দুধ তো ফুটছে এখনো

 23 total views

দুধ তো ফুটছে এখনো // ড. ময়ূরী মিত্র

ভোরেই জ্বলেছে উনুন | এক সসপ্যান দুধ ফুটছে | আর তাতে মলটোভা গুলছেন পিসিমনি | ওই দুধ ফোটা আর প্রাণপণ চামচ নড়ার শব্দে সকালবেলা আমার ঘুম ছাড়ত | উঠেই কী যে আনন্দ হতো আমার | দেখতাম কত না — নতুন মানুষে ভরেছে আমাদের ভাড়াবাড়ির ঘর !

হয়েছে কী —-আমার সেই শিশুকালে আমাদের বাড়িতে বাস করতেন ওবাংলা থেকে আসা অনেক কাকা অনেক পিসি | আমার ছোট্ট মাথায় সবার সব মুখ ধরে রাখতে পারতাম না | প্রায়ই এক কাকার শরীরে অন্য কাকার মুখ বসিয়ে ফেলতাম | রাতে ঘুমের ঘোরে আরো গোলাত সব | শরীরের ওপরের মুখ বা মুখের তলার শরীর |

দেশভাগ তখন লম্বা এক জোঁক হয়ে ঘুরছে দুদেশে | প্রতিদিন সীমা ডিঙিয়ে কেউ না কেউ এসেই যেত | ঘুমচোখে এপার ওপার সব ভুল হত | একটি বাড়িতে অনেক মানুষের ভিড় এত ভালো লাগত মনে হতো,সবাই কাকা পিসিরাই আজ বুঝি প্রথম এলেন বাড়িতে | আমার খোকাচোখ পুরনোকেও নতুন বানিয়ে ছাড়ত | বাচ্চা চাষীর ঝুড়িতে তখন কেবলই নতুন ফসল |

ঠাকুরদা নিয়ম করলেন জলখাবার সবার একরকম হবে | মনে আছে,একটা প্রায় অন্ধকার প্যাসেজে সার দিয়ে কাকা পিসিরা অনেকখানি চিনিগোলা চায়ে বাসি রুটির গোছা চুবিয়ে খাচ্ছেন | কাপে চা কম থাকতো বলে একসাথে দুটো করে রুটি চোবাতেন | কাকাদের সমান খাবো বলে আমিও ঐরকম চায়ে চোবানো চারটে করে রুটি খেতে শুরু করলাম | ছোট্ট পেটটা আমার শক্ত বাতাবি লেবু হয়ে যেত | তবু ভারী লজ্জা “বেবি দুধ” খাওয়ায় | সেটা কতটা দুধ খাব না বলে আর কতটা খাদ্যব্যবস্থায় সাম্য আনব বলে তা বলতে পারি না | তবে সসপ্যানের সব দুধ আমার গর্ভে গেলে কাকাদের চায়ে যে দুধ মোটেই পড়বে না সে বেশ বুঝতাম |

ভাড়াবাড়ির তিনটে মাত্র ঘরে অনেক মানুষের সাথে ঠেসে থাকতে থাকতেই ভালোবাসা চেনা শুরু হলো আমার | সেবার ক্লাসে পড়া পারিনি বলে খুব মার দিলেন আমার এক ওবাংলার পিসি সুতপা | সবে খুলনা থেকে কলকাতায় এসেছেন। ভালো চেনা না হলেও ভালোবাসাটা দ্রুত হয়ে গিয়েছিল আমাদের | মার খেয়ে সারাদিন আমি কথাই বলিনি পিসির সাথে | দিনভর গজগজ করছিলাম নিজের মনে | সন্ধেতে শুনেছিলাম সমস্তটা দিন জল অব্দি খাননি সুতপা | রাতে মা খাবার সাজিয়ে দিলেন আমাকে আর পিসিকে | পরিষ্কার শুনলাম পিসিকে বলছেন , ” বেশ করেছিস | আবার পড়া না পারলে আবার মারবি | ”

রাগী মুখে সুতপার দিকে আড়ে দেখতে দেখতে খেয়ে যাচ্ছি গপাগপ | বোধহয় সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছেন কলকাতার পিসি অপর্ণা — এসে বসে গেছেন আমাদের পাশে | কী যেন একটা লুকিয়ে রেখেছেন না পিঠের দিকে ? মারামারি করে দেখলাম — MA ক্লাসের দিস্তা নোটের খাতায় আমার জন্য লিখে এনেছেন রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের ভাবসম্প্রসারণ | কাল যা ক্লাশে মুখস্থ বলব আমি |

আর তারপর ? সুতপা আর অপর্ণা তাঁদের চারটে হাত ক্রস করে ফেলেছেন | ভাবছি কী বানাবেন এঁরা জোড়া জোড়া হাতে ? ওমা! এ যে দেখি একটি হাতপালকি | ব্যাস ! . হাতগুলোর ফাঁকে ফাঁকে পা গলিয়ে আমি উঠে পড়লাম আমার পালকিগাড়িতে | ওঠবার স্টাইল দেখে তখন কে বলবে সেটা পালকি না পক্ষীরাজ ! পালকি তখন ঘোড়ার গতিতে ছুটেছে ! টগবগ টগবগ ! এদেশ | সেদেশ | নানাদেশ | কত দেশ –কত্ত |

পিসীমায়ের একটি দীপে আলোয় ভর্তি ভূখণ্ড | সীমানা ছাড়ায়ে | দুকূল হারায়ে | প্লাবিত |

★ ★বিশ্বকবি —লেখাটি তোমায় দি? তুমিই তো বেশি কেঁদেছ , বাংলা যাতে ভাগ না হয় | সে নিরুচ্চার কান্না টের পাই | তাই তোমাকেই |

★★ আছে পুনশ্চ : যে সব কীর্তিমান বাবা মা মানুষভরা পরিবার ভেঙে বাচ্চার মনমগজের দফায় রত তাঁদের ” ভিষম দরকারি ” ঠোক্করটাও মারলাম |

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *