ফেয়ারওয়েল – অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

  –

 [post-views]

আজ বিনয় বাবুর ফেয়ারওয়েল. বিনয় বাবু সারদাপ্রসাদ উচ্চ বিদ্যাপীঠ -এর  ইতিহাস বিষয়ের শিক্ষক. ইতিহাস ছাড়া  তিনি বাংলাও পড়াতেন.  মাঝে মধ্যে তাঁকে প্রধান শিক্ষক নির্ধারিত শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে ইংরেজি  ক্লাসেও পাঠাতেন . বিদ্যালয়ের  কর্মজীবনে বিনয় বাবুর প্রবেশ আদালতের নির্দেশে হয়ে ছিল.সে সব এখন অতীত. 
 
বিনয় বাবু,  শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর নিয়োগ কর্ত্তা তৎকালীন প্রধানশিক্ষক ধীমান বাবুর পরামর্শ মেনে চলেছেন. ধীমান বাবু চাকরীতে যোগদানের দিনই বিনয় বাবুকে সহাস্যে  বলেছিলেন, একজন আদর্শ শিক্ষক হতে গেলে দুটি বিষয় মাথায় রাখবে.
 এক, নিয়মানুবর্তিতা দুই, প্রাইভেট টিউশন না করা. 
 
       বিনয় বাবু প্রথমটি শেষ দিন পর্যন্ত মেনে চলে আজ কর্ম জীবন শেষ করছেন. দ্বিতীয়টি পুরোপুরি মানতে পারেন নি. বেকার জীবনের অভ্যাস রাতারাতি ত্যাগ করতে পারেন নি. তবে একটা সময় গবেষণার স্বার্থে  সব বন্ধ করে দিয়েছিলেন. তিনি অবশ্য প্রাইভেট টিউশনএর ব্যাপারে নিজের বিদ্যালয়ের ছাত্র -ছাত্রী দের বরাবরই  এড়িয়ে চলতেন. কেননা নিজের বিদ্যালয়ের ছাত্র -ছাত্রীদের উনার বিষয়ে পাস করানোর  নীতিগত কোন দায় না থাকলেও  একটা পরোক্ষ দায় থেকেই যেত. খুব কম শিক্ষকই আছেন এই অলিখিত দায়টিকে কার্যক্ষেত্রে  এড়িয়ে যেতে পারেন ——–. 
 
      বিনয় বাবুর প্রথম দশ বারো বছরের কর্মজীবন খুব সুখের ছিল. প্রবীণ,  নবীন প্রায় সব শিক্ষকই সেই সময় রুটিন মাফিক  ঠিক সময়েই  ক্লাসে যেতেন, আসতেন.  পড়ানোর মধ্যে একটা অভ্যন্তরীণ   প্রতিযোগিতা ছিল. বিভিন্ন জাতীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেবার তাগিদ ছিল. এমনকী সুবীর বাবুর দায়িত্বে বার্ষিক নাটক, গানবাজনার অনুষ্ঠান নিয়মিত হতো. উচ্চমাধ্যমিক  স্তরে নবীন বরণ অনুষ্ঠান একটা আলাদা মাত্রা পেতো. ওইদিন ছাত্র ছাত্রীরা একটু অতিরিক্ত স্বাধীনতা ভোগ করতো. বিনয় বাবুর মতো কয়েকজন দায়িত্ববান শিক্ষক জাতীয় দিন গুলিতে বিবিধ বক্তব্য রাখতেন. বিনয় বাবুর কাছে এটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল. অন্যেরা আগাগোড়া নজর রাখতেন যাতে কোন বিশৃঙ্খলা না হয়. 
 
শিক্ষক দিবসের দিন সাধারণত একাদশ -দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র -ছাত্রীরা পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ক্লাস নিতো. শিক্ষক -শিক্ষিকারা পেছনের বেঞ্চে বসে শুনতেন কে কী রকম পড়াচ্ছে. স্টাফ রুমে সেই সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো. কোন কোন ছাত্র আবার  কোন কোন   শিক্ষকের পড়ানোর বিভিন্ন স্টাইল  নকল করতো.এরপর স্টাফ রুমে এসে  ছাত্র ছাত্রীরা গোলাপ ফুল, কলম উপহার দিয়ে  শিক্ষক -শিক্ষিকাদের প্রণাম করতো .  শিক্ষকরা দু হাত তুলে তাদের আশীর্বাদ করতেন. সে সব সত্যিই একটা সুখের দিন বা সময় ছিল. 
 
