পরনিন্দা, পরচর্চা – যেন এক সুখের ঠিকানা – পুলক মন্ডল

[post-views]
.

স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘পরনিন্দা পৃথিবীতে এত প্রাচীন এবং ব‍্যাপক যে, সহসা ইহার বিরুদ্ধে যে-সে মত প্রকাশ করা ধৃষ্টতা হইয়া পড়ে’। গুরুদেব-ই যদি এমনটা ভাবেন, তাহলে এ-তুচ্ছ কলমচী এ সম্পর্কে কিইবা মত প্রকাশ করতে পারে! তবুও, তবুও যেহেতু এ পৃথিবীতে নিন্দা না থাকলে জীবনের গৌরব খুঁজে পাওয়া যায়না, সে কারনে এ প্রসঙ্গে দু-চার কথা বলা যেতেই পারে।

               একটা অদ্ভুত রকম সমীক্ষায় দেখছিলাম শতকরা নব্বই ভাগ লোকই পরনিন্দা করেন। তবে আরও মজার ব‍্যাপার তারা প্রায় প্রত‍্যেকেই বলেন, পরনিন্দা-পরচর্চা আমার ধাতে নেই।

      পরনিন্দা এক অসম্ভব সুখ।  আবার শুধু সুখ-ই নয়, এক ধরনের বিনোদনও। তবে পরনিন্দার মধ্যে যে সুখ আছে তাতে বিদ্বেষ নেই। ক‍্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাম্প্রতিকতম সমীক্ষায় জানা গেছে একজন মানুষ প্রতিদিন মোট
বাহান্ন মিনিট গসিপ অর্থাৎ পরনিন্দা করেন। ১৮-৫৮ বছর বয়সী ৪৬৭ জন নারী-পুরুষ কে নিয়ে এই গবেষণা হয়।

          গুজব আর পরচর্চা কিন্তু এক নয়। গুজব কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে রং-চড়ানো রটনা। কিন্তু পরচর্চা মানুষকে নিয়ে। পরচর্চার উদ্দেশ্য তৃতীয় ব‍্যাক্তির মূল‍্যায়ন। রটনা ঘটানো নয়। এক্ষেত্রে সমাজের পক্ষে তা ক্ষতিকারক হয় না। সুতরাং পরচর্চা করতে গেলে তৃতীয় ব‍্যক্তির সম্পর্কে  বেশ নির্ভরযোগ‍্য কিছু তথ্য পরচর্চাকারীর কাছে থাকতেই হবে।

যেমন ধরুন পরিচিত কেউ হঠাৎ একটা  বড় পোস্টে চাকরি কিম্বা কোন শিল্পকর্মের জন্য বিশেষ কোন সম্মান অর্জন করেছেন, এটা আগে জানতে হবে ; তারপর এর পেছনে পরনিন্দাকারী ঘুষ কিম্বা সুপারিশের গোপন গন্ধ খোঁজেন। বোধহয় এটা বেশিরভাগ মানুষেরই স্বাভাবিক স্বভাব! কোন ব‍্যাপারে কারো দক্ষতাকে ব‍্যঙ্গ করে তাঁর আড়ালে তাঁকে হেয় করার মানসিকতা আসলে নিজেদের ব‍্যর্থতা ঢাকার এক  অক্ষম প্রচেষ্টা মাত্র।

      যদিও ঘুষ দিয়ে বা সুপারিশে প্রায়শই কিছু পাওয়া যায়, এমনটা আকছার ঘটছে বলেই আমরা পরনিন্দা করি ব‍্যাপারটা ঠিক এতটা সরলও নয়। আসলে সাফল্যলাভী ব‍্যক্তিটি যদি আমাদের অপছন্দের হয় তাহলে আমরা তাঁর সাফল্যের ছিদ্র খুঁজি, কেননা এর পেছনে থাকে একধরনের সূক্ষ্ম বা স্থূল ঈর্ষা।

       তবে এটা অত্যন্ত সত্য যে, আড়ালে যে ব‍্যাক্তিকে নিয়ে পরচর্চা হয় তিনি যে পরচর্চাকারীদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগের তাতে কোন সন্দেহ নেই। কেননা অনেক ভালো লোকও পরনিন্দা করেন। এমনও দেখা গেছে কোন বিষয়ে পারদর্শী এমন ব‍্যক্তিও অপর কোন সফল ব‍্যক্তির আড়ালে  নিন্দা করছেন। এক্ষেত্রে নিন্দাকারী ব‍্যক্তির চাইতে অপর ব‍্যক্তিটি যে দক্ষতায় কয়েক কদম এগিয়ে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

তবে বুকে জ্বালা নিয়ে পরনিন্দা পর্বটা শুরু হলেও পরে কিন্তু বেশ আবেশি সুখ অনুভব করেন অনেকেই। সুতরাং বলা যেতেই পারে যে সূক্ষ্ম ঈর্ষা পরনিন্দার অন্যতম ফ‍্যাক্টর।

টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ‘বায়নকার’-এর মতে পরচর্চা সামাজিক কুসংস্কার দূরীকরনে কাজ করে। চানাচুর যেমন বাড়ির কিচেন থেকে অফিস ক‍্যান্টিন হয়ে  ট্রেনে-বাসে সর্বত্র মেলে তেমনি পরনিন্দাও তাই। তবে বেশি চানাচুর খেলে যেমন আ‍্যসিডিটির আশঙ্কা থাকে, তেমনি মাত্রাতিরিক্ত পরচর্চা চরিত্রের বদলও ঘটাতে পারে।

    তবে  নির্দিষ্ট করে পরনিন্দা-পরচর্চা ভালো না মন্দ তা নিয়ে নানা মত থাকলেও ১৯৯৪ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ১২টি গবেষণায় মনোবিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন, পরচর্চা অনেক ক্ষেত্রেই পরচর্চাকারীদের মধ্যে  দলগত সংহতি মজবুত করে।        কি বলবেন তাহলে!  পরনিন্দা খুব  একটা  মন্দ নয়! না কি উত্তম কুমার স্টাইলে বলবেন, পরনিন্দার বিরুদ্ধে যারা তাদের মাথায় পড়ুক……

.

আপনার মতামতের জন্য
[everest_form id=”3372″]
Pulak Mondal

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top