বিবাহ – মির্জা চয়ন

 

[printfriendly]

 

 

 

[post-views]

 

 

[smbtoolbar]

 

 

 

আমি যখন প্রীতিলতা সেন কে বিয়ে করে প্রথম বাড়িতে আসলাম তখন পাড়ায় ছড়িয়ে পরলো এই রকম কথা  মওলানা রহমান সাহেবের ছেলে এক হিঁদু বাড়ির মেয়ে বিয়ে করে এনেছে। পাড়ায় লোকজন দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়লো। একদলের চিন্তা ভাবনায় এরকম প্রকাশ পেলো যে,  হিঁদু বাড়ির মেয়ে বিয়ে করে মওলানার ছেলে খুব ভালো কাজ করছে। একটা মেয়ে তো মুসলমান হলো। আর একদল বলাবলি করছিলো এই বলে এটা মোটেও ঠিক হয় নি। জাত ধর্মের বেড়াজাল ডিঙিয়ে ঘরে হিঁদু বাড়ির মেয়ে এটা মেনে নেয়া অসম্ভব। তারা মওলানা সাহেবের বাড়ি একঘরে করার সিদ্ধান্ত নিলো।

প্রীতির বাবা আমাদের অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী হিন্দু পরিবারের লোক। তাঁর নাম-ডাক শুধু আমাদের অঞ্চলে তাই নয়, তিনি জেলা শহরেও খুব পরিচিত। তিনি আমাদের শহরের নামকরা একজন এডভোকেট। সেই রজনীকান্ত সেনের মেয়েকে বিয়ে করে আমি ঘরে তুলেছি। জাত ধর্মের কোনোই বালাই নেই। আমার বাবা মওলানা রহমান সাহেব গ্রামের মাদরাসার বড় হুজুর এবং আমাদের গ্রামের মসজিদে ইমামতি করেন।

বিয়ের খবর ছড়িয়ে পরার পর প্রথমেই মসজিদ কমিটির সভাপতি উত্তর পাড়ার শেখ কুদ্দুস কাকা বাবা কে মসজিদে যেতে মানা করে দিয়েছেন।মা এসে বললেন এখন বাকি মাদরাসা, কি যে হবে বলা যাচ্ছে না। মাদরাসার প্রধান মৌলুবী আমার বাবা। এই মাদরাসা এই অঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো মাদরাসার একটি। এই মাদরাসা আমার পিতামহের পিতা ১৮১৯ সালের দিকে প্রতিষ্ঠা করেন। এই মাদরাসার একটি ঐতিহ্য আছে। দেশের অনেক বড় বড় মওলানা মুফতীগন এই মাদরাসার ছাত্র ছিলেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী আমাদের বংশের লোক এই মাদরাসার খেদমত করে চলছেন।আর সেই মাদরাসার খোদ বড় হুজুরের ছেলে একটা হিন্দু পরিবারের মেয়ে বিয়ে করে এনেছে। এটা কি মানা যায়।

এলাকায় একটা চাপা ক্ষোভ আর উত্তেজনা সৃষ্টি হলো। ঢাকা থেকে বড় চাচা আর কাইয়ুম ভাই চলে এসেছেন। বিকেলেই সদর হতে পুলিশের ওসি এবং কনস্টেবল এসেছিলো। কাইয়ুম ভাই  কিছু একটা বলে বিদায় দিয়েছেন। প্রীতিলতার বাবা আইনজীবী তিনি জেলা বারের সম্মানিত নেতা। তিনি এসপি অফিসে গিয়ে নালিশ করে পুলিশি অভিযান করিয়েছেন।

আমার সামনে তখন বড় চাচা, কাইয়ুম ভাই আর আমার শ্রদ্ধেয় পিতা মওলানা রহমান সাহেব। তাদের সকলের কন্ঠে উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা প্রকাশ দেখতে পেলাম। বড় চাচা বললেন এটা তুমি কি করলে আবদুল্লাহ? তুমি আমাদের মান সম্মান সব ধুলোয় মিশিয়ে দিলে। আমার বাবা অর্থাৎ মওলানা রহমান সাহেবের মুখে কোনো ভাষা নেই।  সকালের কথা ছাপিয়ে কাইয়ুম ভাই আমার পক্ষ নিয়ে বললেন যা হয়েছে তা তো আর ফেরানো সম্ভব না ।  আমি আবদুল্লাহর সাথে কথা বলি কি করা যায় তা দেখতেছি।

কাইয়ুম ভাই বিষয় টা দেখার নামে যে কথাটা আমাকে বললেন তাতে আমার মাথায় এক আকাশ ভেঙে পড়লো। তিনি প্রস্তাব দিলেন যা হইছে তো হয়েই গেছে। এখন এক কাজ করো আমি প্রীতিলতার বাবা কে খবর দেই সে এসে প্রীতি কে নিয়ে যাক। তুমি এসব ভুলে যাও। প্রীতি বাবা প্রীতিকে নিয়ে কলকাতায় তার পিসির বাড়িতে যাবে ঐখানেই প্রীতির বিয়ের ব্যবস্থা করবে।

আর আমরা এখানে তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করবো। দক্ষিণ পাড়ার জোয়াহের মাতাব্বরের বড় মেয়ে শারমিন আক্তারের সাথে তোমার বিবাহের ব্যবস্থা করবো। এ বিষয়ে আমরা জোয়াহের কাকার সাথে কথা বলেছি। তিনি রাজি আছেন। তুমি যদি শারমিন কে বিয়ে করো তবে সব ঝামেলা চুকে যাবে। তোমার বাবা এলাকায় আবার মাথা উঁচু করে চলতে পারবে।

এইবার আমি মুখ খুললাম বললাম মিয়া ভাই আপনারা যা বলছেন তা হয়তো সঠিক। কিন্তু আমি প্রীতির প্রতি কোনো অন্যায় করতে পারবো না। আমি ওকে বিয়ে করে এনেছি আর স্ত্রী’র মর্যাদা দিয়েছি। প্রীতি কে ফিরিয়ে দেয়া আমার সম্ভব নয়। প্রীতির সাথে এই অন্যায় করার আগে আমাকে মেরো ফেলেন মিয়া ভাই। এই কথা শুনে মিয়া ভাই অনেকটা চুপ মেরে গেলেন। তিনি আর কোনো কথা বাড়ালেন না।

আমি আর প্রীতি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন হতে আমাদের সম্পর্ক। আমাদের সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ায় সকলে জানতো। একবার ভার্সিটিতে যুগল প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলো। তখনই আমাদের বিষয় টা সকলে জানতে পারে। এর পূর্বে দু’একজন বন্ধু বান্ধব ছাড়া কেউ জানতো না। ঐ আয়োজনের পর আমরাই সেইবার সেরা কাপল নির্বাচিত হয়েছিলাম।

আমি প্রীতি কে আর প্রীতি আমাকে ভালোবাসে। এ ভালোবাসা চিরন্তন ও সত্য। সেই আদিম যুগ হতে এই ভালোবাসা আজও চলছে। ভালোবাসার জন্য আমাদের সমাজে প্রচলিত বিবাহ বিধানটা আমার কাছে খুব একটা অগ্রাজ্য নয়। আমার কাছে ভালোবাসাটাই প্রধান এবং চিরন্তন সত্য।

 আমাদের বিবাহ আইন বলতেছে বিবাহ একটি চুক্তি। অর্থাৎ একজন পুরুষ এবং একজন নারী একসাথে বসবাস করতে চুক্তিবদ্ধ হয়ে একটি কাগজে স্বাক্ষর করলে তারা সমাজে স্বামী- স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। স্বামী হিসেবে স্ত্রীর ভরনপোষণ এবং স্ত্রী স্বামীর প্রতি  কিছু দায়িত্ব পালন করবে। এই আইনের কোথাও ভালোবাসা শব্দের উল্লেখযোগ্য উল্লেখ আছে বলে আমার জানা নেই। আমার মনে হয় একটা কাগজে স্বাক্ষর করার মধ্য দিয়ে যে সম্পর্ক সেটা কেবলই ভরনপোষণের বিষয় থাকে সেখানে ভালোবাসা তৈরি করে নিতে হয়। আর যারা ভালোবাসা তৈরি তে ব্যর্থ হয় তখনই বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটায়। এ বিবাহের সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার মতো আমার কোনোই ইচ্ছা আকাঙ্খা নেই।

কিন্তু আমার আর প্রীতিলতার বিষয়ে কেনো প্রশ্ন উঠবে? সে হিঁদু বাড়ির মেয়ে তাকে বিয়ে করলে ধর্মান্তরিত হতে হবে এ কেমন বিধান। সমাজের এ অধিকার তো থাকা উচিত নয়। বিবাহপূর্বক ভালোবেসে ছেলে মেয়ে বিছানায় গেলে তা পাপে পরিনত হয় আর কাগজে স্বাক্ষর করে বিছানায় গেলে তা শুদ্ধ হয় এসব বোধহয় আমরা মানুষ জাতিই তৈরি করেছি। অনেক প্রেমিক প্রেমিকাকে দেখেছি আকাশ -বাতাস-সূর্য কে সাক্ষী রেখে বিছানায় গিয়েছে। আমার বিশ্বাস  সেটা শুধুই যৌনতা এ ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। আমি আর প্রীতি তো তা করি নি।   ভালোবেসে সংসার জীবন সন্তান উৎপাদন করে লালন পালন বোধকরি বিবাহের ভিতর পরবে। সেখানে স্বামীকে স্ত্রী’র ভরনপোষণের শর্ত জুড়ে দিতে হবে না। স্বামী স্ব-ইচ্ছায় স্ত্রী র ভরনপোষণ করবে সন্তান জন্ম দিবে তাদের লালন পালন করবে ভালোবাসার সুখের সংসার হবে আর তখনই বিবাহ পরিপূর্ণতা লাভ করবে।

আমার বিশ্বাস ধর্মীয় বিধানগুলো খুব বেশি জটিলতার সৃষ্টি করে নি যতটুকু জটিলতা আমাদের সমাজ তৈরি করেছে।

ধর্ম কোনদিনই বিবাহ বিচ্ছেদের কারন হতে পারে না। আমাদের সমাজ এ নিয়ে বেশি তর্ক করে এবং বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটায়। ভিন্ন ধর্মালম্বী নরনারী বিবাহ হলে ধর্ম ছুটে যায় বা জাত চলে যায় এ বিশ্বাস আমি করি না।

আজ ৫ বছর আমি আর প্রীতি সংসার করছি। আমাদের জীবন সুন্দর ভাবে চলছে। সৃষ্টিকর্তা চান তো জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমরা একই বন্ধনে জড়িয়ে থাকবো। আর এরই মাঝে বেড়ে উঠবে আমাদের রাজকন্যা প্রাপ্তি …..

মির্জা চয়ন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top