ফুটপাতের রাজা

গোপা সরকার

ইংরাজী ভাষায় নিজের নাম লিখুন ।

 97 total views

অণুগল্প।
শিরোনাম-ফুটপাতের রাজা
কলমে-গোপা সরকার
তারিখ- ৭/০৫/২০২১
————–
সেদিন ছিল লক্-ডাউনের ১২তম দিন । ডিউটি যাবার পথেই পড়ে রাস্তাটা। সমস্ত রাস্তা ফাঁকা, জি.টি.রোডের ব্যস্ততা নেই। ট্রাফিক সিগন্যালে হুড়োহুড়ি নেই-সবাই যেন বিশ্রাম নিচ্ছে। অদ্ভুত শান্ত প্রকৃতি।ঝকঝক করছে প্রকৃতির বুকচিরে গজিয়ে ওঠা কালো কালো রাস্তাগুলো। বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ নেই, শ্বাসনেবার জন্য হাঁসফাঁস নেই-চারদিকে যেন এক অনন্য নিস্তব্ধতা।কারো কোনো তাড়াহুড়ো নেই।জি.টি. রোড চলেছে আপন খেয়ালে। হঠাৎ আমার ডিউটির গাড়িটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। আমি শান্তপ্রকৃতি দেখছিলাম বিভোর হয়ে।হঠাৎ ছন্দপতন ঘটায় ড্রাইভার দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম-কি হলো দাদা? উত্তরে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি এ যে ফুটপাতের রাজা।

বস্তির পাশেই পরে এই ফুটপাতটা। একটি উলঙ্গ শিশু চারটি সারমেয়র সাথে খেলায় মগ্ন। খেলত খেলতে একবারে রাস্তার ওপর। কবির ভাষায়-“ভিখারি মায়ের শিশু / কলকাতার যীশু
সমস্ত ট্রাফিক তুমি মন্ত্রবলে থামিয়ে দিয়েছো।সম্বিত ফিরতেই আমি শিশুটির কাছে গেলাম তাকে রাস্তার ওপর থেকে সরানোর জন্য। হঠাৎ দেখি ঐ চারটে সারমেয় রে-রে করে তেড়ে এল, ওরা যেন বলতে চাইলো তোমার কোনো অধিকার নেই ঐ বাচ্ছার গায়ে হাত দেবার ।আমি অবাক হয়ে গেলাম ঐ সারমেয় গুলির আচরণে। ড্রাইভার দাদা তাড়া দিচ্ছে । আমিও বিষ্ময় উন্মোচন না করে যেতে পারছি না। তাই বিষটি বোঝার জন্য পাশে বস্তিতে গেলাম।

ওর নাম রাজা।বয়স ২ – ৩ বছর হবে। ওর মাতাল বাবা ওর মা কে ছেড়ে চলে গেছে ।এত দিন কোনো খোঁজ খবর ছিল না ওর বাবার ।কাল হঠাৎ ওর মা তাপসী মারা গেছে । তাই পুলিশ ওর বাবাকে খুঁজে এনেছে বডি সৎকার করার জন্য। আমি জিজ্ঞেস করলাম তাপসী মারা গেল কি ভাবে? তাপসীর যখন বিয়ে হয় তখন ওর বয়স ১৫ বছর। দু বছর পর রাজা জন্মায়। শ্বশুর বাড়িতে খুব অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে তাপসীকে । একবেলা খাবার জুটতো তার । সে খুব কুকুর দের খাওয়াতে ভালোবাসত। নিজের একবেলার খাবার থেকেই সে কুকুরগুলোকে খাওয়াতো। এই ভাবেই চলছিল। হঠাৎ একদিন তাপসীর স্বামী মা ছেলেকে ফেলে উধাও হয়ে গেল। তখন কোনো কুলকিনারা না দেখে ছেলের পেটে দুমুঠো দেবার জন্য একটা বাড়িতে বাসন মাজার কাজ নিল । সে যখন কাজে যেত তখন ঐ কুকুরগুলোই ওর বাচ্ছাকে সামলাতো কাউকে কাছে ঘেঁসতে দিত না। একটা রুটি ওরা পাঁচজনে ভাগ করে খায়। বেশ চলে যাচ্ছল মা – ছেলে- আর ঐ চার সারমেয়ের সংসার। হঠাৎ বিপত্তি ডেকে আনলো মা ছেলের আধপেটা সংসারে লক্-ডাউন। বড়লোকের বাঁচার লক ডাউন- আর গরীবের না খেয়ে মরার লক্-ডাউন। হতভাগীর কাজটা চলে গেল কারণ-সামাজিক দৃরত্ব তো বজায় রাখতে হবে। গত তিন দিন সে প্রায় না খেয়েই ছিল । হঠাৎ পেটের ব্যাথা শুরু হলো তাপসীর অসহ্য যন্ত্রনা।পাড়ার ছেলেরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল ।সেখানই মৃত্যু হলো তাপসীর । মৃত্যুর কারণ বলেছে জনডিস।
অনেক স্বপ্ন নিয়ে সে ছেলের নাম রেখেছিল রাজা। রাজার মতোই সে ।বস্তির কারো খাবার সে খায় না। সারমেয়রা যে খাবার খাওয়ায় সে তাই খায় ।সত্যি সে রাজা- ফুটপাতের রাজা। তার পারিষদ ঐ চার সারমেয়।সে সারাদিন ওদের আদর যত্নে কাটিয়ে দিনশেষে ওদের ঘেরাটোপে ঘুমিয়ে পড়ে।সোস্যাল দূরত্বকে বুড়োআঙুল দেখিয়ে মায়ের অভাব পুরণ করছে ঐ সারমেয়ের দল। এ এক নিস্পাপ আলিঙ্গন, এ এক নিস্কাম ভালোবাসা যা আমার মাতৃহৃদয়কে ভেঙে টুকরো টুকরো করেছে। আমার দুচোখে এনেছে জলের প্লাবন। হে প্রকৃতি তুমি শান্ত হও,ক্ষমা করো আমাদের অহং সর্বস্ব মনুষ্য সমাজকে। এই নির্মম প্রকৃতির প্রতিশোধে কত শিশুর যে ফুটপাতের রাজা হয়ে ঘুরবে তা ভাবলে শিহরিত হতে হয়।
——সমাপ্ত—–

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *