বাংলা কাব্যে স্বাধীনতার চেতনা জাগানো প্রথম কবি – সৌম্য ঘোষ

 [post-views]

সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও বিদ্রোহের ধুনী পড়ন্ত বেলায় তখনও ধিকিধিকি করে জ্বলছিল । শিক্ষিত বাঙালি বা বাঙালি বুদ্ধিজীবী সমাজ সিপাহী বিদ্রোহকে প্রথমে সমর্থন জানায় নি।

বরং তারা শাসক ইংরেজদের তুষ্টিবিধান করে নিরাপদ শান্তিপূর্ণ স্বস্তির জীবনকে অনেক বেশি গ্রাহ্য বলে মনে করেছিল। কিন্তু পরে যখন তারা বিদেশী শাসকদের অত্যাচারের বীভৎস রূপ দেখে আঁতকে উঠলো, তখনই বাঙালি বুদ্ধিজীবী মহলে ইংরেজ বিরোধী ভাবনার মুকুল ফুঁটে উঠল । ১৮৫৮ সালে আত্মপ্রকাশ করলো কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ” পদ্মিনী উপাখ্যান” ।

এই কাব্যগ্রন্থে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি কবিতা সেই সময় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। যা আজও আমাদের স্মৃতি কোঠায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। ঊনিশ শতকের তৃতীয় ভাগে ইংরেজদের লালনে-পালনে তুষ্ট বাঙালিসমাজ তখন সবেমাত্র স্বাধীনতার প্রয়োজন নির্মম ভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে । বিদেশি শাসকদের অত্যাচারের বীভৎস রূপ তাদেরকে আতঙ্কিত করে তুলছিল ।

স্বাধীনতা আন্দোলন সবেমাত্র দানা বাধতে শুরু করেছে । রবীন্দ্রনাথ থেকে মুকুন্দ দাস, নজরুল কেউ নেই তখনও বাংলা কাব্য সাহিত্যে । সেই সময় কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় লিখলেন তাঁর অসামান্য অমর-অজর কবিতা :

” স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে,
কে বাঁচিতে চায়
দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে,
কে পরিবে পায়।
দিনেকের স্বাধীনতা স্বর্গ সুখ তায় হে , স্বর্গ সুখ তায় ।”

এই কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পর, বাংলার মানুষ তখন খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরে ছিল এই কবিতাটিকে । রঙ্গলালের আগে তখনও সাহিত্যে স্বদেশ চেতনার স্থান ছিল না । কবিতা বলতে তখন চলত আখড়াই, হাফ আখড়াই খেউর আর টপ্পার আসর । জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রীয় চেতনার উন্মেষ ঘটল এই ‘স্বাধীনতাহীনতায়’ কবিতা তথা গানে । “বন্দেমাতরম”– এর আগে পর্যন্ত ঊনিশ শতকের শেষ দিক অব্দি এই গানটি লোকের মুখে মুখে ফিরত।

বাংলা কাব্য সাহিত্যের প্রাচীন যুগের শেষ কবি বলে মনে করা হয় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তকে । আধুনিক যুগের সূচনা করলেন তাঁরই প্রিয় শিষ্য কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। “স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায় ” দিয়েই হলো তাঁর বোধন। তাঁর আগে কোন কবি বীররস ও বিশেষ করে স্বদেশ চেতনাকে কবিতার উপজীব্য করেননি। এ ব্যাপারে, রঙ্গলালই প্রথম । আর এভাবেই তিনি সূচনা করে দিলেন বাংলা কাব্য সাহিত্যের এক নতুন যুগের। শিষ্যদের উদ্দীপ্ত করে ঈশ্বর গুপ্ত রয়ে গেলেন শেষ হওয়া যুগের শেষ কবি হয়ে ।

গুপ্তকবি সম্পাদিত “সংবাদ প্রভাকর” পত্রিকাটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল একটি লেখক গোষ্ঠী । সম্পাদক ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর শিষ্যদের দিয়ে কাঙ্খিত কাজগুলি করিয়ে নিতে পেরেছিলেন ।
সম্পাদক হিসেবে এখানেই তাঁর কৃতিত্ব । রঙ্গলালের কলমে সতেজ হয়ে উঠল বাংলা কাব্যে মার্জিত সরলতা, শ্লীলতা , বীররস ও স্বদেশপ্রেমের ছোঁয়া । স্বাভাবিকভাবেই সমকালীন পাঠকসমাজের কাছে রঙ্গলাল অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন । তাঁর রচনার বৈশিষ্ট্য সুললিত ছন্দ , বীররস ও দেশপ্রেম মানুষকে স্বাদ বদলের সুযোগ দিল ।

“পদ্মিনী উপাখ্যান” কাব্যগ্রন্থ তাঁকে পাঠকদের কাছে সুপরিচিত করালো । রঙ্গলালের পরে এসেছিলেন মাইকেল । তাহলে, মাইকেলের কাব্যনায়িকা হিসেবে “প্রমীলা”র নির্বাচন কি “পদ্মিনী” র কথা ভেবেই ? আধুনিক বিদগ্ধ সমালোচকেরা সহমত জ্ঞাপন করেন যে , বাংলা কাব্যে নিম্নরুচি ও আদি-রসের কবল থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব মাইকেলের আগে রঙ্গলালই প্রথম গ্রহণ করেছিলেন।

এরপর রঙ্গলালের একের পর এক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হতে থাকে । যেমন , কর্মদেবী (১৮৬২), শূর সুন্দরী (১৮৬৮), কাঞ্চী কাবেরী ( ১৮৭৮) ইত্যাদি । এছাড়াও তিনি অনুবাদ করেন
মহাকবি কালিদাসের কুমারসম্ভব (১৮৭০), মেঘদুত ও ঋতুসংহার ((১৮৭২) । ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরাতত্ত্ব বিষয়ক বাংলা ও ইংরেজি গদ্য রচনাগুলি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

১৮৮৭ সালের ১৩ই মে কলকাতার খিদিরপুর অঞ্চলে নিজে বাসগৃহে মহাপ্রয়াণ ঘটে । বাংলা কাব্যসাহিত্যে যিনি স্বদেশ চেতনার বোধন করেছিলেন, তাঁর বসতবাড়িটি আজ প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে চলেছে।।

সৌম্য ঘোষ
সৌম্য ঘোষ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top