      নব্বুইর দশকের শেষাশেষি একটা সময়ের পর ধীরে ধীরে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রভাব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে প্রথম প্রকাশ্য বিভাজন ঘটাতে শুরু করলো. শিক্ষক সংগঠন গুলি রাজনৈতিক দূষণ শুধু  নিজেদের মধ্যে ছড়িয়েই  শান্ত হলেন না. বিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশটিকেই নষ্ট করে দিলেন. একদিকে প্রকাশ্য রাজনীতি, ক্লাস ফাঁকি, দেরী করে আসা আর তাড়াতাড়ি ট্রেন, বাস ধরার একটা অশুভ প্রবণতা শুরু হলো. যারা এই বদ অভ্যাস মেনে নিতে পারলেন না তাঁরা একঘরে হলেন.এককথায় শিক্ষকরা শিক্ষাগত কারণে নয় রাজনৈতিক স্বার্থে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে গেলেন. কেউ কেউ মধ্যপন্থা অবলম্বন করে আন্তরিক সম্পর্ক আরও নষ্ট করে দিলেন. 
 
বহিরাগত প্রধান শিক্ষক তা রুখতে পারলেন না. স্থানীয় প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব নেবার পর সারদা প্রসাদ উচ্চ বিদ্যাপীঠের  আরও অবনতি লক্ষ করা  গেল. তিনি শিক্ষকদের ব্যক্তিগত চর্চা, মনোভাব শোনার জন্য একটা নিজ গোষ্ঠী তৈরী করলেন. স্টাফ রুমে  ক্রমশঃ একটা দমবন্ধর পরিবেশ তৈরী হলো. কিন্তু বিনয় বাবু  বিদ্যালয়ের স্মারক পত্রিকার নিয়মিত সংখ্যা ও গুরুত্ব পূর্ণ সংখ্যাগুলির সম্পাদনার ক্ষেত্রে   দীর্ঘ কয়েক বছরধরে দায়িত্বে ছিলেন.আবার  সময়ের সংকেত ধ্বনি শুনে সেই দায়িত্ব ছেড়েও দিয়ে ছিলেন.  
 
        বিনয় বাবু ও  বিজ্ঞানএর প্রতিবাদী শিক্ষক সমর বাবু  আরও কয়েকজন  একসময় বুঝতে পারলেন,  সুখের দিন শেষ. এখন কথা বলাই দায়. সব পৌঁছে যাচ্ছে প্রধান শিক্ষক এমনকী পরিচালন সমিতির কাছে. স্টাফ কাউন্সিল, একাডেমিক কাউন্সিল, পরিচালন সমিতিতে নিজের পছন্দের শিক্ষক দের নিয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষক নিজের হাত আরও শক্ত করলেন.বিক্ষুদ্ধ শিক্ষক দের কোন কমিটিতেই জায়গা হলো  না.মূল্যবোধ চলে গেলো. প্রচলিত প্রথা বাতিল করে  স্টাফ কাউন্সিলএর সম্মতি ছাড়া যোগ্য কয়েকজন  সিনিয়র শিক্ষককে সু-কৌশলে এড়িয়ে,  একসময়,  এক নবীন শিক্ষককে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদে বসানো হলো. 
 
      বিনয় বাবু, সমর বাবু, সাজেদ বাবুরা এই ব্যবস্থার তীব্র নিন্দা করে প্রধান শিক্ষকের চোখের বালি হয়ে গেলেন. এমনকী বিনয় বাবু ও আরও একজন সিনিয়র  শিক্ষক শোভন বাবু  পরিচালন সমিতির অনুমতি সাপেক্ষে  গবেষণা মূলক   উচ্চ ডিগ্রী লাভ করেও   এক চাপা বিদ্বেষএর শিকার হলেন. আরও কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা  প্রথাগত  ডিগ্রী বাড়িয়েও কোন মর্যাদা পেলেন না.  আড়ালে ব্যাজস্তুতি শুরু হলো. 
 
       বিনয় বাবু আজন্ম দক্ষিণ পন্থী ও প্রতিবাদী হওয়ায় একমাত্র শিক্ষক হিসেবে একটি পাঠ্য বিষয় অনুমোদন  থেকে  পড়ানো, খাতা দেখার  দায়িত্ব নিয়েও সোজা পথে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে  আর্থিক প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোন রকম  সহযোগিতা পান নি. অথচ  বিনয় বাবু কোনোদিন তাঁর কর্মজীবনে মেডিকেল লিভ  নেননি – ক্লাস ফাঁকিও দেন নি . তৎকালীন প্রধান শিক্ষক এক্ষেত্রে তাঁর প্রতিশ্রুতি বা কথা রাখেন নি. শেষে, উচ্চ আদালতে গিয়ে বিনয় বাবু   সমস্যার সমাধান করেন .
 
শোভন বাবুকে আবার মহান শিক্ষক দিবসের দিন পরিচালন সমিতির সভায় এই আর্থিক প্রশ্নেই আলোচনার  নামে ডেকে পাঠিয়ে প্রধান শিক্ষক কার্যতঃ অপমান করে আত্মতৃপ্তি লাভ করেন . শেষে পরিচালন সমিতির সম্পাদক বিনয় বাবুর পরামর্শে শোভন বাবুর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে  ছিলেন. অপমানিত, মানসিক ভাবে আহত হয়ে শোভন বাবু আর আদালতে যেতে সাহস পাননি.  
 
      বিনয় বাবু অবশ্য শেষ দেখে ছেড়েছিলেন. তাই প্রধান শিক্ষক  অনুগামী সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর  দূরত্ব বেড়ে গিয়ে ছিল অনেক. কেবল সমর বাবু বিনয় বাবুকে এই  সাহসী  লড়াইএর জন্য বাহবা দিয়ে ছিলেন. 
 
       তাই যৌথ পরিবার যেভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থ নিয়ে এক সময় ভেঙে যায় সারদা বিদ্যাপীঠএর  সদস্যরা এক সময় মানসিক দিক দিয়ে সেই ভাবেই  বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন. যাবার আগের এই সব তিক্ত অভিজ্ঞতা বিনয় বাবুকে বড় বেশী অসহায় ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিলো. বিনয় বাবুর পেনশন বুকেও একটি অনভিপ্রেত মন্তব্য লিখে দেওয়া হয়েছিল.
 
সমর বাবু ও আরও দু’জন শিক্ষক প্রকাশ্যে প্রধান শিক্ষকের এই ভূমিকার প্রতিবাদ জানিয়ে ছিলেন. তবে আদালতে সুবিচার মেলার পর ডি. আই -এর নির্দেশে প্রধানশিক্ষক   সেই মন্তব্য প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়ে ছিলেন . কিন্তু স্বাভাবিক সম্পর্কে সেদিন থেকেই ফাটল ধরে যায়… 
 
   তাই বিনয় বাবু ফেয়ারওয়েল না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বেশ কয়েক বছর আগেই. ভেঙে যাওয়া সংসার থেকে কোন কিছুই গ্রহণ করতে তাঁর মন সায় দেয় নি. 
 
     একান্তে বসে এই সব হারিয়ে যাওয়া দিনের কথা আজ বড় বেশী করে মনে পড়ছে –. আজ রুটিন মোতাবেক এগারো ক্লাসে শেষ বারের মতো গেলেন. ছাত্ররা পড়ার ব্যাপারে কোন উৎসাহ দেখালো না. ওরাও বুঝতে পেরে ছিল, স্যার আগামী কাল থেকে আর আসবেন না. তাই সকলে নীরব রইলো. পিরিয়ড শেষ হবার ঘন্টা বাজলো. বিনয় বাবুর কাছে এটা বিদায়ের ঘন্টা.
 
একসময় সহকর্মীদের সঙ্গে 
শিক্ষক হিসেবে  শেষ সাক্ষাৎকার  বা বসার সময় এসে  গেল. 
     ঘড়িতে এখন বিকেল চারটে. 
 
প্রধান শিক্ষক ও স্টাফ কাউন্সিলের সম্পাদক প্রথমেই সপ্রশংস বক্তব্য রাখলেন. পরিচালন সমিতির সভাপতি বা অন্যান্য সদস্যদের কাউকেই দেখা গেলো না. একটি পুষ্প স্তবক, একটি রুপোর কলম বিনয় বাবুর হাতে দেওয়া হলো. বিনয় বাবু তাঁর ডেপুটেশন সহ স্থায়ী চাকরির প্রায় তিন দশকের কিছু অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন.
 
কাউকে কোন ব্যক্তি আক্রমণ না করে শুধু ছাত্র -ছাত্রীদের প্রতি আরও দায় বদ্ধতার দিকে সকলকেই নজর দিতে বললেন.এতে  কেউ কেউ বিব্রতও  বোধ করলেন. শুরু হল আলিঙ্গন পর্ব.  শিক্ষিকারা মৃদু হাসলেন. হাত নাড়ালেন. কেউ কোন কারণে নীরব রইলেন.  
 
      এরপর একটা গ্ৰুপ ছবি তোলা হলো. এভাবেই সাক্ষাৎপর্ব শেষ হলো. ট্রেনের যাত্রীরা যে যার  বাড়ী চলে গেলেন. বিনয় বাবু মিষ্টির বাক্সটা খুলে  বাকী শিক্ষক দের ভাগ করে দিলেন. পুষ্প স্তবকটি বিনয় বাবু যে টেবিলে বসতেন সেখানেই রেখে দিলেন.  স্টাফ কো-অপারেটিভএর  পক্ষ থেকে  দুটি উপহার   দেওয়া বই, একটি কলম, আর একজন অতি প্রিয়  সহকর্মীর উত্তমকুমার-এর ওপর লেখা একটি জীবনীমূলক বই ইতি মধ্যেই বিনয় বাবুর দীর্ঘ দিনের ব্যবহার্য কাঁধের সাইডব্যাগের মধ্যে রেখে দেওয়া হয়ে ছিল . একান্ত ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ এগুলো আর  ফেরানো গেল না. 
 
         বিনয় বাবুকে এবার বাড়ী ফিরতে হবে. আগে সৌজন্য বশত :বিদায়ী শিক্ষকদের উপহার সহ বাড়ী পৌঁছে দেওয়া হতো. বিনয় বাবুর ক্ষেত্রে সেটা দেখা গেল না. 
 
         নীচে নেমে দীর্ঘ দিনের সাথী সাইকেলটি নিয়ে ধীরে ধীরে  বিনয় বাবু  বিদ্যালয়ের গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন. পেছন ফিরে শেষ বারের মতো বিদ্যালয়ের চার দিকে একবার তাকালেন. এক অজানা কৃতজ্ঞতায় মাথাটা নীচু করলেন.
         বিদায় !সারদা বিদ্যাপীঠ.
       ‘ স্যার, আবার আসবেন.’
 
আবার পেছনের দিকে ফিরে তাকালেন বিনয় বাবু. দেখলেন, একদা ছাত্র বর্তমানের সহকারী প্রধান শিক্ষক নিলয় বাবু আর দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে  পাশে বসা, বিভিন্ন বিষয়ে  সমর্থন করা  সহমর্মী  শিক্ষক সাজেদ বাবু মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছেন —হয়তো কিছু বলতে চেয়ে ছিলেন -বলা হলো না. 
       বিনয় বাবু দুজনকেই প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানালেন.যেহেতু দুজনেই স্থানীয় তাই বিদ্যালয়ের উন্নতিতে আরও দৃষ্টি দিতে বললেন. 
 
কিন্তু, প্রধান শিক্ষক নিজের ঘরে বসে থাকলেও বিদায় জানাতে আসেন নি. 
amitab mukhapadya

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top