ধারাবাহিক প্রবন্ধ : কবিতার রূপকল্প: পর্ব ১০ – রবীন্দ্র সমসাময়িক – সৌম্য ঘোষ

 Soumya Ghosh

যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের
মৃত্যুর বেশ আগে থেকেই শুরু হয়েছিল রবীন্দ্রোত্তর পর্বের বাংলা কবিতার নান্দীপাঠ । এই নান্দীপাঠের অন্যতম মুখ যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ( ১৮৮৭-১৯৫৪)। তাঁর প্রথম তিনটি কাব্যগ্রন্থ—— মরীচিকা, মরুশিখা, মরুমায়া আধুনিক কালের কবিতা পাঠকের কাছে এখনো আকর্ষক । মোহিতলাল মজুমদার  যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তর  কবি ভাষা সম্বন্ধে বলেছিলেন এই কবি প্রচলিত কবি  ভাষাকে যেন পদদলিত করেছেন । চলিত, সাধু ,সংস্কৃত , ম্লেচ্ছো, চাষা বা ভদ্র সব শব্দকেই নির্দ্বিধায় কবিতায় ব্যবহার করেছেন ।
ক্ষুদিরাম দাস যতীন্দ্রনাথের সঙ্গে ইংরেজি কবি টমাস হার্ডি কে তুলনা করেছেন। দুজনেরই কবিতার ভাষা লালিত্য বর্জিত, দুজনেই ছিলেন অজ্ঞাবাদী আর উভয়ই ছিলেন জীবন সম্বন্ধে নৈরাশ্যবাদী । রবীন্দ্র অনুসারীদের মত যতীন্দ্রনাথ মাধুর্যের লালিত্যে মনোহরণ করতে চাননি কবিতাকে । তিনি লিখেছেন :
 “কল্পনা, তুমি শান্ত হয়েছ, ঘন বহে দেখি শ্বাস,
  বারো মাস খেটে লক্ষ কবির একঘেয়ে ফরমাস!”
তিনি লিখেছেন :
 “মিথ্যা প্রকৃতি, মিছে আনন্দ, মিথ্যা রঙিন সুখ,
  সত্য সত্য সহস্রগুণ সত্য জীবের দুখ ।”
তাঁর কবিতায় শব্দকে বা উপমাকে বৈপরীত্য সংঘাতে বাজিয়ে তুলে জীবনের অন্তর্নিহিত বিরোধকে মূর্ত করেন এই কবি আর সেই ভাবে পরিস্ফুট হয় তার কবি দৃষ্টির স্বাতন্ত্র্য । জীবন সম্বন্ধে আবেগময় সমালোচনা এবং মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী মনোভাব কবি যতীন্দ্রনাথের বৈশিষ্ট্য ।
                 কবি যতীন্দ্রনাথের একটি বিখ্যাত কবিতা উদ্ধৃতি করলাম :
       লোহার ব্যাথা
    যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
ও ভাই কর্মকার
আমাদের পুড়িয়ে পিটানাে ছাড়া কি নাহিক কর্ম আর ?
কোন ভােরে সেই ধরেছ হাতুরি,রাত্রি গভীর হল,
ঝিল্লিমুখর স্তব্ধ পল্লী, তােল গাে যন্ত্র তােল
ঠকা ঠাই ঠাই কাদিছে নেহাই, আগুন ঢলছে ঘুমে
শ্রান্ত সাঁড়াশি ক্লান্ত ওষ্ঠে আল গােছে ছেনি চুমে।
দেখােগাে হেথায় হাপর হাঁপায়, হাতুড়ি মাগিছে ছুটি;
রাত্রি দুপুরে মনে নাহি পড়ে কি ছিলাম আমি ভােরে,
ভাঙ্গিলে গড়িলে সিধা বাঁকা গােল লম্বা চৌকা করে;
কভু আতপ্ত, কভু লাল, কভু উজ্জ্বল রবিসম
কভু বা সলিলে করিলে শীতল অসহ্য দাহ মম।
অজানা দুজনে গাঁয়ে আগুনে জুড়িয়া মিটালে সাধ,
ধড় হতে কভু বাহুল্য বােধে মাথাকে কেটে দিলে বাদ।
ঘন ঘন ঘন পরিবর্তনে আপনা চিনিতে নারি,
স্থির হয়ে যাই ভাবিবারে চাই,পড়ে হাতুড়ির বাড়ি।
                      || মোহিতলাল মজুমদার ||
                          মোহিতলাল মজুমদার
(১৮৮৮- ১৯৫২) এর কবিতায় দেহগত কামনার অকপট স্বীকৃতি আকৃষ্ট করেছিল আধুনিক সাহিত্য আন্দোলনের  পুরোগামীদের তাঁরা মোহিতলালের এইসব চরণ মুগ্ধ বিস্ময়ে উচ্চারণ করেছেন, ” দেহ ভরি করো পান কবোষ্ণ এ প্রাণের মদিরা ।” বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “প্রগতি” পত্রিকায় লেখা হয়েছিল,  রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া
 “Revolution রূপ পেয়েছে শ্রীযুক্ত যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ” মরীচিকা”-য় এবং evolution পরিণতি লাভ করেছে শ্রীযুক্ত মোহিতলাল মজুমদারের “বিস্মরণী”- তে ।”  কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় , কবি মোহিতলাল তাঁর পরবর্তী আধুনিক সাহিত্য সম্বন্ধে মন্তব্য করেছিলেন,  “শ্মশান-ভূমির পচ্যমান আবর্জনা।” মোহিতলালের কবিতার আসল বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর রূপ মুগ্ধতা এবং ইন্দ্রিয়মদিরতা। ইন্দ্রিয়ের পঞ্চ উপাচারে জগতের সৌন্দর্য বন্দনা করেছেন তিনি।
আর সেই কারণেই কবি রূপ তপস্যায় মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দুনিয়ার মরুভূমি, মরুদ্যান ,ইরানি তরুণীদের কথা ব্যবহার করেছেন অনর্গল আরবি ও ফারসি শব্দে। রূপমুগ্ধ বলেই এই কবি আস্থা রেখেছিলেন দেহবাদে । লিখেছেন, “সত্য রে চাহিনা তবু, সুন্দরের করি আরাধনা ।”  আবার কখনো বলেছেন, “ভুলেছি আত্মার কথা, মানি শুধু দেহের সীমানা।”
কবিতার রূপকল্প: পর্ব  ১০তিনি দেবেন্দ্রনাথ সেনের অনুরাগী ছিলেন । দেবেন্দ্রনাথের মত সনেট রচনা তে পারদর্শী ছিলেন । মোহিতলালের কবিতার তীব্র আবেগ চৈতন্য দ্বারা শাসিত । এই কবি রূপকল্প সচেতন । তাঁর কবিতার রূপকল্প ও ভাষা ছিল সংহত ও পরিশীলিত ।  মোহিতলাল মজুমদারের একটি কবিতা যা পাঠকদের অতি পরিচিত । স্কুল জীবনে পাঠ্যপুস্তকে পড়া সেই বিখ্যাত কবিতা টি উদ্ধৃতি করলাম :
কালবৈশাখী 
মোহিতলাল  মজুমদার 
মধ্যদিনের  রক্ত  নয়ন  অন্ধ করিল  কে !
ধরণীর  ‘পরে   বিরাট  ছায়ার  ছত্র  ধরিল  কে !
কানন-আনন  পাণ্ডুর   করি
জলস্থলের নিশ্বাস  হরি
আলয়ে-কুলায়ে  তন্দ্রা  ভুলায়ে  গগন  ভরিল  কে!
আজিকে   যতেক  বনস্পতির   ভাগ্য দেখি   যে  মন্দ,   নিমেষ গনিছে  তাই  কি  তাহারা সারি সারি  নিস্পন্দ?
  মরুৎ-পাথারে   বারুদের   ঘ্রাণ
এখনি  ব্যাকুলি  তুলিয়াছে  প্রাণ?
পশিয়াছে  কানে  দূর  গগনের  বজ্রঘোষণ   ছন্দ?

লিখেছেন —– অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ।
                       চুঁচুড়া ।  হুগলী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top