প্রত্যাগত -নুজহাত ইসলাম নৌশিন

[post-views]
.

জিরো পয়েন্ট ফাইভ মিলিগ্রাম ডিজো! দ্বিধা নিয়ে বসে আছি খাবো কি খাবো না। খেলে একটা ঝামেলা থেকে নিশ্চিত মুক্তি। মাথার কাছে বালিশে হেমন্ত দুপুরে কয়েক ফালি রোদ জানালা গলিয়ে আসছে।আমি চোখ বন্ধ করলাম, আরামদায়ক উষ্ণতায়। মৃত্যুর আগে এতটুকু উপভোগ করা যেতেই পারে।

যদিও পুরোপুরি মরবো কি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত নই। মরার জন্য ডিজো একটা যথেষ্ট না, মনে হয় পুরো ফাইল খাওয়া লাগবে। যা হবার হবে, নির্জন বাসায় একটু নিজের মতো ভাবা দরকার।

জীবন বাজে রকম ভাবে বিষিয়ে গেছে । খুব বাজে ভাবে। আলো ভেবে গিয়ে মরিচীকার দেখা – হাহ্! জীবন! আমি কার কাছে বলবো? আর কি বলবো! কেউ কি বিশ্বাস করবে? মনে হয় না। নিজের প্রেমিকের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি – কিন্তু কতদিন ? কে যেন বলছিলো শুরু থাকলে শেষ হবেই। এর শেষ কোথায়? ক্লান্তি আর অবসাদ নামক ভাই বোনের অত্যাচারে আবার চোখ বুজে এল।

‘ তোমার ঠোঁট তো ভারী আবেদনময়ী। ‘
আমি আঁতকে উঠলাম মনে মনে। আমি শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করে বললাম, ‘হাসি তাই তো ? ‘
না, আমি ঠোঁটের কথাই বলেছি। রাকিবের সরল উত্তর।
অথচ যদি বলত , ‘ তোমার হাসিটা সুন্দর ‘ তাহলেই বেশি খুশি হতাম।

আয়নার সামনে মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে ভাবি আমি কে? আস্ত নারী শরীর! আর কিছু না কি? শরীরটাই আমার অস্তিত্ব?
রাকিব তো তেমনই বলে। ইদানীং বেশি বলে। ভূত কে তো ভালোবাসা যায় না, শরীরকেই ভালোবাসতে হয়। সুতরাং তোমার শরীরকে ভালোবাসা মানেই তোমাকে ভালোবাসা।

বিস্ময়ের শেষ পর্যায়ে গেলে বোধহয় মানুষের মুখে কথা আসে না। তারপর ও আমি ক্ষীণ প্রতিবাদ করে বলেছিলাম, ‘ দ্যাখো, অনুভব বলেও একটা ব্যাপার আছে না, তাই না? ‘
ধ্যাত, তোমার কি মনে হয় আমি নপুংসক? আমার অনেক চাহিদা।
আমি থতমত খেয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু সেই মুহূর্তে আর কিছু বলতে পারি নি।

তারো কিছু দিন পর জানতে পারলাম, যদিও বিষয়টা না জানলেই হতো। তবু জেনেই ফেললাম। আমার আবার অনেক কৌতূহল!
আচ্ছা নিরা , তুই সত্যি টা বলবি? হুটহাট কয়েকদিনের জন্য কই ডুব দিস? ‘
নিরা চোর চোর চোখে আশেপাশে চেয়ে বলল, প্রমিস কর। কাউকে বলিস না কিন্তু ।

আমি বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ালাম-
শোন, কি করে যে বলি। তুই যে টাইপ –
আরে বল। কিছু মনে করবো না, তোর লিপিস্টিক বক্স ছুঁয়ে বলছি কাউকে বলবো না।
এবার নিরা বিশ্বাস করলো মনে হয়- শোন, ‘ ওর না খুব রাগ। আমায় অবিশ্বাস করে –‘
কি বলছিস তুই , ‘ রাগ, অবিশ্বাস? ‘

গাধী, এই জন্য তোকে কিছু বলতে চাই না। নিরা বিড়বিড় করে বলল, যদিও আমি শুনে ফেলেছি।
ঠোঁটে আরো খানিকটা ম্যাজেন্টা কালার লাগিয়ে সহজ হয়ে বলল, ‘ শিহাবের সাথে রাত কাটাতে। আর কিছু জিজ্ঞেস করিস না। ছেলেদের অনেক চাহিদা থাকে – তুই বুঝবি না এসব। তুই বড্ড ন্যাগিং রে! কি করে যে তোর প্রেমিক তোকে সহ্য করে- কথা অসমাপ্ত রেখেই চলে গেলো।
আরো কিছু বলতে চাইছিলাম, কিন্তু চুপ করে গেলাম।

‘ জানো, ওইদিন কী হইছে? ‘
রাকিবের খুশি খুশি ভাব এখন আমার আতঙ্ক জাগায় আমার মনে।না জানি কোন কথা বলে বসে।
আমি নিরুত্তাপ গলায় বললাম, না তো।
আরে ক্রিকেট খেলায় তোমায় নিয়ে বাজি ধরেছিলাম।
আমি চিল চিৎকার দিয়ে বললাম,’ আর ইউ ক্রেজি? তুমি আমায় নিয়ে বাজি ধরলে! মানেটা কি?

আরে এটা তো কমন ব্যাপার। বন্ধুদের আড্ডায় এরকম হয়েই থাকে। কন্ডিশন ছিলো বাংলাদেশ জিতলে ইন্ডিয়ার সাথে – তুমি আদিবের পার্টনার হবে।
তুমি তাতে রাজি হয়েছিলে?
আরে রাজি হওয়া না হওয়ার কি আছে! আর বাংলাদেশ কি জেতার মতো খেলে? হা হা হা…
মনে মনে সেদিন বাংলাদেশ কে খেলায় হারার জন্য ধন্যবাদ দিয়েছিলাম।

তারপর অনেক ভেবে – চিন্তে বের করলাম, এসব আধুনিক প্রেম আমার জন্য না। আমি অনেকটা পিউরিটান ধাঁচের।
যেদিন সম্পর্কের ব্যাপারে হেস্তনেস্ত করতে যাবো সেদিন দেখি রাকিব ঘাড় চুলকাচ্ছে।
এলার্জি নাকি?
হা হা হা –
আমি একটা প্রশ্ন করলাম, এখানে হাসির কি আছে?
আরে অন্য ব্যাপার। আঁতকে উঠলাম। ভয় ভয় গলায় বললাম, কি?
কোনমতে হাসি থামিয়ে বলল, ‘ ডিপার্টমেন্ট আমার ঘাড়ের লাল – চাকা চাকা এলার্জিকে ভেবেছে –
কি ভেবেছে?
ভেবেছে আমার প্রেমিকা বোধহয় আমাকে –
থামো, প্লিজ। বাকিটা শুনার মতো রুচি হয় নি বলে আমি চলে এসেছিলাম।

ঘেন্নায় শুনতাম মানুষের গা ঘিন ঘিন করে । এখন আমার তাই হচ্ছে। গায়ে গুনে গুণে দশ বালতি পানি ঢাললাম। যে হাত রাকিব আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে ধরতো, সে হাত লাইফবয় হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে ধুয়ে ধুয়ে ক্লান্ত হয়ে গেলাম । পাগলের মতো চিৎকার করতে পারলে শান্তি পেতাম পুরোপুরি।

শীত পড়তে শুরু করেছে। দশ বালতি পানি দিয়ে গোসল করার খেসারত দিচ্ছি । কিন্তু হেমন্ত দুপুরের রোদের তাপ আমায় একটু একটু শুদ্ধ করে তুলছে। হাত থেকে ডিজো ফাইভ মিলিগ্রাম ফেলে দিলাম। স্বাভাবিক ভাবে ঘুমানোর আগে একটা সিদ্ধান্ত নিলাম – মানসিক শান্তির জন্য। সাইবার আইনে রাকিবের নামে একটা মৌখিক অভিযোগ এবং রাকিব কে শেষ টেক্সট – ‘ যে যায় সে সারাজীবনের জন্যই যায় । ‘

রোদের তাপে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। আহ্ কী উত্তাপ!

.
আপনার মতামতের জন্য
[everest_form id=”3372″]
nuzhat-islam-naushin

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top