বাংলার লোকসংস্কৃতি — মধ্য পর্ব

Story and Article:

বাংলার লোকসংস্কৃতি– মধ্য পর্ব
“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
সৌম্য ঘোষ
“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
মানুষের জীবন-চর্চা ও চর্যার সমন্বিত রূপই সংস্কৃতি। স্যার ই বি টাইলর সংস্কৃতি প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, “জ্ঞান-বিজ্ঞান, আচার-বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতিবোধ, আইন-কানুন এবং অনুশীলন ও অভ্যাস এবং অন্যান্য সব সম্ভাবনা যা মানুষ সমাজের সদস্য হিসেবে আহরণ করে তাই সংস্কৃতি” [Ref.‘সংস্কৃতি ও সংস্কৃতিতত্ত্ব’, পৃ. ১৩]। এই সংজ্ঞা অনুসরণ করলে সহজেই বোঝা যাবে সংস্কৃতির পরিধি কত ব্যাপক।

বাংলার সংস্কৃতিকে নগর-সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি ও আদিম সংস্কৃতি— এই তিন শ্রেণিতে বিন্যাস করা চলে [Ref.’বাংলার লোকসংস্কৃতি’, পৃ. ১৪]। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক জীবনযাপনের সুবিধাভোগী শিক্ষিত নগরবাসীর সংস্কৃতিই নগর-সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি মার্জিত-শোভন ও দ্রুত পরিবর্তনশীল, ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা কিংবা স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণায় এর জন্ম নয়। আদিম সংস্কৃতি বাংলার সুদূর অতীতের কৌম সমাজের স্মৃতিনির্ভর আদিবাসীদের সংস্কৃতি। বাংলার লোকসংস্কৃতির সঙ্গে এই আদিম সংস্কৃতির আছে প্রচ্ছন্ন আত্মীয়তা।

প্রকৃতপক্ষে লোকসংস্কৃতিই বঙ্গসংস্কৃতির প্রধান ধারা, এর মর্মমূলেই আবহমান বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় প্রোথিত। যথার্থ পরিকল্পিত আধুনিক নগরায়ণ এখনও এদেশে হয়নি। গ্রামীণ সমাজ ও সভ্যতার স্মৃতি ও ছাপ এখনও এই অপরিণত নগরগুলো বহন করছে। জীবন-জীবিকা, আচার-প্রথা ও প্রকৃতিই সংস্কৃতির নিয়ামক। মূলত: কৃষি-জীবন ও নদনদী বাংলার সংস্কৃতিকে নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ করেছে। স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামই ছিল বাংলার প্রাণকেন্দ্র এবং সংস্কৃতির উৎস, লালন ও বিকাশ-ক্ষেত্র। এই গ্রামকেন্দ্রিক সংস্কৃতির মধ্যেই বাংলা ও বাঙালির আত্মপরিচয় প্রচ্ছন্ন আছে। এই প্রসঙ্গে একটি উক্তি স্মরণ করা যেতে পারে:

“বস্তুত বাঙালির ইতিহাস লোকধর্মের লোকায়ত দর্শনের, লোকসাহিত্যের, লোকশিল্পের, লোকসঙ্গীতের ও লোকবিশ্বাস-সংস্কারের ইতিকথারই অন্য নাম। [Ref.’বাংলা, বাঙালি ও বাঙালিত্ব’, পৃ. ৯]

গোপাল হালদার হাজার বছরের প্রবহমান বঙ্গসংস্কৃতিকে ‘পল্লীপ্রধান বাঙালি সংস্কৃতি’ বলে অভিহিত করেছেন [Ref.‘সংস্কৃতির রূপান্তর’, পৃ. ২১৭]। আফসোস করে তিনি এই প্রসঙ্গে বলেছেন, “অত্যন্ত পরিচিত বলিয়াই আমরা তাহার সহজ ও অনাড়ম্বর উপকরণ ও উপাদানকে আমাদের সংস্কৃতির প্রধান অবলম্বন বলিয়া ভাবিতে কুণ্ঠিত হই” [ঐ, পৃ. ২১৭]।

বাংলার লোকসংস্কৃতির জগত বিচিত্র ও ব্যাপক। লোকসমাজের জীবনাচরণ ও ভূয়োদর্শনের প্রতিফলন আছে লোকবিশ্বাস, লোকসংস্কার আর লোকাচারে। পালা-পার্বণ-বিবাহ-ক্রীড়া-মেলা-নবান্নে মূর্ত হয়ে ওঠে উৎসব-আনন্দের রূপ। প্রাত্যহিক জীবনযাপনের অনুষঙ্গে আসে পোশাক-পরিচ্ছদ-প্রসাধন-খাদ্যের কথা। শিল্পকলার মোহন ভুবনে রচিত হয়েছে প্রয়োজনে ও সৌন্দর্যের অনন্ত সখ্য। লোকসাহিত্যে জীবনের উপলব্ধি ও আনন্দ-বেদনার আলেখ্য চিত্রিত। এইসব উজ্জ্বল প্রাণময় উপাদানেই রচিত হয়েছে লোকসংস্কৃতির সাতনরী।

বাংলার লোকসংস্কৃতি বঙ্গজনপদবাসীর যৌথ জীবনচর্চার এক আন্তরিক ভাষ্য। সমন্বয়, সহাবস্থান ও সৌহার্দ্যের এক অপূর্ব নিদর্শন বাংলার এই লোকসংস্কৃতি। ইতিহাস-পূর্বকালের বঙ্গ-জনপদের আদিম অধিবাসীদের বিশ্বাস-সংস্কার ও লোকাচারকে কেন্দ্র করেই এই লোকসংস্কৃতির জন্ম। নানা জনগোষ্ঠীর রক্তের মিশ্রণে যেমন বাঙালি জাতি গড়ে উঠেছে, তেমনই তার সংস্কৃতি সম্পর্কেও এ-কথা সত্য। সুদূর অতীতের স্মৃতিচিহ্নবাহী বাংলার লোকসংস্কৃতি তাই ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যে’র ধারণাটি সার্থক করে তুলেছে।

বাংলার লোকসংস্কৃতির উপাদান বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় আনন্দ-রূপের সন্ধান, প্রবল জীবনাগ্রহ, প্রতিবাদী চেতনা, ধর্ম-নির্বিশেষ মানুষের কথা, মানবিকতা ও ইহজাগতিকতার পরিচয়। লোকায়ত বাংলার উদার মানবিক জমিনের অধিবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠী চিরকালই ভাববিদ্রোহী, মিলনপ্রয়াসী, সমন্বয়পন্থী। ‘বিবাদে-বিরোধে-বর্বরতা’— এ-কথা লৌকিক সমাজের মানুষ তাদের জীবনাচরণে সত্য করে তুলেছে। আমরা বাংলার লোকসংস্কৃতির সাধারণ রূপের প্রেক্ষাপটে তার সমাজ-সংলগ্ন ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত হতে চাই, যার সূত্রে আধুনিককালে লোকসংস্কৃতির প্রাসঙ্গিকতা ও তার প্রগতিশীল উপকরণ আবিষ্কৃত হয়ে বর্তমান প্রজন্মকে প্রাণিত ও শ্রদ্ধাশীল করে তুলতে পারে।

( আগামী পর্বে সমাপ্ত )
 “””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””'”””””””””””
লিখেছেন…. সৌম্য ঘোষ। চুঁচুড়া।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top