নবদুর্গা

 12 total views

নবদুর্গা।
—– ছন্নছাড়া।

দুর্গা সরল সিধে সাদা এক গ্রামের মেয়ে। পড়াশুনাতে বা গৃহস্থালি কাজকর্মে তার কোন আগ্রহ নেই। স্নাতক হওয়ার পর সে তার পড়াশুনায় ইতি টানল। কিন্তু তার উচ্চাকাঙ্খা কম নয়। ছোটবেলা থেকেই সে অন্য মেয়েদের থেকে একটু আলাদা। সে স্বপ্ন দেখে তার যেখানে বিয়ে হবে তারা অর্থাৎ তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন যথেষ্ট ধনী হবে। বাড়িতে চাকর বাকর সমস্ত কাজ করবে। আর সে বাড়ির গিন্নিটি সেজেগুজে চাকরদের হুকুম দেবে আর তারা তার নির্দেশ মত কাজকর্ম করবে।

কিন্তু ভাবলেই ত আর সব হয়ে যায় না। তার বাবা দেখেশুনে তার জন্য অনেক সম্বন্ধ ঠিক করার চেষ্টা করলেন। তাদের মধ্যে অনেক ধনী পরিবারের ছেলেরা ছিল। আবার কিছু সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেও ছিল। কিন্তু দূর্গার কোন ছেলেকেই পছন্দ হয় না।

অবশেষে তার বাবার এক বন্ধুর ছেলেকে দূর্গার পছন্দ হল। তার নাম আবীর। সে স্কুল মাস্টার। বাবা মার একমাত্র সন্তান। ছেলের বাবার অনেক জমি জায়গাও আছে।

কিন্তু তার পছন্দ হলেও তার বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সেখানে বাড়ির মেয়ের বিয়ে হোক সেটাতে মত ছিল না। কিন্তু তার বাবার মুখের উপর কথা বলার সাহসও কারো ছিল না। আর দূর্গার যখন পছন্দ হয়েছে, সেখানে কারো জোর করে না বলাটাও ঠিক হবে না ভেবে সবাই বিয়েতে মত দিয়ে দিল।

দূর্গাও মনে মনে খুশি হল। সে যেমনটি চেয়েছিল তেমনই বিয়ে হবে তার। সর্বোপরি তার স্বামীর পৈতৃক সম্পত্তি বা স্বামীর আয়ের কোন ভাগীদার নেই। এমনকি দেওর ননদদের কোন ঝক্কি ঝামেলা নেই। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে তার নিজের রাজত্ব সে কায়েম করতে পারবে। এসব কিছু দেখেই সে বিয়েতে মত দিয়েছে।

তারপর নির্দিষ্ট দিনে আবীরের সাথে তার বিয়ে সম্পন্ন হল। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে সে দেখল সেখানে কোন কাজের লোক নেই। সমস্ত কাজ বাড়ির লোকেরা নিজেরাই করে। গৃহস্থালির কাজ পুরোটাই তার শাশুড়ি একা হাতে সামলায়। শ্বশুর মহাশয় জমি জায়গা, গরুবাছুর, সামলায়। আর তার স্বামী স্কুলের কাজের সাথে সাথে বাবা মা কে কাজে সাহায্য করে। সে বুঝতে পারল সে যা ভেবেছিল সেটা হওয়া সম্ভব নয়। তাকেও যে বাড়ির কাজকর্মের ভার সামলাতে হবে সেটা সে বুঝে গেল।

এভাবে বিয়ের পর বেশ কিছু দিন পার হয়ে গেল। দ্বিরাগমন পর্যন্ত তার শাশুড়ি তাকে কোন কাজ করতে দেননি। দূর্গাও সেটাকেই স্বাভাবিক মেনে নিয়েছে। সে ত এটাই চেয়েছিল। কিন্তু সমস্যা শুরু হল যখন তার স্বামী তাকে সবার হাতে হাতে বাড়ির কাজকর্ম করতে বলল।

দূর্গা তার স্বামীর মুখের উপর বলে দিল যে, “সে তাদের বাড়ির কাজের লোক হয়ে আসেনি।” বাপের বাড়িতে তাকে কেউ কাজ করার কথা বলত না। তার পক্ষে বাড়ির কোন কাজ করা সম্ভব নয়। আস্তে আস্তে সে বাড়ির সবাইকে অগ্রাহ্য করতে শুরু করল।

