ধারাবাহিক প্রবন্ধ – কবিতার রূপকল্প – ২য় পর্ব – সৌম্য ঘোষ

 

বাংলা কবিতার জন্ম লগ্ন থেকে কবিতা তথা পদ্যই ছিল সাহিত্য সৃষ্টির একমাত্র বাহন ।চর্যাপদ থেকে শুরু করে রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র, চৈতন্যজীবনী ,মঙ্গলকাব্য সমূহ , বৈষ্ণব শাক্তপদাবলী সবই পদ্যে লেখা ছিল । সেই পদ্য কখনো কখনো কবিতার স্তরে উত্তরণ হয়েছিল ।পরবর্তী কালপর্বে বাংলা সাহিত্য নানাদিকে শাখায়িত হলো । সৃষ্টি হল গদ্য ,নাটক ,উপন্যাস, ছোটগল্প ইত্যাদি । ফলত: কবিতা রেহাই পেয়ে গেল । কবিতার দায়িত্ব থাকলো না গদ্যের করণীয় কাজ করার ।

ধীরে ধীরে গল্প বলার দায়িত্ব, কাহিনীকাব্যের দায়িত্ব নিল কথাসাহিত্য। এই সময় থেকে কবিতা আর সাহিত্য সমার্থক নয়। কবিতা সমগ্র সাহিত্যের একটি অংশ হিসেবে গণ্য হলো । এই যুগের মত এত বৈচিত্র্য মধ্যযুগে ছিল না । আধুনিককালে কবিতা লিখিত হলো ——- সাহিত্যিক মহাকাব্য , আখ্যানকাব্য ,গাথাকাব্য, রুপককাব্য গীতিকাব্য ,শোককাব্য ,নাট্যকাব্য ইত্যাদি । আরো একটি যুগান্তকারী বিষয় হলো মনন ও চিন্তন এর পরিবর্তন । আধুনিককালে কাব্য হয়ে উঠল সেকুলার । মাইকেল মধুসূদন যদিও হিন্দু পুরাণ নিয়ে কাব্য লিখেছিলেন। তথাপি তাঁর “ব্রজাঙ্গনা কাব্যে ” রাধা বৈষ্ণবদের মহাভাব স্বরূপিনী নন । তিনি নিছকই Mrs. Radha . রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ঈশ্বর আছে , একথা ঠিক বটে কিন্তু তাঁর কবিতায় ঈশ্বর কোন বিশেষ ধর্ম সম্প্রদায়ের ঈশ্বর নন । উত্তরকালের বাংলা কবিতা ধর্মনিরপেক্ষ । কোন ধর্মীয় প্রচারের প্রবণতা আধুনিককালের কবিদের কবিতায় থাকেনা ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের পরবর্তী কবিরা ইংরেজি জানা কবি । প্রাচীন ও মধ্যযুগের কবিরা শুধু বাংলায় জানতেন । কেউ কেউ যেমন , বড়ু চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি ,গোবিন্দ দাস , ভারতচন্দ্রের মতো কবিরা সংস্কৃত জানতেন। যথা, ” ত্বমসি মম জীবনাং / ত্বমসি মম ভূষণং / ত্বমসি মম ভব জলাধিরত্নম ” ( জয়দেব )। সৈয়দ আলাওল ফারসি জানতেন । এমনকি ভারতচন্দ্র ফারসি জানতেন।

উনবিংশ শতাব্দী থেকে বাংলায় কবি হিসেবে যারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন তাঁরা সকলেই প্রায় ইংরেজি ভাষা জানতেন । তাঁদের ইংরেজি কাব্যের ভাব ও শৈলী প্রভাবিত করেছিল । মাইকেল মধুসূদন মূল ভাষায় হোমর , ভার্জিল , দান্তে পড়েছিলেন । মধুসূদন মিল্টনকে আদর্শ বলে মানতেন । স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ গোড়ার দিকে “বাংলার শেলী” হিসেবে পরিচিত ছিলেন । জীবনানন্দ প্রসঙ্গে ইয়েটস, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ক্ষেত্রে হুইটম্যান, অমিয় চক্রবর্তীর আলোচনায় হপকিনস, বুদ্ধদেব বসুর ক্ষেত্রে সুইনবার্ন-বোদলেয়ার , বিষ্ণু দের কবিতা এলিয়ট প্রভৃতির প্রভাব সম্যকভাবে পরিলক্ষিত হয়।

কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর পর থেকে আধুনিক সূত্রপাতের মধ্যবর্তী — এই সময়টা মূলত: কবিওয়ালা, টপ্পাকার নিধুবাবু ও দাশরথি রায়ের কথা প্রধান সংগীত লক্ষ্য করা যায়। শুধু এই যুগসন্ধ্যায় নয় চর্যাপদ থেকে আধুনিককালের পূর্ব পর্যন্ত সব বাংলা কবিতায় ছিল সুরাশ্রিত । শুধু পদ সাহিত্য নয়, মঙ্গলকাব্য, চৈতন্যজীবনীও পাঁচালীর সুরে কথকরা পড়তেন। আর কাব্যের উপভোক্তোরা শুনতেন ।

আধুনিক কালের কবিতা মূদ্রণের যুগের কবিতা । এই যুগের উপভোক্তারা শ্রোতা নন , তারা পাঠক। মুদ্রণের ফলে ভেঙে গেল এই গোষ্ঠীগত উপভোগের যূথবদ্ধতা । কবিতার পাঠক এখন একলা পাঠক। আধুনিক যুগে কবিতা হয়ে দাঁড়ালো একজন কবির সঙ্গে একজন পাঠকের সংলাপ ।১৭৭৮ সালে বাংলায় ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার পর থেকে তার প্রভাব বাংলা কবিতায় পড়তে শুরু করল । কবিতা শব্দ সুরের নির্ভরতা ছেড়ে স্বাবলম্বী হলো।

সমস্ত রবীন্দ্র কবিতা এক শব্দ সংগীতের শেষহীন বিপুল ভান্ডার । কিন্তু রবীন্দ্র উত্তর সাধকরা সেই সীমাকে অতিক্রম করে গিয়েছেন অন্তর্গত সংগীতের ব্যঞ্জনায় । উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বিচার করলে দেখা যায় যে, প্রথম পঞ্চাশ বছর ছিল মূলতঃ ব্যবহারিক গদ্যের প্রাধান্য । দ্বিতীয় পঞ্চাশ বছরের সৃজনশীল সাহিত্যে গদ্যের ব্যবহার দেখা যায়। এই গদ্য চর্চার ফলে বাংলা কবিতার লাভ হল । এখন থেকে যা কিছু কবিতা নয় , কবিতা তার হাত থেকে রেহাই পেলো ।

এই সময় থেকে জ্যোতিষ চর্চা, ইতিহাস ,উপাখ্যান, জীবনী আর পদ্যে লেখা হতো না । গদ্যের কাছ থেকে রেহাই পেয়ে কবিতা হয়ে উঠল ” মানুষের চৈতন্যের ভাষা । ” কবিতার অগ্রগতি হলো শুদ্ধতার দিকে। এই শুদ্ধতা অর্জন করতে আধুনিক পর্বের বাংলা কবিতার অনেক সময় লেগেছিল । আমরা দেখতে পাই, ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্তের সাংবাদিকতা , নীতিকথা, মধুসূদন- হেমচন্দ্র – নবীনচন্দ্রের আখ্যান, রঙ্গলাল- হেমচন্দ্রের স্বদেশপ্রেম ইত্যাদি ।

কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী থেকেই শুরু হয় শুদ্ধ কবিতার জয়যাত্রা । স্বয়ং মধুসূদন দত্ত দুটি অসামান্য গীতি কবিতা লিখেছিলেন , ” জন্মভূমির প্রতি” ও ” আত্মবিলাপ ” ।কবিতা সবসময় শুদ্ধতা অর্জন করতে চায় কিন্তু তারা নিরঙ্কুশভাবে অর্জিত হয় না । যে ভাষা আমাদের জীবনযাপনের কাজে লাগে সেই ভাষাতেই কবিতা লিখিত হয় । তাই জীবন যাপনের স্বেদ-গ্লানি থেকে কবিতার মুক্তি নেই। বর্তমান সময়ের হতাশা ও নৈরাজ্যতার অবসাদ ছিন্ন করে কবিতা কখনই সঙ্গীতের মতো বিশুদ্ধ হতে পারে না।।

 

বাংলা কবিতার জন্ম লগ্ন থেকে কবিতা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top