প্রত্যাখ্যান – শম্পা সাহা

 2 total views

[post-views]

“শা…,যতসব! বা….ন্যাকামি! দেখলে ইয়ে পর্যন্ত জ্বলে যায়”, ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে খাটের উপর। নিজের মনে বিরক্তিতে বিড়বিড় করতে থাকে সুবীর, সুবীর দাস। আসলে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে একটা নামি পেজের গল্পের নামে ওর চোখ আটকে গিয়েছিল, ‘কান্না’। ছবিটা বেশ! অত্যন্ত সুন্দরী একটি মেয়ে, চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে, ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ছবি । কিন্তু তারচেয়েও বেশি কৌতুহলী হয়েছিল লাইক ও কমেন্ট দেখে ,বাপরে বাপ ! এক ঘন্টায় টু পয়েন্ট ফাইভ কে লাইক আর 156 টা কমেন্ট!

   যদিও গল্পটল্প এককালে পড়তো মায়ের চাপে, আসলে ওর মার নিজেরও গল্পের বই পড়ার ভীষণ নেশা তার থেকেই ছেলের মধ্যে চালিয়েছেন কিন্তু এখন ওসব ব্যাকডেটেড! কিন্ডেল বা পিডিএফে প্রচুর ই-বুক পাওয়া যায়, যার দাম খুব কম আর সাজিয়ে রাখারও ঝামেলা নেই । তবুও মা বলেন বইয়ের মাধুর্যই আলাদা। নতুন বইয়ের গন্ধ নাকি অতসী মানে সুবীরের মাকে পাগল করে। আসলে স্কুল টিচার তো তাই ,তার ওপর আবার বাংলার তাই বোধহয় এসব সাহিত্য টাহিত্যের নেশা! প্রতি বছর বইমেলায় 3-4 হাজার টাকার বই মায়ের কেনা চাই ই চাই । সেজন্য মায়ের আলাদা ফান্ড ও আছে!

    আগে সুবীর বই পড়লেও এখন আর এত সময় পায়না । তারপর যদি কাউকে বলে গল্পের বই বা কবিতার বই পড়ছি ঠাট্টা করে মেরে ফেলবে। বরং ই-বুক,বা পিডিএফ পড়ছি বলাটা প্রেস্টিজের।

   সেই পুরনো বই পড়ার নেশাতেই গল্পটা পড়তে শুরু করা। দেখি তো এত ভাল গল্প! এত লোক পছন্দ করেছে! আসলে হাতে কাজ নেই বললেই চলে । মাঝরাত পর্যন্ত প্রতি রাতে ফেসবুক ঘাঁটা এটা এখন একটা ট্রেন্ড হয়ে গেছে বলা যায় । না হলে যেন মনে হয় কি বাদ গেল !কি বাদ গেল!

   গল্পটা একটা কালো মোটা মেয়ের, তাকে  তার ভার্চুয়াল প্রেমিক প্রত্যাখ্যান করে ,যার সঙ্গে ফেসবুকে প্রেম। যদিও মেয়েটি আগে থেকেই  বলেছিল, সে সুন্দরী নয় ,কালো ,মোটা , বিশ্রী দেখতে ! তবু ছেলেটি সম্পর্কের জন্য জোর করে কিন্তু সামনা সামনি দেখে মেয়েটিকে প্রত্যাখ্যান করে আর মেয়েটি ভেঙে পড়ে কান্নায়।

   কমেন্ট গুলো পড়তে থাকে সুবীর । একটু কৌতূহল, পাবলিক কি ভাবছে! যা ভেবেছে ঠিক তাই !সকলে এক্কেবারে মেয়েটির দুঃখে গলে জল ,  আহা! মেয়েদের কত রকম বঞ্চনার শিকার হতে হয়! সত্যিই তো এখনো কেন রূপ কদর পাবে ?ইত্যাদি, ইত্যাদি। নারীবাদীরা তো অনেকে আবার পুরুষ সমাজকে কাঁচা মাংস  লোভীটোভী ও বলেছেন, কেন মেয়েরা কুৎসিত বলেই রিজেকটে্ড? কেউ কেউ সমগ্র পুরুষ সমাজকে দেখনদারি , সুন্দর চেহারার  অন্ধ ভক্ত, গুণের মূল্য দেয় না ইত্যাদি বলেও গালাগাল দিয়েছেন। এসব কমেন্ট পড়ে রাগ হলো না জোরে হেসে উঠল সুবীর। কেন রাগ হবে কেন ?

   এত সব মিথ্যে কথা শুনে নিজের মুখটা আয়নায় একবার ভালো করে দেখে ,মোটা গরিলার মত চেহারা, থ্যাবড়া নাক, তারপরে ও খেতে ভালোবাসে ,তাই ওজন একশোর প্রায় কাছাকাছি আর গায়ের রং পুরো বাবার মত আবলুস কাঠ! অত মোটা আর চর্বির

বাহুল্য ওকে একেবারে আলাদা করেছে ছোটবেলা থেকেই । ছোটতে তবু চোখ গুলো দেখা যেত এখন খেয়ে খেয়ে এমন হয়েছে যে পুরো যেন বেঢপ জলহস্তী !

   তবে দু’বছর আগেও ও এতটা মোটা ছিল না । তখন প্রথম কলেজে উঠেছে, যদিও ছোট থেকেই ওর গরণ একটু মোটার দিকে তবু চলনসই ছিল ,কিন্তু মুখের আদল ,মোটা নাক, ঘন কালো কোঁকড়া চুল ,বন্ধুরা আড়ালে কেউ কেউ সামনেই ওকে অসুর বলে ঠাট্টা করত । প্রথম প্রথম রাগ হলেও পরে বুঝেছিল প্রতিবাদ করে লাভ নেই ,যা সত্যি তা তো বলবেই । কিন্তু বন্ধু তো!তাই অতটা খারাপ লাগত না। কিন্তু চেহারার কথা ভেবে বা মেপেজুপে যদি মনটা চলতো তাহলে তো দিব্যি হতো! তা হলো না , সুবীর প্রেমে পড়ল অম্বিকার।

   অম্বিকাও এমন কিছু আহামরি নয়, বেশ শ্যামলা ঘেঁষা রং, নাক ও চাপা তবে  চোখ দুটো বেশ সুন্দর,  ছিমছাম চেহারা । ও প্রপোজ করাতে অম্বিকা রাজি হয়ে যায়, যদিও ওর দু একজন বন্ধু বলেছিল, “কার প্রেমে পড়লি? তোর চোখ নেই ?”, সুবীর প্রতিবাদ করে ওঠে, “আমি বা কি আহামরি রাজ কার্তিক ?” তারপর ওদের প্রেম একেবারে চূড়ান্ত, চূড়ান্ত ভালোবাসায় ডুবে গেল সুবীর। জীবনের প্রথম প্রেম ভাবতেও কেমন রোমাঞ্চ হত! কলেজে যাবার আগে ও রোজ ওর  অল্প ওঠা দাড়ি নিয়ম করে সেভ করে ,ফর্সা হবার ক্রিম ,বডি স্প্রে মেখে, যে জামা গুলো পড়লে ওকে ভালো দেখায় সেগুলো পরে কলেজে যেত । এমনকি পারলে ছুটির দিনও পড়ার নাম করে দেখা করা চাই-ই চাই ।

সুবীর পাগলের মত ভালবাসত অম্বিকাকে। মিথ্যে কথা কেন বলব ,অম্বিকাও বেশ ভালোবাসতো ওকে।দেখা করতো ,ফুচকা খেতো, সব খরচ যে সব সময় যে সুবীর দিত এমন নয় । অম্বিকা ও খাওয়াতো ,চাওমিন ,চপ, আইসক্রিম । অম্বিকা কে দেখে  সুবীরের পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে বলে মনে হতো । ও ফিরেও তাকাতো না অন্য মেয়েদের দিকে। তাকাবে কেন? যাকে ভালবাসে তাকে ছাড়া অন্য মেয়েদের দেখাটা ভালোবাসায় ধোঁকা দেওয়া। এসবই অম্বিকা ওকে শিখিয়েছে, যদিও ও যে জানতোনা এমন নয়, তবে অম্বিকা বলেছে যে !সত্যিই মেয়েরা কত কিছু জানে !

  সুবীরের বন্ধুরা যতই ঐসব নিয়ে হাসাহাসি করত, “বউ ভক্ত হনুমান ,জাম্বুবান “, এসব বলেও ডাকত  কিন্তু ও এসব গায়ে মাখতোনা। ভালোই জানে ও দেখতে ভালো না ,খুব একটা বড় লোকের ছেলে তাও নয় ,সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের। ভালোবাসাই ওর আছে যা দিয়ে ও অম্বিকা কে আটকে রাখতে পারে।অম্বিকা অবশ্য বেশ বড় লোকের মেয়ে । ওর বাবা বড় ব্যবসায়ী, দেখতে ভীষণ সুন্দর। অম্বিকা ওর মায়ের মত দেখতে। ওর বাবা ওর মা, একমাত্র মেয়ে হওয়ার কারণে শ্বশুরবাড়ির ব্যবসা দেখাশোনা করেন । দাদুর মৃত্যুর পর এখন উনি প্রায় মালিক যদিও ব্যবসা ওর মায়ের নামে ।

   ওদের সম্পর্ক গড়াতে লাগল দু মাস ,চার মাস ,পাঁচ মাস । অম্বিকা যেন ডানা মেলতে লাগলো প্রজাপতির মতো! নিয়মিত পার্লারে গিয়ে কতো কি করতো! জিম টিম ও।

    সে বছর পুজোর সময়ে ওরা সিমলা গেল। সুবীর ওদের বেলেঘাটার বাড়িতেই।  ওদের আর অত পয়সা কোথায় যে পুজোয় হিল স্টেশন বা সি বিচে যাবে!একবার পুরি আর দুবার দীঘা গিয়েছে ,এই তেইশ বছরের জীবনে । তাও পুরি মামা আর একবার সেজ মাসি দীঘা নিয়ে গেছিল, একবারই বাবা খরচ করে দীঘা নিয়ে যায়। তবু একমাত্র ছেলে বলে ওর কোন অভাব ওর বাবা-মা রাখেননি ।

   সেবার পুজোর পর সিমলা থেকে এসে অম্বিকা আর দেখা করতে চাইল না ,ফোনও ধরছিল না ,মেসেজেরও উত্তর নেই। যদিও বলে গিয়েছিল যে কদিন বাইরে থাকবে ফোন মেসেজ না করতে, কারণ বাড়িতে জানাজানি হলে অসুবিধে ।ওখানে পুরো ফ্যামিলি যাবে, বাবার বন্ধুরাও। কিন্তু ফিরে আসা তাও তো প্রায় দিন তিনেক! ফোন না পেয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় সুবীর,’কি ব্যাপার অম্বিকা ফোন ধরছেনা কেন? মেসেজের রিপ্লাই ও নেই ! যাব একবার ওদের বাড়ি?’  কিন্তু সাহস করে উঠতে পারল না।

   কলেজের প্রথম দিন কলেজে গিয়ে ও খোঁজ করতে শুরু করে । ওই তো!  গোলাপি টি-শার্ট ,নীল জিন্স চুল উঁচুতে তুলে বাঁধা ,চোখে সানগ্লাস! কি মিষ্টি লাগছে ! সুবীর দৌড়ে যায় ,”কিরে ফোন ধরিস নি কেন?”, অম্বিকা ওকে দেখে স্বাভাবিকভাবেই বলে ,”এমনি ,আসলে বাড়িতে ছিলাম তো তাই “। কিন্তু এরপর থেকে আর সুবীরের সঙ্গে আগের মত কথা বলত না ,ফোন করতো না,  মেসেজ করলে রিপ্লাইও দিত না ,ফোন ধরতোও না।কি হল ওর? সুবীর বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করত ওরাও কিন্তু কিছু বলতে পারলোনা । সুবীর আর ধৈর্য ধরতে পারে না ।একদিন সরাসরি জিজ্ঞাসা করে, “তুই আমাকে আ্যাভয়েড করছিস কেন ?”,

 “আ্যাভয়েড করছি? “,

 “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই করছিস! ফোন ধরিস না, মেসেজের রিপ্লাই দিস না, কলেজে এলে কথা বলতে চাস না, দেখা করা তো দুরের ব্যাপার।”

  অম্বিকা এক মুহুর্ত মাথা নিচু করে যেন নিজেকে প্রস্তুত করে নিল তারপর বলল,

“দেখ আমি আর এই সম্পর্কটা কন্টিনিউ করতে পারবোনা, উই আর জাস্ট ফ্রেন্ড “,

 “জাস্ট ফ্রেন্ড”, সুবীর অবাক ,ওর মাথার মধ্যে কেমন একটা  হতে লাগল, মুখটা মলিন হয়ে গেল চোখ ,জ্বালা করে উঠলো, গলার কাছে একটা কিছু যেন আটকে আছে ,ব্যথা হচ্ছে ভীষণ!

    ও কোনরকমে মাথা তুলে বলল ,”প্লিজ এরকম বলিস না ,আমি তোকে খুব ভালোবাসি “,

  “কিন্তু আমি বাসি না”,

   “তুই যে বলেছিলি তুই আমাকে ভালবাসিস! “,

    “হ্যাঁ , তখন বাসতাম”,

     “আর এখন? ” সুবীর কোন রকমে কান্না চেপে বলে।

      “এখন বাসি না”,

 সুবীর কেঁদে ফেলে, “প্লিজ ,প্লিজ এরকম করিস না! আমাকে ছেড়ে  যাস না। আমি কি করেছি, আমার কি দোষ বল? “,

     ততক্ষণ ওর বন্ধুরা এসে দাঁড়িয়েছে ওদের কাছে। হঠাৎই একটা রোখ চেপে যায় সুবীরের। এই বন্ধুরা  ওকে এই প্রেম নিয়ে কত হাসি ঠাট্টা করেছে আর ওদের সামনে অম্বিকা ওকে ছেড়ে চলে যাবে!  চলে যেতে উদ্যত অম্বিকার বাঁ হাতটা টেনে ধরে সুবীর,

   ” প্লিজ যাস না, আমার কি দোষ? কেন ভালবাসিস না আমায়, অন্তত সেটা তো বলবি”,

   হাত ধরাতে ভীষণ রেগে এক ঝটকায় অম্বিকা হাত ছাড়িয়ে নেয় ,”একবার নিজের চেহারাটা দেখেছিস আয়নায়! তোকে কেউ আমার বাড়িতে মেনে নেবেনা”, গট গট করে চলে যায়  অম্বিকা।আজ সবচেয়ে যন্ত্রণার জায়গায় হাত পড়েছে সুবীরের ও আর কোন উত্তর দিতে পারল না । চেহারার জন্য অনেক কথা শুনেছে, ও নিজেও জানে ও দেখতে খারাপ কিন্তু অম্বিকা এসব দেখেই ত এতগুলো মাস ওর সঙ্গে ছিল, ওকে “ভালোবাসি” বলে ছিল আর আজ হঠাৎ সেই ওর চেহারা খারাপ বলে খোঁটা দিয়ে গেল ।

   তারপর থেকে শুধু খাওয়াই সুবীরের প্রিয় বন্ধু । খেতে তো ও বরাবরই ভীষণ ভালবাসে । আজকালতো সুবীর ভাবে কেউ খাবার বাদ দিয়ে অন্য কিছুকে ভালোবাসে কি করে ?শুধু এই  ধরণের গল্প পড়লে আর দুঃখের কাঁদুনি শুনলে হাসি পায় । আচ্ছা মানুষ কি সত্যিই জানেনা নাকি জানতে চায় না , নাকি জেনেও অজানার ভান করে ,আসলে চেহারা খারাপ বলে প্রত্যাখ্যান শুধু মেয়েরা নয় ছেলেরাও হয় যেমন হয়েছে সুবীর নিজেই।

0 - 0

Thank You For Your Vote!

Sorry You have Already Voted!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top