কিন্তু তার শ্বশুর বা শাশুড়ি কেউই তাকে কোনদিন কাজ করতে বলতেন না। বরং নিজেদের ছেলেকেই বকাঝকা করতেন। বলতেন, “তুই কিছু বলিস না। দেখিস সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে।” পাড়ার লোকজনদের কাছে উল্টে তারা বউমার প্রশংসাই করতেন। সবাইকে বলতেন, “বউমা খুব ভালো হয়েছে, বাড়ির সবাইকে খুব যত্ন আত্তি করে। ঘরের কাজকর্ম করে।” সবার খুব খেয়াল রাখে ইত্যাদি ইত্যাদি।

দুর্গা কিন্তু এইগুলোকে তার শ্বশুর শাশুড়ির দুর্বলতা হিসেবে নিল। তার স্বামীও আর তাকে কিছু বলত না। সে নিজের ইচ্ছা মত যখন খুশি যেখানে সেখানে যেতে লাগল। একটি বিউটি পার্লারে কাজ নিল সে শ্বশুর বাড়ির কাউকে কিছু না জানিয়েই। তারপর নিজের মত করে সময় কাটাতে লাগল। কিন্তু তাতে তার সেই গিন্নিপনাটা পরিপূর্ণ হচ্ছিল না। কারণ একে ত কোন চাকরবাকর নেই, তার উপর বাড়ির সমস্ত কিছুই শাশুড়ির হতে।

ক্রমেই সবকিছু অসহ্য হয়ে যাচ্ছিল দূর্গার কাছে। শ্বশুরবাড়ি ক্রমশঃ তার কাছে বিরক্তির জায়গা হয়ে উঠতে লাগল। তার স্বামীও এখন তাকে আর কিছু বলে না। নিজের ইচ্ছা মত যা খুশি করেও তার শান্তি হচ্ছিল না। ক্রমশঃ সে যেন হাঁপিয়ে উঠছিল।

ক্রমে ক্রমে তার বাপের বাড়ি যাওয়া আসা বাড়তে লাগল। একদিন তার স্বামী না থাকতে পেরে এ ব্যাপারে কথা বলতে যেতেই সে আহার্য মুখের উপর বলে দিল ” আমি কি করব না করব সব কি তোমায় কৈফিয়ত দিতে হবে নাকি? ” বলেই দূর্গা বাপের বাড়ি চলে গেল।

তার এহেন রূপ দেখে আবীর হতচকিত হয়ে গেল। বুঝতে পারল সামনে বড় বিপদ। সে তার শ্বশুরবাড়িতে সব জানাবে বলে ফোন করল।
তার শাশুড়ি ফোন ধরতে সে সব জানাতেই তার শাশুড়ি তাকে তাদের বাড়ি যেতে বললেন। ” দেখো বাবা, তুমি এখানে এস। সামনাসামনি কথা বলে সব মিটমাট করে দেব। “

আবীর বাবা-মাকে সব বলল। তারা উল্টে তাকেই বকলেন- “কি দরকার ছিল এসব কথা ওদের জানানোর। যাই হোক তুই যা। গিয়ে কথা বল”। আবীর শ্বশুর বাড়ি পৌঁছাতেই তার বড় শালা ও শ্বশুর মশাই তাকে মারধোর শুরু করে। “আমাদের বাড়ির মেয়ের নামে বাজে কথা বলে বেড়ানো হচ্ছে। দেখ তোর কি করি?” মারতে মারতে তারা আবীরকে প্রায় অর্ধমৃত করে ফেলল।
আবীর বুঝতে পারল এ দুর্গার সুনিপুণ পরিকল্পনা। নাহলে তারা কিছু না জানতে চেয়েই তার উপর কেন এত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল?

কোনমতে প্রাণ বাঁচিয়ে বাড়ি ফিরে আসল আবীর। কিন্তু দুদিন পরেই তার বাড়ি পুলিশ হাজির। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে নাকি তার শশুর বাড়ি গিয়ে তার স্ত্রী ও শাশুড়িকে গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে ফেলতে গিয়েছিল। তার স্ত্রী ও শাশুড়ি তার বিরুদ্ধে বধূনির্যাতন ও খুন করার পরিকল্পনার মামলা রুজু করেছে থানায়। ঘটনার আকস্মিকতায় আবীর হতবাক হয়ে গেল। পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেল। আবীরের জেল হল। কিন্তু কিছুদিন পর সে জামিনও পেয়ে গেল। কিন্তু একজন হতাশাগ্রস্ত মনরোগী হয়ে পড়ল সে।

কিন্তু দূর্গার তাতেও মন ভরল না। সে আবীর ও তার বাবা মার নামে নানা বাজে কথা রটিয়ে বেড়াতে লাগল। আর যেহেতু প্রথম থেকে তার শ্বশুর, শাশুড়ি তাকে ভাল বলে পরিচিত করেছিল সবাই তার কথা বিশ্বাস করে নিল। সে এটাকে নিজের মত করে ব্যবহার করল।

এটাকে হাতিয়ার করে সে প্রচুর টাকা খোরপোশ আদায় করে বছর দুই পরে আবীরকে ডিভোর্স দিল। কিন্তু পরবর্তী কালে তার এই নোংরা অভিসন্ধির কথা অনেকেই জেনে গেল। তবুও কেউ কিছুই বলল না। কিন্তু বাপের বাড়ির পরিবেশ তার জন্য যথেষ্ট অপমানজনক হয়ে উঠল।

তখন তার মনের ইচ্ছা বদলে গেছে। সে ভাবল,” আমি এভাবেই আমার ইচ্ছা পূরণ করব।” তখন সে অর্থ উপার্জনের জন্য এই পথই বেছে নিল। সোস্যাল মিডিয়াতে বন্ধু খুঁজতে লাগল। পেয়েও গেল একজনকে। সে তার পূর্ব পরিচিত।

তাকে সবকথা এমন ভাবে জানাল যেন শ্বশুর বাড়িতে অত্যাচারের ফলে সে সংসার করতে পারে নি। ক্রমশ সে সেই বন্ধুকে বিশ্বাস করাতে পারল যে সত্যিই পরিস্থিতির শিকার।

এইভাবে বন্ধুটির সাথে সম্পর্ক তৈরি করে, সেই বন্ধুর সাথে মিথ্যা ভালোবাসার নাটক করে তাকে বিয়ে করে নিল। তারপর সুযোগ বুঝে আবার পুরানো পদ্ধতি প্রয়োগ করে আবার সেই বন্ধুটিকে ফাঁসিয়ে আবার প্রচুর টাকা আত্মসাৎ করল এবং তাকেও ডিভোর্স দিয়ে দিল। এবং এবারও সে একই ভাবে পরিকল্পনা মাফিক সেই বন্ধুটিকে ও তার পরিবারকে বদনামী করে দিল। সবাই আবার তাকেই বিশ্বাস করল।

এই ভাবে নতুন নতুন জায়গায় গিয়ে বেশ কয়েকবার সে একই ঘটনা ঘটিয়ে প্রচুর টাকার মালিক হয়ে গেল। কিন্তু শেষ বারে সে আর ডিভোর্সের পথে গেল না বরং নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসিক খোরপোশ পাওয়ার ব্যবস্থা পাকা করে নতুন একটি বাড়ি কিনে সেখানে গিন্নি হয়ে উঠল। এখন বেশ কয়েকজন চাকর তার ফাই ফরমাস খাটে। এভাবে সমস্ত পরিচিত মানুষদের থেকে দূরে সরে গিয়ে নতুন এক পৃথিবী গড়ে তুলেছে সে। সেখানে শাঁখা সিঁদুরে সেজে দিব্যি বিবাহিতা সেজে থাকে। কেউ জানতে চাইলে বলে আমার স্বামী আমার উপর অত্যাচার করে, তাই আমি একা থাকি। সত্য সত্যই সে কলিযুগের নবদুর্গা রূপে যেন আবির্ভূত হল পুরুষ তান্ত্রিক সমাজে ।

তবুও তার পুরানো অভ্যাস তার পিছু ছাড়ল না। তারপর আবার নতুন করে কোন সহানুভূতিশীল হতভাগাকে যদি একই রকম ভাবে ফাঁসানো যায় তার পরিকল্পনার জাল বুনতে শুরু করল সে…………।

——-@@@@@@——-

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *