নিঃসঙ্গ -নিবেদিতা চক্রবর্তী

প্রবীর  বাবু সন্ধ্যাবেলায় দোতলার বারান্দায় পায়চারি করছেন।মনটা তার আজ বড় অশান্ত।মাঝে মাঝেই আজকাল  এরকম হয়।বিশাল এই বাড়ীটায় একা একা হাঁপিয়ে ওঠেন তিনি।তখন তিনিবসেন ডায়রী নিয়ে ।লেখেন তাঁর মনের কথা।এভাবেই হালকা করেন নিজেকে।আজ ও তিনিনিজের ঘরেএসে বসলেন চেয়ারে।টেবিলের উপরে রাখা ডায়রী টা খুলে লিখতে শুরু করলেন।

       আজ বড় অশান্ত মন আমার ।ফেলে আসা দিন গুলো বড় মনে পড়ছে ।তোমাকে বড্ড মনে পড়ছে নিরুপমা ।এই একাকী নিঃসঙ্গ মূহুর্ত গুলো ভীষণ অসহনীয় লাগছে।লিখতে লিখতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে প্রবীর বাবুর। হাত দিয়ে চোখ মুছে আবার  লেখেন-চুপি চুপি কত বছর কান্না বয়ে চলেছি বুকে।কিন্তু বাইরে তা দেখাবার জো নেই।পুরুষ মানুষ যে আমি।আমাকে কাদঁতে নেই ।

          ছোটবেলায় খেলতে গিয়ে পা মুচকে গিয়েছিল।ব্যথায় খুব কেঁদেছিলাম।মা চোখ মুছিয়ে বলেছিল”ছেলেদের কাঁদতে আছে নাকি?তুমি কাঁদলে যে তোমাকে সবাই দুর্বল ভাববে।তারপর থেকে আর জনসমক্ষে কাঁদিনি আমি।যেদিন মা চিরতরে চলে গেলেন,বুক ভেঙে কান্না আসছিল।কিন্তু কাঁদিনি।মনে পড়ছিল মায়ের কথাগুলো-‘ছেলেদের কাঁদতে নেই।’  কাঁদিনি কিন্তু বুকের মধ্যে চলছিল রক্তক্ষরণ।

  তোমাকে নিয়ে শুরু করলাম সংসার জীবন।প্রথমে চলার পথ  বড় কঠিন ছিল ।এত বৈভব, সামাজিক প্রতিষ্ঠা সেদিন ছিলনা।টিউশানির পয়সায় সংসার চলত।বেশিরভাগ টাকাই চলে যেত

বাবার ওষুধে। তাই বেশিরভাগ রাতেই চলত তোমার আমার উপবাস তোমাকে লুকিয়ে চোখের জল ফেলতে  দেখেছি।কিন্তু কাঁদিনি আমি ।মন শক্ত করে লড়ে গেছি।

         এরপর স্বচ্ছলতা যখন এলো,আবির এলো তোমার কোল আলো করে পরম যত্নে দু’জনে বড় করলাম তাকে।ও যেদিন বৌমাকে নিয়ে বিদেশ চলে গেল তুমি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলে।জানো,আমারও মনে হয়েছিল হাউ হাউ করে কাঁদি কিন্তু কান্না চেপে রেখেছিলাম বুকের ভিতর।কাঁদলে চলবে কিকরে?তুমি যে তখন দিশেহারা।তোমাকে ভরসা দিতে হবে যে।যে বুক তোমাকে ভরসা জোগাবে সেই বুক কী করে কান্নায় প্লাবিত হবে?দুহাতে আগলে সেদিন তোমায় বলেছিলাম “আমি তো আছি।আগলে রাখবো তোমায় সারা জীবন।”  আমার কথা আমি রেখেছি নিরু।

 তুমি যেদিন চলে গেলে আমার চোখের জল আর বাঁধ মানলোনা।ছুটে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধকরে অনেকক্ষন কেঁদেছিলাম।বাইরে সকলের সামনে তো কাঁদা যাবেনা।পুরুষ মানুষ যে!তারপর থেকে নিঃসঙ্গ ,একাকী আমি।ছেলে বলেছিল তাদের সঙ্গে যেতে। কিন্তু আমি যাইনি।তোমার স্মৃতি জড়ানো বাড়ী খানা ছেড়ে যেতে পারিনি আমি।জীবনে চলার পথে দুঃখে,কষ্টে আঘাতে  যখনই চোখে জল এসেছে,বারবার মনে হয়েছে আমি কাঁদলে চলবে কেন?আমাকে যে ভরসা হয়ে দাঁড়াতে হবে আমার কাছের লোকেদের,আপন জনদের।তাই প্রকাশ করিনি।চুপি চুপি কান্না বয়ে চলেছি বুকের মধ্যে।

তারপর শুরু করেছি লিখতে- তোমার কাছে আমার মনের কথা।যখন খুব কষ্ট হয়  তখন লিখি।।আমার প্রতিটি অশ্রুবিন্দু অক্ষর হয়ে ফুটে ওঠে পাতার উপরে আর আমার মন হালকা হয়।মনে হয় যেন কেঁদে হালকা হল মন।তোমাদের তো কাঁদা বারণ নয়।তাই কেঁদে মনের কষ্ট লাঘব করতে পেরেছ।কিন্তু আমরা?আমরা ছেলেরা যে কাঁদতেও পারিনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top