বাংলার লোকসংস্কৃতি — ৩য় পর্ব

Story and Article: 02-06-21.

বাংলার লোকসংস্কৃতি–৩য় পর্ব
=======================
সৌম্য ঘোষ
=======================

লোকসংস্কার ও লোকবিশ্বাসের সঙ্গে সুদূর অতীতের টোটেম, ট্যাবু ও জাদু-বিদ্যার সম্পর্ক অতি নিবিড়। সঙ্কট-শঙ্কা-অমঙ্গল দূরীকরণের পন্থা-পদ্ধতির সঙ্গে লোকবিশ্বাস ও সংস্কারের গভীর যোগ। ব্রত-মানত-বশীকরণ-জাদু-মন্ত্র-ঝাড়ফুঁক-টোটকা-তাবিজ ইত্যাদির মাধ্যমে ইচ্ছাপূরণ ও মুশকিল আসানের চেষ্টা চলে। এই ক্ষেত্রে যে আচার-পদ্ধতি তা অনেকাংশেই কোনও ধর্মীয় শাস্ত্রাচার অনুসরণ করে না। লোকবিশ্বাস ও সংস্কারে ধর্মের শাসন-গণ্ডি হামেশাই অতিক্রান্ত হয়ে যায়। গার্সি বা ওলাবিবি-ভিটেকুমোরের পূজা, পীর-দরবেশের দরগায় মানত— এ-সব ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমানের ভেদাভেদ লুপ্ত। মুসলমান কৃষকের মনসা-তুষ্টির পূজা কিংবা হিন্দু মাঝির ‘বদর বদর’ বলে যাত্রা শুরু এ-সব লোকসংস্কারের অন্তর্গত, যা প্রজন্ম পরম্পরায় প্রচলিত। বৃষ্টিকামনায় যেমন কোনও পল্লীবাসী কৃষিনির্ভর হিন্দু ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দে-রে তুই’ এই গান গাইতে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না, তেমনই হিন্দু দেব-দেবীর নাম নিয়ে সাপের মন্ত্র-উচ্চারণে মুসলমান ওঝারও কোনও দ্বিধা থাকে না। আসর-বন্দনায় ভক্তি-নিবেদনে আল্লাহ-ভগবান- রসুল-দেবতা সম-পাঙক্তেয়, একই নিঃশ্বাসে উচ্চারিত।

বাংলার লোকাচারেও সম্প্রদায়-নির্বিশেষে অভিন্নতার সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। জন্ম, বিবাহ, মৃত্যু, কৃষিকর্ম এইসব নানা বিষয়ে প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত লোকাচার বাঙালির জনজীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বন্ধ্যা নারীর সন্তান-কামনা, গর্ভবতী রমণীর ‘সাধভক্ষণ’, সন্তান জন্মের পর অনিষ্ট-ভঞ্জন সর্তকতা ও বিবাহের কিছু আচার লোকসমাজে অভিন্ন। কৃষি-সম্পর্কিত লোকাচারেও গভীর সাদৃশ্য আছে। বৃষ্টি-কামনা, বীজ-বপন, ফসল-রক্ষা, ফসল-তোলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে লোকাচার পালিত হয় তাতে কৃষিজীবী সমাজের ঐক্য-একাত্মতার আন্তরিক চিত্র ফুটে ওঠে।

বাংলার লোকজীবনে আবাস-আসবাব-খাদ্য-পরিধেয়-প্রসাধন-অলঙ্কার-তৈজসপত্রও মূলত এক। খড় বা ছনের দোচালা ঘর, পাটকাঠি বা কঞ্চির বেড়া, একপাশে গোয়ালঘর, এক চিলতে উঠোন, চারপাশে গাছ-গাছালি— গ্রামীণ মানুষের বাস্তুগৃহের এই হল সাধারণ ছবি। মাদুর-কাঁথা, বাঁশের মাচা কিংবা মাটির মেঝে— শয়নের উপকরণ। তৈজসপত্রের মধ্যে মাটির হাঁড়ি-পাতিল-সানকি-কুঁজো, কাঁসার থালা-বাটি-ঘটি-ঘড়া। কেবল স্ব স্ব সম্প্রদায়ের শাস্ত্রনিষিদ্ধ আহার-সামগ্রী বাদে বাঙালিসমাজের খাদ্যাভ্যাসও প্রায় অভিন্ন। লোকায়ত বাঙালির পোশাক-পরিচ্ছদও ছিল এক— ধুতি, লুঙ্গি, চাদর, গামছা, ফতুয়া ইত্যাদি। আর মোটা সুতোর তাঁতের শাড়ি গ্রাম্য রমণীর সর্বজনীন আটপৌরে পোশাক। কোনও কোনও অঞ্চলে হিন্দু সধবার মতো বিবাহিত মুসলিম রমণীর শাঁখা-সিঁদুর ব্যবহারের কথাও জানা যায়।

প্রমোদ-বিনোদন-ক্রীড়ার ক্ষেত্রেও সম্মিলিত অংশগ্রহণের বাতাবরণ ও অবাধ সুযোগ ছিল। নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা, দাড়িয়াবান্ধা কিংবা হা-ডুডু এইসব লৌকিক ক্রীড়ার রূপ ছিল সর্বজনীন। মেলা কিংবা নবান্নের উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। বাংলার প্রায় সব লৌকিক মেলাই ধর্মাশ্রিত, তা সাধু-গুরুর জন্ম-মৃত্যু, পূজা-পার্বণ কিংবা ঈদ-মোহররমকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। উপলক্ষ ধর্মীয় উৎসব হলেও মেলার মেজাজ-চেহারা কিন্তু পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ, আর্থ-সাংস্কৃতিক চেতনায় তা লালিত।

স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম-সমবায়ের আনুকূল্যে বাংলায় এক সমৃদ্ধ লোক-শিল্পকলার ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল। মূলত জীবনের প্রাত্যহিক প্রয়োজন ও চাহিদাই ছিল এই শিল্পকলার প্রেরণা এবং তা সিদ্ধ করেই এর মধ্যে শিল্পবোধ আর সৌন্দর্যচেতনার স্বাক্ষর প্রতিফলিত হয়েছে। নকশা-আলপনা, লোকচিত্র-মৃৎ-ধাতু-বেত-কাঠ-সূচি-বয়ন বা বাস্তুশিল্প-লোকশিল্পকলার এই যে বিশাল জগৎ এতে বাংলার লোকশিল্পীদের মেধা, নৈপুণ্য, উদ্ভাবনা ও শিল্পবোধের পরিচয় বিধৃত। লোকবিজ্ঞানী এই লোকশিল্পের মধ্যে যে সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ অভিন্ন শিল্পচেতনা খুঁজে পান তা তাৎপর্যপূর্ণ: “এই শিল্পকলার মধ্যে কোনও সাম্প্রদায়িকতা নেই। হিন্দু বাঙালি তার লক্ষ্মীর পা, ঝাঁপি কিংবা সরায় যে বক্তব্য রাখেন, বাঙালি মুসলমান জায়নামাজ ও মহরমের বিচিত্র মটিফসম্পন্ন পিঠেতেও সেই একই বক্তব্য রাখেন। উদ্দেশ্যও একই। ধর্মের মধ্যে যা মহৎ তাকে উৎসাহিত করা” [Ref.‘বাংলাদেশের লৌকিক ঐতিহ্য’, আবদুল হাফিজ, পৃ. ১৮]।

বাঙালিসমাজ এক ঐতিহ্যপূর্ণ সমৃদ্ধ লোকসাহিত্যের গর্বিত উত্তরাধিকারী। ছড়া-ধাঁধা-প্রবাদ-মন্ত্র-কিংবদন্তি-লোকশ্রুতি-লোককথা-লোককাহিনি-গীতিকা ও গীতির এক বিপুল ঐশ্বর্য ভাণ্ডার নিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলার লোকসাহিত্য। লোকসংস্কৃতির অধিকাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ এই লোকসাহিত্য। বাঙালি-মানসের, তার শিল্প-চিত্তের গভীর পরিচয় এখানে ফুটে উঠেছে। লোকসাহিত্যের অন্তর্গত শিল্প-নিদর্শনের মধ্যে লোক-সাধনাশ্রয়ী সম্প্রদায়-গীতি ব্যতিরেকে আর সবই সমাজে সমষ্টিগত সৃষ্টি, যা কালান্তরে প্রসারিত। প্রজন্ম পরম্পরায় লালিত এইসব রচনায় সমাজ-অভিজ্ঞতার স্মৃতি জড়িয়ে আছে, কখনও কখনও ইতিহাসের টুকরো ছবিও দুর্লক্ষ্য নয়। অজ্ঞাতনামা লোককবিদের রচিত গানে পলাশী-যুদ্ধের স্মৃতি, নীল-বিদ্রোহের কথা, গণ-আন্দোলনের চিত্র অম্লান হয়ে আছে। টিপু পাগলার বিদ্রোহ, তিতুমীরের সংগ্রাম, ক্ষুদিরামের আত্ম-বলিদান স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের প্রেরণায় লোককবির কাছে ধরা দেয়।

সামন্ত-সমাজের নির্মম শোষণ, শ্রেণিবিভক্ত সমাজের অবিচার, শাস্ত্রাচারশাসিত ধর্মের হৃদয়হীন প্রভুত্ব সমাজে ভাববিদ্রোহী বাউলের জন্ম দিয়েছে। শাস্ত্রদ্রোহী, জীবনজিজ্ঞাসু বাউলসম্প্রদায় সামাজিক বিভেদ, অনৈক্য ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। এই দর্শন-দারিদ্র্যের দেশে বাউলসমাজই অধ্যাত্মসাধনার মোড়কে একটি জীবনবাদী দার্শনিক তত্ত্ব উপহার দিয়েছে। বাউলগান ও সমানধর্মা মরমিসঙ্গীতে তত্ত্ব ছাপিয়ে মানববন্দনা, মর্ত্যপ্রীতি, সম্প্রদায়-সম্প্রীতি ও মানবিকতাবোধের অন্তরঙ্গ প্রকাশ লক্ষ করা যায়।

বাউলমতের শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার ফকির লালন সাঁইয়ের গানে জাতধর্মের বিভক্তি, ছুঁৎমার্গ, অস্পৃশ্যতা নিন্দিত হয়েছে। বর্ণভেদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন। ধর্মীয় জাতিত্বে অবিশ্বাসী লালন তাই জাত হাতে পেলে আগুন দিয়ে পোড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন। মানবতার আদর্শে অনুপ্রাণিত লালন সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ লুপ্ত করার পক্ষে দৃঢ় মত প্রকাশ করেছেন। ইহজাগতিকতার উচ্চারণও শুনি লালনের গানে:

“এমন মানব-জনম আর কি হবে।
মন যা করো ত্বরায় করো এই ভবে।।
অনন্তরূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই
শুনি মানবের উত্তম কিছুই নাই
দেব-দেবতাগণ করে আরাধন

জন্ম নিতে মানবে।।

কত ভাগ্যের ফলে না জানি
মন রে পেয়েছ এই মানব-তরণী
বেয়ে যাও ত্বরায় সুধারায়

যেন ভরা না ডোবে।।”

শুধু তাই নয়, লালন ফকির, লোক সমাজের এই মহত্তম আধ্যাত্মিক-সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি জমিদারের পীড়ন-অত্যাচারের বিরুদ্ধে একতারা ফেলে লাঠি নিয়ে রুখে দাঁড়াতেও পিছ-পা হননি। লালনের শিষ্য দুদ্দু শাহও ছিলেন সামাজিক অঙ্গীকারে দৃঢ়-দৃপ্ত মুক্তমনের সাধক-বাউল। সব মিলিয়ে বলা যায়, দূর অতীতের কৃষিসমাজের স্মৃতিবাহী বাউলগান বাংলার লোকসংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

 
“””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””‘”
লেখক– সৌম্য ঘোষ। চুঁচুড়া।

_______________________________

1 thought on “বাংলার লোকসংস্কৃতি — ৩য় পর্ব”

  1. সুপ্রভাত! সুন্দর সকাল।
    STORY AND ARTICLE
    STORY AND ARTICLE– সকল আধিকারিক এবং আমার প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় সকল বন্ধুদের জানাই শুভেচ্ছা!
    খুব ভালো থাকুন, Story and Article – এর সাথে।
    এটাই আমাদের যৌথ পরিবার!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top