বন্ধুগুলো আমার

ড . ময়ূরী মিত্র

ইংরাজী ভাষায় নিজের নাম লিখুন ।

 9 total views

বন্ধুগুলো আমার

একবছর আগে —–

সারাদিন বড় শ্রম হয়েছে | সন্ধ্যে শেষে ফিরছিলাম দমদম স্টেশন দিয়ে | রেলস্টেশনের বাজারে শীতের ফল ফুল থরে থরে সাজানো | বিক্রেতারা দাম হাঁকছে | ক্রেতারা চেঁচাচ্ছে | দরদস্তুর করছে | সস্তা দামে সরেস ফলটি লুফে নিয়ে হাসতে হাসতে ছুটছে বউ বাচ্চার কাছে | স্বপ্ন —সন্তানসন্ততি ফল চুষে তৃপ্ত হবে , পুষ্ট হবে | স্টেশনবাজার তখন আমার ভরাকলসির স্বপ্নবাজার |

এরই মাঝে সেদিন সবচেয়ে হাসিমুখ ফলওয়ালি গভীর ঘুমে কাত | যুবতী অঙ্গগুলো ছড়ানো এলোমেলো | মানুষের ভিড়ে যে কোনো মুহূর্তে চেপ্টা হয়ে যেতে পারে তার ফ্যাকাশে ফর্সা পা হাত | তবু দেখো — ক্রেতাকে নস্যাৎ করে আপন পসরা সাজিয়েও কেমন বেমক্কা ঘুম মারছে ফলবতী ! অন্যদিন কত হাসে আমার পানে চেয়ে | এত হাসে যে আমি বলি —-ওরে হাঁস প্যাকপ্যাক করে হাসিস না আর | ক্রেতা পাশ কাটাবে তোর ঘন হাসিতে | ভাববে , বিক্রিতে খেয়াল নেই তোর | হাঁস হেসে বলত —-কোটার বিক্রি শেষ হলে নয় হাসি পায় নয় ঘুম পায় গো দিদি | কিছুতে অনেক বিক্রিতে মন দিতে পারিনা | সেদিনও ভরাবাজারে তার ঘুম দেখে নিশ্চিত হলাম —নিজের হিসেব মত বিক্রির কোটা তার শেষ | বুঝতাম ফলবতী আমার বড়ো confident —সরেস ফলও আনতো — বিকোতও প্রচুর এবং দ্রুত | নিত্য হাসতে হাসতে রেলগাড়িতে ফিরত | সেদিন কেন জানি –তার ঘুমন্ত গোমড়া মুখ এতো লোকের মাঝে আমাকে কেমন একা করে দিয়েছিল | একেবারে হঠাৎই | খুব একা — বন্ধুর হাসি না দেখে | সেই বোধহয় তার সাথে শেষ দেখা |

বাড়ি ফিরলাম | খানিক রাঁধলাম বাড়লাম | তারপর সেই দুখী মনটাকে নিয়ে লন্ড্রি চললাম | কাঁধে শাড়ি ভর্তি বিশাল ব্যাগ | সাইজে বড় বলে , বেড়াতে যাওয়ার ব্যাগেই নিয়েছিলাম লন্ড্রির কাপড় | বড় বড় শ্বাস নিচ্ছি | মাঝপথে ধেয়ে এল সব্জিওয়ালা | আমার আরেক মহব্বতের মানুষ | নাম –কোকিল কিংবা দিলরুবা | একমাত্র রোজগেরে ছেলেটার রক্তমাখা শরীর পুড়িয়ে দুদিন পর যে হাসতে হাসতে হিন্দি গান ধরে খরিদ্দারের সাথে , তার তো ওমন নামই হবে বলুন ? যে কথা হচ্ছিল —- হাঁফাতে দেখে আমার ব্যাগখানা জাপটে ধরে সে বললে —এত শাড়ি নিয়েছেন কেন? অনেকদিনের জন্য যাচ্ছেন নাকি ? -কোথায় যাচ্ছেন ? এতদিন কী করবেন সেখানে ? -এত রাতে — ? আমাকে যেতে দেখে কী উদভ্রান্ত প্রেম রাস্তার ধারে বসে থাকা এক বিক্রেতার ! ভাবছিল —দিদি যাচ্ছে না –দিদি চলে যাচ্ছে | হাতখানি আমার পেঁচিয়ে ধরেছিল মহব্বতী সব্জিওয়ালা | উত্তরের অপেক্ষাও নেই | শুধু প্রশ্ন আর প্রশ্ন | আমার চলে যাওয়ায় লুকোনো ত্রাস ফুটছে | মনের মধ্যে থাকে যে চোখ , সেই চোখে | টগবগ | টগবগ | আমার যাওয়া না যাওয়ায় এতো চিন্তা কখন জমল তোর ভাই ? ওরে , আর কেমনে যাই ?

★★★★

দিন সাতেক আগে —

কষ্ট হচ্ছিল ফলবতী হাঁসের জন্য | কাউকে না বলে অটো করে গিয়েছিলাম দমদম স্টেশনে | নাহ ! ট্রেন চালু হবার পরও আসেনি | ফলের ঝুড়ি বসানোর জায়গায় পুরু ধুলো | কোন জায়গায় যে তার বসার ছোট বালিশ রাখত , টিফিন বাক্স সমেত থলিটা নামিয়ে রাখত –কেন চিনতে পারি না আমি ? সেকী চিহ্ন হারিয়ে গেছে বলে ? আর আমার কোকিল ? সে তো আছে আমার বাজারে | এখনো সবজির পসরা নিয়ে আসে সে | তবে ডাকেও না –গায়ও না | চেনেই না আমাকে | বাঁচবে বলে শুধু বেচে যায় ক্ষিপ্র | ফসল উৎপাদনে ঘাটতি নেই তবু সবজির দাম কেন চড়া তা নিয়ে মাঝে মাঝে টুকরো আর্তরব কেবল শোনা যায় প্রিয় ফসলকুমারের গলায় | নিজের সাথে ধীরলয়ে কলহ করে সে | এত মৃদু যে বুঝতেই পারি না কোকিল কাঁদছে নাকি দিল হারিয়েছে দিলরুবা ?

এরপর মেলা হবে —
কত যেন সংখ্যাটা ঘোষণা করলেন সরকার ? ১৭৯ ? আরে বলুন না পঞ্চাশহাজারের পুজোর পর এবার মেলার exact সংখ্যাটা কী ?
সেখানে পিঠে হবে |
পুলি হবে ক্ষীর কিংবা গুরমাখা নারকেল পুর দিয়ে |
ইলিশ রাঁধার কম্পিটিশন হবে |

মহামান্য নাগরিকরা খাবেন আর শাড়ি পাঞ্জাবির চ্যালেঞ্জ খেলবেন |
আপত্তি করব কেন ভাই ? জীবন যাদের কাছে চ্যালেঞ্জ তাদের তো কোনো খবরই দিতে পারলাম না আপনাদের | দেখছেন না –আমার mentally challenged বাচ্চাগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে | আমার কোল থেকে — স্কুল থেকে লক্ষযোজন দূরে চলে যাচ্ছে তারা ?

আপনি কেন সময়কে বৃথা হতে দেবেন ভাই ?
খেলুন —| আরে মজা লাগবে –খেলুন |
শাড়ি কোট এবং last of all পিওর লেদার কাবুলি কিংবা চপ্পল মারামারির খেলা |
আরে ওই ওই লেংগী লেংগী খেলা আর কী |

দুটো অনুরোধ —
রসালো খেলার নাম কখনো ভুলবেন না আর খেলতে একদম লজ্জা পাবেন না | কেমন ?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *