বাংলার লোকসংস্কৃতি — উন্মেষ পর্ব

বাংলার লোকসংস্কৃতি: উন্মেষ পর্ব
_______________________________
সৌম্য ঘোষ
“”””””””””””””””””””””””””””””

বাংলা বা বঙ্গ নামে যে ভূ-খণ্ড বাঙালির আবাস-ভূমি হিসেবে চিহ্নিত, তার উদ্ভবের পূর্বে প্রাচীন সময়ে এই অঞ্চল অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপদে বিভক্ত ছিল। পুণ্ড্র, বঙ্গ, সমতট, হরিকেল, বরেন্দ্র, তাম্রলিপ্ত, দণ্ডভুক্তি ইত্যাদি নানা নামে এইসব অঞ্চল পরিচিত ছিল। এ-সবই কৌম-নাম, এখানে বাস ছিল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর। পরবর্তী সময়ে এই জনপদগুলো ক্রমশঃ একত্রিত হয়ে তিনটি প্রধান অঞ্চলে বিভক্ত হয়— পুণ্ড্র বা পুণ্ড্রবর্ধন, গৌড় ও বঙ্গ। রাজা শশাঙ্কের আমলে বঙ্গদেশের এক ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে রাষ্ট্রীয় ঐক্যের পূর্ণ স্বরূপ লাভ করতে আরও বেশ কয়েক শতাব্দী সময় লেগেছিল।

‘বঙ্গ’ নামের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণে’। ‘বোধায়ন ধর্মসূত্রে’ও বঙ্গের উল্লেখ মেলে। তবে এসব উল্লেখে জাতি-বিদ্বেষ ও দেশ-ঘৃণাই প্রকাশ পেয়েছে। পতঞ্জলিকৃত পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’র ভাষ্যে ‘বঙ্গে’র পাশাপাশি ‘সুহ্ম’ ও ‘পুণ্ড্রে’র উল্লেখও আছে। ‘চর্যাপদে’ও ‘বাঙালি’, ‘বঙ্গাল’-এর পরিচয় পাওয়া যায়। পুরাণ-রামায়ণ-মহাভারতেও ‘বঙ্গ’ নামটি উচ্চারিত। ইবনে বতুতার সফরনামায় পাওয়া যায় ‘বঙ্গালা’। মুঘল আমলে বঙ্গাঞ্চল ‘সুবাহ বাঙ্গালাহ্‌’ নামে অভিহিত হত। এই নাম পর্তুগিজদের কাছে রূপান্তরিত হয়ে হয় ‘বেঙ্গলা’। এরই সাদৃশ্যে ইংরেজরা নাম দেয় ‘বেঙ্গল’ [Ref.‘বাংলা, বাঙালি ও বাঙালিত্ব’, আহমদ শরীফ]।

 নর্ডিকগোষ্ঠীর উত্তরাধিকার খুবই নগণ্য। তুর্কি-মুঘল-পাঠান-ইরানি-আরব এইসব বহিরাগত মুসলমানদের রক্তও মিশেছে বাঙালি জাতির দেহে, কিন্তু তা বাঙালির ‘দেহ গঠন বৈশিষ্ট্যে’ তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেনি। মূলতঃ আদি-অস্ট্রেলীয় নরগোষ্ঠীর দেহ-কাঠামোয় অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর রক্ত মিশে বাঙালির দেহাবয়বে একটি মিশ্ররূপ এনে দিয়েছে। প্রকৃতি ও আকৃতিতে আজকের বাঙালি ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মিশ্র প্রতিনিধিত্ব করছে।

বাংলার আদিম সমাজ ছিল বৃত্তিনির্ভর জাতিগোষ্ঠীর কৌমসমাজ। বর্ণপ্রথার অভিশাপ থেকে সে সমাজ ছিল মুক্ত। খ্রিস্টপূর্ব যুগেই বঙ্গ-অঞ্চল ব্রাহ্মণ্যধর্মের সংস্পর্শে আসে। গুপ্ত যুগে বৃহত্তর ভারত থেকে আগত ব্রাহ্মণ-বসতি গড়ে ওঠে বাংলায়। অব্রাহ্মণ জাতিসমূহও বিশেষ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই সময় পর্যন্ত অব্রাহ্মণ সমাজে জাতিভেদ প্রথার অস্তিত্ব ছিল না। চর্যাপদে নিম্নবর্গের মানুষের পরিচয় ও সামাজিক অবস্থান জানা যায়। শবর, ডোম, চণ্ডাল ও কাপালিক— এরা ছিল অবজ্ঞাত, অস্পৃশ্য, নগর-জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। সেন আমলে রাজশক্তির পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে ব্রাহ্মণ্যধর্ম বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে। এই সময়েই প্রবর্তিত হয় কৌলিন্য-প্রথা।

প্রাচীন বাংলায় যে বর্ণ-বিন্যাস গড়ে উঠেছিল তাতে সর্বোচ্চ স্থান ছিল ব্রাহ্মণগোষ্ঠীর। শাসক ও সামন্ত শ্রেণির সঙ্গে এদের ছিল গভীর সম্পর্ক। এর পরেই ছিল করণ-কায়স্থের স্থান। বিত্ত ও বিদ্যার কল্যাণে সমাজে এরাও প্রতিপত্তিশালী হয়ে উঠেছিল। অম্বষ্ঠ বৈদ্যদের অবস্থানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরে ছিল যারা তারা প্রায় সকলেই অন্ত্যজ শ্রেণিভুক্ত শ্রমজীবী মানুষ। তবে বর্ণপ্রথার রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয় ও সামাজিক স্বীকৃতির পর ব্রাহ্মণ ব্যতীত অন্য সব বর্ণের মানুষই শূদ্র হিসেবে গণ্য হত। সমাজবিন্যাসের এই ধারা অনুসরণ করলে সহজেই বোঝা যায় কীভাবে সামাজিক অনৈক্য ও বিভেদ স্থায়ী রূপ পেয়েছিল।

প্রকৃতপক্ষে তুর্কি বিজয়ের ফলেই মধ্যযুগের বাংলায় অতি-দ্রুত মুসলিম সমাজ-বিস্তারের সুযোগ ঘটে। মূলতঃ সুফি-দরবেশদের মাধ্যমেই এদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচারিত হয়। বাংলায় বহিরাগত মুসলমানের সংখ্যা নিতান্ত নগণ্য। নির্যাতিত-অবজ্ঞাত-অধিকার বঞ্চিত নিম্নবর্ণের মানুষই ইসলামের সাম্য-মৈত্রীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ ও সুফি দরবেশদের চরিত্র-মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে এবং ঐহিক স্বার্থের কারণে ধর্মান্তরিত হলেও পূর্বপুরুষের ধর্ম-আচার-সংস্কার কখনও সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেনি। হিন্দু সমাজের বর্ণভেদের আদলে মুসলিম সমাজেও গড়ে ওঠে চারটি বর্ণস্তর: আশরাফ, আতরাফ, আজলাফ, আরজাল। উচ্চবর্ণের অভিজাত মুসলমানের সঙ্গে পল্লীবাসী সাধারণ মুসলমানের কোনও বৈবাহিক সম্পর্ক বা সামাজিক লেনদেন ছিল না। এই ব্যবধান ছিল দূরতিক্রম্য। তাই আশরাফ-স্বধর্মীর সঙ্গে নয়— একই সমতলের প্রতিবেশী বিধর্মী হিন্দুর সঙ্গেই তার মানসিক ঐক্য, সামাজিক মেলবন্ধন ও আত্মিক সম্পর্ক রচিত হয়েছে। অভিন্ন আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, জীবন-বিকাশের অভিন্ন শর্ত, অস্তিত্বরক্ষার সম-স্বার্থ উভয় সম্প্রদায়কে একই সূত্রে বেঁধেছিল। তাই বৃহত্তর বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতি হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সাধনারই ফসল।

( তিন পর্বে চলবে…)
 “”””””””””””””””””””””””””'””””””””””””””””’
সৌম্য ঘোষ। চুঁচুড়া।
*** শেষ পর্বে গ্ৰন্থ-ঋণ।
———————————————

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top