বর্ধমান রাজপরিবারের ট্র্যাজিক নায়ক প্রতাপচাঁদ

বর্ধমান রাজপরিবারের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী।
———————————————————
বর্ধমান রাজপরিবারের ট্র্যাজিক নায়ক প্রতাপচাঁদ
——————————————————
পুলক মন্ডল

বর্ধমান রাজপরিবারের রাজত্বকাল দু’শ বছর স্থায়িত্ব পেয়েছিল। ঠিকঠাক বললে দু’শ তের বছর। ১৭৪০ এ চিত্রসেন রাই বর্ধমানের প্রথম রাজা হন এবং ১৯৫২ তে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পর যখন রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে তখন শেষ রাজা ছিলেন উদয়চাঁদ রাই। বর্ধমান রাজপরিবারের এই দীর্ঘ সময়ের ইতিহাসে রাজত্ব করেছেন আট’জন রাজা। এঁদের মধ্যে সবচাইতে স্বল্প সময়(১৮১৬-১৮২০), মাত্র চার বছর রাজত্ব করেও সবচাইতে বিতর্কিত, নানা ঘাত-প্রতিঘাতে মোড়া এক নাটকীয় চরিত্ররুপে রাজপরিবারের ইতিহাসে হাজির হয়েছেন তিনি, রাজা প্রতাপচাঁদ রাই। মাত্র আঠাশ বছর বয়সে আচমকা তাঁর অন্তর্ধান এবং নিরুদ্দেশের চোদ্দ বছর পরে জটাজুটধারী এক সাধু এসে যখন দাবী করেন যে তিনিই রাজা প্রতাপচাঁদ, তখন তাঁকে অভিযুক্ত করে বর্ধমানের তৎকালীন দত্তক রাজার করা মামলাকে ঘিরে দেশজুড়ে যে বিতর্কের পরিবেশ তৈরি হয় তা বর্ধমান রাজবংশের ইতিহাসে এক রোমাঞ্চকর ঘটনারুপে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন ‘জাল প্রতাপচাঁদ’ উপন্যাস। অনেকে বলেন মহানায়ক উত্তম কুমার অভিনীত সুপারহিট সিনেমা ‘সন্ন্যাসী রাজা’ আসলে ভাওয়াল রাজার নয়, প্রতাপচাঁদেরই কাহিনী। এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল যে প্রতাপচাঁদ বর্ধমান রাজবংশের চতুর্থ তথা সেই শেষ পুরুষ, যার শরীরে সরাসরি রাজবংশের পত্তনকারী রাজা চিত্রসেনের রক্ত বয়েছে। প্রতাপচাঁদের পর আরও চারজন রাজা এসেছেন কিন্তু তাঁরা ছিলেন দত্তক। রাজবাড়ীর অন্দরে প্রতাপচাঁদকে সিংহাসনচ্যুত করার যে চক্রান্ত হয়েছিল তা যে আসলে রাজসম্পত্তি দখলের জন্য তা ইতিহাসবিদদের লেখা থেকে জানতে পারা যায়। এখন দেখা যাক, কেমন ছিলেন রাজা প্রতাপচাঁদ——
বর্ধমান রাজপরিবারের তৃতীয় পুরুষ রাজা তেজচন্দ্রের একমাত্র পুত্র প্রতাপচাঁদ। মা রাজার জ্যেষ্ঠামহিষী নানকী দেবী। ছোট থেকেই প্রতাপ খুব দুরন্ত। ঘুড়ি ওড়াবার শখ খুব। অবিভক্ত বর্ধমান জেলায় ফিবছর উত্তরায়ণে ঘুড়ি ওড়ানোর যে উৎসব হয় তার শুরুও প্রতাপচাঁদের হাত ধরেই। একবার ঘুড়ির সুতো লেগে কানের কিছুটা অংশ কেটে যায়। আবার ঘোড়ায় চড়ার নেশাও বাগ মানেনা। নতুন ঘোড়া এলেই রাজপুত্র সবার আগে চড়বেন। একবার এক নতুন ঘোড়া রাজপুত্রের পিঠে কামড় বসিয়ে একখাবলা মাংস তুলে নেয়। এদিকে রাজকুমারের দুরন্তপনার সাথে যেন পাল্লা দিয়ে একের পর এক বিয়ে করে চলেছেন রাজা তেজচন্দ্র। তাঁর সপ্তম তথা শেষ বিবাহের কিছুকাল পরেই বার্ধক্যজনিত অসুখে পড়ে একপ্রকার নিরুপায় হয়ে রাজ্যভার তুলে দিলেন একমাত্র পুত্রের হাতে। প্রতাপচাঁদ যখন রাজা হলেন তখন তিনি চব্বিশ বছরের যুবক। রাজ্যাভিষেকের অব্যবহিত পর থেকেই তাঁর সাথে প্রতি পদে পদে বিবাদ শুরু হল পিতার কনিষ্ঠা মহিষী কমলকুমারী ও কমলকুমারীর দাদা পরানবাবুর সাথে। এই পরানবাবু তাঁর কয়েকজন অনুচরকে সঙ্গে নিয়ে রাজ্যজুড়ে নতুন রাজাকে ভণ্ড ও প্রতারক বলে প্রচার শুরু করলেন। আসলে পরানবাবুর উদ্দেশ্য ছিল রাজা হিসাবে প্রতাপচাঁদ অকর্মণ্য এটা যে কোনভাবে প্রমান করে নিজপুত্র চুনীলালকে দত্তক পুত্ররুপে তেজচন্দ্রকে গ্রহন করানো।
রাজবাড়ীর অন্দরের সাথে নিরন্তর এই সংঘাতে প্রতাপচাঁদ ক্রমশ বিমর্ষ ও একাকী হয়ে পড়লেন। শুরু করলেন রাজকাজে অবহেলা এবং একইসাথে চলতে থাকল অত্যধিক মদ্যপান। এইভাবে কেটে গেল প্রায় চার বছর। এইসময় প্রতাপচাঁদ অত্যধিক অসুস্থ হয়ে পড়লেন। রাজবৈদ্যরা নিদান দিলেন তাঁর অসুখ ভাল হবার নয়। এরপর তাঁকে পালকি করে বর্ধমান থেকে নিয়ে আসা হয় কালনা রাজবাড়িতে। ভাগীরথী তীরবর্তী কালনা ছিল বর্ধমান রাজাদের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী। এবারে হুবহু তুলে ধরা যাক ‘জাল প্রতাপচাঁদ’ উপন্যাসের কিছু অংশ, ‘ কাতান দ্বারা ঘাট ঘেরিয়া তাহাকে অন্তর্জলি করা হইল। সে সময় বিস্তর লোক তথায় উপস্থিত ছিল। কিন্তু তাহারা সকলে কাতানের বাহিরে দাঁড়ায়ে ছিল। তাহাতে আলোক ভাল হয় নাই। জলের ধারে একটা তাঁবু খাটানো, পৌষ মাস, বড় শীত। আত্মীয়স্বজনেরা সেখানে বসিয়া ছিলেন। রাত্রি দুই প্রহরের পর ঘাটে শবদাহ হয়। রাত্রি তৃতীয় প্রহরের সময় রাজা তেজচন্দ্র বর্ধমান যাত্রা করেন’।
প্রতাপচাঁদের হঠাৎ অসুস্থ হওয়া, গভীর রাতে কাতানের ভেতর শবদাহ, বর্ধমান থেকে তেজচন্দ্রের একা রাতে কালনায় আসা এবং সেই রাতেই বর্ধমানে ফিরে যাওয়া এসব ঘটনাবলিকে অনেকেই সাজানো ঘটনা বলে মনে করেন। তাঁদের মতে এসব ধারাবাহিক ঘটনাগুলিকে সুচতুরভাবে সাজিয়ে মহারাজ তেজচন্দ্র মারফৎ তাঁর পুত্রের আনুষ্ঠানিক মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করিয়েছিলেন পরানবাবু। প্রতাপচাঁদ আদৌ মারা গেছেন কিনা তা নিয়ে সেইসময় যে সন্দেহের বাতাবরন তৈরি হয়েছিল তার পেছনে আরও একটা বড় কারন ছিল যে প্রতাপচাঁদের চিতাভষ্ম কালনার সমাজবাড়িতে রাখা হয়নি যেখানে রাজপরিবারের অন্যদের চিতাভষ্ম রাখা হয়।
এই ঘটনার চোদ্দ বছর পর ১৮৩৫ সালে কালনায় ভাগীরথীর পাড়ে এক সাধুর আগমন ঘটে, যিনি নিজেকে প্রতাপচাঁদ বলে দাবী করেন। এলাকায় আলোড়ন পড়ে যায়। এই ঘটনার বিবরন আছে ‘জাল প্রতাপচাঁদ’ উপন্যাসে- ‘শহরে রাষ্ট্র হয়ে গেল রাজা আসছেন। উৎসুক জনসাধারন কালনা পাথুরিয়ামহল ঘাটের দিকে ছুটিল…… দারোগা মহিবুল্লা যথাকালে গঙ্গা তীরে উপস্থিত হইলেন। আভূমি নতশিরে জাল রাজাকে সেলাম করিয়া হাত জোড় করিয়া দাঁড়াইলেন। রাজা নৌকা হইতে তঞ্জামে উঠিলেন। একজন ভৃত্য আসিয়া তাহার দক্ষিণ দিকে একটি তরবারি রাখিয়া গেল। আর একজন ছাতা ধরিল। তৃতীয় একজন আড়ানি ধরিল, অপর দু’জন চামর করিতে লাগিল….গঞ্জের বৃদ্ধ মহাজনেরা গলায় কাপড় দিয়ে দাঁড়াইল, দূর হইতে স্ত্রীলোকেরা উলু দিতে লাগিল’।
রাজার আগমনে প্রজাদের এই অভিনন্দন পর্ব বর্ণনার পর লেখক বলছেন, ‘রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর অতীতকাল হইলে পল্টন কালনায় পৌঁছাইল। …… গলবি সাহেব পিস্তল হাতে দারোগা ও নাজিরের সঙ্গে ঘাটে গেলেন…. কাপ্তেন সাহেব হুকুম দিলেন, অমনি সিপাহি বন্দুকে গুলি গাঁথিল’।
সম্ভবত গুলি চালনার আকস্মিকতায় ভাগীরথীতে ঝাঁপ দিয়ে ওপারে নদীয়ায় পালিয়ে যান জাল প্রতাপচাঁদ। পরে এক সঙ্গী সহ গ্রেপ্তার হন তিনি। জালিয়াতির অভিযোগে দত্তক রাজার বকলমে মামলা করেন পরানবাবু, তিনিই সাধুকে ধরার জন্য বর্ধমান থেকে পল্টন পাঠান। দীর্ঘদিন যাবৎ চলা এই মামলার বিবরন ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। লোকমুখে রটে যায় প্রতাপচাঁদের ছোটবেলার নানা কথা এবং রাজবাড়ীর অন্দরের বহু কাহিনী হুবহু বলে দিচ্ছেন ঐ সাধু। ক্রমশ বহু প্রজা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে উনিই রাজা প্রতাপচাঁদ। যদিও শেষরক্ষা হয়নি, আদালতে নানা সাক্ষ্যপ্রমাণে জানা যায় ঐ সাধু তথা জাল প্রতাপচাঁদের আসল নাম কৃষ্ণলাল ব্রহ্মচারী। তিনি কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা এবং তাঁর সঙ্গীর নাম নরহরি চন্দ্র। আদালতে সাজাপ্রাপ্ত হন তিনি, যদিও পরবর্তীকালে তাঁর সম্পর্কে ইতিহাসে কোন উল্লেখ নেই।
রাজা প্রতাপচাঁদের স্মরণে ১৮৪৯ সালে কালনা রাজবাড়ীর প্রাঙ্গণে তাঁর স্ত্রী শিবভক্ত পেয়ারীকুমারী দেবী নির্মাণ করেন প্রতাপেশ্বর শিবমন্দির। গবেষকরা এই মন্দিরটিকে ভারতবর্ষের অন্যতম সেরা টেরাকোটা শিল্পের নিদর্শন রুপে আখ্যা দেন। পঁচিশ ফুট উচ্চতার এই দেউলটির চার দিকে চারটি দরজা, যার মধ্যে তিনটি কৃত্রিম। পূর্বদিকের দরজাই এর প্রবেশদ্বার। গর্ভগৃহে যে শিবলিঙ্গটি আছে তা প্রায় সাড়ে চার ফুট উচ্চতার। মন্দিরে প্রবেশদ্বারের মাথায় রাম-সীতার অভিষেকের টেরাকোটা চিত্র, খিলানে শিবদুর্গা। কৃত্রিম দরজাগুলোর মাথায় ও চারপাশে টেরাকোটার রামায়নের যুদ্ধকাহিনী থেকে শ্রীকৃষ্ণ, ষড়ভুজা কালী, মনসা, অশ্বারোহী সেনা থেকে সাধক নানা চিত্র। যা দেখলে মনে হবেই প্রতাপচাঁদের ছোটবেলা থেকে যুবা বয়সের বিতর্ক সবেরই যেন ছাপ পাওয়া যাচ্ছে মন্দিরগাত্রে। ——————————————————
নীচের ছবিটি প্রতাপেশ্বর মন্দিরের যেটি কালনা রাজবাড়ী চত্বরে স্থিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top