বাংলার লোকসংস্কৃতি — শেষ পর্ব।

STORY AND ARTICLE:
dated..

বাংলার লোকসংস্কৃতি — শেষ পর্ব
=========================
সৌম্য ঘোষ
————————————————

বাংলার লোকসংস্কৃতিতে সম্প্রীতি ও সমন্বয়ের যে রূপ প্রতিফলিত তার আভাস আগেই দিয়েছি। এই লোকসংস্কৃতির মূলধারাটি প্রবল জীবনাগ্রহ ও মানবিক চেতনাবোধের ভেতর দিয়ে ইহজাগতিকতায় সমর্পিত। সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় জীবনের সঙ্কট-সমস্যাতেও লোকসংস্কৃতির জনক-ধারকেরা সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। ছড়া-গীতি-গীতিকায় আছে সংগ্রামী ও প্রতিবাদী চেতনার স্বাক্ষর। প্রকৃতপক্ষে জীবনঘনিষ্ঠতা ও সমাজ-সংলগ্নতা বাংলার লোকসংস্কৃতিতে একটি জীবনবাদী ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছে।

এই লোকসংস্কৃতি চর্চার ভেতর দিয়েই একদিন বাঙালির আত্মানুসন্ধান ও স্বরূপ-অন্বেষার সূচনা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তার ঋত্বিক। গুরুসদয় দত্ত এই লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান নিয়েই গড়ে তুলেছিলেন তাঁর ব্রতচারী আন্দোলন। বাঙালির জাতিসত্তার স্বরূপ উদঘাটনের জন্য লোকসংস্কৃতিই ছিল অন্যতম অবলম্বন। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশি যুগের গানের কথা উল্লেখ করতে হয়। সারিগান-ভাটিয়ালি-কীর্তন কিংবা বাউলের সুর বসিয়ে রচনা করা তাঁর সেইসব স্বদেশি গান, কী অবিস্মরনীয় উদ্দীপনা জাগিয়েছিল বাঙালির মনে তা আজ ইতিহাসের অন্তর্গত। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’— যে গানটি আজ বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত, সেই গানের কথা ও সুরের জন্যেও রবীন্দ্রনাথকে শিলাইদহের গগন হরকরার বাউল গানের কাছে যেতে হয়েছিল। চারণকবি মুকুন্দ দাসের স্বদেশি যাত্রা ও গান বাঙালিকে মুক্তি-পাগল করেছিল। আমাদের দেশের সংগ্রাম-আন্দোলনেও লৌকিক সমাজের কবি ও গায়কদের বিশেষ ভূমিকা আছে। ভাষা আন্দোলনের গান বেঁধে এক বাউল কবি, মহিন শাহ, পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত হন।

লোকসংস্কৃতি বাঙালি জীবনের এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণা। তবুও কোনও কোনও নগর-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক সভ্যতাগর্বী শিক্ষাভিমানী পণ্ডিত অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য আর উন্নাসিকতায় লোকসংস্কৃতিকে খারিজ করতে চান। প্রসঙ্গত এখানে প্রখ্যাত লোকবিজ্ঞানী আশুতোষ ভট্টাচার্যের একটি উক্তি উদ্ধৃত করতে চাই:

“বাংলার সংস্কৃতি বাংলার পল্লীতেই জন্ম ও পরিপুষ্টি লাভ করিয়াছে। সেইজন্য আজ যে নাগরিক সংস্কৃতি এ দেশের উপর স্পর্ধিত শির উন্নত করিয়া দাঁড়াইতে চাইতেছে, তাহা কিছুতেই জাতির মর্মমূলে নিজের শিকড় প্রবেশ করাইতে পারিতেছে না। উপরের দিকে হইতে ইহাকে যতই শক্তিশালী বলিয়া মনে হইতেছে; ভিতরের দিক হইতে তাহা ততই শক্তিহীন হইয়া পড়িতেছে। অতএব কল্যাণের পথে সমাজকে যাঁহারা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিতে চাহেন, ধ্বংসোন্মুখ পল্লীজীবনের মধ্যেই এখনও তাঁহাদিগকে বাঙালি সংস্কৃতির মৌলিক উপাদানের সন্ধান করিতে হইবে।” [Ref. ‘বাংলার লোকগীতি’, আশুতোষ ভট্টাচার্য]।

জাতির ক্রান্তিলগ্নে কিংবা জাগৃতি-মুহূর্তে তার ঐতিহ্যলগ্ন আত্মপরিচয় সম্পর্কে কৌতূহল ও সন্ধিৎসা জাগে, যেমন জেগেছিল বাংলাদেশের ভাষা-আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের কালে। গ্রাম এবং তার সংস্কৃতিই আমাদের যথার্থ পরিচয়ের ঠিকুজি। বিশাল বাংলার যে গ্রামকে নিয়ে আমাদের সংস্কৃতি, সভ্যতা, আমাদের স্মৃতি-স্বপ্ন, গৌরব, ঐতিহ্য, আমাদের ইতিহাস— তাকে আবিষ্কারের মাধ্যমেই আমাদের জাতিসত্তার স্বরূপ উন্মোচিত হবে। সেই হবে বিস্মৃত-বিভ্রান্ত বাঙালির সত্যিকারের ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’। প্রসঙ্গক্রমে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের আন্তরিক, গাঢ়, শিকড়-সন্ধানী এক উচ্চারণ দিয়ে বক্তব্য শেষ করি:

“…গ্রামের পর গ্রামে নিজেদের আবিষ্কার করেছি, নিজেদের বিদ্রোহের ঐতিহ্য, বিদ্রোহের সংস্কৃতি, যাতে পুনর্বার না হারি। এ বেঁচে থাকার লড়াইতে জিততেই হবে। এখান থেকে তৈরি হবে সভ্যতার বোধ, যে বোধের ভিত্তিতে আছে সমতা, কেন্দ্রে আছে সহমর্মিতা, মূল এবং চতুর্দিকে আছে মানুষ। তাহলেই আমরা সকল আবেগ দিয়ে ভালোবাসব এবং ঘৃণা করব; সকল বৈপরীত্যে সততার সঙ্গে জীবনযাপন করব, সঙ্কল্পে দৃঢ় হয়ে সমাজে পরিবর্তন তৈরি করব উন্মাদক বন্যতা, বর্বরতা, দাসত্ব এবং নির্যাতন শেষ।” [Ref ‘বাংলাদেশের গ্রাম’, পৃ. ৭৮-৭৯]।

 “””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””

ঋণ স্বীকার :—-

(১) অতুল সুর: ‘বাংলার সামাজিক ইতিহাস’। কলকাতা, কার্তিক ১৩৮৩।
(২)আশুতোষ ভট্টাচার্য: ‘বাংলার লোকশ্রুতি’। কলকাতা, দ্বি-স, শ্রাবণ ১৩৯২।
(৩)ওয়াকিল আহমদ: ‘বাংলার লোকসংস্কৃতি’। ঢাকা, আশ্বিন ১৩৮১।
(৪)গোপাল হালদার: ‘সংস্কৃতির রূপান্তর’। ১ম বাংলাদেশ সংস্করণ, ঢাকা, এপ্রিল ১৯৭৪।
(৫)নীহাররঞ্জন রায়: ‘বাঙালির ইতিহাস – আদিপর্ব’। কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ, অগ্রহায়ণ ১৩৮২।
(৬)বিনয় ঘোষ: ‘বাংলার লোকসংস্কৃতির সমাজতত্ত্ব’। কলকাতা, আশ্বিন ১৩৮৬।
=========================

লেখক — অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ।
চুঁচুড়া।

______________________________

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top