পটলপুরের পটচিত্র – পর্ব ৩ // সুব্রত মজুমদার

 25 total views

#অদ্ভুতুড়ে

#পটলপুরের_পটচিত্র (পর্ব ৩)

#সুব্রত_মজুমদার

রোগী একলাফে উঠে পালাল। অবিনাশ ডাক্তার পড়লেন চিন্তায়, জলে মাছের সমান পদ্মপুকুর, পুকুর ভেঙ্গে মাছ বেরিয়ে গেলে অনেক টাকা লোকসান। উঠে পড়লেন চেয়ার হতে।

ছাতা বের করার জন্য হাত ঢোকালেন ওষুধের আলমারিতে । ছাতা আলমারির নিচের থাকেই থাকে। নিচের থাকটা অন্য দুটো থাকের থেকে বড়। কিন্তু কি আশ্চর্য টান মারলেও ছাতা বের হয়ে আসতে চায় না।
বিরক্ত হয়ে গেলেন ডাক্তারবাবু, আরও জোরে টান দিলেন।

কিন্তু তাতেও কাজ হল না। ভয়ানক রেগে গেল ছাতাখানা, হাতে কামড়ে দিল ডাক্তারের। ডাক্তারবাবু ‘উফ’ বলে একটা শব্দ করে বের করে আনলেন হাতখানা।

-“কি হল হে ডাক্তার ?” উপস্থিত একজন শুধাল।
-“কি জানি কিসে যেন কামড়ে দিল।”
উপস্থিত ইয়ারবন্ধুরা ত্রস্ত হয়ে উঠলেন কামড়ের কথা শুনে। ভয়ে ভয়ে নিজেদের চেয়ারের তলাটা দেখতে লাগল তারা। নিজের সুরক্ষা সর্বাগ্রে। কেউ কেউ তো পা তুলে বসলেন। নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পর বন্ধুর কথা মনে পড়ল।

-“সাপ টাপ নয় তো হে ? এই বর্ষার সময় সাপের উপদ্রব বাড়ে।” শুধাল একজন।
ডাক্তারের টনক নড়ল এবার। সাপ হতেই পারে। তাহলে উপায় ? হাতের উপর টর্চের জোরালো আলো ফেলে দেখতে লাগলেন। হ্যাঁ স্পষ্ট দাঁতের দাগ।

অজ্ঞান হয়ে গেলেন ডাক্তার। তড়িঘড়ি একজন ছুটল বিশে ওঝার ঘর। এ তল্লাটের মধ্যে বিশে ওঝাই সাপেকাটার একমাত্র ওঝা ।

বিশে ওঝা বসেছিল রান্নাঘরে। ছেলেপিলেদের নিয়ে বাপের বাড়ি গেছে বৌ, তাই এই সূযোগে পুরোনো প্রেম ঝালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল সে। উনুনের মুখে অল্প অল্প করে কাঠের গুঁড়ো ঢুকিয়ে দিচ্ছিল আর আগুনটা লকলক করে উঠছিল খিচুড়ির হাড়িকে ঘিরে। আর মাঝে মাঝে লজ্জা জড়িত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল অতসীর দিকে। অতসী ওর……

-“খিচুড়ি আর বেগুন ভাজা করছি। খেয়ে যাবে। একদিন খেলেই নাহয় আমার রান্না।”

অতসী ব্যস্ত হয়ে বলল, “না না, বেশিক্ষণ বসা হবে না আমার। বলাইয়ের বাপ মাছ ধরতে গিয়েছে অবিনাশ ডাক্তারের পুকুরে। পুকুর ভেঙ্গে মাছ উঠে আসছে গো। তুমিও যেতে পারতে।”

বেশ রসিয়ে জবাব দেওয়ার ইচ্ছা ছিল বিশের, কিন্তু সেই রসে মাছি পড়ে গেল নিমেষে। বাইরে যেন কার ডাক শোনা গেল -“বিশু ভাই বাড়িতে আছ ?”

একরাশ বিরক্তি নিয়ে বিশু বলল,”আছি আছি। কি দরকার ?”

লোকটা আর বিলম্ব না করে ঢুকে পড়ল বিশের রান্নাঘরে। তারপর জিভ বের করে বলল,”আমি জানতাম বৌমা বাপের বাড়ি গেছে।”

বিশে রেগে গিয়ে বলল, “আমার বৌ কোথায় গেল তাতে তোমার কি ? আমাকে নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বলে ফেল তো কিজন্য এসেছ ?”

-“অবিনাশ ডাক্তারকে সাপে কেটেছে রে, বিশাল লম্বা গোখরো। আর বোধহয় বাঁচবে না।” বেশ উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল লোকটা।

মনে মনে হাসল বিশে, এই অবিনাশ ডাক্তারই বলেছে যে মন্ত্রে বিষ যায় না, অ্যান্টিবেনিম না কি যেন খেতে হয়। আজ সেই ডাক্তারই মরতে বসেছে। বাঁচাতে পারলে বুক বাজিয়ে বলতে পারবে, – দেখ ডাক্তারেরও ডাক্তার এই বিশে ওঝা।

বিশে গেল অবিনাশ ডাক্তারের ঘরে। গিয়েই দেখে ডাক্তার পড়ে আছে মেঝেতে। না, বিষের তো কোনও লক্ষণ দেখি যাচ্ছে না। হাতের উপরে কামড়ের দাগটা ভালো করে দেখতে লাগল বিশে। স্পষ্ট দুটো দাগ। বিষাক্ত সাপই বটে।

ডাক্তারের পিঠে বুকে আর কপালে কড়ি রেখে মন্ত্র পড়তে লাগল বিশে।

সাঁওতালি পব্বতে লোহার বাসর
কালিনাগ পবেশিল তাহার ভেতর।
দংশিল লখাইধনে কঠিন কালিয়া,
সেই বিষে লখাইয়ের নীল হল কায়া।
গরুড় অমেত্ত আনে, ঝাড়ে আস্তিকের মা,
সে ঝাড়নে লখাই আমার কাড়িল রা।
লখাই কোলে নিল মায়ে আহা কি আনন্দ,
আজি হতে এই মন্ত্রে বিষ হল বন্ধ।

ঝেড়েই চলল বিশে। কিন্তু ডাক্তারের নড়নচড়ন নেই। শেষমেশ হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, “ডাক্তার আর বাঁচবে না গো। বিষ মাথায় উঠে গেছে। তা না হলে অত কঠিন কঠিন মন্তেও রা না কাড়ে !”

আলমারির ভেতরে বসে বসে এইসব তামাশা দেখছি চরণদাস। ডাক্তার তো ওর ধুতিটাকেই ছাতা ভেবে টানছিল। কি বের করছিস চোখে দেখ। তা নয়…

কি করবে আর একরকম বাধ্য হয়েই নিজের ধুতি বাঁচাতে কামড় দিয়েছে ডাক্তারের হাতে। আর ডাক্তারও পারে মাইরি, একদম অজ্ঞান !

রেগেমেগে আলমারি হতে বের হয়েই ডাক্তারের গালে লাগাল কষে এক চড়। ধড়মড় করে উঠে বসল ডাক্তার। গালে হাত বুলোতে লাগল।

চরণদাসের মুখে সব কথা শোনার পর উপস্থিত একজন বলল, “তা তুমি তখনই বেরিয়ে এলে না কেন চরণ ? তাহলে তো এতকিছু হত না।”

চরণদাস বলল, “কি আর বলব বলুন, মাসখানেক আগে একশ টাকা নিয়েছিলাম সমর দত্তর কাছ হতে, সুদসহ তিনশ হয়েছে এখন। রোজই তাগাদায় আসছে। না পালিয়ে উপায় আছে ?”

চরণদাসের বক্তব্যকে সমর্থন করল সবাই, আর সেই সঙ্গে অবিনাশ ডাক্তারের ভীতু স্বভাব নিয়ে শোরগোল পড়ে গেল। কিন্তু চরণদাসের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এল না কেউই। অর্থনীতিতে বাঙালি বড়ই রক্ষণশীল।

এইসব আলোচনার মাঝেই সমর দত্ত এসে হাজির। অবিনাশ ডাক্তারকে সাপের কাটার খবরটা তার কানেও গেছে, তাই তিনি এসে হাজির হয়েছেন। এই বাহানাতে কিছু সময়ও কাটবে। আর বিশে ওঝার বিষঝাড়া নাকি খুবই মনোজ্ঞ, চোখের প্রশান্তি।

এদিকে সমর দত্তকে দেখেই আবার আলমারিতে ঢুকে পড়েছে চরণদাস। অবিনাশ ডাক্তারের জ্ঞান ফেরায় সমর দত্তর সময় কাটানোর একটা উপায় হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে। হতাশ হয়ে ফিরেই যাচ্ছিলেন, কিন্তু চরণদাস কে দেখেই থমকে দাঁড়ালেন । এগিয়ে গেলেন আলমারির দিকে। চলল চরণদাস আর সমর দত্তর ভেতর দড়ি-টানাটানি খেলা।

একবার সমর দত্ত টেনে হিঁচড়ে বের করে চরণদাসকে তো চরণদাস আবার ঢুকে পড়ে আলমারির ভেতর।

চরণদাস আর সমর দত্তর এই খেলা দেখতে ভিড় জমে যায়। উপস্থিত জনতা দু’দলে ভাগ হয়ে দু’জনকে উৎসাহ দিতে থাকে।

একদল বলে, “টেনে… টেনে…. টেনে বের করুন ব্যাটাকে… হ্যাঁ.. হ্যাঁ…”
তো অপরদল বলে, “একদম বেরোবি না চরণ, ওই সুদখোরকে সুযোগ দিবি না একদম। কামড় লাগা কামড়।….”

নিজের চেয়ারে বসে বসে গালে হাত দিয়ে আলমারিটার ভবিষ্যত চিন্তা করতে থাকেন অবিনাশ ডাক্তার। এরকম ধস্তাধস্তি কি সহ্য করতে পারবে ওই আলমারি ?

না, ডাক্তারের আশঙ্কাই সত্যি হল। উল্টে পড়ল আলমারি। আলমারির ভেতরে চরণদাস আর তলায় সমর দত্ত। আলমারিটা গেল। দুজনের অবস্থা দেখে মনে মনে খুশি হলেন ডাক্তার, সঙ্গে আলমারির দুঃখ।

চোখের কোণ দিয়ে একবিন্দু জল গড়িয়ে পড়ল। সেই অশ্রু আনন্দ না দুঃখের তা ডাক্তারই জানেন।
চলবে…..

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *