বাতাসে বহিছে প্রেম

বাতাসে বহিছে প্রেম

প্রাণের বন্ধু স্বরূপের বোনকে সেই ছোট্টবেলা থেকেই ভালো লাগতো দেবেশের।সেই ভালোলাগা কবে যে ভালোবাসায় গিয়ে ঠেকেছে তার হিসাব দেবেশ নিজেও দিতে পারবে না।সুস্মিতা এখন কলেজ ছাত্রী।যেহেতু দেবেশ দাদার বন্ধু তাই সে দেবেশকে সে দেবুদা বলেই ডাকতো।দেবেশ কোনদিনও তার মনের কথা সুস্মিতাকে খুলে বলেনি।স্বরূপ চাকরি পেয়ে যখন পন্ডিচেরী চলে যায় তখন মা,বোনের দেখাশুনার দায়িত্ব দেবেশকেই দিয়ে যায়।দেবেশ রোজ রাতে একবার করে তার বন্ধুর বাড়িতে আসে তার মা,বোনের খবর নিতে।দেবেশ আসার পর সুস্মিতা এককাপ চা করে দেয় সেটা খেয়ে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে দেবেশ চলে যায়।
দেখতে দেখতে সুস্মিতার গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়।শুরু হয় তার বিয়ের জন্য ছেলে দেখা।দেবেশ তখন একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে একজন সূচাকুরে।স্বরূপ ছুটিতে বাড়িতে এসে বোনকে প্রস্তাব দেয় দেবেশকে বিয়ে করার জন্য।
— তুই কি বলছিস দাদা?আমি দেবেশদাকে ভালোবাসি ঠিকই কিন্তু সেটা কখনোই প্রেমের দৃষ্টিতে নয়।
— কিন্তু সুমি আমি জানি তুই ওকে বিয়ে করলে খুব সুখী হবি।ওকে সেই ছেলেবেলা থেকে চিনি।আমার বন্ধু বলে বলছি না,ও খুবই ভালো ছেলে রে!আর তাছাড়া আমি যদি খুব ভুল করে না থাকি ওর দৃষ্টিতে তোর প্রতি আমি ভালোবাসা দেখেছি।
— না দাদা,এটা আমি মেনে নিতে পারবো না।
সুস্মিতার বিয়ে ঠিক হল সরকারি চাকরি করা ছেলের সাথে।দেবেশ তার ভালোবাসার কথা বুকেই চেপে রাখলো।বিয়ে ঠিক হওয়ার পর যেহেতু ছমাস দেরি ছিল বিয়ে হতে তাই রিতেশ ও সুস্মিতা দুজনেই দেখা সাক্ষাৎ,বেড়ানো সবই করতো।দুবাড়ির কেউ কোন আপত্তিও করেনি।
বিয়ের তখনও মাস খানেক বাকি।সুস্মিতা আর রিতেশ সেদিন বাইক নিয়ে বেরিয়েছিল।কিছু কেনাকাটা করে রেস্টুরেন্টে খেয়ে বাড়ির পথে যখন রওনা দেয় তখন ঘড়ির কাটা সাড়ে দশটার কাটা পেরিয়ে গেছে।দুবাড়ীর সকলেই চিন্তা করছে। ফোনে কাউকেই পাচ্ছে না।সুস্মিতার মা অস্থির হয়ে দেবেশকে ফোন করেন।দেবেশ আসে রাত তখন পৌনে বারোটা।কোথায় খুঁজবে?কি করবে কিছুই বুঝতে পারে না সে।সারে বারোটা নাগাদ অচেনা নম্বর থেকে একটি ফোন আসে সুস্মিতার মায়ের মোবাইলে।ফোনটা ধরে অবশ্য দেবেশ।কথা শেষ করেই সে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যায়।যেতে যেতে মাসিমাকে বলে যায়,
— সুস্মিতার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।আমি সেখানে যাচ্ছি ,চিন্তা করবেন না।আমি ফোন করে সব জানাবো।
নার্সিংহোম পৌঁছে খবর নিয়ে জানতে পারে দুজনেরই অবস্থা মারত্মক।তবে রিতেশের হাত পায়ের কোন ক্ষতি না হলেও ডক্টররা মনে করছেন সুস্মিতার বা পায়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে।তবে জ্ঞান কারোরই ফেরেনি। রিতেশদের বাড়ির থেকেও সকলে হাজির হল সেখানে।ভোরের দিকে রিতেশের জ্ঞান ফিরলেও দুদিনের মধ্যে সুস্মিতার জ্ঞান ফেরে না।স্বরূপ খবর পেয়েই প্লেনে চলে আসে কলকাতায়।দুই বন্ধু সব সময়ের জন্য নার্সিংহোম বসে।তিনদিনের মাথায় সুস্মিতার জ্ঞান আসে।তারপর তার পায়ের অপারেশন।রিতেশ ছাড়া পেয়ে বাড়ি চলে যায়।ফোনেই সে যোগাযোগ রাখে স্বরূপের সাথে।
অপারেশনের পর ডক্টর জানিয়ে দেন সুস্মিতা হাঁটাচলা করতে পারবে ঠিকই কিন্তু একটু খুঁড়িয়ে।কান্নায় ভেংগে পরে স্বরূপ।দেবেশ তাকে শান্তনা দেয়,
