নেশা

নেশা
অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়

দীর্ঘ বছর বাদে ত্রিদিবের সাথে আমার দেখা এক বিয়ে বাড়িতে । প্রথমটায় চিনতে পারি নি ওর ক্ষয়ে যাওয়া চেহারার জন্য । মদ খেয়ে এসেছে । টাল সামলাতে পারছে না । ওর বউ আর মেয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করছে ওকে স্বাভাবিক রাখতে । কিন্তু ওর তখন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই । আমি এগিয়ে গেলাম ।
বললাম , তুমি ত্রিদিব না ?
ওরা তিনজনেই আমার দিকে তাকালো । ত্রিদিব ঠিক চিনেছে আমাকে ।
বলল , ঘনা ? আই মিন তুই আমাদের ঘনশ্যাম তো ?
বললাম , হ্যাঁ । ঠিক চিনেছিস ।
তারপর পরিচয় করিয়ে দিল ওর স্ত্রী আর মেয়ের সাথে। ত্রিদিবের মুখ থেকে ভক ভক করে মদের গন্ধ আসছিল । ওর অসংলগ্ন কথা আর মাতলামি দেখে সকলেই ঘুরে ফিরে তাকাচ্ছে । অবস্থা বেগতিক বুঝে তাড়াতাড়ি ওদের নিয়ে বসিয়ে দিলাম ডিনারে । খাবার শেষে এক রকম জোর করেই উঠিয়ে দিলাম একটা অটোতে ।
এর মাস খানেক বাদে একদিন ত্রিদিব এলো আমার অফিসে । না , সেদিন মদ খেয়ে আসে নি । একদম সুস্থ, স্বাভাবিক। তবুও রিস্ক নিলাম না । ওকে নিয়ে চলে এলাম লিন্ডসে স্ট্রিটের এক রেঁস্তোরায় । খাবার খেতে খেতে ত্রিদিব শুরু করলো ওর না বলা কাহিনি ।

ত্রিদিব বলল , স্কুলের স্যারদের জন্যই আজ আমার এই অধঃপতন । তুমি বুঝতেই পারবে না সাধারণ ছাত্রদের টিচাররা কিভাবে টিজ করতেন । সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন সবার সামনে ব্যাক বেঞ্চারসদের হেয় করে । ছাত্র জীবনে কম অপমান সহ্য করিনি । তুমি ভালো ছেলে । তোমার অভিজ্ঞতা হয়তো ভালো । কিন্তু আমার জীবটাই নষ্ট করে দিল ওই সব স্যারেরা ।
আমি বললাম , কি রকম ?
তবে শোনো একটা ঘটনা বলি । আমি অংকে বরাবরই পন্ডিত । পাটিগণিত আমার কাছে বিভীষিকা । তো হয়েছে কি , একদিন ক্লাসে অংক স্যারের প্রিয় ছাত্রগুলো আসে নি । স্যারের মন খারাপ । বোর্ডে একটা অংক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন অংকটা কে পারবে ? ঘটনা চক্রে সেদিন সকালে আমার দাদা আমাকে ঐ অংকটা করিয়েছিল । আমার মনে আছে । ভালোছেলে হওয়ার ইচ্ছায় তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বললাম , স্যার , আমি পারবো ।
ভুত দেখার মত অবস্থা স্যারের । নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছেন না । কি শুনলেন তিনি ? ঠিক শুনেছেন তো ?
নিশ্চিত হবার জন্য জিজ্ঞেস করলেন , তুই কি বললি ?
একটু ভয় পেয়ে কাতর স্বরে বললাম , আমি পারবো স্যার ।
স্যার বিদ্রুপ করে কেটে কেটে বললেন , তুই ! পারবি ! এই অংকটা !
একবার বোর্ডের অংকটা দেখলেন । আর একবার পুরো ক্লাসটাকে দেখে নিয়ে আমার দিকে তাকালেন ।
বললেন , ওরে পাঁঠা , এটা অংক | কাঁঠালপাতা না যে চিবিয়ে চিবিয়ে খাবি । বোস চুপ করে ।
সবাই হো হো করে হেসে উঠলো । মুখটাকে বাংলার পাঁচ করে বসে পড়লাম ।
কিছুক্ষন থেমে ত্রিদিব বলল , ছোটোর থেকে ছাগল , পাঁঠা শুনতে শুনতে আমি মেনে নিয়েছি যে আমিও চতুষ্পদ শ্রেণীর প্রাণী ।
আমি মৃদু প্রতিবাদ করে বললাম , এক দিনের বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা থেকে এই জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সঠিক হয় নি ।
কি বলছিস তুই ? বিচ্ছিন্ন ঘটনা মানে ? কত বলবো ? এতো রোজকার ঘটনা । বছরের পর বছর ধরে চলেছে । একদিনের ঘটনায় আমি সিদ্ধান্ত নিই নি । আমার মত হাজার হাজার ছেলে হীনমন্যতায় ভুগছে শুধু এই জাতীয় স্যারদের জন্য । ভালো আছেন । অনেকেই ভালো আছেন । আমার দুর্ভাগ্য ,তারা কেউ আমার কপালে জোটেন নি । জুটলে হয়তো এরকম নেশাখোর , মাতাল হতাম না ।
আর এক স্যারের কথা বলি । উনি ছিলেন ইতিহাসের স্যার । ক্লাসে তখন মুঘল পিরিয়ড পড়ানো হবে । শুরুতেই স্যার বললেন যে মূলত ছয়জন মোঘল সম্রাটের নাম ইতিহাসে প্রসিদ্ধ । তোমরা কেউ বলতে পারবে ওই ছয়জন সম্রাটের নাম ?
আবার আমি লাফিয়ে উঠলাম । কেন উঠলাম ? ক্লাসটা হচ্ছে পুজোর ছুটির পরে । পুজোর সময় আমাদের পুজো মন্ডপে এসেছিলেন বিখ্যাত জাদুকর পি সি সরকার । উনি অনেক মজার কথা বললেন । দু-তিনটে ম্যাজিক দেখালেন । উনি বলেছিলেন মোঘল সম্রাটদের নাম মনে রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় । ” বাবার হইলো একবার জ্বর সারিল ঔষধে ।” সারাদিন কথাটা বলে বলে আমার মুখস্থ হয়ে গেছে । সেইজন্য আমি লাফিয়ে উঠলাম ।
স্যারের একটুও ভালো লাগলো না । উনি আশা করেছিলেন উনার প্রিয় ছাত্রদের মধ্যে থেকে কেউ দাঁড়াবে । তাই একরাশ বিরক্তি নিয়ে বললেন ,
বলবি ? বল দেখি কেমন পারিস ?
বাবর থেকে ঔরঙ্গজেব পর্যন্ত একদমে বলে দিলাম । সবাই অবাক । স্যারের তো চোখ ছানা বড়া । আমার মুরগির বুক চওড়া হয়ে ভীমের বুক হয়ে গেল । পায়ের তলায় মাটি নেই । আমার চোখদুটো ক্লাসের সব ছাত্রদের মুখের ওপর দিয়ে বিজয় গর্বে ভ্রমন করে এলো । হঠাৎ বাজ পড়লো ঘরে । সবাই চমকে উঠলো । স্যারের চোখে আগুন । এই অন্যায় পরাজয় তিনি মানতে পারছেন না । আমাকে অপদস্থ করতে বাজখাঁই গলায় বললেন ,
ভালো ছেলে সাজা হচ্ছে । দেখাচ্ছি তোমায় ।
আমি তো হা হয়ে তাকিয়ে আছি ।
বল , তোর বাবার নাম বল ?
স্যার তো আমার বাবার নাম জানে । পরিচিত । আবার নাম জিজ্ঞেস করছে কেন ?
তবুও বললাম ।
তোর ঠাকুরদার নাম কি ?
একটু মনে করে তাও বললাম ।
ঠাকুরদার বাবার নাম কি ?
এই রে ! এতো জানি না ।
আসলে জানার কখনো প্রয়োজন হয় নি তাই বাবাকে জিজ্ঞেস করি নি । আর তখন এত চালাক ছিলাম না যে বানিয়ে বানিয়ে বলবো । বাধ্য হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি । আমাকে বাগে পেয়েছেন । এবার হবে আমার মুণ্ডুপাত ।
বললেন , নিজের বাপ্ – ঠাকুরদার নাম জানিস না , তোর চুল্লু ভর পানিতে ডোবা উচিত । কত বড় ছাগল , নিজের বাপ ঠাকুরদার নাম বাদ দিয়ে পরের বাপ্ ঠাকুরদার নাম মুখস্থ করেছিস । তোরা সবাই চিনে রাখ এই ছাগলটাকে ।
ক্লাসের মধ্যে হাসির রোল । কিছুক্ষন আগেও যে চোখে বিজয়ীর অহংকার ছিল , মুহূর্তের মধ্যে সেই চোখ গেল জলে ভোরে । কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লাম ।
বারো তেরো বছর বয়স থেকে নিজেকে গরু , ছাগল ভাবতে শিখেছি । মনে মনে ঠিক করলাম আমি যখন ভালো না তখন খারাপ হব । সেই থেকে শুরু খারাপ ছেলেদের সাথে মেলা মেশা । স্কুলের বাথরুমে লুকিয়ে বিড়ি খেতাম । ধরা পড়লে জুটতো মার । আবার খেতাম । মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েই মদের বোতলে ঠোঁট ছোঁয়ালাম । প্রথমদিকে ভালো লাগে নি । বন্ধুরা উৎসাহ দিল । আস্তে আস্তে ধরে গেল নেশা । মদের নেশা । যত বড় হতে লাগলাম তত নেশা বেড়ে গেল । প্রথম প্রথম বাড়ির জিনিস চুরি করে মদের টাকা জোগাড় করতাম । জুটে গেল গ্লাসের বন্ধু । রোজ ডিউটি থেকে বাড়ি ফেরার পথে চলে যেতাম বারদুয়ারী । বাংলা মদ সাথে ভেজানো ছোলা নুন আর লেবু দিয়ে মাখা । আহা ! এই স্বাদের কোন তুলনা নেই ।
ট্রেনে উঠে যাতে ঘুমিয়ে না পড়ি তাই এক একটা স্টেশনের নাম জোরে জোরে বলতাম । কিন্তু নিজেদের স্টেশন আসার আগেই ঘুমিয়ে পড়তাম । ঘুম যখন ভাঙতো দেখি কৃষ্ণনগর কিংবা রানাঘাটে পৌঁছে গেছি । চেকার ধরতো । এক রাত্রি জেলে কাটিয়ে ফিরে আসতাম ।
কোনো লজ্বা নেই ।
কোনো কোনো দিন স্টেশনে নেমে যেতাম সাইকেল স্ট্যান্ডে । কিন্তু সাইকেলে উঠতে পারতাম না । দোকানের ছেলেটা সাইকেল রেখে দিয়ে রিকশায় তুলে দিত । টাল খাচ্ছি । বেগতিক দেখে রিক্সায়ালা আমাকে বসিয়ে দিত পাদানিতে | পাদানিতে বসে রিক্সাওয়ালার সিটের পেছনের রিং দুটো ধরে থাকতাম শক্ত করে । কতদিন ট্রেনে উঠতে পারি নি । মাথা ঘুরে স্টেশনে পড়ে গেছি । প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকতাম । রেলওয়ে পুলিশ তুলে নিয়ে যেত ।
এর নাম কারন সুধা । এই নেশা যে করেছে সেই জানে এর মাহাত্ম । আমাকে ভালো করতে আমার বাবা উঠে পড়ে লাগলেন । নিয়ে গেলেন সল্ট লেকে এক ডাক্তারের চেম্বারে । মদের নেশা ছুটাবার ডাক্তার । অনেক কাউন্সেলিং হল । ওষুধ দিলেন । আমি মনে মনে হাসি |
জিজ্ঞেস করলাম , কেন ?
আরে , যে ছেলে হেঁটে হেঁটে বারদুয়ারী গিয়ে মদ খায় ,জানবি সে মদ খায় না , মদ তাকে খায় । নেশা এমন জিনিস ।
হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল , তুই ভালো ছেলে । আমার মত পাঁঠার সাথে বন্ধুত্ব রেখেছিস বলে ধন্যবাদ । বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে একটা জিনিস চাইব ?
কি ?
পঞ্চাশটা টাকা দিবি ? গলাটা শুকিয়ে গেছে । একটু মদ খাবো । ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top