বিখ্যাত হতে চাই তো আমিও!

শিরোনাম :
বিখ্যাত হতে চাই তো আমিও!
তন্ময় সিংহ রায়

সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের নানান কর্মব্যস্ততার মতই , ব্যস্ততা যেন আজ কোষের রন্ধ্র রন্ধ্র লুটপাট করে , আধিপত্য স্থাপনের মাধ্যমে হিটলারি কর্তৃত্ব প্রয়োগে , চাবুক হাতে
সিংভাগ কবি-সাহিত্যিকদের দৌড় করাতে চায় মিনিটে মিনিটে!
উপযুক্তভাবে লেখা-পড়া না করেই যেন সব ফাঁকি দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে হতে চায় বাংলা সাহিত্যের এক একটা এভারেস্ট বা জ্যোতিষ্ক!
সম্ভব হলে ছায়াপথ হতেও তাঁরা যেন বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করবেন না , এমনই সব ব্যাপার-স্যাপার!
মজার বিষয় হল , নানান কৌশলে আবার নিজেরাই নিজেদের নামের পাশে বৈচিত্র্যময় , ভারী ভারী পদবী হিসেবে নিঃসংকোচে আঠা দিয়ে জুড়ে দেয় ‘প্রখ্যাত , বিখ্যাত , স্বনামধন্য , আন্তর্জাতিক’ ইত্যাদি , সাথে অর্থ
বা সোর্স প্রয়োগের মাধ্যমে রাতারাতি সেলিব্রিটি হওয়ার এক আন্তরিক প্রচেষ্টা তো আছেই।
আর এ সিস্টেমের ব্যাসযুক্ত চাকা সিস্টেমের গতিবেগকে বৃদ্ধি করে রেখেছে যথেষ্ট বলাটাও এখানে বোধহয় অযৌক্তিক খুব একটা কিছু হবে না।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ বেশ বহুবছর যাবৎ ,
বাংলায় ভালো গায়ক , নায়ক ,
অভিনেতা , সুরকার , গীতিকার , পরিচালক , রাজনীতিবিদ , শিক্ষক , ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার , ভালো মানের কবি-সাহিত্যিক ইত্যাদির যেন হঠাৎ’ই আকাল পড়ে গেল এ হতভাগ্য বাংলায়!
যেন মন্দের ভালোতে ধুঁকে ধুঁকে চলছে এ বাংলার সেই সমাজ , যেখানে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু থেকে উত্তম কুমার বা কিশোর কুমার , আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পল্লী কবি জসীমউদ্দীন থেকে ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় , পুলক বন্দোপাধ্যায় বা হেমন্ত-মান্না দে , এনাদের মতন সব কিংবদন্তি স্রষ্টা সমৃদ্ধ করে রেখে গেছেন আমাদের!
আগের সেই স্বাদ ও পুষ্টি কিছুই যেন আর পায়না পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বিশেষত বাঙালিরা , সেখানে ভারত ও সর্বোপরি আন্তর্জাতিক মহল তো নয় দিলাম ছেড়েই!
ছন্দ মেলাতে পারলেই যেমন আজ সবাই
কবি ,
আবার ইন্টারনেট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বাংলায় গুচ্ছখানেক শব্দ ঘষ ঘষ করে লিখে দিতে পারলেই সে আজ হয়ে দাঁড়ায় পূর্ণাঙ্গ লেখক।
আঙুলের কড় ধরে যেন আজ গুনে বলে দেওয়া যাবে যে প্রকৃত পন্ডিত , গুণী , বিনয়ী ও সমাজ সচেতন অর্থাৎ সর্বদিকেই সমৃদ্ধশালী কবি-সাহিত্যিক বর্তমানে ঠিক ক’জন?
আর উত্তরে যেন নির্দ্বিধায় ও বেমালুম মুখ থেকে বেরিয়েও আসে ‘গুটিকয়েক’ শব্দটা।

বাংলার বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিন থেকে যাত্রা শুরু করে আজ সবে মাত্র বছর পাঁচেক হল প্রফেশনালি ভারতের বিভিন্ন জেলা , রাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া , কানাডা , লন্ডন , যাপান প্রভৃতি বিদেশের বিভিন্ন জনপ্রিয় , মাঝারি জনপ্রিয় , কম জনপ্রিয় অফ লাইন ও অনলাইন নিউজ পেপার , ব্লগ , নিউজ পোর্টাল ইত্যাদিতে বিশেষত প্রবন্ধ লেখার সামান্য চেষ্টা করে চলেছি , এছাড়াও কবিতা ও ছোটো গল্পও অল্পবিস্তর চেষ্টায় বেরিয়েছে কিছু স্বনামধন্য পেপারে।
আর যেটা লিখতে আমি পছন্দ ও চেষ্টা করি একটু বেশি , তা হল বাংলা কোটেশন এবং গদ্য কবিতা।
বলাবাহুল্য বেশ কিছু কোটেশন সৌভাগ্যবশতঃ বেশ জনপ্রিয়তাও পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়!
সার কথা প্র‍্যাক্টিসে আছি , আর মনে মনে সর্বক্ষণ কামনায় থাকি , আমার ভূলগুলো যদি কেউ দেন সংশোধন করে , তো যেন ঋণী হয়ে থাকি তাঁর কাছে!
পড়ালেখার পাশাপাশি , লেখার গুণগত মান , ভাষার যথার্থ প্রয়োগ , বিন্যাস , বানান , টপিক ইত্যাদিকে প্রাধান্য দেওয়ার থেকে একজন সাহিত্যিকের কাছে অধিকাংশ সময় যখন অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে দাঁড়ায় যেন-তেন প্রকারেণ রাতারাতি বিখ্যাত হওয়ার স্বপ্নটা ওজনে বেশি , তখনই শুরু হয় আবার তাঁর ওজন ক্রমশঃ হালকা হতে!
কারণ ধরা না পড়লে , টুকলি করে মাধ্যমিক পাশ করা তো যায় , সেখানে পাওয়া যায় ডিগ্রিও , কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে প্রকৃত জ্ঞানী ও ভালো মানের হওয়াটা সম্ভব তো নয়’ই , বরং দুর্ঘটনাবশতঃ হঠাৎ বৃষ্টির জলের ঝাপটায় রঙ ধুয়ে আসলটা বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা থেকে যায় প্রবল!
চেষ্টা যদি হয় অন্তর থেকে , তো বাঙালির দ্বারা কি কি সম্ভব?
তাঁর প্রমাণ বিশ্ব ইতিহাসেই আছেই ভুরি ভুরি!
কিন্তু সেই চেষ্টায় যেন বেশ কয়েকবছর চলছে ভাঁটা!
এ প্রসঙ্গে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার উপাদান হিসেবে দেশীয় সাহিত্যের অবদান তো অবশ্যই বিশেষভাবে উল্লেখ্য।
বাঙালি এমন একটা জাতি , যে পারে না বলে এমন কোনো কাজ আছে বলে আমার মনে হয় না ,
আর তাই তো সমগ্র পৃথিবীতে এর আসনটাও প্রথমের দিকে , আর কদরও তো তেমন’ই!
এখন গভীর মনোযোগী হয়ে পড়াশোনা ও কঠিন অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে সেই বাংলা সাহিত্যের নক্ষত্রসম মান-মর্যাদাকে যদি ধরে রাখতে আমরা আদৌ না পারি , তো ভবিষ্যতে বিশ্বদরবারে এ চরম লজ্জা হবে একান্তই বাঙালির!

একজন প্রকৃত লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করা অসম্ভব না হলেও , অপেক্ষাকৃত বেশ দুঃসাধ্য এক মিশন!
বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত বিভিন্ন ধরণের মানুষজন সাধারণত হয়ে থাকেন নির্দিষ্ট একটা বা দু’টো , বড়জোর তিনটে বিষয়ে পারদর্শী।
অর্থাৎ সেই বিষয় সম্পর্কিত পড়া-লেখা করলে অথবা জ্ঞান থাকলে , সাধারণভাবে হলেও , চলে যায় একটা জীবন , কিন্তু একজন পূর্ণ মানের ও সর্বোপরি আন্তর্জাতিক স্তরের লেখক হতে গেলে , তাঁকে বাংলা , ইতিহাস , ভূগোল , অঙ্ক , ইংরিজি , দর্শন , রাষ্ট্রবিজ্ঞান , সমাজ বিজ্ঞান , চিকিৎসা বিজ্ঞান (এনাটমী , ফিজিওলজি , বায়োকেমিস্ট্রি , প্যাথোলজি , সার্জারি প্রভৃতি), দুর্নীতি ও অপরাধ , মহাকাশ বিজ্ঞান , মনোবিজ্ঞান , সংবিধান , অর্থনীতি , আইন , পদার্থ ও রসায়ন বিজ্ঞান ইত্যাদি সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানকে প্রতি মুহুর্তে সংগ্রহ
করে রাখা ও ক্রমাগত এই অভ্যাস চালিয়ে যাওয়া অত্যাবশ্যক।
শুধু তাই নয় , পরবর্তীতে বিশেষত
যুক্তি , প্রয়োজনে ধর্মসংক্রান্ত যুক্তি বা বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ
করে , যথার্থ শব্দের বিন্যাসে তাঁর নির্ভুল উপস্থাপন করাটাই একজন ভালো মানের লেখকের সার্বিক পরিচয় হওয়া উচিৎ।
সর্বশেষ এ কথাই উল্লেখ্য যে , শত কাঁচের
টুকরোর মধ্যেও যে হীরে চেনার , চিনে নেবে ঠিক’ই।
এরজন্যে হীরেকে নিজেকে আলাদা করে চিৎকারের মাধ্যমে আকাশ-বাতাস আন্দোলিত করে বলার বোধহয় কোনো প্রয়োজন নেই যে , দেখো আমিই সেই বহুমূল্যবান বস্তু হীরে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top