— কোন বড় ধরণের বিপদ যে ঘটেনি এটাই বড় প্রাপ্তি। আস্তে আস্তে সুস্মিতা সুস্থ্য হয়ে উঠতে থাকে।তার কাছে কথাটা গোপন রাখা হয়।রিতেশ তাকে দেখতে এসে সব যেদিন শুনলো তারপর থেকে সে আর সুস্মিতাকে দেখতে আসেনি।সুস্মিতা বাড়ি ফিরে যাওয়ার সাতদিনের মাথায় রিতেশদের বাড়ি থেকে ফোন করে বিয়ে ভেঙ্গে দেওয়া হয়।ততদিনে সুস্মিতা জেনে গেছে তাকে আজীবনের জন্য খুঁড়িয়ে হাঁটাচলা করতে হবে।কষ্ট পেয়েছে ঠিকই কিন্তু ভেঙ্গে পড়েনি।বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছে শুনেও বিন্দুমাত্র চোখের জল না ফেলে বলেছে,
— ভাগ্যিস বিয়েটা হয়ে যায়নি,মানুষ চিনতে পারলাম।
তবে সে যে রিতেশকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিল দাদার কাছে সে কথা গোপন করেনি।
আজ দোল পূর্ণিমা।দেবেশ ও স্বরূপ দুজনে বসে স্বরূপের ঘরে গল্প করছে।মনমেজাজ কারোই ভালো নেই।সুস্মিতা তার ঘর লাগোয়া বারাদায় বসে।হঠাৎ স্বরূপ দাঁড়িয়ে বলে,
— দেবু তুই একটু বোস আমি এক্ষনি আসছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ফিরে আসে হাতে কিছুটা আবির নিয়ে।এসে দেখে দেবেশও সেখানে নেই।সে সুস্মিতার ঘরে ঢুকে তার সাথে গল্প জুড়েছে।মা ও সেখানে।সকলেই সুস্মিতাকে নিয়ে,তার ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা করতে থাকে। মায়ের পায়ে আবির দিয়ে এ ওকে আবির মাখায়।সুস্মিতা দেবেশকে আবির দিলেও দেবেশ চুপ করেই দাঁড়িয়ে থাকে।মাকে ঘরের বাইরে নিয়ে যায় স্বরূপ।জানতে চায় দেবেশ যদি রাজি থাকে তাহলে সুমির বিয়ে যদি ওই তারিখেই তার সাথে দেওয়া হয় তাহলে মায়ের কোন আপত্তি আছে কিনা।মা সম্মতি জানান।
ঘরের মধ্যে তখন দেবেশ আর সুস্মিতা।দেবেশ সুস্মিতাকে বলে,
— তোকে একটা কথা বলার ছিল।
— বলো,তুমি আমাকে কিছু বলবে তা এত আমতা আমতা করার কি আছে?
— আছে , এ কথাটা আর পাঁচটা সাধারণ কথার মত নয় –।
— আরে বলেই ফেলো।তবে একটা কথা, রিতেশের সাথে বিয়েটা ভেঙ্গে যাওয়া নিয়ে কোন কথা আমি শুনতে চাই না।আমার ভাগ্য ভালো বিয়েটা হয়ে যায়নি।অন্তত তার মানসিকতাটা বিয়ের আগেই আমার সামান্য খুতের বিনিময়ে জানতে পেরেছি এটাই আমার কাছে বড় পাওনা।এই বিয়েটা ভেঙ্গে যাওয়ায় আমার মনে কোন আক্ষেপ নেই।এবার বলো তুমি কি বলবে?
— আমি — আমি — মানে — তোকে বিয়ে করতে চা — ই
— এটা কি আমার প্রতি অনুকম্পা?অপারেশনের পরে আমার একটা পা স্বাভাবিক পা টা থেকে ছোট হয়ে গেছে।আমি খুঁড়িয়ে হাঁটি।আমাকে নিয়ে বাইরে বেরোতে তোমার খারাপ লাগবে না?
— আমি যে তোকে সেই কবে থেকে ভালোবাসি রে !বলতে পারিনি,যেহেতু তুই বন্ধুর বোন।
— দাদা তাহলে ঠিকই বুঝেছিল।
— কি বলেছে রূপ?
— বিয়েটা ঠিক হওয়ার আগেই দাদা আমায় বলেছিলো তোমার চোখে আমার প্রতি ও ভালোবাসা দেখেছে।আমিই বোকা! সেটা বুঝতে পারিনি।আসলে তোমায় দাদার বন্ধু বলে দাদার চোখেই দেখতাম।আজ বুঝতে পারছি রাখি,ভাইফোঁটার সময় বারবার বলা স্বর্তেও তুমি আমাদের বাড়ি আসতে না কেন?
— আমার প্রশ্নের উত্তরটা দে —
— আজ দোল পূর্ণিমা,এমন দিনে তুমি আমার গোটা জীবনটা রঙ্গিন করে দিতে চাইছো —- আমি কি তোমায় ফিরিয়ে দিতে পারি?তবে তোমার মনের কথাটা তুমি আরো আগে কেন আমায় জানালে না দেবুদা?
— ভয় পেয়েছিলাম,যদি তুই আমায় ফিরিয়ে দিস।
— তবে আজ বললে কেন?
— সে কথা বলতে পারবো না।হয়তো রাধাগোবিন্দই চেয়েছেন,তিনিই আমায় সাহস যুগিয়েছেন।
দেবেশ তার পকেট থেকে লাল আবির বের করে সুস্মিতার মুখটা পুরো রাঙ্গিয়ে দিলো।সুস্মিতাও দেবেশের মুখে আবির মাখিয়ে দিলো।বাইরে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে স্বরূপ আর তার মা সব দেখে সেখান থেকে দুজনেই সরে গেলেন।জীবনের একটা ধাক্কা সুস্মিতার গোটা জীবনটাকে আবিরের লাল রঙে রঞ্জিত করে দিলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *