দুমুখো – শম্পা সাহা

 3 total views

[post-views]

শ্রীলেখা স্যান্যাল একজন চাইল্ড কাউন্সিলর । ওর মূল কাজটাই হলো ছোট বাচ্চাদের মনের ভীতি দূর করা। এজন্য ও বিদেশ থেকে নানা ডিগ্রীও নিয়ে এসেছে। বাবা নামকরা ডাক্তার ডক্টর বিকাশ সান্যাল তার একমাত্র মেয়ে শ্রীলেখা। বিয়েও হয়েছে ডাক্তারের সঙ্গে। সারা কলকাতাতে এমন কোন লোক নেই যে হার্ট স্পেশালিস্ট ডক্টর অরুনাভ লাহিড়ীর  নাম শোনেনি । তাদের একমাত্র ছেলে অণীশ পড়ে ক্লাস নাইনে। অণীশ পড়াশুনাতে এমনিতেই বেশ ভালো তবে ওর সাইন্স এর চেয়ে লিটারেচারে ইন্টারেস্ট বেশি। ছবি আঁকতে ভালোবাসে, গিটার বাজিয়ে দারুন গান করে এবং মজার ব্যাপার এই যে গান, গিটার ও কারো কাছে শেখে না ,পুরোটাই ওর নিজের চেষ্টায় ইউটিউব দেখে দেখে!

    স্কুলের প্রতিটা অনুষ্ঠানে ওর গান বাঁধা ,এমনকি পাড়ার ফাংশানেও অণীশ লাহিড়ী একজন নিয়মিত গায়ক । ওর নিজের একটা ব্যান্ড খোলারও ইচ্ছে । বোর্ড এক্সামটা শেষ হলেই শুরু করে দেবে তবে তারও তো প্রায় বছর দুই বাকি । আগে ছবি আঁকা শিখতো কিন্তু নাইনে উঠার পর তা বন্ধ, বোর্ড এক্সাম এর প্রিপারেশন নিতে হবে । ডাক্তারের ছেলে ডাক্তার হতে চাইবে না তো কে চাইবে? “ওসব  ধাষ্টামো চলবে না”, শ্রীলেখা এবং অরুনাভ ও দুজনেই জানিয়েছেন সাইন্সই পড়তে হবে, এবং ডাক্তারই হতে হবে।

   একবার অণীশ বলেছিল, “আমি ইংলিশ লিটারেচার নিয়ে পড়বো”, শ্রীলেখা অরুনাভ দুজনেই দুদিন কথা বলেননি ছেলের সঙ্গে , এমনকি খাবারও বেড়ে দেননি, রুনুর মা দিয়েছে !  ফ্যামিলির মান সম্মান বলে তো একটা কথা আছে!

    এখন অণীশ ডাক্তার হতে চায় ,গিটার লুকিয়ে রেখেছে স্টোররুমে । চোখের সামনে থাকলে মন খারাপ করে, রাগ হয়, তারচেয়ে থাক দূরে !

   আজ শ্রীলেখা একটা বিরাট সেমিনারে চিফ গেস্ট। বিষয় ‘আডোলোসেন্স এন্ড চাইল্ড সাইকোলজি’, মূল বক্তা হিসেবে শ্রীলেখাকে বিশেষ অনুরোধ করা হয়েছে। রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠান, বহু টিনএজারদের বাবা-মা এসেছেন, কেউ কেউ আবার সন্তানদেরও এনেছেন, এ বিষয়ে শ্রীলেখা স্যান্যালের মতামত জানতে । তাতে যদি তাদের ছেলেমেয়েরা সঠিক পথের দিশা পায় বা নিজেরা তাদের ছেলেমেয়েদের যোগ্য বাবা-মা হয়ে উঠতে পারেন ।আজকাল টিনেজ বাচ্চাদের কত রকম ক্রাইসিস, বাবা-মা সব সময় ভয়ে ভয়ে কি হয় !কি হয়! ছেলে মেয়েদের কি করে হ্যান্ডল করব, কিভাবে তাদের মন বুঝবো, কিভাবে পাব তাদের মনের হদিশ? তাই  হল একেবারে উপচে পড়ছে !

   ঠিক সাড়ে পাঁচটা নিজের কালো মার্সিডিজ থেকে নামলেন শ্রীলেখা স্যান্যাল। লাল ব্লাউজ, কালো সিল্ক, মনে হচ্ছে যেন একেই বলে এলিগ্যান্ট বিউটি! কপালে বড় লাল টিপ, অক্সিডাইস জুয়েলারি।  ওনাক দেখলেই মনের বোঝা অর্ধেক হয়ে যায়। আজ অণীশ ও এসেছে। দেখুক ওর মায়ের প্রভাব-প্রতিপত্তি তবে যদি মা বাবার মতন হবার ইচ্ছে জাগে ।

  কর্মকর্তারা দৌড়ে নিয়ে এলেন, তড়িঘড়ি  বসালেন মঞ্চে,  বরণ করে নেওয়া হল পুষ্পস্তবক দিয়ে । অণীশকে যত্ন করে বসানো হলো গেস্ট চেয়ারে, একেবারে প্রথম সারিতেই। প্রেক্ষাগৃহ অন্ধকার শুধু মঞ্চে আলো,  মূল আলোটা শ্রীলেখা সান্যাল এর উপর। পিন ড্রপ  সাইলেন্স ,সবাই একে একে শিখছেন কিভাবে কিশোর মনের পাপড়ি খুলে খুলে জানতে হবে বয়সন্ধিকালের ছেলে মেয়ের মনের গহীন গোপন কথা। এরপর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন স্ট্রেস, তারপর আত্মহত্যার। এ ব্যাপারে ডক্টর স্যান্যাল একেবারে দৃপ্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন, “বাচ্চারা নিষ্পাপ, ওদের মন কোমল তাছাড়া এই  পিউবার্টিতে , এখন ওদের নিজেদের মনের মধ্যেই প্রতিনিয়ত ঝড়ঝঞ্ঝা চলছে ,ওরা না বড় না ছোট তাই নিজেদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগে। এ সময় বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ খুব স্বাভাবিক,এগুলো মানতে হবে। আজীবন ধরে এগুলো চলে আসছে আর ওদের নিজেদের জীবন ওদের মত করে বাঁচতে দিতে হবে। ওদের ক্যারিয়ার ওরা পছন্দ করবে। ওরা যা চায় তাই হতে দিতে হবে ,জোর করে কোন কিছু চাপিয়ে দেওয়া যাবে না ,তাহলে তার ফল হবে ভয়ঙ্কর ডিপ্রেশন, স্ট্রেস, প্যানিক অ্যাটাক ইত্যাদি। তারা ডিপ্রেশন বা প্রেসারের কারণে নানা নেশার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়তে পারে , তাহলে তাদের ক্যারিয়ার আশানুরূপ হবে না। তাই ওদের পছন্দের বিষয়ের ক্যারিয়ার ওদের ই বেছে নিতে দিতে হবে।”

   সেদিন বক্তৃতা শেষে প্রেক্ষাগৃহ হাততালিতে ফেটে পড়ছে। সত্যিই এভাবে শিশু-কিশোর টিনএজারদের মনের খবর তো কেউ দেননি । সবাই খুব উৎসাহী, “আর নিজেদের ছেলে মেয়ের ওপর চাপ দেবো না বাবা! যা  হতে চায় তাই হোক ,নিজেদের ইচ্ছে মতো। মাত্র একটাই তো জীবন!”

   বাড়ি ফিরে ক্লান্ত শ্রীলেখা এক কাপ কফি নিয়ে টিভির সামনে বসে । অণীশ পড়ার টেবিলে।

    “অনি, অনি, কি পড়ছো ?”,

     “ইংরেজি”,

      “কেন তোমার অংক কি হয়ে গেছে? “

      ,”না “

     “তাহলে ?”,শ্রীলেখা কৈফিয়ৎ চায় ।

    “কাল করব,  আজ আর ইচ্ছে করছে না”।

     “এভাবে বললে হবে? “, উত্তেজিত শ্রীলেখা ছুটে আসেন ছেলের কাছে ।

    ” রোজই  এভাবে ফাঁকি দিতে থাকলে সাইন্স পাবে কি করে ?ডাক্তারই বা কি করে হবে ?সবকিছু এত সহজ নয় “,

     “আমি ডাক্তার হব না”, মাথা নিচু করে জবাব দেয় অণীশ।

   “হবে না মানে ?”, উত্তেজিত শ্রীলেখা, “যার বাবা-মা দাদু ডাক্তার, সে কি হবে, কবি ? সাহিত্যিক? পেইন্টার না গায়ক ?”, তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে শ্রীলেখা ।

    “কেন মা তুমিই তো আজ বললে ,যে যা হতে চায় তাকে তাই হতে দিতে হবে, তাহলে আমাকে কেন হতে দিচ্ছ না, আমি যা চাই!?”

  “সেগুলো ওদের  বলেছি তোমাকে নয় !”

    শ্রীলেখা রাগে গটগট করে বেরিয়ে যান টিভির ঘরের দিকে আর এক কাপ কফি দরকার মাথাটা বড্ড ধরেছে!

0 - 0

Thank You For Your Vote!

Sorry You have Already Voted!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top