পটলপুরের পটচিত্র – পর্ব ৬ // সুব্রত মজুমদার

 29 total views

#অদ্ভুতুড়ে

#পটলপুরের_পটচিত্র (পর্ব ৬)

#সুব্রত_মজুমদার

কপাল শাস্ত্রীর আসল নাম পদ্মপলাশ উপাধ্যায়, ঠাকুরদার ছিলেন বেনারসের বিখ্যাত হস্তরেখাবিদ। জলের তুলনায় তৃষ্ণার্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ভাগ্যান্বেষণে এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেন।

এহেন হস্তরেখাবিদের নাতি যে কপাল পড়তে পারবেন, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহই থাকে না। পদ্মপলাশও কপাল শাস্ত্রী নাম নিয়ে বসে পড়ল বাপ ঠাকুরদার গদিতে।পৈতৃক ব্যবসা। কিন্তু কপালের কপাল বোধহয় প্রসন্ন ছিল না। প্রথম ধাক্কাতেই মুখ থুবড়ে পড়লেন।

সময়টা চৈত্র মাসের দুপুর, বারান্দায় বসে বসে একটা প্রাচীন হোরাশাস্ত্রের পুঁথি পড়ছেন শাস্ত্রী মশাই। আর তখনই ঝোড়ো কাকের মতো এসে হাজির হল সমর দত্ত। বড়লোক বাপের বখেযাওয়া ছেলে। কৃপণ বাপের হাত গলে জল বেরোয় না, খুব অর্থকষ্টে আছে সে।

সবশুনে বিজ্ঞের মতো হাসলেন শাস্ত্রীমশাই, “মানে বাপের ট্যাঁক হতে কিছু মালকড়ি বার করে আনতে হবে। তা ভাই এ কাজ যদি অতই সহজ হতো তবে আমি কি লোকের কপাল দেখে বেড়াতাম ?”

সমর দত্ত ছাড়ার পাত্র নয়। সে শাস্ত্রীমশাইয়ের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল, “আমি তোমাকে ছাড়ব না দাদা, কিছু একটা করতেই হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তুমিই পারবে। বশীকরন করা যায় না ?”

বশীকরন করা যায় কি না তা ভালো করেই জানেন শাস্ত্রীমশাই। ও বিদ্যা কিছুটা শিখেছিলেন বটে কিন্তু প্রয়োগ করতে গিয়ে যা ঘটেছিল…… তারপর হতে ওদিকে পা বাড়ানি উনি।

-“আমার বখরা কি ?” সমর দত্তকে শুধালেন শাস্ত্রীমশাই।
-“শতকরা দশ টাকা”
-“উঁহু, এত বড় কাজ, শতকরা পঁচিশ টাকার কমে পারব না।”

বিনা বাক্যব্যয়ে রাজি হয়ে গেলেন সমর দত্ত। শাস্ত্রীমশাই তখন তার পুরোনো সিন্দুক খুলে তার ভেতর হতে বের করে নিয়ে এলেন খবরের কাগজে মোড়া চূর্ণ। সমর দত্তর হাতে দিয়ে বললেন, “খাবার বা পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দিলেই কেল্লা ফতে। আর মেশানোর সময় ‘ট্রিং ট্রিং টং টটনং, পিং পিং পিং পপপং’ মন্ত্রটা পড়ে নিয়ো ।”

চূর্ণ নিয়ে ঘরে এলেন সমর। সূযোগ খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু সূযোগ আর আসে না। যতবারই খাবারের সঙ্গে মেশাতে যান ততবারই কেউ না কেউ এসে পড়ে। বিরক্ত হয়ে গোটা হাঁড়ির ভাতেই মিশিয়ে ফেললেন সেই চূর্ণ। বশীকরন হচ্ছে তো সবারই হোক, তাহলে আর চিন্তা থাকবে না, কেউ বকাঝকা করবে না। পড়াশোনার পাট তুলে দিয়ে পায়ের উপর পা তুলে খাবেন আর খেলে বেড়াবেন।

কিন্তু সবসময় হিসাব মেলে না। বিশেষত যার ঘরে অপোগণ্ড ভাইবোন থাকে তার। সমরের দুটো পিঠেপিঠি বোন নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে বিচারের জন্য এল রান্নাঘরে মায়ের কাছে। কিন্তু সেখানেও চুলোচুলি। ছোটটা গিয়ে পড়ল ভাতের হাঁড়ির উপর। হাঁড়ির ভাত ছিটিয়ে পড়ল গোটা রান্নাঘরে।

ঘটনায় মর্মাহত হয়ে অন্নজল ত্যাগ করলেন সমর। কিন্তু অন্নের বরবাদ তো গৃহস্থঘরে হয় না। কাজের মেয়েটা সেই ভাত কুড়িয়ে দিয়ে এল গরুর পাতনায়। মা লক্ষ্মী নষ্ট করা পাপ।

শীতের সময় চাষের বলদদুটো বাঁধা ছিল বাইরেই। একটু মুখে দিয়েই মুখ নামিয়ে নিল তারা। এসময়টা রোদের দিকে পিঠ করে জাবর কাটাতেই মনোযোগ দিল তারা। আর সেই সূযোগে তাদের পাতনা হতে কাক, কুকুর, ছাগল, বক, চড়াই, যে যে পারল পেট ভরানোর চেষ্টা করল।

পরদিন সকাল হতেই জমে গেল খেলা। বশীকরণ চূর্ণের ফল পাওয়া গেল হাতেনাতে। যত রাজ্যের হাঁস মুরগি কুকুর বক শালিখ সবাই পিছু ধরল সমরের। সমর যেখানেই যান সেখানেই যায় তারা। জীবন অতীষ্ঠ করে তুলল। রেগেমেগে ছুটলেন কপাল শাস্ত্রীর কাছে।

শাস্ত্রীমশাই তো হে এই কুটিপাটি। কোনোরকমে হাসি থামিয়ে বললেন, “আমি আমার কাজ করেছি। চূর্ণ দিয়েছি, পদ্ধতি বলে দিয়েছি। এখন তুমি যদি সেটা পশুকুলে বিতরণ কর তবে আমার কি দায় ?”

চোখের জল মুছে ফণা তুললেন সমর। শাস্ত্রীমশাইয়ের চোখে চোখ রেখে বললেন, “তাহলে তো হিসেবমতো পঁচিশ পারসেন্ট ঝামেলা আপনার নেওয়ার কথা। যতক্ষণ না এই সমস্যার সমাধান করছেন ততক্ষণ আপনার ঘর হতে বের হব না।”

বিপদে পড়লেন কপাল শাস্ত্রী যত পশুপাখির আস্তাবল হয়ে উঠল ঘর। কিন্তু বশীকরণ কাটানো তার কাজ নয়। অগত্যা গৃহত্যাগ করলেন রাতের অন্ধকারে।

শাস্ত্রীমশাইয়ের গল্প শুনে হেঁসে কুটিপাটি হল সবাই। অবিনাশ ডাক্তার বললেন,”লোকটার কপাল বিচার করে দিতে হবে আপনাকে। যেখানে সব ফর্সা সেখানে কপাল শাস্ত্রী-ই ভরসা।”

তিন

আগন্তুক লোকটার কপাল পরীক্ষা করতে এসে নিজেই কপালের ফেরে পড়ে গেলেন কপাল শাস্ত্রী। মাঝ রাস্তায় দেখা হয়ে গেল জগাইয়ের সঙ্গে।

পথিমধ্যে অনামুখোর দর্শনও অতটা ক্ষতিকর নয় যতটা জগাইয়ের সাক্ষাৎ। এ যেন পাগলা ষাঁড়ের মুখোমুখি হওয়া। তুমি যেখানেই যাও পেছন পেছন ধাওয়া করবে।

-“ও শাস্ত্রীজী, এদিকে… এদিকে… সু… সু….”
পথিমধ্যে এরকম আহ্বান শুনে থমকে দাঁড়ালেন শাস্ত্রীজী। জগাইকে দেখেই যারপরনাই বিরক্ত হয়ে বললেন, “সু সু কি ? আমি কি কুকুর ? পথ ছাড়্।”

পথ ছাড়ল না জগাই, বরং মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। একগাল পাগলাটে হাসি হেসে বলল, “আমার কপালটা দেখে দিতে হবে কাকা। জীবনে খুব দুঃখ। খুব কষ্ট।”

ঝরঝর করে কাঁদতে লাগল জগাই। পাগলের কান্না মানে ভয়ঙ্কর ব্যাপার, যে কোনও সময় যা কিছু ঘটতে পারে। অভিজ্ঞ শাস্ত্রীমশাই সেটা বুঝেই আর না করলেন না। চললেন জগাইয়ের ঘর।

জগাই নিজে পাগল হলেও ঘরখানা বেশ গোছানো। গোটা গ্রামের এরকম পরিপাটি করে সাজানো ঘর পাওয়া যাবে না। কয়েকবছর হল এ গ্রামে এসেছে ও। এর আগে কোথায় ছিল, কি পরিচয় তা কেউই জানে না। জিজ্ঞাসা করলে বলে, “ভগবানের এই সৃষ্টিতে কি ঘর আর কিই বা গাছতলা। চোখ বন্ধ করলে দুনিয়া আঁধার।”

এরপরেই গান ধরে জগাই-

কি আনন্দ কি আনন্দ কি আনন্দ,
নবীন ভানু ওঠে পুবের গগনে পাখি গায় বায়ু বয় মন্দ।
কি আনন্দ কি আনন্দ কি আনন্দ।
মাঠে মাঠে খেলা করে পুবালী বাতাস, হৃদয়ে আঁকে তার ছন্দ।
কি আনন্দ কি আনন্দ কি আনন্দ।
ভাঙি অন্ধ কারা এলো বাইরে যারা তারা উচ্ছলে সঙ্গীত তাণে,
হাজার বছর ধরে যা ছিল হিয়ার পরে আজি মুখরিত সে গানে।
আজি আনন্দ দিনে ভাই জগতে কিছু না চাই শুধু হাসি আর কলগান,
যা ছিল দুখের ভার নাই নাই নাই আর অমৃত রস কর পান।
যা ছিল জীর্ণ জরা সুধারসে হল ভরা কঠিন জীবন সুখছন্দ,
বসন্ত সমাগমে মাধবী-মধুপ রমে মলয়ে বাতাসে বহে গন্ধ।
কি আনন্দ কি আনন্দ কি আনন্দ।

এহেন জগাইকে পাগল বলে ভাবতে ইচ্ছা করে না কারোর। অনেকেই তো জগাইকে সিআইডির লোক বলে সন্দেহ করে। শাস্ত্রী মশাইয়ের সেরকমই সন্দেহ। কিন্তু খোলাখুলি তো সে কথা বলা যায় না।

তবে মাঝে মাঝে জগাইয়ের রকমসকম দেখে আবার অন্যরকমকিছু মনে হয়। মনে হয় যেন ভগবান এই মালটিকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন ব্রেনের তারগুলো ঠিকঠাক ভাবে না জুড়েই।
চলবে….

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *