বিড়ম্বনা – নিবেদিতা চক্রবর্তী

শুভময় বাবুর আজ ভারী আনন্দ।দীর্ঘ দশ বছর পরে তার যমজ ভাই হিরন্ময় সান্যাল আসছে তার ভাইয়ের কাছে।দশ বছর ধরে দেশের বাইরে হিরন্ময় বাবু।ছেলে চাকুরিসূত্রে প্রবাসী।হিরণময়বাবুর স্ত্রীবিয়োগের পরে তাঁর ছেলে তাকে সঙ্গে করে নিজের কাছে নিয়ে গেছে।পোশাক পরিচ্ছদে শুধু শুভময় বাবু আর হিরন্ময় বাবু আলাদা কিন্তু চেহারা ,মুখের গঠন অবিকল একই রকম।হিরন্ময় বাবু দেশে ফিরেছেন ছেলের সাথে দিন দশেক আগে।আজ দেখা করতে আসছেন শুভময় বাবুর সাথে।

শুভময় বাবু আদ্যন্ত খাঁটি বাঙালী।রিটায়ার্ড মানুষ,খুব শৌখিন।একটি মাত্র ছেলে চাকুরী সূত্রে বউ নিয়ে পুনেতে থাকে ।তিনি আর তাঁর স্ত্রী থাকেন কলকাতাতে তাঁদের আদি বাড়ীতে।শুভময় বাবু বাইরে বের হলে পরনে থাকে ফিনফিনে সাদা ধুতিআর আদ্দির পাঞ্জাবি।মাঝে মধ্যে শখ করে বাজার করতে বের হন।নিজের পছন্দ মতো বাজার করে আনেন।এত সবজি,মাছ দেখে গিন্নি রাগারাগি করেন কিন্তু খাদ্যরসিক শুভময় বাবু তাতে কর্ণপাত করেননা।রতনের মা ছেলের সেই ছোটবেলা থেকেই এ বাড়ী তে আছে।বাসন মাজা,কুটনো কোটা ,বাজার করা ইত্যাদি সংসারের নানাবিধ কাজ সেই করে।এখানেই থাকে।তাদের পরিবারে সেও একজন সদস্য।

আজ সকাল সকাল শুভময় বাবু ধুতি পাঞ্জাবি পরে বাজারে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে চশমাটি আর খুঁজে পাচ্ছেন না। চশমা খুঁজে না পেয়ে তো তিনি রীতি মতো শোরগোল তুলে ফেলেন বাড়িতে।গিন্নি ছুটে এসে দেখলেন চোখে চশমাটি তাঁর পরা আছে।বলেন , “ভাই আসার আনন্দে কি সব ভুলে গেলে?চোখে চশমা পরে রয়েছ আর চশমা খুঁজে বাড়ী মাথায় করছ?”শুভময় বাবু একটু লজ্জিত হলেন।গিন্নি তাঁকে বললেন, “কতদিন পরে হিরু আসছে ,আমার ও খুব আনন্দ হচ্ছে গো।”শুভময় বাবুর ও খুব আনন্দ।তিনি আজ নিজের হাতে বাজার করবেন বলে বের হলেন।কিছুক্ষন পরে শুভময় বাবুর স্ত্রী দেখলেন যে বাজারের থলিটাই ভুলে গেছেন নিতে শুভময় বাবু।

থলি রয়েগেছে ঘরে আর কর্তা গেছেন বাজারে।গজ গজ করতে লাগলেন তিনি।মানুষটা যেন ভুলোমনা হয়ে যাচ্ছে।একটু নজর না দিলেই উল্টো পাল্টা করে ফেলেন সব কাজ।কিছুক্ষন পরেই কলিংবেলের আওয়াজে দরজা খুলে রতনের মা বলল, “গিন্নিমা,বাবু ফিরে এয়েছেন।” গিন্নিমা ব্যস্ত হয়ে বাজারের ব্যাগটি নিয়ে এসে বললেন, “নাও ,ধরো,ব্যাগ ফেলে বাজারে চলে গেলে হবে কি করে?জানতাম আবার ফিরে আসতে হবে তোমার।ধরো ব্যাগআর তাড়াতাড়ি বাজারে যাও।” বলেই দরজা বন্ধ করে দিলেন।ওদিকে অপ্রস্তুত মানুষটি বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাজারের দিকে রওনা হলেন।
ঘন্টা খানেক পরে একটি রিকশা এসে দাঁড়াল সান্যাল বাড়ির সামনে।

একই রকম পোশাকে একই রকম চেহারার দুজন প্রৌঢ় নামলেন রিকশা থেকে।একটি পুরোনো আর দুতিনটি নতুন থলে ভর্তি বাজার নিয়ে।বেল বাজলে দরজা খুলে শুভময় বাবুর স্ত্রী তো অবাক।শুভময় বাবু বললেন এত বছর পরে ভাই টা এল আর তাকে তুমি বাজারের ব্যাগ টা ধরিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলে?শুভময় বাবুর স্ত্রী তো বিড়ম্বিত হয়ে লজ্জায় মুখ লুকালেন। হিরন্ময় বাবু হা হা করে হেসে উঠলেন।সকাল সকালে এক কেলোর কীর্তি ঘটে গেল বাড়ীতে।

Nibedita Chakraborty

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top