ধূ ধূ হৃদয় ধুন্ধুমার

 17 total views

ধূ ধূ হৃদয়
ধুন্ধুমার // ড. ময়ূরী মিত্র

ধূ ধূ হৃদয়
ধুন্ধুমার

লিখেছিলাম প্রথমবার | দ্বিতীয় ঢেউয়ে এর প্রাসঙ্গিকতা খুঁজবেন কিনা সে দায়িত্ব পাঠকের |

দেখা হল দুজনকে | প্রথমজনকে দেখি একটি বিখ্যাত চ্যানেলে –তাঁর রেগুলার আলাপচারিতায় | খুবই বিখ্যাত সাংবাদিক | নানা বিষয়ে নানারকম প্রজ্ঞা | নানারকমে প্রজ্ঞা | আর সেই প্রজ্ঞার অবাধে প্রকাশ | করোনার হত্যাযজ্ঞে কর্মকাণ্ড আরো বেড়েছে | একমিনিটের তিনটে শটে তিনবার পাঞ্জাবী বদলে বদলে আসছেন আর বারবার বলছেন — বাড়িতে থেকে বিভিন্ন কালারের পোশাক গায়ে দিয়ে আমরা সাংবাদিকরা দেশকে বাঁচিয়ে রাখছি রে | এই বুড়িবয়সেও শিরশিরে ভাব আনছিল ওঁর self beautification | আর বাড়ির রকিং সাইকেলে মেদ ঝরাতে ঝরাতে দামী towel এ ঘাম মোছা? উফ ! ওহ ! উত্তেজিত ছিলাম আপনার নাটকীয় / নারকীয় গলার খেলায়ও। | ” দেশ ” শব্দ বলার সময় আলাদা base এর গলা | ভাবটা এমন –বাতাসের অভাবে হাঁফ নিতে নিতে মানুষের মরে যাওয়ার থেকেও বোধহয় কঠিন কাজ মরার খবর দেয়া | চ্যানেল কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এসবে আজকাল সাংবাদিকরা যেমন এসবে অভ্যস্ত , দর্শকরাও তেমন | না দেখলে নিজেদের মনই চুকচুক করে |

চমকালাম আজ সকালে | দিনের আগামী প্রোগ্রামগুলোর বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন সাংবাদিক | একটি বইয়ের পাতাগুলো ফরফর করে উল্টে যাচ্ছেন | উল্টে যাচ্ছেন আর বেরিয়ে আসছে তাঁর সুচিপত্র | প্রতিটি পাতায় বিখ্যাত ইলাস্ট্রেটরদের আঁকা দারুণ সব ছবি | নীচে কন্টেন্ট —একটি করে পলিটিক্যাল তরজা | কোনোটা তৃণমূল ভার্সেস বিজেপি কোনোটা বিজেপি ভার্সেস কংগ্রেস | কোনোটা আবার পার্টি ছেড়ে ব্যক্তি ব্যক্তিতে ঝামেলা | চলতে থাকা ঝামেলা নয় | কীভাবে এই মহাদুর্যোগে নেতাদের ঝামেলা বাঁধাবেন — মানুষকে খেপাবেন সেই সূচি | আশ্চর্য প্রতিটি সূচি কিন্তু পৃথিবীব্যাপী মৃত্যুর প্রেক্ষিতে | অথচ সেই সুচিতে নেই –রতন টাটা , সৌরভ , অক্ষয়কুমার , সুনীল গাভাস্কারের মানুষকে বাঁচানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার খবর | এক জুনিয়র খেলোয়াড়ের মেডেল বিক্রি করে টাকা দেয়ার খবর | একসময় বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের ব্যাপক গালাগাল খাওয়া শাহরুখ খানের নিজের রাজ্য ফেলে পশ্চিমবঙ্গেই দেড় কোটি দেয়ার খবর | নেই বিয়ে হতে যাওয়া বরবউয়ের বিয়ের জমানো সমস্ত টাকা তুলে দেয়ার কথা | প্রায় অন্ধ হয়ে যাওয়া আমার কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ছমাসের পেনশন দেয়ার খবর | দিয়ে যে কী খাবেন , কীভাবে যে নিজের জটিল শ্বাসরোগের চিকিৎসা করাবেন কে জানে ! খবর নেই রাজ্য পুলিশের যাঁরা duty করেও বোতল বোতল রক্ত দিচ্ছেন থ্যালাসেমিয়া বাচ্চাদের | ভুল বললাম –খবর আছে কিন্তু এক লাইনের শিরোনামে | এঁদের ইন্টারভিউ হয় না — বড্ড এলেবেলে কাজ করছেন তো এঁরা ! তাই | গ্রাফিক্স বইয়ের সুচিতে শুধু TRP স্লট | অবসরপ্রাপ্ত আমলা — মধ্যমেধার অভিনেতা –যাঁদের সাথে সাধারণের নেই কোনো যোগ | সেই মহামান্যদের দেশ বিশ্লেষণ — চিকিৎসকদের থেকেও বেশি বিজ্ঞানবোধ নিয়ে | কিংবা ওইই —নেতাদের তরজা | বন্ধ কি তবে মানুষের যত দরজা ?

ভয় পাচ্ছিলাম | কেন বইয়ের গ্রাফিক্সটিই বানাতে হল চ্যানেলকে ? তরজার সূচি বানাতে বই ছাড়া আর কি কোনো মনপসনদ আকার পেলেন না তাঁরা ? বাড়িতে আটকানো বাচ্চাগুলো তো এখন সারাক্ষণ টিভির সামনে বসে আছে | কিছুদিন আগে আমি নিজেই তো কতবার করে ক্লাসে বলেছি — ” লক ডাউন শুরু হচ্ছে | কেন হচ্ছে — কী হচ্ছে —
কী হবে জানার জন্য টিভি দেখবে রোজ | ” এতদিন তো তারা জেনে এসেছে — বইয়ের পাতা ওল্টালে বেরোয় কেবল পদ্য , বিজ্ঞান ,ভূগোল ইতিহাস ! ফটাফট বেরিয়ে আসে সহজ পাঠ কিংবা সুকুমারের ছড়ার ছবি | আজ এটা কী বই বানাচ্ছে রে বড়মানুষেরা ? একবারও ভাবলেন না যারা বইকে কেবল জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে দেখতে শিখছে — তরজার বই দেখে সেসব শিশুদের কী ধরণের মনস্তাত্বিক বিপর্যয় ঘটতে পারে ? ভাবলেন না – বই পড়াটাই ছেড়ে দিতে পারে তারা | অথবা বইয়ের এই মিডিয়াকৃত বিকৃত রূপটিকে সত্য মনে করে চিরকালের মত Personality Disorder -এর মধ্যে চলে যেতে পারে | জন্ম নিতে পারে নতুন কোনো Learning Disability ? At least সময়টাকে ভাবুন একবার | এটা কি নরমাল সময় ? সারাদিন বাচ্চাগুলো দেখে যাচ্ছে হু হুঁ করে মানুষ মরছে | পৃথিবীব্যাপী দুর্যোগে এমনিতেই নিজেদের মত করে নিরাপত্তাহীনতার জগৎ গড়ছে তারা — যার খবর পাশে থেকেও কিন্তু পাব না আমরা | পাব বাচ্চাটা যখন আধা কি পুরো পাগলা হয়ে যাবে | ভাবুন | ভাবুন একবার —

আরেকটু বলি ? ইচ্ছে করছে তো খুব ! চিকিৎসকদের কাছে কেন জানতে চাইছেন ওষুধের নাম ? সেই ওষুধে exactly কতটা উপকার হয় ? কাদের বেশি ? একবার দেখলাম জিজ্ঞেস করছেন –কোন পর্যায়ে কত মাত্রায় ভেন্টিলেশন দিতে হবে ? কেন বলবেন এঁরা আপনাদের চিকিৎসার পদ্ধতি ? আপনি চিকিৎসা করবেন এঁদের ? নাকি মেডিক্যাল কলেজের স্টুডেন্ট হবেন ? আপনার চ্যানেলের সিক্রেসি থাকতে পারে , রাষ্ট্রনায়কের পলিসিতে সিক্রেসি থাকতে পারে –আর চিকিৎসকের পারে না ? আসলে কী জানেন –ভারতীয়দের আবেগপ্রবণ মনটা আপনারা গুলে খেয়েছেন | গুণ্ডা বদমাশ টাকা লোটে আর আপনারা চেটে চেটে খান আমাদের মনটাকে | আমাদের মৃত্যুভয়টাকে | প্রশাসককে খোঁচান , খেপান —” কেন তিনি শান্ত থাকছেন ? কেন মৃত্যুর exact সংখ্যা বলছেন না ? ” বললে ভয় নিয়ে খেলতে আরো সুবিধে হয় আপনার | আপনার স্ট্যাটিস্টিক্সয়ে বৈদ্গধ আরো প্রকাশ পায় | আপনি বা আপনারা খুব ভালো করে জানেন — টিভিতে কোনো বিভ্রান্ত চিকিৎসকের মুখ থেকে ওষুধের নামটা বেরোনো মাত্র বাকি সতর্কতা না শুনে মানুষ ছুটবেন ওষুধ কিনতে | ব্যাস তৈরি হল ক্রাইসিস | এবার আপনার লোক যাবে , ওষুধ না পাওয়া মায়ের বাইট নিতে | শুরু করবেন তো ? –দুধরনের মৃত্যু ( ক্রনিক আর করোনা ) নিয়ে আপনাদের phychologial Fun ? মা যত না ঘাবড়ে , একটানা নাটুকে কমেন্ট্রি দিতে দিতে তার থেকেও বেশি তাঁকে ঘাবড়ে দিতে থাকবে আপনার স্টাফ | কোলে বসে অসুস্থ বাচ্চাটাও কিন্তু শুনছে | বড় বড় চোখে শুনছে — শ্বাসকষ্টে বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে শুনছে — তার ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না | যাচ্ছে না পাওয়া | আপনার প্ল্যানমত বাচ্চাটার সামনে দাঁড়িয়েই তো প্রশ্ন ছুঁড়ছে চ্যানেলের চাকরটা —–“ওষুধটা পাওয়া না গেলে —? ” প্রশ্ন শুনে আরো হাজার বাচ্চা আর তাদের মাগুলো ভয়ে কাঁপছে তখন |

উত্তর দিল সাঁঝবাতি | ছোট্ট মেয়েটা ফোন করল | প্রথমে ভুল করে বলল –” আন্টি আমি ক্লাস ওয়ানে পড়ি |” ফোনের ওপারে | দেখতে তো পাই না | আওয়াজ পেলাম মুখের চুকচুকের | বোধহয় জিভ কেটে বললে —” ওহ না না আমি তো ক্লাস টু এ উঠেছি |” বললাম –‘ শিগগির নামের মানে বল |” বললে –“সন্ধের আলো ” | আমি — ” কীসের আলো ? টিউব না বাল্ব ?” আবার জিভ কাটার আওয়াজ —” না না আন্টি বাতি গো বাতি | মোমবাতি | কিংবা ? আচ্ছা — ধর প্রদীপ ! ঠাকুরের কাছে যে প্রদীপ জ্বালানো হয় |”

সাঁঝমেয়ের ডাকনাম গয়না | তার মা বললেন কেউ যদি তাকে জিজ্ঞেস করে –” হ্যাঁ রে গয়না তুই কীসের গয়না ? সোনার না হীরের ?” গয়না নাকি উত্তর দেয় —” সোনারও না রুপোরও না | জানো না বুঝি গয়না মানে অলংকার ? অলংকার মানে হলো –যা যে কোনো জিনিষকেই সুন্দর করে দেয় | অলংকার দিয়ে খাতা বইয়ের শব্দ বাক্য সব সাজিয়ে দিতে পারি সুন্দর করে |”

বুঝলাম সাঁঝবাতি বা গয়নাছুঁড়ির শেষ কথাটি তার মা শিখিয়েছেন | বড় হয়ে ও ঠিক সাজিয়ে ফেলবে গ্রন্থ | তার বাক্য | বাক্যের শব্দ | সব তখন সন্ধের গহনা পরবে | দীপের আলোটা নেভায় কার সাধ্য |
নিজেদের তৈরি বই পড়বে সন্ধেবাতির দল | নিশ্চয় জেনে যাবে –প্রেম ও ঘৃণা —- কাকে কখন কোনটা করতে হবে — কতটা করতে হবে |

নাহ ! এখন আর ভয় করছে না |

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *