পিমলির কান্ড – সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

 [post-views]

 [printfriendly]

আজ বলব এক মারাত্মক পশুপ্রেমী কন‍্যের কথা। যার পশুপ্রেম প্রায় কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। পিমলি এক মাল্টিন‍্যাশানাল কোম্পানিতে উচ্চপদে চাকরি করে। হায়দ্রাবাদে ওর পোস্টিং। গ্রীষ্মের ছুটিতে বাবা’মা প্রথম যাচ্ছে পিমলির কাছে, মনে আশা কতদিন পরে মেয়ের কাছে বেড়াতে যাচ্ছে, বিভিন্ন জায়গায় ঘুরবে একসঙ্গে। বড় ফ্ল‍্যাটে হাত পা ছড়িয়ে থাকবে, আরাম করে রোদ পোহাবে। দীর্ঘ ধকলের ক্লান্ত শরীরে ডোরবেল বাজাতেই নাচতে নাচতে হাজির হল পিমলি।

মা আতঙ্কে চিৎকার করলেন-“ওকি তোর পেছন পেছন এসে লাফ দিয়ে পালালো ও দুটো কি?” পিমলি গদগদ হয়ে বলল-“ওরা আমার দুই মেয়ে, ভীষণ আদরের লিটল্ আর বিটল্।

মা-“আরে না রে আমি পরিস্কার দেখলাম, দুটো বেড়াল।”

পিমলি-“ওদের কে বেড়াল বলবে না,- ওদের বড়জোর আদর করে লিটু আর বিটু বলতে পারো।”

মা রেগে বললেন-“হ‍্যাঁ,মানুষকে মানুষ বলবে না, গরুকে গরু বলবে না, যত্তসব আদিখ‍্যেতা আর কি।”

যাহোক দোর ঠেলে কোনক্রমে ভেতরে ঢুকে দেখা গেল ফ্ল‍্যাটের একখানা ঘর আর লাগোয়া বাথরুম লিটল্ আর বিটল্-এর দখলে। অগত‍্যা আর কি লোটা কম্বল নিয়ে ড্রয়িং রুমে অবস্থান। এদিকে লিটল্ আর বিটল্ তো ভয়ঙ্কর আলাপি, তারা কিছুতেই আর একা ওই ঘরে থাকবে না।

হাটের মাঝে মানে ড্রয়িং রুমে এসে সবার গল্প শুনবে, অগত‍্যা ড্রয়িং রুমের সোফা- কাম- বেডও ওদেরই দখলে। ওদের আবার থেকে থেকে খেলা পায় তখন পর্দা জড়িয়ে খাট টপকে এ ওর পেছনে ছুটোছুটি করে।

বাইরে থেকে কেউ এলে খাটের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করে কিন্তু ভুলেও দরজার বাইরে পা দেয় না কারণ দরজার বাইরেটা সম্পর্কে বিস্তর আতঙ্ক। এ হেন পিমলি যখন প্রথম চাকরি পেয়ে বাড়ি ভাড়া খুঁজতে গেছিল তখন প্রথম খুঁজে পাওয়া বাড়িটা ছিল একটা কুকুর ভর্তি পাড়ায়।

সাধারণত ওইরকম পাড়ায় রাতের ঘুম উড়ে যাবে বলে কেউ যেচে যাবে না। কিন্তু পিমলি গাড়ি থেকে নামতেই কুকুরগুলো লেজ নাড়তে নাড়তে ওর অভ‍্যর্থনায় হাজির হল আর পিমলিও গদগদ-“হাউ সুইট ইউ আর, ও বাবালে, ও বাবালে।” পিমলির বাবা ফালতু ঝামেলা ভেবে যেই একটু ওদের হ‍্যাটা দিয়েছে অমনি পিমলি ফেটে পড়ল-“ওরা তোমার কি ক্ষতি করেছে?-তুমি ওদের অমনি করে হ‍্যাটা দিলে কেন? তোমার সঙ্গে যদি কেউ ওরকম করত।” কিজন‍্য আসা হয়েছে সেটাই ভুলে গেল।

বাড়িওয়ালা দরজা খুলে থ, এক পাল কুকুরের মাঝে পিমলি দাঁড়িয়ে, দূরে ওর বাবা। বলাই বাহুল্য সে বাড়ি যথেষ্ট চড়া মূল‍্য অ‍্যাডভান্স দিয়ে নেওয়া হয়েছিল আর অফিস ফেরতা পিমলির চ‍্যাটার্ড কার থেকে নেমে বাড়ি অব্দি যাওয়া ইস্তক ওরাই সাথী হোত।

এবার এলো পিমলির বিয়ের সময়। অন‍্য সময় টুরে গেলে ঠিকে কাজের মেয়ের কাছে লিটল্ আর বিটল্-এর দায়িত্ব দিয়ে যায়। বিয়ে মানে তো বেশ কিছুদিনের ব‍্যাপার। সমস‍্যার সমাধান হিসেবে পিমলি বিয়েটা স্থগিত করার মতলবে ছিল। শেষে বর আর বরের বাবা মধ‍্যস্থতা করে ঠিক করল, ঠিক আছে লিটল্ আর বিটল্-ও আসুক পিমলির সঙ্গে। কিন্তু নিয়ে যাওয়া বললেই তো নিয়ে যাওয়া মুখের কথা নয়। এরোপ্লেনে করে গেলে ওরা ধকল নিতে পারবে না।

অগত‍্যা ঠিক হল ট্রেনেই যাবে, আর্থিক গুনাগার দিয়ে পুরো টু-এসি ভাড়া করে লিটল্ আর বিটল্ বিয়ে বাড়ি এল। বাড়িতে লম্ফঝম্পের যথেষ্ট জায়গা থাকায় ওদের অসুবিধে হল না। বিয়ের পর পিমলির সঙ্গে ওরাও পিমলির শ্বশুরবাড়ি এল। নববধূ বরণের সময়ে ওদেরও বরণ হল।

বাড়ির সবাইও লিটু, বিটুকে সহজভাবেই নিল। গোল বাঁধল এক হুলোকে নিয়ে, যে শমিক মানে পিমলির বরের বাড়ির। পিমলি যত লিটু,বিটুকে সামলায়, ওরা তত হুলোর সঙ্গে ভাব জমায়।

শাশুড়ি মা বললেন-“আমার শমু যেমন পিমলিকে পছন্দ করেছে তেমনি আমাদের হুলো পুষি লিটু বিটুকে পছন্দ করেছে। ওদের তো দুটো বউতে বাধা নেই, অতএব তোমার এখন তিনটে পোষ‍্য হল-পুষি,লিটল্ আর বিটল্।”

ওদের জন‍্যও উলু পড়ল, সবাইকে মিষ্টি মুখ করানো হল।

পিমলি এবার ট্রেনে চাপল তিন পোষ‍্যকে নিয়ে। হায়দ্রাবাদে পিমলির কাজের ঠিকে লোক মালু ঘরের সদস‍্য সংখ‍্যা বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে মাইনেটা বাড়িয়ে নিল।

সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top