নাস্তিক – সুদীপ ঘোষাল

[post-views]

 

[printfriendly]

তবে শোন, বলি,সতন শুরু করলো,পমদের গ্রামে চাঁদু বায়েন বরাবরই নাস্তিক প্রকৃতির লোক। সে রাস্তা দিয়ে গেলে,বিড়াল যদি রাস্তা কাটে তিন পা পিছিয়ে গিয়ে থুতু ফেলে না।

এক শালিক দেখলে মুখে চুক চুক শব্দও করে না। আবার জোড়া শালিক দেখলে পেন্নাম করে না। শক্ত পোক্ত মন ও দেহের মানুষ। পম বলে ছেলেটা তাকে খুব ছেদ্দা করে। জীবনে সে এত শক্ত লোক দেখে নাই। তাই চাঁদু দা, কে দেখলেই সে নমস্কার জানাতো।

একদিন চাঁদুকে রাস্তায় দেখতে পেয়ে গ্রামের প্রবীণ মোড়ল মশাই বললেন,হাড় আম হাগিয়ে দেবে। পরো নাই তো সত্যি ভূতের কবলে। নিশি ভূত দেখেচিস।

চাঁদু বললো, দেখা আচে সব দেখা আচে।

মোড়ল বললেন,ঠাকুর একদিন ওকে সত্যি ভূতের কবলে ফেলে দাও। পঙ্গু করে দাও শালাকে। কোনো কিচু মানা শোনে না গো।

মোড়োল আরও বললেন,জানিস আমাকে নিশি ভূতে ডেকে নিয়ে গেয়েচিলো। সারারাত দুনি করে জল হেঁচেছি।সকালে দেকচি জলে জলময় জমিগোলা শীতের সকালে জলে আমার জীবন চলে যেতো।

এই গেরামের লোকেই তো বাঁচিয়েছে রে। তাই তোকে বলচি,তেনাদের নামে খারাপ কতা বলো না।

সতন আর মধু পুরোনো দিনের কথা নিয়ে গল্পে মত্ত। বাইরে বেরোলেই নিজের গ্রামের মাটি সোনা হয়ে যায়। তারপর গল্পে ফিরলো আবার ওরা দুজনে।

চাঁদু বললো,ওসব পুরোনো গল্প অনেক শোনা আচে।
মোড়ল বললেন,তাহলে ভগমান মানিস তো?

চাঁদু বললো,ভগমান বলে কিছু লাই গো। সব ভেমরতি। ছেলেপিলে লেকাপড়া শিকচে। তোমাদের জেবন শেষ,তোমাদের ভুয়ো মুরুব্বিয়ানা আর চলবে না। এখন ফোর জি র যুগ। যুক্তির যুগ। আবেগের কতা রেকে দাও গা।

ছেলে মেয়েরা চাঁদুকে ভালোবাসে। কিন্তু ওর মতো হতে পারে না। পম বলে,ওসব আমরা পারবো না বাপু। অতো সাহস নাই।

পমের মা বলে,ভগমান মানে না।ওর সঙ্গে মিশবি না। নাস্তিক লোকগোলা ভালো হয়না। পাপে মরবে। হরি বলো,হরি বলো।

চাঁদুর বয়স কাল চক্রে বাড়লো। নদীর ধারে গভীর রাতে এখনও বসে থাকে। কখনও অমাবস্যার রাতে বটগাছে উঠে বসে থাকে। ভয় বলে কোনো শব্দ ওর জানা নেই। পম সব খবর রাখে।

কিন্তু মানা শোনে না চাঁদু দা। ভীষণ একগুঁয়ে লোক। পম ভাবে,মানুষের এত সাহস ভালো নয় বাপু। তবু পম চাঁদুদার সঙ্গেই ঘোরাঘুরি করে। ওকে ভালোবাসে,শ্রদ্ধা করে।
কাউকে কিছু না বোলে,

একদিন চাঁদু জঙ্গলে গিয়ে দেখলো,চারদিকে সবুজ গাছ। আর মাঝখানে এক কালিমূর্তি। লাল রঙের একটা বেদী সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। হঠাৎ এক জটাজুট ধারি সাধুবাবা এসে বললেন,কি রে কি দেখছিস।এটা পঞ্চমুন্ডির আসন। অমাবস্যার রাতে এখানে বসে আমি সাধনা করি। যা যা নিজের কাজে যা। আমি এখন বসবো।

চাঁদু আজল সেজে বললো,কি হয় বসে?

—- কেন,সিদ্ধিলাভ হয়। জন্মরহিত হয়।

—— যে কেউ বসতে পারে?

—–না,তার আগে অনেক সাধনার স্তর আছে বাবা। অনেক কৃচ্ছসাধনের পর এই স্তরে আসে সাধক।

চাঁদু বয়স্ক লোককে ভক্তি করে। তাই তর্ক না করে ভাবলো,আমি একদিন এই আসনে বসে দেখবো কি হয়?

তার বন্ধু পমকেও বললো কথাটা। পম বললো,ওসব ছেলেখেলার জিনিস নয়। সব কিছু নিয়ে অবজ্ঞা করতে নেই। ওসব দিকে পা বাড়িও না চাঁদু দা। তোমার বয়স বেড়েচে,মনে রেকো। যৌবনের তেজ আর তোমার নাই।

চাঁদুর বয়স এখন একষট্টি বছর। কিছু কিছু রোগ বাসা বেঁধেছে। তবু মনে তার অদম্য সাহস। বললো পম তারই বন্ধু সরোজিনীকে। সরোজিনী বললো,অত সাহস তো ভালো নয় বাপু। বয়স হয়েছে,এবার একটু বুঝে শুনে চলতে হবে। বলে দিস ওকে আমার নামটা করে।

পম জানে,অল্প বয়সে সরোজিনী চাঁদুকে ভালোবাসতো। তারপর সরোজিনীর বিয়ে হয়ে যায়। তিরিশ বছর পরে স্বামী মরে গেলে গ্রামে চলে আসে। কোনো ছেলেমেয়ে হয়নি। মাঝে মাঝে চাঁদু ও পম সরোজিনীর কাছে বসে সুখদুখের কথা শোনে। সতন সব জানতো।

চাঁদুর মাথায় বদবুদ্ধি ভর করেছে। একবার পঞ্চমুন্ডির আসনে বসবেই। পাঁচটা প্রাণীর মাথা পুঁতে এই আসন তৈরী করা হয়। সিদ্ধপুরুষ যারা তারাই এই আসনে বসেন। পম বার বার তাকে এসব কথা বলেছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা।

একদিন ভূতচতুর্দশীর রাতে চাঁদু মরাঘাটের জঙ্গলে গেলো। সেখানেই সে পঞ্চমুন্ডির আসন দেখেছে। ভীষণ সাহস তার। একটা শিয়াল বাঁ দিক দিয়ে চলে গেলো। বাঁয়ে শিয়াল।আবার একটা কালো বিড়াল রাস্তা কেটে একবার চাঁদুকে দেখে নিলো। বটগাছের একটা ডাল ভেঙ্গে পরলো তার সামনে। কি করে ভাঙলো।

ওসব চাঁদুর মাথায় নেই। মনে মনে বলছে,শালা যতসব চালাকি। আসনে বসে দিনের বেলা লোক জড়ো করবো। দেখাবো আমিও বসতে পারি এই আসনে। কোনো চিন্তা ভাবনা না করে বসে পরলো আসনে। হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেলো কেনো? ভয়ে নাকি? কোনোদিন সে ভয় পায় নি। আজ কি হচ্ছে। তার মনে হচ্ছে না বসলেই হতো এই আসনে। আবার পরক্ষণেই মনে হলো তার, কিসব আজেবাজে ভাবছে সে। ঠিক আছে, সব ঠিক আছে।

তারপর শুরু হলো জঙ্গলের রাতকথা। একটা সাপ পাশ দিয়ে সর সর করে আসনের পাশের গর্তে ঢুকছে। বেশ বড়ো সাপ। ও মনে মনে ভাবছে জঙ্গলে সাপ তো থাকবেই। তারপর পোকামাকড়ের খেলা। মনের আনন্দে বিছে,নানারকমের পোকা তার দেহে খেলে বেড়াচ্ছে। চাঁদু নড়তে পারছে না। শুয়ে পরলো অনিচ্ছায়। তারপর কখন যে সকাল হলো বুঝতেই পারলো না। সকালে অনেক লোক তার খোঁজে এখানে এসেছে।এখানে আসার আগে সরোজিনীকে তার গোপন কথাটা বলে বাহাদুরি দেখিয়েছিলো। সেই কথা সরোজিনী সবাইকে বলেছে। তারপর খোঁজ শুরু হয়েছে।

পম বলছে,ও চাঁদু দা ওঠো। সকাল হয়েছে। আসনে শুয়ে ঘুমোতে গেলে কেনে?

মোড়ল বলছেন,বাহাদুর বটে ব্যাটা। দেখিয়ে দিলো বাপু। সাহস বটে। বলিহারি যাই।

সরোজিনী এসেছে। বলছে,কি দরকার বাপু। যেমন মানুষ তেমনটা থাকাই ভালো। হাতির লাদ দেখলে হবে? খরচা আছে।

নানাজনে নানাকথা বলছে। কিন্তু চাঁদু কোনো উত্তর দিচ্ছে না। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে।

কেউ ওই আসনে হাত দিতে সাহস করছে না। গাঁয়ের বামুন হরি ঠাকুরকে পম বললো,দাও না গো একবার নামিয়ে আসন থেকে।

হরিঠাকুর বললো,পাগল নাকি আমি। ওতে হাত দোবো না। অত সাহস আমার নাই।

পম বললো,সাতটা বামুনে বকের ঠ্যাঙ ভাঙতে পারে না শুনেছিলাম। এখন দেকচি এক্কেরে সত্যি কতা।

বামুন বললো,তুমি দাও গা। একমাত্র ওই সাধুবাবা যদি পারে তো পারবে। দু মাইল দূরে খেঁড়োগাঁয়ে সাধু থাকে।

পম দুজনকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলো সাধুকে আনতে। সাধু যখন এলেন তখন দুপুর দুটো বেজে গেছে।

সাধু এসেই বললেন,এ কি পাগল নাকি? সংসারী লোকের এই শখ কেনে হলো। এই বলে তিনি নামিয়ে দিলেন আসন থেকে। তারপর জঙ্গলের ভেতরে চলে গেলেন।

সবাই শহরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো চাঁদুকে। তিনি বললেন,এর স্ট্রোকে এইরকম হয়েছে। ওষুধ দিলেন আর বললেন হাঁটতে। তিনি বললেন,হাঁটলে বেঁকে যাওয়া শরীরের অংশ ধীরে ধীরে ঠিক হবে। কথা বলতে, শুনতে পাবে না কোনোদিন। তবু ওষুধ দিলাম। ওপরওয়ালা দয়া করলে অনেক কিছু হতে পারে।

সবাই ওপরওয়ালাকে বিশ্বাস করে কিন্তু চাঁদু করে না। এখন বোবা কালা হয়ে বেঁচে থাকতে হবে তাকে। সরোজিনী দেখাশোনা করে তার সকাল সন্ধ্যা সবসময়েই। পম গ্রামের লোকদের বলে,দেখো একেই বলে ভালোবাসা।

পম ভাবে,চাঁদুর এরকম কেন হলো? আসনে বসার অভিশাপ না কোনো রোগ? একবার পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে দেখলে হয় না। তাহলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে। একবার সরোজিনীর সঙ্গে আলোচনা করে দেখবো।

হাঁটতে হাঁটতে পম চাঁদুকে দেখতে যাচ্ছে চাঁদনি রাতে। চাঁদের দিকে তাকাতেই তার মায়াময় রূপে পম রহস্য আবরণে আবৃত হলো। পৃথিবীর কিছু রহস্য গোপন থাকাই ভালো।ভাবতে ভাবতে সে এগিয়ে চলেছে ধীরে ধীরে। সতন বললো,পম শালা তালেই ছিলো নাকি বল?

[everest_form id=”3372″]

সুদীপ ঘোষাল

সুদীপ ঘোষাল নন্দনপাড়া খাজুরডিহি পূর্ব বর্ধমান ৭১৩১৫০

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *