প্রতিশোধ – শর্মিষ্ঠা গুহ রায় (মজুমদার)

 [post-views]

[printfriendly]

কী ভয়ানক কথা!এত সুন্দর পুতুলটার পা টা গেল ভেঙে!এখন কী করি?ভেবে ভেবে মাথাটা খারাপ হওয়ার জোগাড়।ব্যাপারটা তাহলে খুলেই বলি।

সকাল বেলা বিছানা থেকে যেইনা পা টা মাটিতে নামিয়েছি অমনি পা গিয়ে পড়ল পুতুলের পায়ের ওপর।’মচাৎ’-একটা শব্দ,সব শেষ!যা হওয়ার তাই হল।আজ সারাদিন কী হবে মনে মনে চিন্তা করে নিলাম।

রাতে শোওয়ার আগে মেয়েটা সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে মেঝের ওপর।’কেনরে বাপু?খেলতে পারিস আর খেলার পরে গুছিয়ে রাখতে পারিসনা?’বিড়বিড় করে বলে উঠি।

অনেকবার বলি,কিছুতেই শোনেনা মেয়েটা।ঘুম থেকে ও ওঠার আগেই সব ঠিক ঠাক করতে হবে।শুরু করলাম ‘মিশন পুতুল ঠিকঠাক করা’।

বাড়ির সবথেকে ভয়ঙ্কর আঠা নিয়ে বসলাম পা টা জুড়তে।জুড়লাম আচ্ছা করে।লাগুক আঠাটা আমি ততক্ষণে গেলাম দাঁত ব্রাশ করতে।আশা করি সব ঠিকঠাক করতে পেরেছি।মনে মনে গানও পাচ্ছে।আসলে ঝড়ের পর শান্তি জীবনে নেমে এলে মানুষের এরকম গান পায়।

একটু চা টা করে খেয়ে নিই।ব্যাপারটা আরও পাকাপোক্ত হবে।এরপর আমি আবার দেখতে যাব পা টা ঠিক হল কী না!মেয়েকে একটু দেরীতেই ঘুম থেকে তুলব আজ।যা অপকর্ম করেছি আজ তার মাশুল তো দিতেই হবে।

এইবার গিয়ে দেখতে বসলাম।হায়রে কপাল!সেইভাবেতো জোড়া লাগেনি পা টা।এখন আমি কী দিয়ে জোড়া লাগাব এই ছাতার মাথার পা টাকে?মুখ উঁচু করে দেখলাম মেয়ে এপাশ ওপাশ করছে।মানে উঠব উঠব ভাব! এখন কী হবে?টিভি সিরিয়াল হলে আমার মুখটাকে তিনবার বিভিন্ন আ্যঙ্গেল দিয়ে দেখাত।

তড়াক্ তড়াক্ করে আমার মুখটাকে টিভিস্ক্রীনে তিনবার দেখেও ফেললাম।ধুম তানা নানা নানা,ধুম তানা নানা নানা —মানসিক ভাবে বিব্রত করে দেওয়া ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক শুনতে পাচ্ছি কানে।মনে ভেসে উঠছে কত কথা।

পরশু রাতেই এই পুতুলটা বহুদিন ধরে বায়না করে মেয়ে আমার
বাগিয়েছে তার পিতৃদেবের কাছ থেকে।বেশ দামীও বটে।তার ওপর পিতৃদেব বারংবার বলে দিয়েছেন পুতুলটিকে সযত্নে রাখতে।আর সেই অমূল্য পুতুলটিকে আমার কন্যা রত্নটি রাতের বেলা ঠিক খাটের তলে রেখে দিয়ে ঘুমিয়েছেন।বাকিটা ইতিহাস।

মাথায় হাত দিয়ে চিন্তা করছিলাম সেসবকথা।কী আর করি,এবার সেলোটেপ দিয়ে দড়ি দিয়ে যদি কিছু করা যায় সেই চিন্তাই করা শুরু করলাম।যাই দেখি ঐসব জিনিস গুছিয়ে নিয়ে আসি।

পাশের ঘরে যেতেই মেয়ের বিশাল আর্তচিৎকার শুনে ফিরে এলাম।এসে দেখি উনিও বিছানা থেকে নেমে পুতুলের ওপরেই পা দিয়ে ফেলেছেন।পা টা পুরোই গেছে খুলে।সে কী কান্না তার।

থামছেই না সেই কান্না! বেচারা চিৎকার করে ওঠে-‘মা আমি এটা ভেঙে ফেলেছি।এখন কী হবে?’তার সাথে আ্য আ্য আ্য কান্না।আমার মাথাটা ঘুরছে বনবন করে।

নিজেকে খুব সংযত শান্ত করে বললাম-‘ওটা আগেই ভেঙেছিল।তোমার পায়ে লেগে ভাঙেনি।দেখছি কী করা যায়।’ ও চোখটা বড় বড় করে বলল-‘তার মানে তুমি ভেঙেছ?’ আমি গম্ভীর গলায় বললাম-‘হুম্,আমি ভুল করে ভেঙেছি।কিন্তু তুই কাঁদিস না,বাবা আসার আগে জুড়ে দেব।’

তারপর আর কী?মেয়ের রাগে গালটা ফুলতে লাগল।আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগলাম পা টা যাতে ঠিক হয়।কিছুই হলনা।মেয়ে বারংবার আমাকে শাসাচ্ছে,ট্যুর থেকে বাবা ফিরলেই সব বলে দেবে আজ।প্রতিশোধ সে নেবেই একদম প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছে।আমি তাকে কিছুতেই বশে আনতে পারছিনা।

দুপুরের দিকে রাগত ভাবে বললাম-‘কী চাস তুই?কী করলে মাথা ঠান্ডা হবে তোর?চিন্তা করে আমাকে জানা।আর বাবাকে আমি ফোন করে সব জানিয়ে দেব।তোকে আর জবাবদিহি করতে হবেনা তাহলে।’মেয়ে কিছুটা শান্ত হল।তাকিয়ে দেখি গালে হাত দিয়ে চিন্তা করছে। মানে কত পরিমাণ আমাকে জ্বালানো যায় তার প্রস্তুতি নিচ্ছে।আমিও রেডি।দেখি ও কী বলে আমাকে?

ঘন্টাখানেক চিন্তা করার পর আমাকে ডেকে বলল -‘মা,আমি আজ পার্কে যাব। আর আগের বার ছত্রিশবার স্লিপ চড়েছিলাম।আজ পঞ্চাশ বার চড়ব।তুমি বাধা দেবেনা।’আপনাদের শুনতে ব্যাপারটা সহজ মনে হচ্ছেতো,কিন্তু ব্যাপারটা অত সহজ নয়।আমি বরাবর বড় হওয়ার পর পার্কে যেতে পছন্দ করিনা।

মেয়ের জন্যই এখন পার্কে যেতে হয়।তাও ঠিক আছে।সে খেলবে আর আমি বেঞ্চে বসে একটু মোবাইল খোঁচাব তা হবে না।আমাকে কন্টিনিউ তার দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।সে স্লিপে উঠবে আর নামবে,উঠবে আর নামবে। মানে যতক্ষণ না আমার মাথা ঘুরতে থাকবে ঐ এক দৃশ্য দেখে,ততক্ষণ সে থামবেনা।

গতবার সে ছত্রিশবার একনাগাড়ে স্লিপ চড়ে রেকর্ড করেছিল।আর আমাকে না নড়ে অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়েছিল আর এবার পঞ্চাশ বার তার লক্ষ্য।আমার শুনেই মাথা ঘুরতে লাগল।

তারপর? আমি পার্কের বেঞ্চে বসে আছি।সে স্লিপে নামছে আর উঠছে,উঠছে আর নামছে।আমি গুনছি-‘পঞ্চাশ,একান্ন,বাহান্ন,তিপান্ন——-ষাট।’


আপনার মতামত এর জন্য

[everest_form id=”3372″]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top