পটলপুরের পটচিত্র – পর্ব ৮ // সুব্রত মজুমদার

 23 total views

#অদ্ভুতুড়ে

#পটলপুরের_পটচিত্র (পর্ব ৭)

#সুব্রত_মজুমদার

এহেন জগাইকে পাগল বলে ভাবতে ইচ্ছা করে না কারোর। অনেকেই তো জগাইকে সিআইডির লোক বলে সন্দেহ করে। শাস্ত্রী মশাইয়ের সেরকমই সন্দেহ। কিন্তু খোলাখুলি তো সে কথা বলা যায় না।

তবে মাঝে মাঝে জগাইয়ের রকমসকম দেখে আবার অন্যরকমকিছু মনে হয়। মনে হয় যেন ভগবান এই মালটিকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন ব্রেনের তারগুলো ঠিকঠাক ভাবে না জুড়েই।

-“শাস্ত্রীজী চা।” বোন চায়নার কাপে করে চা নিয়ে এল জগাই। সঙ্গে বিস্কুট।

চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখেই নিজের কপালখানা এগিয়ে দিল। শাস্ত্রী মশাই ভয়ে ভয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। তারপর জগাইয়ের কপালের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অনেক কপাল পড়েছি রে, কিন্তু তোর মতো কপাল…. না এতবছরেও দেখিনি। সব ধোঁয়া ধোঁয়া। আচ্ছা জগাই…”
-“কি শাস্ত্রীজী…”
-“চা-তে কি দিয়েছিস রে ? কিরকম যেন স্বাদ।”

একগাল হেসে জগাই বলল, “তেমন কিছু না শাস্ত্রীজী, – টিকটিকিরা লেজ।”

-“আঁ…..” চোখ কপালে উঠে গেল শাস্ত্রী মশাইয়ের, গা গুলোতে শুরু করল। পেটে মোচড় দিচ্ছে যেন। আর বসে থাকতে পারলেন না। বমি করতে শুরু করলেন। একনাগাড়ে হয়ে চলল বমি। অবিনাশ ডাক্তার ধাত দেখে বললেন, “ভগবানই ভরসা।”

দিন দুয়েক অজ্ঞান থাকার পর যখন চোখ মেললেন শাস্ত্রীমশাই তখন শরীর খুবই দূর্বল। সেলাইন চলছে।

-“আমি কোথায় ?” চোখ মেলেই প্রশ্ন করলেন শাস্ত্রীমশাই।
-“ধরাতেই আছেন, তবে সময়মতো ধরতে না পারলে উড়ে যেতেন।” সহাস্যে বললেন অবিনাশ ডাক্তার।

ঢোঁক গিললেন কপাল শাস্ত্রী । নিজের কপালের লেখা পড়তে না পারার জন্য খুবই লজ্জিত তিনি। কারোর চোখে চোখ রাখতে পারছেন না। তবে এটা নিশ্চিত যে সুস্থ হওয়ার পর ওই হাড়বজ্জাত বদমাইশটাকে তিনি ছাড়বে না।

গ্রামে যখন এসব হাজারও সমস্যা ঠিক সেইসময় গ্রামের শেষে একান্ত আবাসে গবেষণা করে যাচ্ছেন প্রফেসর রসিক রসায়ন। তার ‘প্রজেক্ট লাবড়ো’ প্রায় বাস্তবায়নের পথে। কিন্তু যা সব উপদ্রব শুরু হয়েছে তাতে গবেষণা চালানোই দায়।

সন্ধ্যা হতেই ল্যাবরেটরিতে ঢোকা দায়, শিশি বোতল সব যেন খটখট করে নড়ছে। প্রথমে ভেবেছিলেন ইঁদুর, কিন্তু না ইঁদুর নয়, ছায়া ছায়া আবছা আবছা মূর্তি। কাছে গেলেই উধাও হয়ে যায়।

আজ সকালে উঠে ল্যাবরেটরির টেবিলে বুনসেন বার্ণারের পাশে বাঁধাকপির তরকারি পেয়েছেন। যেন কেউ খেতে খেতে ফেলেছে। একটু খেয়ে দেখলেন, বেশ ঝালঝাল আর খোশবাইও উঠেছে খুব।

-“অ হা হা… কি করছেন বাবু, উসব কিসে না কিসে এনে ফেলেছে, উ কি কেউ মুখে দেয় ?” দৌড়ে এল চরণদাস।

-“কি সব উল্টাপাল্টা রাঁধিস রে তুই ? দেখ কেমন স্বাদ।” খেঁকিয়ে উঠলেন প্রফেসর ।

চরণদাস মুখ হাঁড়ি করে বলল, “এ্যাতকাল খেয়েদেয়ে এখন রুচছে না ! আমি আর থাকব না, যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাব। আপনি আমার বকেয়া বেতন মিটিয়ে দিন।” গট গট করে বেরিয়ে যায় ঘর হতে।

-“আরে শোন শোন শোন…. আমি ওভাবে বলিনি।” পেছন পেছন ছুটে যান প্রফেসর। কিন্তু কিছুদূর গিয়েই কিসে যেন হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। একটা হাঁড়ি। আর সেই হাঁড়িটা প্রফেসরের পায়ে লেগে উঠে গেল উপরে, তারপর সোজা নিচে এসে আটকে গেল প্রফেসরের মাথায়।

প্রফেসরের চিৎকার শুনে ছুটে এল চরণদাস। ধরাধরি করে নিয়ে গেল অবিনাশ ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারের দাওয়াতে বসিয়ে দেওয়া হল প্রফেসরকে। কালিহাঁড়িতে মুণ্ডু ঢেকে বসে থাকা লোকটাকে দেখতে দলে দলে লোক আসতে লাগল। চরণদাসের কোনও কথাকেই পাত্তা না দিয়ে নিজেরাই গবেষণা করতে লাগল লোকটি কে এবং এই দশা কেন সেই সম্মন্ধে।

-“ঘরে খেতে না পেলে এমনই হয়। কোথাও চুরি করে খেতে গিয়ে এরকম হয়েছে।” মন্তব্য করল একজন।

পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন ই বক্তব্যকে সমর্থন করে বলল, “একদম ঠিক বলেছ ভায়া, সমর দত্তের কেসটাই দেখ না, বেচারার কি হাল।”

সবাইকে ঠেলে সামনে এসে দাঁড়ালেন কপাল শাস্ত্রী। প্রফেসরের হাঁড়িঢাকা মাথাখানা ভালোভাবে নেড়েচেড়ে দেখে বললেন,”আসল জিনিসটাই নেই হে। কপালের জায়গায় কালিমাখা হাঁড়ি । খুব দুঃসময় লোকটার। আর জন্মে বোধহয় সারমেয় ছিল, তাই ভাতের হাঁড়ির উপর এত টান। সেটাই অনুমেয়।”

-“তোর মাথা আর আমার মুণ্ডু। তুই আরজন্মে গাধা ছিলিস গাধা।” হাঁড়ির ভেতর হতে বিড়বিড় করে বললেন প্রফেসর।

কপাল শাস্ত্রী প্রফেসরের কপাল না থাকার আফসোস করতে করতে বললেন,”নিয়তি কে ন বাধ্যতে। যা কপালে আছে তা হবেই। তবে সময়ে আসতে পারলে একটা অকোপল রজঃ দিতাম। কপালে লাগানো মাত্রই কাজ। কপাল খুলে যাবে।”

রণজিৎ মাষ্টার পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন, প্রফেসরের কথা শুনে আর থাকতে পারলেন না। বললেন, “কপাল খুলে গেলেই তো সর্বনাশ, তা রজঃ টা কি ? অজ গজ এসব শুনেছি, কিন্তু রজঃ ?”

শাস্ত্রীমশাই হেসে বললেন,”রজঃ মানে ধুলিকণা। কাব্যে পড়োনি ‘বৃন্দাবনের রজ’ ? ও তুমি তো আবার ভুগোলের মাষ্টার ।”

-“তো ? ভুগোলের মাষ্টার তো কি হল ? ভুগোলের ধুলো নেই ?” খেপে গেলেন মাষ্টার।
-“আছে নাকি ?”
-“আছেই তো। গোটা ভুগোল ধুলোয় ভর্তি। আবহবিকারের ফলে উৎপন্ন হয় ধুলো। সাহারার মরুভূমির ধুলো উড়ে গিয়ে পড়ে আমাজনের বর্ষাবনে, এক আধ টন নয়, বছরে ত্রিশ মিলিয়ন টন। ”

-“আমি বাপু বছরের শেষের একমাস ভুগোল নিয়ে ভুগতাম। ধুলো ঝেড়ে শ্রীগণেশ করতাম।” ফুট কাটলেন অবিনাশ ডাক্তার।

অবিনাশ ডাক্তারকে আসতে দেখে সরে দাঁড়াল সবাই। ডাক্তারবাবু রোগীকে ভালো করে পরীক্ষা নীরিক্ষা করে বললেন,”এ আমার কর্ম নয়। গলায় পেন্সিল আটকে গেলে কিছু করতে পারি, এমনকি গলায় স্বর আটকে গেলেও ওষুধ আছে। কিন্তু এ তো আমার দ্বারা হবে না। কামার ডাকতে হবে।”

-“শেষমেশ বাবুর গলাটাই চলে যাক আরকি। মুণ্ডু ছাড়া বাবুকে ভালো লাগবে না গো ওওও….” হাঁক ছেড়ে কাঁদতে বসল চরণদাস।

ডাক্তার চোখ গোলগোল করে বললেন,”মানে ? এ তাহলে প্রফেসার ?”

কাঁদতে কাঁদতেই সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল চরণদাস, শুনে নড়েচড়ে বসল সবাই। রোগীর মর্যাদা বাড়ল এতক্ষণে। জনাদুয়েক তো চলেই গেল কামার ডাকতে। চারদিকে শুধু ফিসফাস গুজগাজ।

আধঘন্টার ভেতরেই কামার এল। রঘু কামার। কপালে লাল ফেট্টি বেঁধে হাতে খড়্গ নিয়ে হাজির হল সে। দেখে রঘু কামার কম রঘুডাকাতই বেশি লাগছে। রঘুকে দেখে হৈহৈ করে উঠল সবাই। চরণদাস তো রঘুর সামনে এসে দাঁড়াল।

-“বাবুর কাছে যেতে হলে আমার বডির উপর দিয়ে যেতে হবে রঘু।” রঘুর পায়ের কাছে শুয়ে পড়ল সে।

চরণদাসকে ডিঙিয়ে চলে গেল রঘু। পথ আটকে দাঁড়ালেন অবিনাশ ডাক্তার। রঘুকে আটকে দিয়ে বললেন, “এ তুমি কি করতে যাচ্ছ রঘু ? ফাঁসি যাবে যে।”

কপাল শাস্ত্রী উৎসাহিত হয়ে বললেন, “মুণ্ডুটা ফেলে না দিয়ে আমাকে দিস বাবা। ওর কপাল বিশ্লেষণ করতে হবে। গবেষণায় লাগবে।”

বিব্রত হয়ে রঘু বলল, “ধ্যাৎতেরিকি ! মুণ্ডু কাটব কেন ?”
-“তবে যে খাঁড়া নিয়ে হাজির হয়েছিস !” বিস্মিত হয়ে বললেন ডাক্তার।
চলবে….

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *