বাওগোল্লা

বাওগোল্লা//কৃষ্ণজন
কথাটা শুনে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল!
ফাইল দেখিয়ে বলল বুড়া ভামটা, এটার কাজ শেষ করে যাও!
চেয়েছিলাম দ্রুত কাজ সেরে বেড়িয়ে পড়তে। আপ্রাণ চেষ্টা ছিল দুপুরের পরই যেন অফিস থেকে নামা যায়। রাত ৮টা নাগাদ হয়তো বাড়ি পৌঁছতে পরবো। এখন যা দাঁড়ালো! সন্ধ্যার মধ্যেও গাড়ি ধরতে পারবো কিনা সন্দেহ? বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে অনেক রাত হয়ে যাবে। ছুটির আগে প্রতিবারই বস এধরনে ভেজাল করে। ঈদের ছুটি হলে তো কথাই নেই। লোকটার খুব বিনয়ী ভাব। ‘আহ্লাদে গদগদ’ ধরনের। কিন্তু স্বার্থে লাগলে খুব দ্রুত রং বদলে যায়। এ নীতিবান ব্যক্তিটি ঘুস একদম খায় না। খাওয়া-দাওয়ার প্রতি একট-আধটু লোভ আছে বলা যায়; তবে সেটা তার ভাষায়। আমাদের ভাষায় লোকটা একটা আস্ত খাদক! কেউ যদি পুকুরের বড় মাছ, ক্ষেতের বড় সবজি, ফল ইত্যাদি উপহার দেয় তবে আর কথা নেই, খুশিতে একদম বাকবাকুম। উপহার প্রাদনকারীদের কাজটাও মোলায়েমভাবে উদ্ধার হয়ে যায়। অফিসে আসে সাধারণত ১১টার দিকে। ফার্স্ট আওয়ারে আমাদের জ্ঞানের ক্লাস নেয়া হয়। ক্লাসটা নেয়া হয় একটু ভিন্নভাবে, প্রায় দিনই লাঞ্চের আগ পর্যন্ত মিটিং চলে। দুপুরে খেয়ে দেয়ে চেয়ারে বসে বসে একটা ঘুম দেয়। কাজ শুরু করে বিকাল ৫টার পর। অফিস আওয়ারের পর কার কাজ করতে মন চায়? সে চায় সবাই অফিসে থাকুক। দুর্ভাগ্যক্রমে যে ক’জন অফিসে থাকে, বসে বসে তাঁর মহাজ্ঞান গ্রহণ করে তাদের ধন্য হতে হয়। পিওন তোতা মিয়া তো এখন তার ঘরের কাজের লোক হয়ে গেছে। বসের বাড়িই এখন তার অফিস। লোকটা নিজেকে জমিদার মনে করে। নানানভাবে বোঝানোর চেষ্টাও করে তা। সুযোগ পেলেই রাজার প্রতি প্রজাদের বিভিন্ন আনুগত্যের উদাহরণ দেয়। কর্মচারীদের মধ্যে কেউ তার স্ত্রীকে ভাবি বললে মাইন্ড করে। সেটা নানভাবে সে বুঝিয়েও দেয়। নতুন কেউ অফিসে আসলেই আমরা তাকে জানিয়ে দেই, বসের সামনে তার স্ত্রীকে যেন খালাম্মা বলে ডাকা হয়। আগের দিনের জমিদারনীদের মা, আম্মা ইত্যাদি ডাকা হতো। এখনকার জমিদারনীদের বোধয় একটু ডিমোশন হয়েছে? মোদ্দা কথা জেলা অফিগুলিতে একজন সরকারি কর্মকতা যত ধরনের রাজত্ব করার থাকে তিনি তার একফোটও ছাড় দেন না। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, আমি পরওয়া করি না। প্রায় সব সময়ই ৫টা বাজলে অফিস থেকে কিছু না বলে বেড়িয়ে যাই। এতো ভয়ের কিছু দেখি না, সরকারি চাকরি এতো সহজে যায় না। এমনিতেই অন্য জেলায় বদলী হয়ে আছি আমার আবার ভয় কীসের? আমার কাছে এখন সব জায়গাই এক। সমস্যা হচ্ছে, ছুটির সময় আসলেই প্রতিশোধ নেয় বুড়ো ভামটা! সে জানে, দূরের পথ দ্রুত বেড় হতে চাইব তাই ইচ্ছে করেই সেদিন এমন কাজগুলি তুলে দেয় যে সন্ধ্যা পর্যন্ত আটকে রাখা যায়। গোমড়া মুখে কাজ শুরু করলাম। চার’টার পর থেকেই আকাশ মেঘলা হতে শুরু করল। একই সাথে ঝড়ো বাতাস। আকাশ অন্ধকার হয়ে আসলো। মনটা আরো অস্থির হয়ে গেল বাড়ি ফেরার জন্য! কাল আমার এঙ্গেজমেন্ট। বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে মা। পাঁচদিন পর বিয়ে। বিষয়টা হাস্যকর! কিন্তু মা বড় একরোখা। মাকে বললাম,
পাঁচদিন পরই বিয়ে, তার আবার এঙ্গেজমেন্টের কী দরকার?
দরকার আছে, আমি আমার এক মাত্র ছেলের বিয়ের সবগুলো পর্বই উপভোগ করতে চাই।
তাহলে এখন শুধু এঙ্গেজমেন্টই হোক? বিয়েটা আরো পরে কর?
না, এবারই। একসাথে দুটোই হবে। এ নিয়ে আর কথা বলতে চাই না ।
বুঝতে পারলাম মা এবিষয়ে আর কোন কথা বলবেন না। এটুকু যে বলেছেন তাই বেশি। মিথিলার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর থেকে আমার বিয়ের কোন গরজই আর নেই। হবুপাত্রীর ছবিও পাঠিয়েছিল মা। আমি দেখার প্রয়োজন বোধ করিনি। তবে মন অস্থিরতার কারণ বিয়েশাদী কিছু নয়। আসলে আমি অস্থির প্রকৃতির। কোন কিছু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে সেটা না হওয়া পর্যন্ত আর স্বস্তি পাই না।

অফিস থেকে নামলাম ঠিক সনধ্যা সাত’টায়। রাগের চোটে মাথা ব্যাথা ধরে গেল। বাইকটা দিয়ে যেতে হবে সাব্বিরের বাসায়। সে আজ অফিসে আসেনি। তার স্ত্রী ভিষণ অসুস্থ। এ আরেক উটকো ঝামেলা! বড় কোন ছুটি পেলেই সাব্বির মোটর সাইকেলটা চেয়ে বসে। লোকটা আমার ব্যাপারে সব সময় হেল্পফুল তাই নাও করতে পারি না। তাছাড়া অফিসের গ্যারেজে পড়ে থাকার চেয়ে একজনের উপকার যদি হয় ক্ষতি কী? প্রচ- বাতাস তার সঙ্গে বৃস্টি শুরু হলো। সরকারি প্রতিষ্ঠান মানেই চোরের আখড়া। বাজেট ভালো থাকার পরও সব সময় নি¤œমানের রেইনকোট কেনা হয়। যতবারই প্রবল বর্ষণের মুখে পড়ি ততবারই বুকটা ভিজে যায়। বাস স্ট্যান্ড থেকে সাব্বিরের বাসা খুব বেশি দূরে না হওয়ায় ততটা বিরক্ত হলাম না। এ সময়টুকুর মধ্যে বুক ভিজবে না আশা করা যায়। নানা কথা ভাবতে ভাবতে সাব্বিরের বাড়ির কাছে এসে পড়লাম। চিন্তায় ডুব দিলে আমি আশপাশ ভুলে যাই। অভ্যাসটা আজো বদলাতে পারলাম না! পর পর তিনটা গলি। তিনটার মুখের দিকই দেখতে এক রকম। এর আগে দুবার এসেছি। প্রথমবার সাব্বিরের সাথে দ্বিতীয়বার একা কিন্তু সেটা দিনের বেলায়। স্পষ্ট মনে আছে দ্বিতীয় গলি দিয়েই ঢুকতে হয়। তবে গলিতে ঢুকতেই তার বাসা না। সেখানে অল্প কয়টা বাসা মাত্র। রাস্তাটি গলি ছাড়িয়ে অনেকদূর গিয়েছে। কিছুদূর এগিয়েই মাটির রাস্তা। প্রায় দেড় কিলোমিটার গেলে সাব্বিরের বাসা। ঢুকে পড়লাম, দেরী আর সহ্য হচ্ছিল না। বৃষ্টির বেগ বেড়েই চলছে, বাতাসও প্রবল হয়ে উঠেছে। কোথাও বোধয় বড় ধরনের ঝড় হচ্ছে। মনে মনে ভীত হয়ে উঠলাম, এমন ঝড়-বৃষ্টিতে গাড়ি ছাড়বে তো? কিছুদূর যাওয়ার পড় একটা দৃশ্য দেখে ভাল লাগল। ঝড়ো বাতাস রাস্তার মধ্যে গোল হয়ে ঘুরছে। অনেকটা ঘুর্ণিঝড়ের মতো। মজাটা হচ্ছে, লাল একটা কাপড়ের মতো কী যেন সে বাতাসে পাক খাচ্ছে। অনেকটা ঘুড়ি ওড়ার মতো মনে হচ্ছে। কাছে গিয়ে বাইকটা স্লো করলাম। ওটা একটা শাড়ি, কারো বাড়ির ছাদ থেকে উড়ে এসেছে হয়তো। চমৎকারভাবে ঘুরে ঘুরে বাতাসের মধ্যে উড়ছে। এদিকের রাস্তা এখনো পাকা হয়নি অথচ তারখাম্বায় নতুন স্ট্রিট লাইট। বিষয়টা প্রসংশা না সমালোচনার যোগ্য ঠিক বুঝে আসল না? সে যাই হোক, স্ট্রিট লাইটের আলোতে ঝকঝক করছে ছোট ঘুর্ণিঝড়টা আর লাল শাড়িটাকে লাগছে ঘাইরাল ঘুড়ির মতো। হঠাট করেই যেন ছোটবেলায় চলে গেলাম। প্রচ- ঘুড়ি ওড়ানোর নেশা ছিল আমার। দিনরাত মাঞ্জা দেয়া আর কাটাকাটি খেলা। কখনো কখনো ঘুড়িকে এলোমেলো বাতাসে পেত। উড়তে উড়তে কখনো ডানে কখনো বায়ে চলে যেত। মনে হতো ঘুড়িট যেন ঘুড়ে ঘুড়ে উড়ছে। কদাচিৎ এমন হলে খুব মজাই পেতাম। আবার ভয়ও পেতাম। কীভাবে কার কাছে প্রথম শুনেছি মনে নেই? শুনেছি যে, এটাকে বলে বাওগোল্লা। জীন-টিনদের নাকি বিশেষ কিছু। যে ঘুড়িটা বাওগোল্লায় পড়ে সেটা ছিঁড়ে নাকি জ্বীন পরীদের দেশে চলে যায়। মজার ব্যাপার হলো, দু’এবার যে আমার ঘুড়িও সে বাওগোল্পায় পড়েনি তা নয় কিন্তু কখনো ছিঁড়ে যায়নি। মনে মনে হাসি আসলো, শিশুকালে মানুষের বিশ্বাসের মাত্রা কতোই না প্রবল থাকে! ছোট্ট ঘুর্ণিঝড়টাকে বাওগোল্লা ভেবে খুব মজা লাগলো। মনে মনে ঠিক করলাম বাওগোল্লাটা থেকে শাড়িটা উদ্ধার করতে হবে। খামোখা জিনিসটা নষ্ট করে লাভ কি? সাব্বিরকে দিয়ে দিব। যার শাড়ি তাকে পারলে ফেরত দেবে, না পারলে তার ঘরের মানুষ ব্যবহার করবে। ক্ষতি কি? বাওগোল্লাটা তীরের মতো ছেঁদ করে বেড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করল। হঠাৎ করেই পোলাপান হতে খুব ইচ্ছে করছে। পিকআপটা বাড়িয়ে বাইকটা টান দিলাম। চলন্ত অবস্থায় বা হাত দিয়ে শাড়িটা ধরে এগিয়ে গেলাম। ছোট ঘুর্ণিঝড়টুকু পেরুতেই বাচ্চাদের মতো একটা আনন্দ অনুভব করলাম! বাইকটা থামিয়ে শাড়িটা হাতের মধ্যে ভাঁজ করলাম। ভেজা কাপড় ব্যাগে রাখা যাবে না, বাইকের সামনে পেচিয়ে নিলাম। পিছনে ফিরে দেখলাম ঘুর্ণিঝড়টা মিলিয়ে যাচ্ছে, বুঝলাম এটার পাওয়ার শেষ। বাড়ি ফেরার কথাটা ক্ষণিকের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম। কথাটা মনে আসতেই আবার গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলাম। হঠাৎ করেই যেন সুক্ষ্ম একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম। নিজেকে কেন যেন আগের চেয়ে হালকা মনে হচ্ছে, বেশ হালকা! বিষয়টাকে গুরুত্ব দিলাম না। সাব্বিরের বাড়ির দিকে এগিয়ে চললাম। বাতাসের ঝাপটায় বুকটা ভিজে উঠেছে। মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল! কাক ভেজা হয়ে বাসে উঠতে মন চাইছিল না অথচ শেষ পর্যন্ত তাই হবে মনে হচ্ছে। চমকে উঠলাম! কি ব্যাপার? সাব্বিরের বাড়ি পৌঁছতে এতো সময় লাগছে কেন? ভালমতো চারপাশ লক্ষ্য করলাম। অন্য রকম লাগছে। রাস্তার দু’পাশে মাঠ, বাইকটা থামালাম। রাস্তার পাশে বিশাল একটা বট গাছ। খট্কা লাগলো খুব? তবে কি সাব্বিরের বাসা ছাড়িয়ে অনেক দূরে এসে পড়েছি? তাইতো মনে হচ্ছে। বাইকটা ঘুরালাম। খুব ধীরে ধীরে, সাব্বিরের বাসা খুঁজতে খুঁজতে বাইক চালাতে লাগলাম। যাচ্ছি তো যাচ্ছি, এবার আর পথ ফুরাচ্ছে না। ধৈর্য্যহারা হলে যা হয় আর কী। অনেকটা এগুনোর পর দেখলাম বিশাল একটা বটগাছ। ভালমতো দেখতেই চমকে উঠলাম, আরে এতো সেই বটগাছটাই! মাথাম-ু কিছুই বুঝতে পারলাম না। এইবার খুব জোড়ে বাইক টানা শুরু করলাম। কেন জানি বুকটা ধরফর করা শুরু করেছে। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর একই জায়গায় এসে পৌছলাম। ভয় পেলাম! কী হলো বিষয়টা? কোথায় এসে পড়লামরে বাবা! ঠা-া মাথায় ভাবা শুরু করলাম এমন হওয়ার কারণটা কী? দ্বিতীয় গলি দিয়ে সম্ভবত আমি ঢুকিইনি। তাড়াহুড়োয় অন্য গলি দিয়ে ঢুকে পড়েছি। সম্ভবত অনেক দূর পর্যন্ত এসে পড়েছি এবং এখানে এসে রাস্তা হারিয়েছি। তাহলে বট গাছ? বার বার একই বটগাছের তলে কেন ফিরে আসা? এখানেও আমার কোন ভুল হচ্ছে নিশ্চয়ই। হয়তো নিদির্ষ্ট একটা ডিস্টেন্স পর পর একটা করে বটগাছ লাগানো হয়েছে। সাথে সাথে এ প্রশ্নওটা জাগল, প্রতিটি বটগাছের একই সাইজ ও গড়ন হবে কেন? এটারও একটা সমাধান টানার চেষ্টা করলাম, সম্ভবত একই সময়ে এই গাছগুলি লাগানো হয়েছিল আর পরিচর্যা করে একই রকম শেইপ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া মোটরসাইকেলের আলোতে বটগাছগুলি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না তাই হয়তো সব একরকম লাগছে। সমাধানগুলি একটুও বিশ্বাসযোগ্য হলো না নিজের কাছেই। চিন্তায় পড়ে গেলাম। একটা ভয় শিরশির করে ঘাড় থেকে তলপেটে এসে পৌঁছল। সত্যি সত্যি কি তবে বাওগোল্লার মধ্যে পড়লাম? ধ্যাৎ! একি কখনো সত্যি হতে পারে নাকি? আচ্ছা, জ্বীন-পরীর পাল্লায় পড়িনিতো? ভয় লাগল! গা গুলিয়ে উঠল অজানা আতঙ্কে! আবার নিজেকে ঠা-া করার চেষ্টা করলাম। জ্বীন-ভূত কিংবা পরী কিছুই আমি বিশ্বাস করি না। এ সবই আমার মনের কল্পনা। রাস্তা হারিয়ে নির্জন জায়গায় এসে পড়ার কারণেই এসব ভুল হচ্ছে। নানা ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে। খুব ঠা-াভাবে আবার গাড়ি চালিয়ে যেতে হবে। এই বটগাছে একটা মার্ক করে রেখে যেতে হবে। মার্ক করার মতো কিছুই পাচ্ছি না, কোন ইটের টুকরাও চোখে পড়ছে না। বুদ্ধি আসলো মাথায়। বাইক থেকে শাড়িটি নিয়ে গাছের গোড়ায় একটি শিকড়ের সাথে পেচিয়ে রাখলাম। বাইকে স্টার্ট নিলাম। খুবই অস্থির হয়ে গেছি। খুব জোরে বাইক ছুটালাম। নির্দিষ্ট দূরত্বের পর বটগাছটা আবার দেখা যেতে লাগলো। আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে বটগাছের নীচে বাইক থামালাম। গাছে যে মার্ক করেছিলাম হেডলাইটটা সেখানে ঘুরালাম। কলজে কেঁপে উঠল! শাড়িটি দেখা যাচ্ছে। জীবনে এই প্রথম সত্যিকারের ভয় পেলাম! তীব্র ভয়! মাথা খারাপ হয়ে গেল! দিক্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে বাইকটা টান দিলাম। মনে হলো পিছন থেকে কারা যেন ছুটে আসছে? হঠাৎ হেডলাইটের আলোতে সামনে একটা মানুষের অবয়ব দেখা গেল। মানুষ না প্রেতাত্মা ভাবতে ভাবতে তার কাছে এসে পড়লাম। অবয়বটা আলো দেখে আমার দিকে ঘুরলো, হেডলাইটের আলোতে যা দেখলাম তাতে চক্ষু চরকগাছ! একটা মেয়ে মানুষ, গায়ে শুধু ব্লউজ আর পেটিকোট। এলোমেলো ভাবে চুলগুলি ছড়িয়ে আছে। মুখের দিকে তাকালাম, অপরূপ সুন্দর! বুঝতে আর বাকি রইল না, নির্ঘাত পরীর পাল্লায় পড়েছি। মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। বাইকটা সহই লুটিয়ে পড়লাম।

সূর্যের আলোতে চোখ খুলতে কষ্ট হলো। রাতের ঘটনা মনে হতেই লাফ দিয়ে উঠার চেষ্টা করলাম। কপালের ডানপাশে ব্যথা অনুভব হলো। হাত দিতেই দেখলাম ফুলে আছে।
কেমন বোধ করছেন এখন?
নারী কণ্ঠ শুনে চমকে উঠলাম! তাকিয়ে দেখলাম রাতের সেই পরী বা ভূতুনীটা। ভয়ে কাঁপতে লাগলাম। গলা দিয়ে কথা বেরুলো না। বুঝতে চেষ্টা করলাম বিষয়টা কী? সুর্যের আলো দেখা যাচ্ছে, ভূতপেত্মী হলে তো দিনের আলোতে থাকার কথা না। ভালোমত চারপাশে তাকালাম। রাতে যেমন দেখেছিলাম অনেকটা তেমনই। দুই পাশে বিস্তির্ণ লাল মাঠ মাঝখান দিয়ে মাটির রাস্তা। আবারও মাথা এলোমেলো হলো। এ পরিবেশ তো একদমই চেনা লাগছে না? ছটফট শুরু করলাম। মেয়েটির উপস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে ভুলে গেলাম। মেয়েটি আবার কথা বলে উঠল,
আমরা এখানে কেন বলতে পারেন কি?
আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন?
মেয়েটির কথায় ঘোর কাটল। দুটো প্রশ্নের একটিও আমার দেয়া সম্ভব হলো না। ভালো করে তাকালাম মেয়েটির দিকে। পেত্মী বা পরীর মতো কিছু মনে হলো না। রাতে গায়ে শাড়ি দেখিনি এখন দেখা যাচ্ছে। বুঝতে পারলাম শিকড় থেকে খুলে নিয়ে শাড়িটি পরেছে। রাগ হলো, আমার শাড়ি আমাকে না জিজ্ঞেস করে পরবে কেন? কিন্তু লাল শাড়িতে মেয়েটিকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে যে কিছু আর মুখ দিয়ে বের হলো না। তবে এতো সুন্দরের মাঝেও মেয়েটির চোখ-মুখে তীব্র ভয় ও বিদ্ধস্তভাব স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন করলাম।
আপনাকে কি আমার চেনার কথা? এটা কোন জায়গা আমি নিজেই তো কিছু বুঝতে পারছি না!
মেয়েটির মুখ দেখে মনে হলো হতাশ হয়েছে! খুব প্রতাশা নিয়ে তাকিয়েছিল। আচ্ছা হতাশ বেশি হলো কোনটাতে? আমি চিনি না বলে না জায়গাটা চিনিনা বলে?
মেয়েটি বলল, আমি ভেবেছিলাম আপনি আমাকে চিনতে পারবেন!
কিভাবে এখানে এসে পৌঁছলাম বুঝতেই পারছি না? জ্ঞান আসতেই প্রথম প্রচ- ভয় পেলাম! ভাবলাম, কোথায় আমি? অন্ধকারে কিছু বুঝতে পারছিলাম না। একটু খেয়াল করতেই দেখলাম গায়ের শাড়িটা নেই। শরীরে প্রচ- অবসাদ তাও উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। কোন রকম দাঁড়িয়েছি দেখি একটা আলো এগিয়ে আসছে। আলোটা কাছে আসতেই দেখি আপনি। মোটর সাইকেলটা নিয়ে পড়ে গেলেন। জ্ঞান হারালেন। ধীরে ধীরে আপনার কাছে এগিয়ে গেলাম। অন্ধকারে আপনার চেহারাটা চিনতে পারলাম না! অনেক ডাকাডাকি করলাম। কোনভাবেই আপনার জ্ঞান ফেরাতে পারলাম না। আশা ছেড়ে দিলাম! ভাবলাম, হয়তো মরেই গেছেন! হতাশ হয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। একটু এগুতেই প্রচ- ক্লান্ত অনুভব করলাম। জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লাম। চোখ খুলে দেখি, ভোরের আলো। প্রথমেই যে বিষয়টা বোধ হলো প্রবলভাবে, আমার গায়ে শাড়ি নেই। ভীষণ লজ্জা করতে লাগলো। কিন্তু জীবনের ভয় লজ্জার চেয়ে বেশি। ভাবলাম বাঁচতে হলে কিছু একটা করতে হবে। মরে আছেন ভেবে আপনার আশা বাদই দিয়েছিলাম। তাই ওদিকে আর আগালাম না। বাঁচার তাগিদে বড় রাস্তাটা ধরে হাটতে শুরু করলাম। চারপাশ খুব অপরিচিত লাগল। ভাবলাম, হাঁটতে হাঁটতে একটা না একটা লোকালয় তো পাবই। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা বটগাছ চোখে পড়ল। গাছের গোড়ায় আমার শাড়িটা দেখে অবাক লাগল! ভাবার সময় নেই, শাড়িটা ছাড়িয়ে তাড়াতাড়ি পরে নিলাম। আবার হাঁটা শুরু করলাম। দেখি আপনার কাছে চলে এসেছি। তখনও আপনি উপুর হয়ে পড়ে আছেন, পাশে বাইকটা! অদ্ভুত লাগলো! এমনতো হওয়ার কথা ছিল না? আমি তো আপনার উল্টো দিক ধরে হাঁটা দিয়েছিলাম। খটকা লাগল। আপনার পাশ কাটিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। ওমা! দেখি আবার সেই বটগাছ। বুঝতে পারলাম কোন এক গোলক ধাঁধায় এসে পড়েছি। খুব ভয় হতে লাগল! কোন মানুষজন চোখে পড়ল না। ভাবলাম, যাও একজন মানুষ পেলাম সেও মৃত পড়ে আছে! একা একা কী করবো? আমার পক্ষে আর কিছু করা সম্ভব মনে হচ্ছিল না। আপনার কথা আবার মনে আসলো। ভাবলাম, আবার একটু চেষ্টা করি। সত্যিই যদি আপনি না মরে থাকেন? এগিয়ে আসলাম আপনার দিকে। ঠেলে চিত করলাম। এবার ভালমতো মুখটা দেখতে পেলাম। চমকে উঠলাম! সাথে সাথেই প্রাণ কেঁদে উঠল। শুধু মনে হলো, যে করেই হোক আপনাকে বাঁচাতে হবে। দৌড়ে বট গাছটার কাছে গেলাম। একটা গর্তে বৃষ্টি পানি জমে ছিল। দুহাত দিয়ে অতি যতেœ পানি নিয়ে এসে আপনার মুখে ছিঁটালাম। তিন-চার বার এমন করার পর আপনি নড়ে উঠলেন। প্রাণটা যেন ফিরে পেলাম!

বুঝলাম মেয়েটি আমার জন্য ভালই কষ্ট করেছে। ধন্যবাদ দিতে চাইলাম, মুখ দিয়ে বের হলো না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। মেয়েটির কথায় একটা বিষয় পরিষ্কার হলো, আসলেই আমরা কোন রহস্যময় জায়গায় এসে পড়েছি। যে বাওগোল্লা নিয়ে হেসেছিলাম সে বাওগোল্লার মধ্যেই ফেঁসে গেছি হয়তো? এতো দুঃখের মাঝে একটা শান্তনা পেলাম, যে উদ্দেশ্যে শাড়িটা উদ্ধার করেছিলাম তা পূরণ হয়েছে। এটাকে মালিকের হাতে তুলে দেয়া গেছে। কিন্তু একটা বিষয় খুব খটকা লাগল? মেয়েটি বার বার তাকে চেনার কথা বলছে কেন?
সত্যি করে বলুনতো আপনাকে কি আমার চেনার কথা?
ঠিক জানি না, হয়তো আবার হয়তোন না!
তাই? কিন্তু আপনাকে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না?
বলছি, আগে বলুন তো আপনার নাম কি তাশফিন আহমেদ?
খুবই বিষ্মিত হলাম! রহস্যময় এই জায়গার মতো এটাও রহস্যময় মনে হলো আমার।
বললাম, হ্যাঁ
বাড়ি রংপুর, চাকরি করেন টাঙ্গাইাল?
হ্যাঁ। এতো কিছু আপনি কি করে জানেন?
মেয়েটি খিলখিলিয়ে হেসে উঠল, প্রাণ জুড়ানো হাসি মেয়েটির। এতো ভীতিকর অবস্থার মধ্যেও মেয়েটির নিশ্চিন্ত হাসি অবাক করল! মেয়েটি আবার বলল,
আপনার বিয়ে ঠিক হয়েছে না?
হ্যাঁ! সবইতো জানেন দেখছি?
আচ্ছা আর হয়রান করছি না আপনাকে। শেষবারের মতো আরেকটি প্রশ্ন, যে মেয়েটির সাথে আপনার বিয়ে ঠিক হয়েছে, তাকে কি আপনি একবারও দেখেছেন?
কথাটা বলে মেয়েটির মুখ আজানা কারণে লাল হয়ে উঠল? বললাম, না। মনে হলো, মেয়েটির সুন্দর মুখটা কেমন যেন অন্ধকার হয়ে গেল। মনটা নরম হলো। বললাম, দেখুন আপনি বা আমি উভয়ই ভীষণ বিপদের মধ্যে আছি! আসলেই কোন বিপদ কি না, আর বিপদ হলে সেটা কত বড়- এসবের কিছুই আন্দাজ করতে পারছি। এ মুহূর্তে কোন ধরনের রহস্যই আমাদের জন্য মঙ্গলজনক নয়। সত্য বিয়ষটা একটু খুলে বলুন প্লিজ। এসব কথার কাছেও গেল না সে। সে বলে যেতে লাগল,আপনাকে দেখানোর জন্য সে মেয়েটির একটা ছবি না পাঠানো হয়েছিল? আপনি কি তা দেখেননি?
মেয়েটির কথায় পুরানো বিষয়টি আবার মনে পড়লো। দিন পনের আগে কুরিয়ারে মায়ের চিঠি আসল।

প্রিয় তাশফিন
যেই মেয়েটির সহিত তোমার বিবাহ ঠিক করিয়াছি তাহার একটি ছবি প্রেরণ করা হইল, অবসর মুহূর্তে তাহা দেখিয়া লইও। মেয়েটি অতীব সুন্দরী। ভালো থাকিও, শরীরের যতœ নিও।
ইতি
তোমার মা

আমার মা অতি মাত্রায় স্বল্পভাষী। আমিও স্বল্পভাষী কিন্তু তার কাছে ফেল মেরেছি। সারাদিনে মোট দশটি কথাও বলে কি না সন্দেহ? পুরনো আমলের শিক্ষিত হওয়ার কারণেই কি না জানি না, তিনি সব সময় সাধু ভাষায় লেখালেখি করেন। মিলিথার বেইমানীর পর থেকেই বিয়ের প্রতি আমার আর কোন আগ্রহ ছিল না। অনেকদিন ধরেই মিথিলা তলে তলে বদলেছে। আমি এতো গাধা যে টেরই পাইনি। যখন টের পেলাম তখন স্বামী নিয়ে অস্ট্রেলিয়া পগারপার। ফোন করলে ঠিকমত রিসিভ করতো না। বাড়ির সবার আচরণও যেন কেমন মনে হচ্ছিল? বিষয়গুলি খট্কা লাগলেও ব্যস্ততার কারণে ভাবার সুযোগ হয়নি। ভাববোই বা কেন? দীর্ঘদিনের প্রেম, বিয়ে ঠিক। আমি শুদ্ধ চরিত্রের মানুষ, অল্প কদিন পরই বিয়ে। ভাবার কি’ই বা আছে? পাঁচ কান ঘুরে খবরটা আসতেই ছুটে গেলাম ওদের বাড়িতে। বাড়ির কেউই কোন কথা বলতে চাইলো না। মিলিথার বাবা খুব অপমান বোধ করলেন! কেন তার বাড়িতে আসলাম? বিয়ের বিষয়টা আমাকে তো জানিয়ে দেয়াই হয়েছে তবে এখন কেন এখানে এসে তাদেরকে বিব্রত করা? অবাক হলাম! এই লোকটাই আমাকে কথায় কথায় বাবা বাবা করতো। বাড়ি তৈরি সময় নিজে থেকেই তিন লাখ টাকা দিয়েছি। বলেও দিয়েছি ও টাকা ফেরত দেয়ার দরকার নেই। আজ তার আচরণ দেখে মনে হচ্ছে আমি তাদের কাছে স্্েরফ একটা উটকো ঝামেলা! শেষ পর্যন্ত কথা বলল নাবিলা, মিথিলার ছোট বোন।
তাশফিন ভাই, আপু অনেকদিন ধরে বলতে চেয়েও, বলতে পারেনি আপনি কষ্ট পাবেন বলে! প্রায় বছর খানেক হলো হাফিজ ভাইয়ের সাথে আপুর একটা ভাব হয়। তিনি বড় ভাইয়ার মামাতো শালা। হাফিজ ভাই অস্ট্রেলিয়া থাকে। দেশে এসেছিল বিয়ে করতে। সে একজন ডাক্তার। আপু তাকে বলেছিল আপনার কথা কিন্তু হাফিজ ভাই এতো জিদ্দী! এতো ছেলে মানুষ! কী আর বলব? খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে মরার মত অবস্থা! শেষে তাকে বাঁচানোর জন্য আপু তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যায়।
এসব জানতে পারলে আপনি আঘাত পাবেন! আপু তাই সিদ্ধান্ত নেয়, কিছুই আপনাকে বলবে না। আমাদের বলে যায়,তারা চলে যাওয়ার সাথে সাথেই যেন আপনাকে জানানো হয়। আপুর কথা, এসব শুনে আপনি তাকে ঘৃণা করলেই ভালো। তাহলেই আপনি তাকে ভুলে নতুনভাবে আবার জীবন শুরু করতে পারবেন। আপু সবসময়ই আপনার মঙ্গল চেয়েছে।
আপু আরো বলেছে, আপনার টাকাটা খুব শীঘ্রই শোধ করে দেওয়া হবে। এ নিয়ে আপনি যেন চিন্তা না করেন।
আমি হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছিলাম না। বিস্ময় কাটতেই বললাম, ঠিক নাবিলা। তোমার আপু সত্যিই আমার মঙ্গল চায়।
সত্যিই ধন্যবাদ তাকে, এমন একজন লোভি মেয়ের সাথে জীবন কাটাতে হবে না বলে। আমাকে আগে জানায়নি তার অস্ট্রেলিয়া যাওয়া মিস হয়ে যেতে পারে এই ভেবে। আর টাকার যে কথা বললে, এতোদিনে আমার দানটা সত্যিকারের দানে পরিণত হয়েছে। আপনজনকে কিছু দিলে ওটা প্রকৃত দান হয় না, প্রকৃত দান হয় দূরের কাউকে দিলে।
দুনিয়া উল্টে যায় আমার! ভেবেছিলাম আর বিয়েই করব না। মা আঠার মতো লেগে থাকে। তার একমাত্র ছেলে স্ত্রী-সন্তানহীন হয়ে মারা যাবে, এটা মোটেও মেনে নেয়ার মতো মানুষ সে নয়। বড় বুদ্ধিমতি তিনি। বছর দুয়েক কিছুই বললেন না, এরপর শুরু হলো বিয়ের জন্য পিড়াপিড়ি। সময়ের চেয়ে বড় মলম কিছু নেই। যতবড় ক্ষতই হোক না কেন একদিন তা শুকিয়ে যায়। মায়ের খুশির জন্য শেষ পর্যন্ত রাজি হলাম। একবছর পর্যন্ত মা নীরবে পাত্রী খুঁজে গেল। মাস খানেক আগে ফোনে বলল, তোমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, বাড়ি এসে মেয়ে দেখে যাও। বললাম, কোন দরকার নেই, তোমার পছন্দই আমার পছন্দ। মা কিছু আর বলল না। দিন পনের পর ছবি পাঠিয়ে দিল। কী কারণে জানি ছবিটা দেখার কোন আগ্রহ বোধ করিনি। মেয়েটি কথা বলে উঠল, বর্তমানে ফিরলাম।

কি হলো এমন চুপ হয়ে আছেন কেন? কিছু বলছেন না যে?
না। ছবিটা আসলে দেখা হয়ে উঠেনি। কিন্তু কেন?
না, মানে, যে মেয়েটির সাথে আপনার বিয়ে হচ্ছে তাকে আপনি দেখবেন না?
মেয়েটির চেহারায় একটা আড়ষ্টভাব দেখতে পেলাম। মেয়েটাকে এতো ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব না। তার দরকারও নেই। কিন্তু মেয়েটি চরম বিপদের মধ্যেও এই বিষয়টি নিয়ে এতো গুরুত্ব দিচ্ছে দেখে অবাক হলাম! বিষয়টা এতো ঘাটাচ্ছে কেন? বেশি বিরক্ত হলাম। মনে হলো মেয়েটা যতটাই সুন্দর ততটাই নিবোর্ধ। এই বিপদের মাঝে কী সব ছেলেমানুষী কথাবার্তা চালাচ্ছে। অনেকটা রাগ করেই মুখ দিয়ে বেড়িয়ে আসলো, আপনি যেভাবে বিষয়টা নিয়ে ঘাটাচ্ছেন তাতে মনে হচ্ছে সেই ছবিটা আপনার ছিল?
কথাটা বলেই ধাক্কা খেলাম! মেয়েটির মুখ লজ্জায় ভীষণ লাল হয়ে উঠল!। এমন লাজুক মুখ আমি আর কখনো দেখিনি। মেয়েটি মুখটা নামিয়ে নিয়েছে মাটির দিকে। এবার আমি অস্থির হয়ে উঠলাম। সন্দেহ দানা বাঁধলো মনে।
বলালম, প্লিজ এভাবে চুপ করে থাকলে তো হবে না। হ্যা-না একটা কিছু একটা বলুন।
মেয়েটি বুদ্ধিমতি, পরিবেশ সর্ম্পকে যথেষ্ঠ সচেতন মনে হলো। সাথে সাথে গম্ভীর হয়ে জবাব দিল, হ্যাঁ।
মুখে রক্ত জমলো বিষ্ময়ে! এটা কি করে সম্ভব? এও কি কখনো হয়? একটার পর একটা অবিশ্বাস্য বিষয়ে ঝাটকা খেতেই লাগলাম! বিষ্ময়ের সাথে কথা বলতে লাগলাম:
গত রাতে এখানে আসার আগে আপনি কোথায় ছিলেন?
কেন?
দরকার আছে
আমার বাড়িতে।
বাড়িতে?
বাড়িতে মানে বিকেলে মাঠে গিয়েছিলাম হাটতে। হঠাৎ করেই ঝড়ো বাতাস, বৃষ্টি শুরু হলো। কোত্থেকে একটা ঘুর্ণিঝড় মতো কী যেন এসে পড়লো সামনে। দৌঁড়ে সরে যেতে চাইলাম। কিন্তু পারলাম না। ঘুর্ণঝড়ের মধ্যে পড়তেই আর কিছু মনে নেই।
তার মানে আপনি ছিলেন রংপুর? আর আমি টাঙ্গাইল। দুজন দুজায়গায়। আপণি ঘুর্ণিঝড়ে পরেছিলেন কিন্তু আমিতো কোন ঘুর্ণিঝড়ে পড়িনি। তাহলে আমার বেলায় এমনে হলো কেন? কাল রাত বহুবার এখান থেকে বেড়িয়ে যেতে চেয়েও পারিনি। কেন? এটা কোন জায়গা? কেমন জায়গা? দুইজন দুইজায়গা থেকে একজায়গায় কেমন করেই বা আসলাম? কিছুই তো মাথায় আসছে না!
আমার নাম তিথি।
মেয়েটি নাম বলাতে লজ্জা পেলাম, এতক্ষণেও তার নামটা জিজ্ঞেস না করা, একধরনের অভদ্রতা। হঠাৎ মনে হলো গত রাতে ছোট একটা ঘুর্ণিঝড়ের মতো কী যেন দেখেছিলাম এবং এর মধ্যে দিয়ে বাইক চালিয়েছিলাম। তবে কি সেটাও এই মেয়েটির ঘুর্ণিঝড়ের মতোই কিছু ছিল? সত্যিই কি বাওগোল্লা বলতে কিছু আছ? মাথা পুরোই আওলা হয়ে গেল! মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম
আপনার নাম কি শুধুই তিথি?
সাবিকুন নাহার, ডাক নাম তিথি।
সুন্দর নাম।!
মনে মনে ভাবলাম তোমার রূপের মতোই সুন্দর! মাথাটা একটু ঠান্ড করে একমিনিট সময় নিলাম। বললাম,
শোন তিথি, খুব ভালভাবে আমাদের দুজনকেই একটা বিষয় বুঝতে হবে। যতই আজগুবি মনে হোক না কেন এটাই এখন বাস্তব, আমরা অদ্ভুত কোন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছি। জানিনা আমাদের শেষ পরিণতি কী? দু’জন দুইস্থান থেকে এক জায়গায় কেন পৌঁছলাম- যদিও এটা বিরাট রহস্য তবুও যাই ঘটুক না কেন আমাদের দুজনকে একসঙ্গেই থাকতে হবে।
তিথি বলল, আমার মনে হচ্ছে এটা কুদরতের একটা খেল, আমরা যেহেতু স্বামী-স্ত্রী তাই এক জায়গায় এনে ফেলেছে।
স্বামী-স্ত্রী? অবাক হলাম!
হ্যা তাইতো, এক সপ্তাহের মধ্যে তো তাই হয়ে যেতাম, তাই না?
তাশফিন আপনি আমাকে আসলেই চিনতে পারেননি! আমরা একই কলেজে পড়েছি। আমি ভর্তি হওয়ার পরপরই আপনি পাশ করে বেড়িয়ে যান। খুব কম সময়ই আপনাকে দেখেছিলাম। যদিও তেমন কোন রসগোল্লা না আপনি, তবুও আপনাকে কেন জানি আমার খুব ভাল লাগতো।
কিন্তু আপনি বোধয় অন্য কারো প্রেমে অন্ধ ছিলেন! যখন আপনার সাথে বিয়ের প্রস্তাব আসলো, পুরানো ভাললাগাটা আবার জেগে উঠলো।
জানতে পারলাম আপনিও বিয়েতে রাজি, ভাললাগাটা ভালোবাসায় রূপ নিল। মনে মনে আপনাকে আমি স্বামী ভাবাই শুরু করেছিলাম। বিষয়টাকে ছেলেমানুষী হিসেবে ধরে নিতে পারেন।
আপনাকে দেখার পর থেকে তাই আমার একটুও ভয় লাগছে না। কিন্তু আপনি যে পুরান প্রেমিকাকে এখনও ভুলতে পারেননি সেটা বোঝাই যাচ্ছে। সেটা ভেবে মনটাও খুব খারাপ হচ্ছে এখন!
মনটা নরম হয়ে গেল।
দেখ তিথি, বিষয়টা তা না।
মিথিলাকে আসলেও এখন আমার আর মনে পড়ে না। কিন্তু মেয়েদের প্রতি একটা অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল! বিয়েটা করতে চেয়েছিলাম শুধু দায় এড়ানো জন্য তাই পাত্রী দেখার বিষয়টা এতো গরজ করিনি।
তুমি এতো সুন্দর জানলে কী আর না দেখে পারতাম?
কখন যে তুমিতে নেমে এসেছি লক্ষ্য করিনি। ভালই লাগল। তিথি বলে উঠল, আপনি মিথ্যে বলছেন? খুশি করতে চাইছেন। কথায় অভিমানের সুর থাকলেও মুখে তার খুশি খুশি ভাবই ফুটে উঠল। বললাম, একদম মিথ্যে বলছি না, তুমি অনেক সুন্দর!
লজ্জা পেল তিথি, পর মূহুর্তেই ভীত হয়ে উঠল তার কণ্ঠে বলে উঠ
আচ্ছা এখন কি করব আমরা?
জানি না।
আমার তো খুব ক্ষিদে পেয়েছে
আমারও
বলার সাথে সথে লক্ষ করলাম ভয়াল এক দানব পেটে নাড়া দিয়ে উঠেছে! শোন তিথি আমাদের এখন যে কাজটা করতে হবে… বলতে বলতে মোবাইলটার কথা মনে আসলো। তাড়াতাড়ি করে বাইক থেকে ব্যাগটা নামিয়ে মোবাইলটা বের করলাম। যা ভেবেছিলাম তাই, কোন নেটওর্য়াক নেই। গম্ভীর হয়ে উঠলাম।
বাইকে উঠে বললাম, তিথি
হুম
পিছে বসো।
বটগাছটার নিচে আসলাম। বটগাছটা খুব ভাল করে দেখলাম। আসলেই কি বটগাছ? সাধারণ বট গাছের তুলনায় এর উচ্চতা অনেক বেশি তবে গড়ন ও পাতা বটের মতোই। এত দেখার টাইম নেই। রওয়না দিলাম আবার। দশ মিনিট পর সেখানেই আবার ফিরে আসলাম। অদ্ভুত ব্যাপার! রাস্তাটা গেছে সোজা অথচ ঘুরে কেন একজায়গায় আসতে হচ্ছে বুঝতে পারছি না? বুঝলাম রাস্তা দিয়ে গিয়ে কাজ হবে না। এবার রাস্তার পাশ দিয়ে চলতে লাগলাম। একই কাহিনী। বেপরয়া হয়ে উঠল মন। রাস্তার ডান পাশের মাঠে নামলাম। মাঠ ক্রস করে উত্তর দিকে বাইক চালালাম। বৃষ্টিতে লাল মাটি আঠা আঠা হয়ে আছ। চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিছুদূর যাওয়ার পর ঝোপ ঝাড়ের মতো দেখতে পেলাম, আম, আপেল, কলা সহ অনেক জানা-অজনা ফল-ফুলের গাছ দেখতে পেলাম। প্রচ- ক্ষুধা থাকার পরও এ মুহূর্তে সেগুলির প্রতি আগ্রহ বোধ করলাম না। একটা খালের মত দেখা গেল। খুশি হয়ে উঠলাম, সামনে হয়তো নদী পাব। এগিয়ে চললাম, প্রায় ঘণ্টা খানেক চালানো পর অদ্ভুত এক জায়গায় আসলাম। নীচে পানি এসে মিশেছে, উপরে ঘন কালো মেঘ। এতো ঘন যে আকাশ দেখাই যায় না। বুঝলাম আর এগুনো যাবে না। বাইক ঘুরালাম, তিথি কথা বলে উঠল, কি করবে এখন?
ওর মুখে তুমি শোনাতে শিহরিত হলাম! বিপদের কারণেই হয়তো বেশ দ্রুত সহজ হয়ে যাচ্ছি আমরা। বলালম,
রাস্তার ঐপাড় দিয়ে চেষ্টা করবো আবার। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল তিথি। প্রচ- খিদে পেয়েছে তারপরও গাছ থেকে কিছু পাড়তে সাহস পেলাম না। খেয়ে আবার কী না কী হয়? মূল রাস্তার কাছে চলে আসলাম। রাস্তার বা পাশের মাঠ দিয়ে এবার চলতে লাগলাম। একটু যাওয়ার পর প্রচ- একটা ধাক্কা খেলাম। ডান পাশের দৃশ্যাবলী যেমন লাগছিল বা পাশেও তেমনই লাগছে। একই রকম ঝোপ ঝাড়, একই রকম ভাবে গাছের ফলমূল ঝুলছে। একটু এগুনোর পর খালের অবয়বটি ফুটে উঠল। সব কিছু একই রকম। তাও জিদ করে এগুলাম। মাঠ শেষ হয়ে গেছে। পানি এসে মিশেছে মাটিতে, উপরে ঘন কালো মেঘ। তিথিকে বললাম,
তিথি, জানি না আমাদের ভাগ্যে কি আছে? যে দিকে যাই আমার মনে হয় এমনই পাবো। আমার মনে হয় ঐ বটগাছের নীচেই আমাদের আপাতত আশ্রয় নিতে হবে। তিথি বলল, তোমার যা খুশি তাই কর। এসব তোমার দায়িত্ব।
এবার আর ভুল করলাম না, ফেরার পথে যতটুকু পারলাম ফলমূল সাথে করে নিয়ে নিলাম। বট গাছটাকেই আশ্রয় স্থল বানালাম।

মাস খানেক হয়ে গেছে কোন মানুষের দেখা পাইনি। জায়গাটা অদ্ভুত! কিন্তু মাটি, গাছপালা আমাদের দেশের মতই। ঝোপÑঝাড়ে কিছু পরিচিত পাখি দেখতে পেয়েছি। ভালোমত পাখি চিনি না তাই এদের নামও মনে করতে পারলাম না। কাঠ বিড়ালী দেখেছি। ঝোপের থেকে ডালপালা কেটে বটগাছের নীচে একটা ছাপড়ার মতো করেছি। ব্যাচেলোর মানুষদের একটা সুবিধা থাকে, তারা প্রয়োজনের তাগিদে এমন কিছু না কিছু জিনিষ রাখে যা বিপদের সময় কোন না কোনভাবে কাজে লাগে। আমার ফল খাওয়ার খুব নেশা। রাস্তাঘাটে ফল কিনে সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেক সময় আমি ফল খাই। আমার সাথে একটা ফল কাটা নাইফ সবসময় থাকে। নাইফটা খুবই সুন্দর, হাতলের মধ্যে ভেঙ্গে ভরে রাখা যায়। এই বিপদে নাইফটা আমার খুবই কাজে লাগছে। আর কাজে লাগছে ম্যাচ লাইটটা। আমি ধুমপান করি না, ম্যাচ লাইটটা রাখি অন্যকারণে, এটার পিছনে চর্ট সিস্টেম। তাছাড়া ক্যারেন্ট গেলে মোম ধরানোর কাজেও লাগে, এজন্যই সাথে রাখা। যখন বুঝলাম এখানে থাকা ছাড়া উপায় নেই তখন প্রথম চিন্তা হলো, পানি পাবো কোথায়? পানির খোঁজে বেশি কষ্ট করতে হলো না। উত্তর দিকে কিছুদূর আগানোর পরই একটা খালের মতো দেখা গেল, তারমানে দক্ষিণেও একই হবে। বক দেখা গেল কিছু। আরো দু’চার ধরনের পাখি। অদ্ভুত এক জালে আঁটকে গেছি! যেদিকেই যাই না কেন একই বিষয়, নীচে পানি মিশেছে, উপরে ঘন কালো মেঘ। ফিরে আসি বারবার ভগ্ন মনে। প্রতিটি দিন পার করার সঙ্গে সঙ্গে তিথির প্রতি ভালোবাসা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিলাম তাকে বিয়ে করার।
বললাম,
তিথি
হুম
আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
খিলখিল করে হেসে উঠল তিথি। হাসি থামতেই চাইছে না যেন। বলল, বিয়ে করবে কাজী কই? সাক্ষী কই? এগুলি ছাড়া কি বিয়ে হয়?
বললাম, তুমি রসিকতা করছ, সিরিয়সলি ভাব, এখানে আমরা কতদিন থাকব তার ঠিক নেই। আমি তোমাকে ভালবাসি তুমিও তাই। এতোদিনে আমাদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সাক্ষী নাই কে বলেছে? এই যে বট গাছ, এই বটগ্ছাাই কাজী, এই বটগাছই সাক্ষী। তুমি রাজি কিনা তা বল?
তিথি রসিকতা করতে চাইল, আমার গাম্ভির্য দেখে আর সাহস পেল না। বলল, আমি রাজি।
পাখী শিকারে বের হলাম। বিয়ের উৎসব মাংস ছাড়া মানায়?

দেখতে দেখতে তিন বছর পার হয়ে গেছে। পরিবেশটা অনেক আপন হয়ে গেছে এখন। হঠাৎ হঠাৎ ভয় পাই না। কোন কিছু দেখে আঁৎকে উঠি না। দক্ষ শিকারী হয়ে উঠেছি। ঘরটা একটু বড় করেছি। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো তিথির কোল জুড়ে এসেছে আমার সন্তান। দু বছরে পা দিয়েছে। নাম দিয়েছি সাক্ষ্য। নামকরণের যথেষ্ঠ স্বার্থকতা আছে। আমাদের এই রহস্যময় জগতের একমাত্র জীবন্ত সাক্ষ্যই তো সে। ঘর ভরে তার দৌঁড়াদৌঁড়ি, মুখে ভাঙ্গা ভাঙ্গ মা, বাবা ডাক মন ভরিয়ে দেয়। সত্যিই খুব সুখী মনে হচ্ছে নিজেকে। আজকাল ভিষণভাবে একটি বিষয় আমাকে চিন্তিত করে তুলেছে! তিথিকে বলতে সাহস পাচ্ছি না। তাকেও চিন্তায় ফেলে লাভ নেই। কিন্তু বিষয়টা এড়াতেও পাড়ছি না। সেদিন মাছ ধরতে গিয়েই প্রথম বিষয়টা চোখে পড়েছে। বেশ বড় একটা মাছ বড়শীতে গেঁথে ফেলেছিলাম প্রায়, ঠিক তখনই ঘটল ঘটনাটা। এতো দ্রুত ঘটে গেল যে ভালমত বুঝতেও পাড়লাম না। কী যেন একটা মাছটাকে টুক করে গিলে ফেলল! যতটুকু বুঝলাম বিশাল একটা কিছু পানির নিচে দেখা গেল। ভয়ের একটা ¯্রােত শিরদাঁড়া বেয়ে বয়ে গেল। কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলাম! আজাকাল নদীতে যাওয়া একদম কমিয়ে দিয়েছি। পাখী শিকাড়ের চেষ্টা করি বেশি। তিথি বিষয়টা লক্ষ্য করল।
আজকাল মাছ ধর না কেন?
ভাল লাগে না!
কী বল? তোমার তো মাছ ধরার খুব নেশা! হঠাৎ কি হলো?
কিছু হয়নি। শোন, সাক্ষ্যর দিকে ভালভাবে খেয়াল রেখ
কেন? হঠাৎ করে আবার কী হলো?
না, তেমন কিছু না, যাহোক ও যেন নদীর দিকে না যায়!

খুব দূর থেকে একটা চিৎকারের শব্দ ভেসে আসছিল। প্রায় অস্পষ্ট। আস্তে আস্তে স্পষ্ট হতে লাগলো। যখন পুরোপরি স্পষ্ট হল দেখলাম আমি আসলে ঘুমের মধ্যে শুনছিলাম। ভাবলাম স্বপ্ন! ঠিক তখনই আবার চিৎকারটা শোনা গেল। বুকটা কেঁপে উঠলো! এতো তিথির গলার আওয়াজ। হুরমুর করে ঘর থেকে বেড় হলাম। শব্দটা নদীর দিক থেকে আসছে। পাগলের মত দৌড় দিলাম। অজানা আতঙ্কে মনটা ভরে গেল। নদীর কাছে পৌঁছতেই তিথি চিৎকার করে কেঁদে উঠল আমাকে বলতে লাগলো, ওগো! সাক্ষ্য নদীর মাঝখানে ভেসে চলে গেছে। দ্রুত চোখ বুলালাম নদীর দিকে,দেখলাম সাক্ষ্য একটা কলাগাছে জড়িয়ে ভাসছে। গতকালই কিছু কলাগাছ কেটেছিলাম ভেলা বানানোর জন্য। নদীটা পেরিয়ে যাওযার খুব ইচ্ছ কাজ করছিল। নদীটা পার হলে কী আছে খুব জানতে ইচ্ছা করছিল। শরীরটা ভাল না লাগায় গাছগুলিকে আর বাঁধা হয়নি। ছোট বাচ্চা, এভাবে বেশিক্ষণ ভেসে থাকতে পারবে না। আমাকে দেখেই বাবা বাব বলে চিৎকার শুরু করলো। তিথি কে কিছু জিজ্ঞেস করার মত সময় নেই! আগে বাচ্চাকে উদ্ধার করতে হবে। দানবটার কথা মনে হলো, ঝরের গতিতে দৌড়ে গেলাম ঘরে। পাথর ঘষে ঘষে একটা ধারালো ছুরির মত বানিয়ে ছিলাম, কাটাকাটির কোন রকমের কাজ চালাতাম সেটা দিয়ে।হাতে নিয়ে ছুটলাম ঊর্ধ্বশ^াসে। তিথিকে কিছু বলার মত সময় পেলাম না, ঝাপ দিলাম নদীতে। সাঁতরানো শুরু করতেই ভয়ে শীতল হয়ে গেলাম! চোখের কোণে স্পষ্ট দেখতে পেলাম দানবটাকে। মাছ আর কুমিরের সংমিশ্রণে ভীষণ ভয়ানক কিছু একটা। সাক্ষ্যর কাছাকাছি আসতেই আমার আর সাক্ষ্যর মাঝামাঝি ভেসে উঠল দানবটা। হঠাৎ করেই ভয় শূন্য হয়ে গেলাম। আমার সন্তানকে বাঁচতে হবে, দুনিয়ার কোন কিছুকেই পরোয়া করার সময় নেই। হা করে উঠল দানবটা হয়তো আমাকে গিলে ফেলার জন্যই। বোঁথা ছুরিটাই চালালাম ওটার মুখ বরাবর। হারামিটা আক্রমণটা বুঝে ফেললো। সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে আমাকে লেজ দিয়ে একটা বারি মারলো। কপালে এসে লাগলো আঘাতটা। প্রচ- ব্যাথায় কেঁপে উঠলাম। তিথি আর সাক্ষ্যর ভয়ার্ত চিৎকার শুনতে শুনতে তলিয়ে যেতে লাগলাম নদীর গভীরে। প্রচ- কষ্টে দম বন্ধ হয়ে আসলো।

বাবা…. বাবা….বাবা…. আবারো দূর, অনেক দূর থেকে চিৎকার কানে ভেসে আসছে। চোখ খুলতে খুব কষ্ট হচ্ছে! মনে হচ্ছে এ জনমে আর চোখদুটি খোলা যাবে না। সাক্ষ্যর কথা মনে পড়লো। মনে বল চলে আসলো। ভাবলাম, যে করে হোক চোখ খুলতেই হবে। দেখতে হবে দাবনটাকে ভালমতো। দানবটার দুর্বল স্থান বেড় করে আক্রমণ করতে হবে। পেটের মধ্যে ছুরি চালাতে পারলে ওটাকে হয়তো কাবু করা যাবে। আবার বাবা….. বাবা… ডাক কানতে আসতে লাগলো। বহু কষ্টে চোখ দুটি খুললাম। একদম মুখের কাছে দাবনটার মুখটা দেখতে পেলাম। কিন্তু কেমন যেন ঘোলা ঘোলা লাগছে। একটু সময় নিতে নারী মুখের মত লাগতে লাগলো। ঘোরা ভাবটা সরতেই চমকে উঠলাম! এ দেখী মায়ের মুখ! খুব দ্রুতই ঘোর কেটে গেল। দেখি মা মুখের কাছে গভীর উদ্বেগে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো ভেজা। হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাস করলাম মা তুমি? আমার কণ্ঠ শুনতেই মা চিৎকার করে উঠল। ওরে তোরা কোথায়? খোকার জ্ঞান ফিরেছে! তাশফিনের জ্ঞান ফিরেছে! মা বাচ্চাদের মত আনন্দে নাচতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন একসাথে ঘরে ঢুকলো, ঠিক যেন রেলগাড়ির বগির মতো সারিবদ্ধ হয়ে। কারা ঢুকলো সেগুলো দেখার মত সময় নেই। তিথি আর সাক্ষ্যর কথা ভেবে আমি অস্থির হয়ে উঠলাম। বললাম, মা আমি এখানে কীভাবে এলাম! তোমরা এখানে কেন?
মা তখন তখন খুশিতে কাঁদছে।
বড় দুলাভাই বলল, কীভাবে এলাম মানে? তোর কিছু মনে নেই।
মনে নেই মানে? কী মনে থাকবে?
কিছুই মনে নেই?
আমি “না” বলে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম!
বড় দিদি বলল, তোর এক্সিডেন্ট হয়েছিল মনে নেই? টাঙ্গাইলে যে মটরসাইকেল এক্সিডেন্ট করেছিলি?
আমার কিছুই মনে আসছে না!!!!
বড় দিদি বলল, খোকা আজ তিন বছর হলো তুই কোমায় ছিলি। দীর্ঘদিন তুই হাসপাতালে ছিলি। তোর মাথায় প্রচ- আঘাত লেগেছিল। এই মাস ছয়েক হলো তোকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে। সবাই তো আশা ছেড়েই দিয়েছিল। চাচি আশা ছাড়েনি। তার একটাই কথা আমার ছেলের কিছু হয়নি। ও সেরে উঠবে। ওকে সেরে উঠতেই হবে। সত্যি, চাচির ভালোবাসারই শেষ পর্যন্ত জয় হলো।
আমি একদম বাকহারা হয়ে গেলাম! এসব কী বলছে সবাই! স্বপ্ন দেখছি না তো! কিন্তু তাই বা কীকরে হয়? এতো জীবন্ত স্বপ্ন হয় নাকি? তাহলে তিথি আর সাক্ষ্য কী আমার স্বপ্ন? তিনবছরের দীর্ঘ কোন স্বপ্ন? কিন্তু সেটাই বা কীভাবে সম্ভব? এতো জীবন্ত কোন স্বপ্ন হয় নাকি?
মা কথা বলে উঠল, শোন খোকা তোর এতো কথা এখন বলার দরকার নেই। কিছু মনে না পড়লে নেই। ওই তিক্ত স্মৃতি মনে না পড়াই ভালো। তোর এখন জ্ঞান ফিরেছে, কীভাবে দ্রুত সুস্থ্য হওয়া যায় এটাই এখন জরুরী। বিশ্রাম নে বাবা। সবাই ঘর থেকে বেড় হয়ে গেল। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমার শুধু মনে হচ্ছিল তিথি আর সাক্ষ্য আমার স্বপ্ন হতেই পারে না। কিন্তু এ বিষয়ে সবাইকে কিছু বলতেও পারলাম না। এই অসম্ভব ঘটনা নিজেরই এখন বিশ^াস হচ্ছে না অন্যদের হবে কি? খুব আপন কিছুকে হারানোর অনুভুতি নিয়ে গভীর নিঃশ^াসে চিৎ হয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম শুধু।

তিথির বিষয়ে খুব জানতে ইচ্চা করছিল। নিশ^য়ই এতোদিনে বিয়ে হয়ে গেছে। হয়তো সন্তান হয়েছে। হয়তো সেই সন্তানের নামও রেখেছে সাক্ষ্য। হাসি আসলো, এমনটা হলেতো মজাই! মাকে তিথির বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হলো। কিন্তু লজ্জা পাচ্ছিলো খুব। জিজ্ঞেস করবো কি করবো না ভাবতে ভাবতে বলেই ফেললাম,
মা
কী?
একটা কথা বলবো?
কী বলবি?
তুমি লজ্জা দিবে নাতো?
মা সন্দিহান হয়ে তাকালো। কী এমন বলবিরে বাপ যে লজ্জা পেতে হবে?
না তেমন কিছু না, ঐযে… তুমি আমার জন্য একটা মেয়েকে ঠিক করেছিলে না?
হুম?
তার খবর কী? মানে এতোদিনে নিশ্চয়ই বিয়ে হয়ে গেছে?
তিনি কথা জানতে চাইতেই মায়ের মুখটা উদাস হয়ে গেল! মুখটা বেজার করে মা যে উত্তরটা দিল তাতে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো।
আর বলিশ না, মেয়েটার কথা ভাবলেই মনটা খারাপ হয়ে যায়!
কেন মা?
মেয়েটা খুব লক্ষ্মী ছিল। তোর বউ করে আনার খুব সখ ছিল আমার। কিন্তু তা আর হলো না!
কেন মা? অন্য জায়গায় বিয়ে করে ফেলেছে তাই?
আরে না! মেয়েটা তোকেই পছন্দ করতো, আমি সেটাও জানতে পেরেছিলাম। বিষয়টা আসলে তা না, মেয়েটা হারিয়ে গেছে!
মানে? সে কি বাচ্চা নাকি মানসিক ভারসাম্যহীন যে হারিয়ে গেল?
আরে সে সব কিছুই না। মেয়েটা এক ঝরের রাতে হারিয়ে গেছে!
বুকটা ধরফর করে উঠলো! কেমন যেন বিপদের গন্ধ পেলাম। গলার স্বর আর শান্ত রাখতে পারলাম না। আহা মা! এতো না ঘুরিয়ে খুলে বলতো?
আমার আচরণে মা একটু অবাক হলো। কিন্তু গল্পের মুডে থাকায় এতোটা মাথা ঘামালো না বোধ হয়? মা বলতে লাগলো, আরো খোকা বলছি,বলছি,
যেদিন তোর এক্সিডেন্ট হয় সেদিনেই কথা, একই দিনে দুটো ঘটনা হওয়াতে বিষয়টা আমার স্পষ্টই মনে আছে। আমাদের এখানে প্রচ- ঝর হয়েছিল। মেয়েটা সন্ধ্যার দিকে নদীর পাড়ে গিয়েছিল বেড়াতে। সঙ্গে করে কাউকে নিয়েও যায়নি। কপাল খারাপ! ঝরের মধ্যে পড়ে। অনেক বড় একটা ঘুর্ণিঝর হয়েছিল। ঝরের পর মেয়েটাকে খোঁজা শুরু হয়, ওর বাবা ফোন করে জানায় তিথিকে পাওয়া যাচ্ছে না! ঠিক তখনই তোর এক্সিডেন্টের খবর পাই। পাগল হয়ে ছুটে যাই টাঙ্গাইল। এরপর আর তেমন বিস্তারিত জানি না শুধু জানি ওকে আর পাওয়া যায়নি!
আর পাওয়া যাবে কীভাবে? মনে মনে ভাবলাম। ওতো ছিল আমার সাথে। মাথাটা খারাপ হয়ে যাওয়ার দশা হলো। আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে! আমার বউ বাচ্চাকে মৃত্যুকুপে ফেলে আমি এখানে আরামে বসে আছি। আর সবকিছু স্বপ্ন ভেবে স্বস্তির নিঃশ^াস ফেলছি!!! ঘৃণায় গা’টা রি রি করে উঠল! নিজেকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে ফেলতে ইচ্ছা করছে। তখনই ভেবেছিলাম, এতো জীবন্ত স্বপ্ন হয় কী করে? হতেই পারে না। কী অদ্ভূত পৃথিবী! একটি নারী যাকে কোনভাবেই চিন্তাম না, সে মনে প্রাণে আমাকে ভালোবেসেছি! বায়গোল্লার দেশে সে একা যায়নি। তার ভালোবাসার মানুষটিকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে পেরেছিল। কিন্তু নিয়তি তার বুড়ো আঙ্গুলটি ঠিকই দেখিয়ে দিল। না জানি কোন নতুন খেলার মজায় আবার দুজনের বিচ্ছেদ ঘটালো। কী করি? কী করি? আমার সেখানে ফিরতেই হবে। মাথার চুলগুলি টানাটানি করা শুরু করলাম। আমার আচরণে স্তম্ভিত হয় গেল মা। বলল, খোকা তুই এমন করছিস কেন? তোর কি আবার মাথায় ব্যাথা উঠেছে! এক মুহূর্তের জন্য বাস্তবে আসলাম। বলতে গিয়েও মাকে কিছু বললাম না। মা কিছুই বুঝবে না। মা একটু আসি বলে উঠে গেলাম।

বিশাল একটা দাও নিয়েছি কোমরে। ঐ দানবটাকে মারার জন্য শক্তিশালি অস্ত্র দরকার। একবার বন্দুকের কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু পরে দেখলাম এতো গুলি নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তার চেয়ে একটা দাও নিয়ে গেলে অনেক কাজেই আসবে। আমার কোমরে দাও দেখে সবাই আমাকে ভয় পায়। সবাই ভাবে পাগল হয়ে গেছি! মায়ের কষ্ট যেন আরো বেড়ে গেছে! কিন্তু আমার তো কিছুই করার নেই! মা বোঝে না, তার সন্তানের অমঙ্গল কামনায় সে যেমন ভীত আমিও তেমন আমার সন্তানের অমঙ্গল কামনায় ভীত। ঝর দেখলেই ছুটে যাই। সামান্য একটু ঝর দেখলেই তার মাঝে গিয়ে দাঁড়াই! কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না! দিনরাত শুধু ঝরের জন্য দোয়া করি। একটা ঝর শুধু একটা ঝর! আর এক বার রহম কর। নিয়ে যাও আমায় আর একবার বাওগোল্লার দেশে। আমার সন্তান মৃতুর মুখে! শতানটার হাত থেকে ওকে বাঁচাতে হবে। আমার স্ত্রী আমার পানে চেয়ে আছে। শুধু একটাবার দয়া কর হে ঈশ্বর! হে ঝর! হে বাওগোল্লা!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *