দাবার চাল

দাবার চাল
অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়

দিদির দেখা দেখি মালবিকাও সিদ্ধান্ত নিল শ্বশুরকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবার । মুশকিল হলো স্বামীকে নিয়ে । রুদ্রজিৎকে এই কথাটা বলতেই পারছে না মালবিকা । এত গম্ভীর , ভয় লাগে বলতে । বাধ্য হয়ে দিদি আর মা কে গিয়ে বলে ফেলল মনের ইচ্ছার কথা । খুব খুশি দুজনে । মা অসাধারন । সব সময় ভরসা দিয়ে গেছে । কুটিল বুদ্ধিতে মার জুড়ি মেলা ভার । দিদি অনামিকা ও কম যায় না । এই রাস্তা ইতি মধ্যেই চষে এসেছে । সে নিজেও তাড়িয়েছে তার শাশুড়িকে । বাড়ি ছেড়ে যাবার দিন দিদির হাতে পায়ে ধরে দিদির শাশুড়ির কি কান্না । বলে ,
বৌমা , তুমি যা বলবে আমি তাই করবো । তোমার সব কাজ করে দেব । শধু এই বয়সে আমাকে স্বামীর ভিটে থেকে তাড়িও না ।
কফির কাপটা টেবিলে রাখতে রাখতে দিদি বলল , ও সব কান্না কাটিতে আমার মন ভিজবে না । আগে ভাবেন নি কেন ? এখন আর কিছু করা যাবে না । যেতে আপনাকে হবেই । আর এতো আমার একার ইচ্ছা না , আপনার ছেলেও চায় আপনাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে । সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে । ওসব ন্যাকা কান্না বন্ধ করে অটো তে গিয়ে বসুন ।
কাঁদতে কাঁদতে বৃদ্ধাশ্রমে চলে গেল দিদির শাশুড়ি ।
মালবিকার দিদি বলল , তুই যাই বল ছুটকি , আমার বর তোর বরের মত এরকম ঘাড় ত্যাড়া না । রুদ্রর যেন একটু বেশী বাবা পীড়িত । রুদ্র যদি বুনো ওল হয় তাহলে আমি বাঘা তেঁতুল । আমি যদি তেমনি মায়ের বেটি হই , তোর শ্বশুরকে ভিটে মাটি ছাড়া করবো । যেমন যেমন বলবো ,তেমন তেমন করবি । বাকিটা আমার হাতে ছেড়ে দে ।
নতুন ফ্ল্যাটে আসার পর থেকেই বড্ড বেমানান ছিল এই বুড়োটা । দুপুরের দিকে মালবিকার বন্ধুরা আসতো । কিটি পার্টি । খুব লজ্বা লাগতো মালবিকার । শ্বশুর মশাইয়ের ঘন ঘন বাথরুমে যাওয়া একদম বিশ্রী ব্যাপার । ফ্লাটটার বড় বড় দুটো বেডরুম । এটাচ্ড বাথ । একটা কিডস রুম । একটা স্টোর রুম । আর একটা ড্রইং রুম । শ্বশুর মশাইকে স্টোর রুমে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল মালবিকা । বারান্দার সাথে লাগোয়া একটা কমন বাথরুম আছে । মেইড সার্ভেন্ট বা বাইরের কাজের লোকেদের জন্য । সেই বাথরুমটাই শ্বশুর মশাই ব্যবহার করতেন । বয়স হলে একটু ঘন ঘন বাথরুম পায় । তাকে বারান্দার ওপর দিয়েই যেতে হত বাথরুমে । ড্রইং রুমের খোলা দরজা দিয়ে দেখা যায় । খুব লজ্বা লাগে মালবিকার । বান্ধবীরাও হাসা হাসি করে । তখন থেকেই মনে মনে ঠিক করেছে যেভাবেই হোক এই বুড়োটাকে বাড়ি থেকে তাড়াতে হবে । কিন্তু মুশকিল রুদ্রকে নিয়ে । এমনিতেই তার ওপর প্রচন্ড রাগ বাবাকে স্টোর রুমে থাকতে হয় বলে । বুদ্ধি করে মালবিকা বলেছিল ,
তোমার বাবার তো ঠান্ডার ধাঁচ । বেডরুম দুটোতেই এ সি । উনি কিভাবে থাকবেন ? ওদিকে রৌণক আর আমার বিদেশী কুকুর আমান্ডা এ সি ছাড়া ঘুমাতে পারে না । তাহলে উনি কোথায় শোবেন ? তুমি তো সবেতেই আমার দোষ দেখ ।
কথা বাড়ায় নি রুদ্র । কিন্তু ভালোভাবেও নেয় নি ব্যাপারটা ।
অফিসে পরপর দুটো প্রমোশন হয়ে এখন সে বোর্ড অফ ডিরেক্টরস এর একজন সম্মানীয় সদস্য । স্যালারি এবং সুযোগ সুবিধা প্রচুর গুন্ বেড়ে গেছে । এ সবটাই সে পেয়েছে পুরস্কার স্বরূপ । খুব কড়া হাতে এবং চতুরতার সাথে সে বন্ধ করে দিয়েছে শ্রমিক আন্দোলন । প্রতি বছরই পুজোর আগে বোনাস আর অন্যান্য দাবি দাওয়া নিয়ে কর্মচারী ইউনিয়ন ধর্মঘট ডাকে । কাজ বন্ধ । কোটি টাকার লোকসান । রুদ্রজিৎ সেন গুপ্ত বদলি হয়ে এসেছে কানপুর শাখা অফিস থেকে । ইউনিয়নের নেতাদের অদ্ভুত কায়দায় সে জব্দ করলো । একদিনও কাজ বন্ধ হয় নি । কোম্পানির লোকসান তো হয় নি উপরন্তু তার নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলে কোম্পানির আয় উর্ধমুখী । রুদ্রজিতের কদর গেল বেড়ে । যে কোন মিটিংয়ে রুদ্রজিতের বক্তব্য গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয় । নেক্সটার এন্ড ডেক্সটার কোম্পানির সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম রুদ্রজিৎ সেনগুপ্ত ।
ভাগ্য সহায় মালবিকার । কি ভাবে যেন ঠান্ডা লেগে গেল মালবিকার শ্বশুরের । অবস্থা বাড়াবাড়ি । নার্সিং হোমে পাঠাতে হল । সেই সময় পাশে এসে দাঁড়ালো মালবিকার দিদি আর মা ।
দিদি বলল , দারুন সুযোগ । এক বার যখন বুড়োটা বাড়ির বাইরে গেছে , ওকে আর ঘরে আসতে দেওয়া যাবে না । রুদ্রকে বলবি যে এটা ছোঁয়াচে রোগ । রৌণক বাড়িতে থাকলেই খালি দাদুর কাছে যায় । দাদুর ছোঁয়া লেগে ছেলের যদি কিছু হয় , আমি কিন্তু ছেড়ে কথা বলবো না ।
দিদির শেখানো কথা মালবিকা রাত্রে বিছানায় বলল রুদ্রকে ।
কি করতে চাও তুমি ?
উনার জন্য অন্য কোনো ব্যবস্থা |
মানে বুঝলাম না ।
উনি এখানে থাকলে ছেলেকে আটকানো যাবে না । সুতরাং উনার অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করতে হবে ।
কোথায় ? নিজের বাড়ি ছেড়ে এই বয়সে বাবা কোথায় গিয়ে থাকবেন ?
দিদি বলছিল ওর সন্ধানে কয়েকটা ভালো বৃদ্ধাশ্রম আছে । দারুন সুযোগ সুবিধা । অনেকে মিলে এক সাথে থাকা । তাছাড়া অসুখ -বিসুখ হলে ওরাই ডাক্তার দেখাবার সব ব্যবস্থা করে । কথা বলার সাথী পাবেন । ভালোই থাকবেন ।
রুদ্রর মত তুখোড় বুদ্ধিমান ছেলের পক্ষে বুঝতে অসুবিধা হল না মালবিকার পেছনে কে বা কারা আছে । সে জানে তার ভায়রা ভাই এক নম্বরের ভেড়ুয়া । বৌয়ের ভয়ে সব সময় গুটিয়ে আছে । একটা কথা বলার সাহস নেই । সে শুনেছে কি ভাবে তার বড় শালী তার শাশুড়িকে বাড়ি ছাড়া করেছে । এখন বুদ্ধি দিচ্ছে মালবিকা কে । মনে মনে হাসলো রুদ্রজিৎ । ইউনিয়নের নেতাদের বদমায়েশি ঠান্ডা করে দিলাম , আর তুমি তো ওদের তুলনায় কিছুই নও । ছোটোর থেকেই দাবা খেলতে ভালোবাসি । খুব একটা খারাপ খেলি না । দাবার ঘুঁটির চাল দিতে ভালোই পারি । তোমার মত অনেকেই কিস্তি দিয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাৎ আমি করেছি ।
কি হল , ঘুমিয়ে পড়লে নাকি ? মালবিকা জিজ্ঞেস করলো ।
ভেবে দেখছি , বলে রুদ্র পাশ ফিরে চোখ বন্ধ করলো ।
অসম্ভব আনন্দ মালবিকার । কাল সকালেই দিদিকে খবরটা দিতে হবে ।
পরের দিন যথা সময়ে অফিসে চলে গেল রুদ্র । রুদ্র বেরোবার আগে ড্রাইভার রৌণক কে স্কুলে দিয়ে আসে । এখন বাড়ি একদম ফাঁকা । দিদি আর মা কথা দিয়েছে আজ দুপুরে এখানে খাবে । বাবার শরীরটা ভালো নেই | একটু জ্বর জ্বর হয়েছে । পরে একদিন বাবা আসবে । ঠাকুরকে ছুটি দিয়ে নিজের হাতে সব রান্না করেছে মালবিকা । আজ তার খুব আনন্দের দিন । তার সবচেয়ে কাছের মানুষ তার মা , বাবা আর দিদি । বাবাকে বাদ দিয়ে আজ সেলিব্রেট করতে হচ্ছে ।
দিদিকে মালবিকা বলল , তোর জন্য একটা ভালো গিফট আমি অন লাইনে বুক করেছি । তোর পুরস্কার ।
মা বলল , দাঁড়া , বুড়োটাকে আগে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাক । ও যা ঘাড় ত্যাড়া ছেলে , এতো সহজে মানবে বলে আমার মনে হয় না ।
অনামিকা বলল , মানবে মা , সব মানবে । বৌকে ছেড়ে থাকবে কিভাবে ? রাত্রি গভীর হলেই তো ইচ্ছা জাগবে । সেটা তো আর পাশ বালিশে মিটবে না । তখন বৌকেই চাই । কোথায় যাবে বাছাধন ? তার ওপর ছুটকি যেমন সুন্দরী তেমন ছুটকির ফিগার । মেয়ে হয়ে আমারই লোভ লাগে । ওতো ছেলে । নিজেকে ঠিক রাখা অত সহজ ?
দিদির কথা শুনলে লজ্বা লাগে মালবিকার । মার সামনে এই সব কথা বলা যায় ? দিদিটা যেন কি , একটুও লাজ লজ্বা নেই । তবে মালবিকার ফিগারের প্রশংসা সবাই করে । খুব ভালো লাগে মালবিকার । রৌণক হবার পরে চেহারাটা বিশ্রী হয়ে গেছিল । পেটটা ফুলে বেলুন । নিজেরই খারাপ লাগতো । তারপরেই নিয়ম করে শুরু করলো যোগা । সকালে রাস্তায় হাঁটা । তারপর প্রাণায়াম । দেখতে দেখতে চেহারা শেপে চলে এলো । পেট বুক সব ঠিক ঠাক । কে বলবে মালবিকার আট বছরের একটা ছেলে আছে ?
দুদিন ধরে একই কথা বলে গেল মালবিকা । অফিসে কাজের চাপের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে গেল রুদ্র । রবিবার সকালে ডাইনিং টেবিলে কফির কাপটা বাড়িয়ে দিয়ে মালবিকা আবার তুললো সেই কথা । খবরের কাগজটা পাশে সরিয়ে রাখলো রুদ্র । কফিতে গভীর চুমুক দিয়ে একটা সিগারেট ধরালো । একমুখ ধোয়া ছেড়ে বলল ,
বুঝলে ডার্লিং , অনেক ভেবে দেখলাম তুমি ঠিকই বলেছ । বুড়ো হয়ে গেলে বাবা মা কে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোই উচিত । যত খারাপ খারাপ ছোঁয়াচে অসুখ হয় সেই সময়ে । বাড়ির সকলের পক্ষে বিশেষ করে বাচ্চাদের পক্ষে অত্যন্ত ভয়ের । আমি একটা বৃদ্ধাশ্রম দেখে এসেছি ।
আনন্দ আর ধরছে না মালবিকার । আরও ঘন হয়ে বসলো রুদ্রর দিকে । ইচ্ছে করছে রুদ্রকে এত্তো বড় একটা চুমু খেতে । কিন্তু রৌণক এসে যেতে পারে । থাক ওটা রাতের জন্য তোলা । প্রাণ টা ছটফট করছে মা আর দিদিকে খবরটা দেবার জন্য । ভাবতেই পারেনি রুদ্র এত সহজে তার কথা মেনে নেবে । দিদি ঠিকই বলেছে । শুনতে খারাপ লাগলেও বৌয়ের শরীরের লোভে সব স্বামীরাই বৌয়ের দিকে । নিজের বাবা মা কে ত্যাগ করতেও পিছ পা হয় না । সত্যি , মেয়েরা শরীরের বিনিময়ে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে ।
তারপর বলো , মালবিকা অধীর আগ্রহে জানতে চাইলো ।
ও হ্যাঁ । আমি তিনটে বেড পাশা পাশি চেয়েছি । কিন্তু একজন মহিলা হয়ে যাওয়াতে ওদের নিয়মে তিনি এক ঘরে থাকতে পারবেন না । তাকে অন্য্ ঘরে মহিলাদের সাথেই থাকতে হবে ।
কি হেঁয়ালি করছো ? আমি তো তোমার কথার মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না । তিনটে বেড কেন ? আর মহিলা এলো কোথা থেকে ?
কেন ? আমার বাবা , তোমার বাবা আর তোমার মা ।
আমার বাবা মা বৃদ্ধাশ্রমে যাবে কেন ?
যে কারনে আমার বাবা যাবে , ঠিক সেই কারনে । ওদের তো বয়স হয়েছে । দেখাশুনো করার লোকের প্রয়োজন । কে দেখবে ? বৃদ্ধাশ্রমে ডাক্তার দেখাবার ভালো ব্যবস্থা আছে । তুমি তো আমাকে বলে ছিলে । তাছাড়া কথা বলার মানুষ পাবে । ভালোই হবে একসাথে থাকবে তোমার মা , বাবা আর আমার বাবা ।
মালবিকার কাঁদতে ইচ্ছে করছে । সে ভাবতেই পারছে না তার ভাগ্য এত খারাপ । এরকম স্বামী যেন শত্রুর ও না হয় । সে তো শাড়ি গয়না চায় নি । সামান্য এইটুকু চাহিদা । লোকে বৌয়ের জন্য কত কিছু করে । রুদ্র একটা বাজে লোক । সে থাকবে না এ রকম লোকের সাথে । তার কিছু ভালো লাগছে না । স্বামীর বুদ্ধির কাছে সে হেরে গেল | উঠে যাচ্ছিল মালবিকা । হাত ধরে মালবিকাকে চেয়ারে বসালো রুদ্র । বলল ,
শোনো , তোমার কাছে যেমন তোমার বাবা মা , আমার কাছে তেমন আমার বাবা । যে মানুষটা বুকের রক্ত জল করে আমায় এত বড় করলো , মানুষ করলো ,আমি সেই মানুষটাকে শুধু মাত্র বৌকে খুশি করার জন্য ত্যাগ করবো ? বৌ বৌয়ের জায়গায় আর বাবা মা তাদের জায়গায় । আমাকে এতটা নির্বোধ ভাবলে কি করে যে আমি যে ঘরে থাকি সেই ঘরের ছাদটা ভেঙে ফেলবো ?
আমি জানি তুমি কি ভাবছো । আমার সাথে আর থাকতে ইচ্ছে করছে না । এখনই রৌণক কে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যেতে পারলে বাঁচো । সমস্যা নেই । থাকো সেখানে । যতদিন ভালো লাগে থাকো । মন শান্ত হলে আবার ফিরে এসো । তোমার জন্য দরজা সব সময় খোলা থাকবে । তবে বাবা আমাদের সাথেই থাকবেন । পাশের ঘরের এ সি খুলে ওখানে বাবার থাকার ব্যবস্থা করবো । কিডস রুমে ওই এ সি টা লাগিয়ে দিলে রৌণক ওখানেই থাকতে পারবে । কিংবা তোমার সাথেও এক বিছানায় শুতে পারে । আমি বরঞ্চ স্টোর রুমে গিয়ে থাকবো । চলি । আজকে বাবাকে রিলিস করবে । বাবাকে নিয়ে আসি ।

______________

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *