নিশীথে তোমাতে বিভোর

 6 total views

 নিশীথে তোমাতে বিভোর
রওনক জাহান  রিপ্তী
পার্ট ১

নিস্তেজ হয়ে পড়ে যেতে নিলেই কারোর দুহাতের বাহুডোরে আটকা পড়ে যাওয়ায়,, সামনের মানুষ টাকে দেখার ব্যাকুলতা নিয়ে অবসন্ন ও নিবন্ত চোখজোড়া ধীরে ধীরে খুলে ল্যাম্প লাইটের সামান্য আলোয় তাকে বিশ্লেষণ করার ব্যর্থ চেষ্টা চালালো আরোহী। মাথায় খুব জোরে আঘাত লাগায় নিজের মাঝে ও নিজে আছে কিনা তাও বুঝে উঠতে পারছে না ও। মাথাটা নিতান্তই আশি মনের বোঝার মতো লাগছে ওর কাছে।কে ওকে নিজের মাঝে পরম আবেশে আগলে নিলো তা দেখার জন্যও অন্তত ওর চোখ খুলা চাই ই চাই।তাই অনেক চেষ্টায় চোখ পিটপিট করে খুলে তার দিকে তাকিয়ে তাকে বিশ্লেষণ করাতেই মত্ত আরোহী।

“””অদ্ভুত রকমের ফরসা অনেকটা শেতাঙ্গদের মতো।তবে শেতাঙ্গ বললে ভুল হবে। কারন ফরসা অনেকটা ওদের মতো হলেও বাংগালী যে তা স্পষ্ট বোঝা যায়।ডার্ক রেড ঠোঁট,ভ্রু কুচকানো অবস্থায় বড় বড় টানা টানা চোখ যা অতিরিক্ত রাগের ফলে রক্তিম আভায় পরিনত হয়েছে। গালে টোল স্পষ্ট। ব্ল্যাক আর ব্রাউন কালারের কম্বিনেশনে ঘেরা সিল্কি চুল যা কপাল ছাড়িয়ে পড়ে আছে। চুলের জন্য কপালের অংশ টা প্রায় পুরোটাই ঢাকা পরে আছে। হোয়াইট টিশার্ট তার উপর আকাশি কালারের পাতলা শার্ট। শার্টের সবগুলো বাটন খুলা থাকায় হালকা বাতাসেও তা অবিরাম দুলে উঠছে।

আরোহীর মনে হতে লাগলো,, এই রাগমাখা মুখের সাথে গালে টোল আর কালার ম্যাচিং টা নিতান্তই অনন্য আর তা যেন আল্লাহ নিজের হাতে বানিয়েছেন। এর একটুও যদি ব্যতিক্রম হয় তাহলেই যেন সব সৌন্দর্য হারিয়ে যাবে।এই রকম ছাড়া লোকটিকে যেন কিছুতেই মানাতো না। লোকটিকে আরো কিছুক্ষন দেখতে চাইলো আরোহী কিন্তু তা আর করে উঠতে পারল না কারন ব্যথায় চোখ দুটো নিতান্তই নিবিয়ে আসছে তার। আস্থার আবাশ পেয়ে পরিশ্রান্ত শরীর টাকে তার উপর পুরোপুরি ভাবে এলিয়ে দিয়ে নিবন্ততার পাল্লা আরও খানিকটা ভারি করে চোখ দুটো বুজে নিলো ও। সাথে সাথেই যেন পরম আবেশে আরোহীকে বুকে জরিয়ে নিলো সে।


সকালে আস্তে আস্তে চোখ খুলে সামনে তাকাতেই নিজেকে এক অচেনা জায়গায় আবিষ্কার করে আরোহী। উত্তেজনার বসে তাড়াহুড়ো করে শোয়া থেকে উঠে বসতেই মাথায় হালকা চাপ লাগে যার ফলে বেশ জোরেসোরেই চেচিয়ে উঠে ও।

—–আহহহহহহহহহহ….

আরোহীর কন্ঠ শোনা মাত্রই দরজার কাছ থেকে একজন ভিতরে উকি দিলো। আরোহীর জ্ঞান ফিরেছে দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়ে দৌড়ে এসে আরোহীর কেবিনের পাশের চেয়ার টায় ধরাম করে বসে পরল অনু। খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,,,,,

—-ও মাই গড ও মাই গড!! অতঃপর তোর জ্ঞান ফিরেছে জানু! তুই জানিস তোকে এই অবস্থায় দেখে আমার কি নাজেহাল অবস্থা হয়েছিলো।আমি তো ভাবলাম এইবার বুঝি আমার অনলি এন্ড ওয়ান বেস্টু টাও আমায় ছেড়ে চলে যাবে।

আফসোস এর পাহাড় জমিয়ে কথা গুলো বলেই মুখ কালো করে বসে থাকলো অনু। অনুর এই মুখ কালো অবস্থা দেখে বেশ হাসি পাচ্ছে আরোহীর। কিন্তু আরোহী এখন অনুকে পাত্তা দিতে চায় না।কারন ওকে পাত্তা দেওয়া মানে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনা।
ঠোঁট উল্টিয়ে আরোহীর দিকে ফিরে বসে আরোহীর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আবারো বলতে লাগলো অনু,,,,

—-কি রে,,,,,তুই কি কথা বলা ভুলে গেলি নাকি?? At any cost তুই বোবা হয়ে গেলি না তো?

অনুর এই রকম আহাম্মক মার্কা কথায় আরোহী এইবার চরম বিরক্ত। ভ্রু কুচকে মনে মনে ভাবতে লাগলো আরোহী….

—- এর সাথে কথা বললেও দোষ আর না বললেও দোষ। কথা বলছি না দেখে আমায় বোবা বানিয়ে দিলো আর যদি কথা বলি তখন প্রশ্নের ঝুলি নিয়ে বসবে। বলদ একটা।

আরোহীর এই রকম চাহনি দেখে অনু আবার ভ্যা ভ্যা করে কান্না জুরে দিলো আর বিলাপ করতে করতে বলল,,,

— হে খোদা,,,তোমার কাছে কি পাপ করেছিলাম যে আমার এক মাত্র বেস্টু টাকেও তুমি বোবা বানিয়ে দিলা।ও ছাড়া আমার আর কে আছে বলো! আমি এখন সারাদিন কার সাথে কতগা বলব? প্লিজ প্লিজ,,,,ওর কথা ফিরায় দাও। তাইলে আমি মসজিদে গুনে গুনে একশ টাকা দিব।
না না,,,একশ না দিলেও পঞ্চাশ ঠিক দিব।

আরোহী বিরক্তিতে চেচিয়ে উঠে বলল,,,,

—- উফফফফ থামবি তুই!!

আরোহীর মুখে কথা শুনতে পেয়ে আহ্লাদিত হয়ে চেচিয়ে উঠে আরোহীর মাথায় একটা বারি দিয়ে বলল,,,,ওহহহ রিয়েলি তুই কথা বলছিস!

আরোহী ব্যথায় কুকরিয়ে উঠে বলল,,

—- আহহহ,,,,,,মেরে ফেলবি নাকি??

— সসরি দোস্ত।আমার কি দোষ বল!! আমি তো ভেবেছিলাম তুই আর কথা বলবি না।সেই তুই ই যখন কথা বলছিস তখন তো…..

অনুকে থামিয়ে দিয়ে আরোহী বলল,,
—– তোর আর কিচ্ছু বলতে হবে না।তুই প্লিজ চুপ কর!

অনু আরোহীর কথাকে পাত্তা না দিয়ে মুখ বাকিয়ে বলল,,,

— আচ্ছা তোর কি “হাইড্রোক্যাফালাস” হইছে??

— এতোদিনে এই শিখলি??”হাইড্রোক্যাফালাস” মানে হলো মাথায় পানি জমা।আর আমার মাথায় পানি জমেনি বুদ্ধু। আমার মনে হয় এইটা
“ট্রোমাটিক ব্রেইন ইনজুরি ” কারন মাথায় আঘাত পেয়েছি অনেকটা।তবে খুব একটা সিরিয়াস না মনে হয়।

চেম্বারে আসতে আসতে আরোহী আর অনুর কথা কিছুটা শুনতে পেয়ে কথার মাঝে ফোড়ন কেটে ডক্টর আবির হাসান বলল,,,

—– ইয়েস,,,,তোমার “ট্রোমাটিক ব্রেইন ইনজুরি” ই হয়েছে।তবে খুব বেশি সিরিয়াস না।বেশ কয়েকটা টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।বেশি সিরিয়াস হলে তুমি এইভাবে বসে থাকতে বা কথা বলতে পারতে না।

অনু খুব বুঝে ফেলেছে এই রকম একটা ভান করে বলল
— ওহহ।

অনুর এই রকম দায়সারা ভাবে কথা বলাটা বেশ লাগলো আবিরের। আরোহীর চেকাপ করতে করতে বেশ কয়েক বার সে আড়চোখে অনুকে দেখল।অনুর বোকা বোকা কথা বলাটাও যেন আবিরের কাছে একটা আর্ট মনে হতে লাগলো। অনুও আড়চোখে আবিরের দিকে তাকাচ্ছে আর মিটিমিটি হাসছে
আরোহী বেশ কিছুক্ষন ধরেই অনু আর আবির কে খেয়াল করছে। দুজনের মাঝে যে কিছু একটা হতে চলেছে তা ও বেশ বুঝতে পারছে। কিন্তু ট্যুর এ এসে এই রকম কোনো কিছুতে অনুকে জরাতে দিতে চায় না আরোহী। অনুর দিকে এক পলক তাকিয়েই আবির কে উদ্দেশ্য করে বলল আরোহী,,,,

—-উহুম উহুম,,,, বলছিলাম কি আমি তো এখন অনেকটাই সুস্থ। রিলিজ কখন……

এইটুকু বলতেই আবির স্বাভাবিক হয়ে বলল,,,,

— তোমার চেকাপ কম্পলিট আর তুমি এখন অনেকটাই সুস্থ, বিকালেই যেতে পারো। তবে তিন চার দিন বেড রেস্ট এ থাকাটাই ভালো।
বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেলো।

কিছুক্ষণের মাঝেই চারিদিকে পিনপিনে নিরবতা কাজ করল। অনু আবিরের যাওয়ার পানে অপলক ভাবে তাকিয়ে রইল। আর আরোহী মনে মনে ভাবতে লাগলো,,,,

— দুর্বল হোস না অনু। না আছে কোনো চিনা জানা আর না আছে অনেক দিনের কোনো পরিচয়। একি শহরেও থাকে না। কিভাবে কি হবে!

আরোহীর ভাবনার মাঝেই অনু সব চিন্তা ভাবনা ঝেরে ফেলে বলল,,,

—- আচ্ছা,,, এইবার বল কিভাবে কি হলো??

— কিসের কিভাবে কি হলো??

— আরে ধুর!! তোর মাথায় আঘাত টা লাগলো কিভাবে??সেইটা বল…..

—– দোস্ত এইটা শোনার জন্য না অজস্র সময় আছে।আমরা আগে ক্যাফেতে ফিরি তারপর না হয় বলব সব টা।

ক্যাফেতে ফিরার কথা মনে পরতেই অনু লাফিয়ে উঠে চিন্তিত মুখ করে বলল,,,

— ওরে,,,, তোকে খুজে পাওয়া গেছে কিনা তা তো স্যার দের জানানোই হয়নি। আর আমিও যে এখানে এসেছি তাও তো বলা হয়নি। না জানি আজ ক্যাফেতে ফিরার পর কতো ঝড় সামলাতে হবে!তুই তো অসুস্থ এই দোহাই দিয়ে বেচে যাবি।কিন্তু আমি তো শেষ!
তুই জানিস,,,,,কাল থেকে আংকেল আমাকে কতোবার কল করেছে! আমি ফোন রিছিভ ই করিনি। তুই যে মেডিকেল ক্যাম্প এ এসে এইসব ঝামেলা বাধিয়েছিস,,তা আংকেল জানতে পারলে তোর ক্যাম্প তো দুরে থাক তোর মেডিক্যাল এ পরাই বাতিল করে দিবে।

অনুর কথায় আরোহী বেশ জোরেশোরে হেসে ফেলল।
অনু অবাকভাবে আরোহীর দিকে তাকিয়ে বলল,,,

— কি রে!! তোর কী এক ফুটাও চিন্তা হচ্ছে না??
আমি চিন্তা করে মরছি আর তুই হাসছিস!

আরোহী — তুই ই যদি সব চিন্তা করে ফেলিস!! তাহলে আমি করব টা কি শুনি??
তাছাড়া তুই তো আছিস ই চিন্তা করার জন্য।


★সুখ্যাত বিজনেসম্যান মিস্টার আরমান চৌধুরীর মেয়ে হলো আরোহী। আরোহীর একটা ভাই ও আছে। তার নাম আর্থ। আরোহী এইবার মেডিকেলের ফাস্ট ইয়ারে পরে।আর আর্থ ক্লাস নাইন এ।অনেক বড়লোক হয়েও আরোহীর মাঝে অহংকারের লেশ মাত্র নেই। সব সময় সাদামাটা থাকাটাই ওর কাছে ভালো লাগে।
দেখতে ফর্সা।ধবধবে ফর্সা না হলেও যথেষ্ট ফর্সা।
টানা টানা কাজল কালো চোখ। কোমড় অবধি লম্বা চুল আর হাসলে তো গালে টোল স্পষ্ট! বলতে গেলে খুবি মায়াবী দেখতে।
আরোহী সহ আরো ৫ জন ৪ দিনের মেডিক্যাল ক্যাম্প এর জন্য সুন্দরবন এ এসেছে। তার মাঝে দ্বিতীয় দিনেই এইসব ঘটে গেলো।★

#চলবে

(সবার ভালো লাগলে পরের পর্ব দিবো…….অন্যথায় না। ভূল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *