্বক ধ্বস্তাধস্তি করে, দরজার খিল আটকে দিয়ে নিজ অশ্লীল কামনার চরিতার্থ করলো, নির্দোষ বোবা একটা মেয়ের উপরে সুযোগের সদ্ব্যবহার নিয়ে। মাঝরাতে ঝড় থামলে তরু ছাড়া পেল। কোনমতে মাস্টার মশাইয়ের বাড়ি থেকে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে সোজা চলে গেল ওর ছোটবেলার বন্ধু ; বট বৃক্ষের কাছে। এই দুঃখজনক ঘটনা কাউকেই বোঝাতে পারলো না
তরু।
কিছুদিন পর গ্রামের সকলে বুঝে গেল তরু গর্ভবতী। সবাই প্রচলিত ধর্মমতানুযায়ী ভাবলো গাছটি ওকে আশীর্বাদ দিয়েছে।
এভাবে ৯ টা মাস কেটে গেল। হঠাত একদিন তরুর প্রসব বেদনা শুরু হলো। ব্যথায় কাৎরাতে কাৎরাতে তরু বট গাছটির কাছে গেলো। সহসা বেশ জোরে একটা ঝড় আসলো। মনে হচ্ছে যে বৃক্ষটি নিজের ডালপালা দিয়ে ওকে আগলে রাখছে। কিন্তু আফসোসের কথা হচ্ছে এটা, এই প্রবল ঝড়ে না বৃক্ষটি নিজে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারলো, আর না তরুকেই বাঁচাতে পারলো। ঝড় শেষে পুরো গ্রামবাসী এসে দেখতে পেলো ; বৃক্ষটি নিজ স্থান থেকে উপড়ে পড়েছে। আর পাশে পড়ে রয়েছে তরুর নিথর মৃতদেহ। অবশেষে গ্রামের প্রবীণেরা আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিল এবং সে অনুযায়ী সেই বটবৃক্ষের কাঠ দিয়েই তরুর অন্তিম-সংস্কার করা হলো।
শেষ –

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top