নেকুমুনুপুষু – শম্পা সাহা

” আমার বর না একদম মেয়েদের কাজ করা পছন্দ করে না, শ্বশুর বাড়ি ও তাই!”

তা বলে এতো ভালো চাকরি টা ছেড়ে দিবি?

“দেখ ভালো থাকার জন্য ই তো চাকরি করা, তাহলে যদি ওর রোজগারে দিব্যি সংসার চলে যায় তবে আমি আর কেন বেরোতে যাবো? আর তাছাড়া আমি বেরিয়ে গেলে সংসার কে দেখবে?”

“কেন এতোদিন যারা দেখতো! তারাই দেখবে! তাছাড়া তোর শাশুড়ি ও তো চাকরি করতেন! “

“সেই জন্য ই বিয়ের পর চাকরি ছাড়তে হবে বলেছিল সুব্রত। আসলে ও বলে, “মা বাড়িতে না থাকায় ওদের দু ভাইকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে! “আর তাছাড়া শাশুড়িও হাউস ওয়াইফ বৌমাই চাইতেন। “

“তাহলে উনি কেন ছাড়েন নি?”

“বাদ দে তো, এই বেশ আছি! কেন ফালতু ফালতু খাটতে যাবো? অন্য কথা বল।”

সুনীতার কথায় এষা বেশ বিরক্ত। ওর বর ব্যাঙ্কের বড় চাকুরে আর ও তার আদুরে বউ।

সুনীতা একটু দূরে যাওয়াতে, এষা মুখ ব্যাঁকায়, “হুঃ,নিজের বরের মুরোদ নেই বউ কে সুখে রাখার, আর বড় বড় নারীবাদী কথা! “

পার্লারে চেয়ারে শুয়ে রীণিতা! পাশে দাঁড়িয়ে অ্যাটেন্ডেন্ট মেয়েটি কাঁচি হাতে বিরক্ত, কারণ রীণিতা তখনও সুজয়ের কাছে ডিরেকশন নিচ্ছে,

“কি কাট্ করি বলো তো?
লেয়ারে মানাবে আমাকে? ও আচ্ছা! যদি না মানায়! এ বাবা, যাঃ! আমার এই পাতলা চুলে স্টেপ মানাবে? আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক তো? আচ্ছা, রাখি? “

ফোন কেটে গেল। রীণিতা গদগদ মুখে জানায়, স্টেপই করো, ও বলেছে। বলার সময় মুখ থেকে একটা আদুরে জ্যোতি বেরোচ্ছে যেন!

মেয়েটি মনে মনে ভাবছে, এই পাতলা চুলে ভদ্রমহিলা কে মোটেই স্টেপে ভালো লাগবে না! ভদ্রমহিলা তো বেশ শিক্ষিতা বলেই মনে হচ্ছে, তবু?

পার্টি তে এসে শ্বেতা এক কোণে দাঁড়িয়ে। একটা স্লিভলেস গাউন পড়ে। ওকে দেখে হৈ হৈ করে ওঠে বৈশাখী। ও নিজে একটা দারুণ সালোয়ার পরণে। ওকে মানিয়েছেও ভীষণ।

“কি রে, এভাবে দাঁড়িয়ে কেন?”, ওরা কলেজে একসাথে পড়াশোনা করতো, এখন আবার সহকর্মীদের স্ত্রী। তাই বন্ধুত্ব বেশ গাঢ়।

” দেখ না, এই বিটকেল গাউন পড়ে একটু ও নড়তে পারছি না! “, শ্বেতা বিরক্তি প্রকাশ করে।

” তাহলে পড়েছিস কেন? “,
“দেখ না কৌশিক এতো সখ করে আনলো! ”
“ঢং, তোর ভালো না লাগলে পড়লি কেন? “

” না, রে ও বললো, সোনা তোমাকে খুব ভালো লাগবে! ”
শ্বেতা বেশ গর্বিত। বৈশাখী অবাক, “পছন্দ না হলে সাফ জানিয়ে দিবি”, ” না রে ওকে না বলতে আমার খারাপ লাগে! “, শ্বেতা বেশ একটা শ্লাঘা বোধ করে কথা গুলো বলতে।

এক গা গয়না, ভারী একটা বেনারসি পরে দেবযানী ও বেশ জবুথবু। কিন্তু শাশুড়ি র কড়া নির্দেশ, ননদের বিয়ে, সব বউরা যেন সব গহনা লকার থেকে বের করে পরে। মুখার্জী পরিবারের ঐতিহ্য বলে কথা!

নাকে নোলক পরে দেবযানী বেশ অস্বস্থিতে, তবু বেশ ভালো লাগছে, বেশ একটা আলাদা ফিলিং, বেশ রাণী রাণী লাগছে।

ছোট জা কলেজে পড়ান বলে যা ঘ্যাম! দেখো শাশুড়ি র কথা ও অমান্য করে! গহনা বলতে ওই গলায় একটা পাতলা টিং টিং এ হার, আর কানে ছোট দুল! ছোট লোকের মেয়ে কি বলে সাধে! যেমন ভিখিরি বাড়ির মেয়ে তেমন চাল। কুকুরের পেটে কি ঘি সয়?

জায়েরা , বড়, মেজো, সেজ, ছোট বৌ কে তাদের দল থেকে বাদ দিয়ে নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত ছোট বৌ এর নিন্দা করতে।

এই চিত্র ও আমাদের বেশ পরিচিত। আমরা যত ই নারী স্বাধীনতা নিয়ে চিৎকার করি, যতই বলি পুরষরা আমাদের দমিয়ে রাখতে চায়, আমাদের ব্যক্তি স্বাধীনতা কে সম্মান করে না, মূল্য দেয় না, আমরা পুরুষ তান্ত্রিক সমাজ দ্বারা নিপীড়িত, সত্যি কি সব ক্ষেত্রে তাই? আমাদের এই বশম্বদ হয়ে থাকার ইচ্ছেও কিছুটা দায়ী নয়?

আমি এক উচ্চ শিক্ষিতা মহিলা কে বেশ সুরেলা গলায়, ন্যাকা ন্যাকা সুরে বলতে শুনেছি, “আমার ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট, এ টি এম কার্ড, স্যালারি অ্যাকাউন্ট নাম্বার সব ও জানে, আমি ওসব কিছুই বুঝি না? ” এই কথা বলতে বলতে তিনি যেভাবে চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে সবার প্রতিক্রিয়া দেখছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল যেন তিনি বিশ্ব জয় করেছেন! বলতে ভুলে গেছি, তিনি একজন শিক্ষিকা!

আমাদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে কে দায়ী ?কেন এ দেশে এখনো আমরা সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন, এ জন্য কারা প্রকৃত দায়ী এবং কতোটা ,তা নিয়ে কি এখনো সন্দেহ আছে?

আমরা দোষারোপ না করে, পারি না কি নিজেদের মানসিক অবস্থা কে সুদৃঢ় করতে? এক দিনে হবে না জানি, কিন্তু চেষ্টা তো করাই যায়?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top