বন্ধু

#বন্ধু
#শম্পা_সাহা

অনেক্ষন থেকেই ওষুধের শিশিটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে।মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে সবগুলোই একসাথে মুখে পুরে দিই তারপর এক ঢোক জল।কিন্তু দোটানা ভয়ংকর।ঘাম দিচ্ছে,চোখ ছাপিয়ে জল ভেজাচ্ছে বুক।না দোষ দেবার জায়গা তার নেই। সব জেনেই তো ও এগিয়েছে।আজ কাকে দোষ দেবে?

অফিসের বস সুধন‍্য রায়।হ‍্যান্ডসাম, স্মার্ট আর একজন মেয়েকে চার্মড করতে যা যা দরকার সব মাপ মতো।একেবারে লেডি কিলার যাকে বলে।মেয়েরা ওর দিকে আকৃষ্ট হয় ডানা গজানো বর্ষার উইপোকার মত।বাদলা পোকা গুলো যেমন পুড়বে,মরবে জেনেও আগুনে ঝাঁপ দেয়, সুধন‍্যর দিকেও মেয়েরা ঠিক একই ভাবে ছুটে যায়।

মজার কথা সুধন‍্য বিশ্বাস প্লে বয় এবং উনি সেটা নিজে বেশ গর্ব করে বলেন , মেয়েদের সামনেই।তবু কোন ও এক অমোঘ মোহ মেয়েদের ওর কাছে তাড়িয়ে নিয়ে যায়।অবিবাহিত সুধন‍্য রায়ের শয‍্যা সঙ্গীনি হতে পারাটাই যেন বিশাল ক্রেডিটের!

না ,উনি খালি হাতে বা প্রেম ভালোবাসার গল্প ফেঁদে বা ভয় দেখিয়ে কাউকে বাধ‍্য করেন না ।যারা যারা ওনার সাবোর্ডিনেট তারা প্রত‍্যেকেই বিনিময়ে প্রোমোশন, ইনক্রিমেন্ট বা মুম্বাই বা বেঙ্গালুরুর মত পছন্দের শহরে ট্রান্সফার পায়।রয় এন্ড সন্সের যে ডালপালা বিদেশে, কেউ কেউ সেখানেও যেতে পারে।তবে তার আগে তার সত‍্যিকারের যোগ‍্যতা কিন্তু যাচিয়ে নেন মিঃ রায়।

উনি ভোগী কিন্তু নিরেট নন।ব‍্যবসাটাও ভালো বোঝেন।আর সব সম্পর্কের ক্ষেত্রেই বিছানা ও তার বিনিময় মূল‍্যটাও আগে থেকে ঠিক করে নেন।একজন পারফেক্ট বিজনেস ম‍্যান।ওসব ছেঁদো প্রেম ভালোবাসায় বিশ্বাসী নন।তাই আজও ব‍্যাচেলর।

তবে প্রচুর বিজনেস টাইকুনের মেয়েরাও কিন্তু সুধন‍্য রায়ের জন্য পাগল।সঙ্গ ছাড়া তো তাদের আর পাবার কিছু নেই, না প্রোমোশন, না টাকা পয়সা!তবুও তারা কোনো পার্টি তে সুধন‍্য রায়কে দেখলে আঠার মত লেগে থাকে।তারা সুধন‍্যর জন্য সব বিলিয়ে দিতে পারলে যেন বাঁচে।সোসাইটির অন‍্য পুরুষেরা বলে ,”মিঃ সুধন‍্য রায় ,দ‍্য পাইড পাইপার অফ ফিমেল ওয়ার্ল্ড!”

রিয়া কিন্তু সুধন‍্য রায় কে সত্যি সত্যিই ভালোবেসেছিল।কারণ লোকটার মহত্ব,ভন্ডামি হীন সোজাসুজি মতবাদ।উনি যা চাইতেন তার দাম দিতেন এবং কোনো জোর জবরদস্তি বা ভয় দেখানো নয়,কোনো ভালোমানুষির মুখোশ নয়।এবং উনি সত‍্যিই হেল্পফুল।

রিয়া অবাক হয়ে ভাবতো ঈশ্বর আর শয়তান কিভাবে একদেহে অবস্থান করে? উনি সারাদিন অফিসে ড্রিংক করতেন, কিন্তু কোনো এক যাদুবলে তার আচরণ কখনো বেহিসেবি নয়,পা টলে না এক মুহুর্তের জন‍্য।সোজা দাঁড়িয়ে থাকেন।এবং তার ভদ্রতা ও সৌজন্য বোধ অবাক করার মত।

গত মাস ছয়েক আগে তখন রিয়া সদ‍্য এ কম্পানিতে জয়েন করেছে।হঠাৎই দিন পনেরোর মধ্যে মায়ের একটা সিভিয়ার অ্যাটাক।টানা কয়েকদিন ও অফিস যেতে পারে নি।সুধন‍্য রায় ব‍্যাপারটা জানতে পেরে সব রকম সাহায্য করেন এবং নার্সিং হোমের বিরাট বিল নিজেই পে করেন।রিয়া মাসে মাসে মাইনের টুয়েন্টি ফাইভ পারসেন্ট করে কাটাবে বলে।ওই অবস্থায় সেদিন মিঃ রায় না থাকলে হয়তো রিয়াকে মাকেও হারাতে হতো।

কিন্তু সুধন‍্য রায় যে এটা শুধু রিয়ার জন‍্যেই করেছে এমন নয় ।পরে রিয়া খোঁজ নিয়ে জেনেছে বহু এমপ্লয়ি এমনকি পুরুষদেরও মিঃ রায় এভাবেই হেল্প করেন।অর্থাৎ শুধু মেয়ে পটাতেই যে করেন এমন নয়।এতে রিয়া যেন মনে মনে একেবারে কেনা হয়ে যায়।আর মন দিয়ে বসে ওর চেয়ে প্রায় পনের বছরের বড় ,ওর অফিসের বস মিঃ সুধন‍্য রায় কে।কৃতজ্ঞতা বড় বিসম বস্তু‌!যার থাকে সে সব সময় বিকিয়ে দিতে চায় নিজেকে।

নীল অবশ‍্য বার বার বারণ করেছিল।”স‍্যার তোকে হেল্প করেছেন ভালো কথা।তুই ও তো টাকাটা ফেরৎ দিচ্ছিস।তাতে প্রেমে পড়ার বা পাগল হবার কি আছে?স‍্যার এই রকমই “।
কিন্তু রিয়া কিছুই বুঝতে চায়নি।পিপীলিকার মত ছুটে গেছে জ্বলন্ত আগুনের দিকে।

তাই নীলের ওর প্রতি বন্ধুত্ব, ওর প্রতি দায়িত্ব, ওর মায়ের প্রতি কর্তব্য কিছুই ওর চোখে পড়েনি।ওর চোখে তখন সব সময় একটাই মুখ,সুধন‍্য রায়ের।

নীল ওকে স‍্যার সম্পর্কে বোঝাতে চেয়েছিল।বলেছিল এ ভালোবাসার কোনো পরিণতি নেই তাতে উল্ট শুনেছিল,”তুই স‍্যার কে ,হিংসে করিস!তুই স‍্যারের নখের যোগ‍্য ও না!”

সেদিন থেকে আর নীল রিয়াকে বারণ করেনি স‍্যারের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে।এমনকি যখন মাস দুয়েক আগে একটা ক্লায়েন্ট মিটিংয়ের পর স‍্যার ওকে ডিনারে নিয়ে যাবেন,খুশিতে ডগমগ রিয়া ওকে ফোনে জানিয়েছিল ।নীল কি হতে যাচ্ছে বুঝতে পেরেও কিছু বলেনি।চুপ করে থেকেছে।শুধু সেদিন রাতে নীল আর ডিনারটা করতে পারেনি!

মিঃ রায় কিন্তু স্পষ্ট জানিয়েছিলেন,”আমাদের ঘনিষ্ঠতা কিন্তু আজ রাত পর্যন্তই ,এর পরে আমি আর তোমাকে ডাকবো না আর তুমিও কিন্তু কিছু দাবি করতে পারবেনা!তাই কি চাই সেটা এখনই বলো!”
“আমার কিচ্ছু চাইনা!”
সুধন‍্য রায়ের অফার ফিরিয়ে ও কোনো দাবী ছাড়াই সুধন‍্য রায়ের সঙ্গে কাটিয়েছিল একটা রাত।

এই প্রথমবার কেউ এভাবে ওনার অফার ফিরিয়ে দিল!কিন্তু এই আবেগ গুলোক উনি কোনোদিনই প্রশ্রয় দেন না।এবং সব রকম সতর্কতা ও অবলম্বন করেন।কিন্তু কোথায় যে কি ভুল হলো?আসলে হয়তো রিয়া এটাই চেয়েছিল!ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা মিলেমিশে এক অদ্ভূত মানসিক অবস্থার সৃষ্টি করে।

গত দু মাস রিয়া পর পর পিরিয়ড মিস করে।নীলকে জানাতেই নীল টেস্ট কিট এনে দেয় ।তাতে দুবারই রেজাল্ট পজেটিভ।রিয়া বেশ বুঝতে পারে কি হয়েছে আর কেন?কিন্তু কাউকে কিছু বলার নেই।ভয় হয়!মা যদি জানতে পারে,অফিসের লোক বা অন‍্য কেউ!

ওষুধের শিশিটা খালি করার কথা দ্বিতীয় বার মাথায় আসে,মায়ের মুখটা মনে পড়ে।আর মিঃ রায়!নাঃ ওনার কোনো দোষ নেই।উনি আগে ভাগেই সবটা বলে নিয়েছিলেন তাই ওনার কাছে গিয়ে দাঁড়াবার কোনো মানে হয় না।

বোতলের ট‍্যাবলেট গুলো হাতের পাতায় উপুড় করে জলের বোতলের মুখটিটা খোলে।অমনি মায়ের ঘর থেকে প্রচণ্ড কাশির আওয়াজ।মার বোধহয় আবার টান উঠেছে?তাড়াতাড়ি ট‍্যাবলেট গুলো বোতলে পোরে।অর্ধেক মেঝেতে পড়ে ছড়িয়ে যায়।দৌড়ে গিয়ে খোলা বোতলটা মায়ের মুখের সামনে ধরে।

মা জলটা গিলতেই ইনহেলারটাএগিয়ে দেয় রিয়া।”তোমাকে কতবার বলেছি না,এটা সঙ্গে নিয়ে শোবে”!কয়েকবার ইনহেলার নিয়ে মা চোখ খোলেন,”আজ একটু আমার কাছে শুবি?”

আচ্ছা মায়েরা কি সব বুঝতে পারে?মায়েরা কি অন্তর্যামী?তাহলে রিয়াও তো মা?ওর ভেতরেও তো একটা ছোট্ট প্রাণ আছে!

রিয়া মায়ের পাশেই শুয়ে পড়ে,”তুমি শোও আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিই!”মা কেমন বাচ্চা মেয়ের মত গুটিসুটি ওর বুকের কাছে।ওর বাবা যখন মারা যান তখন তো ওর মাত্র দেড় বছর বয়স।কত কষ্ট করে মা ওকে মানুষ করেছেন!আর ও কিনা মাকে একা করে দিয়ে চলে যাচ্ছিলো?ছিঃ।

ওর মা যদি ওকে একা মানুষ করতে পারে ও কেন পারবে না নিজের সন্তানকে একা মানুষ করতে?এ তো ওর ভালোবাসার চিহ্ন।ও তো বিনিময়ে সুধন‍্য রায়ের কাছ থেকে কিছু নেয়নি।শুধুই বিলিয়ে দিয়েছে ভালোবেসে।তাহলে সে ভালোবাসা বইবার ক্ষমতা কি ওর নেই?ও কি ওর মায়ের চেয়েও দুর্বল?

পরদিন অফিসের লাঞ্চ আওয়ারে,ক‍্যান্টিনে বসে নীলকে জানিয়ে দেয়, মিঃ সুধন‍্য রায়ের সন্তান ও একাই মানুষ করতে চায়।
“লোকে কি বলবে সেটা ভেবেছিস?”
“হ‍্যাঁ ভেবেছি।সে তো মা একা বলে মাকেও লোকে কত কি বলেছে?তাতে কি?”
“আমার কি এখানে কোনো ভূমিকাই নেই নেবার মত?”

নীল মনের আসল কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারে না।কিন্তু রিয়ার এটা জেদ,একার লড়াই।এখানে ও কারো দয়া নেবে না।অল্প হেসে বলে,”কে বললো তোর কোনো ভূমিকা নেই?তুই যে আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড।এই ভূমিকাটাই বা কম কিসে?”
“কিন্তু..”,নীল কি একটা বলতে চায় কিন্তু রিয়া আগেই থামিয়ে দেয়,”লড়াইয়ে নামার আগেই আমায় দুর্বল ভেবে বসলি?তুই কেমন বন্ধু রে?”

নীল রিয়ার আত্মবিশ্বাসী মুখটা দেখে ভাবে ভালোবাসা মানে যে সব সময় দুদিকেরই হতে হবে তার কি মানে আছে?রিয়া যদি সুধন‍্য রায়কে ভালোবেসে একা এতবড় দায়িত্ব নিতে পারে তবে সে রিয়াকে ভালোবেসে কেন চিরকাল ওর পাশে থাকতে পারবে না?’

নীল রিয়ার হাতে আলতো হাত ছুঁইয়ে বলে,”একটা করে কফির অর্ডার দিই?”,”দে,কিন্তু খাওয়াবি তুই”,”আচ্ছা বেশ”,নীল হাসতে হাসতে কফি আনতে যায়।

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top