বুক রিভিউ – ২ – তৈমুর খান 

 2 total views

[post-views]

পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ পঞ্চধারার সমন্বয় – তৈমুর খান 

ফ্রানজ কাফকা বলেছিলেন:”Youth is happy because it has the capacity to see beauty. Anyone who keeps the ability to see beauty never grows old.”(Franz Kafka) অর্থাৎ  তারুণ্যই সুখী হয় কারণ তাদের সৌন্দর্য দেখার ক্ষমতা আছে। যে কেউ সৌন্দর্য দেখার ক্ষমতা রাখে না।প্রাচীন বৃদ্ধরা সক্ষম হন না। তরুণ কবিদের  প্রকাশিত এক ফর্মার কাব্যগ্রন্থগুলি পড়তে গিয়ে এই কথাটিই মনে হলো। হ্যাঁ সাহস আছে। দর্প আছে। ভীরুতাও আছে। আড়ষ্টতাও আছে। কিন্তু সময়ের নিরিখে জগৎ-জীবনকে দেখার কৌশল এবং বিবমিষার এক দ্বান্দ্বিক প্রজ্ঞায় আবিষ্ট হয়ে ওঠার উপলব্ধিও আছে। তাঁরা কবিতা লিখতে এসেছেন কবিতাকে ভালোবেসেই। শব্দে শব্দে নিজস্ব অনুজ্ঞাকে বাসন্তিক বসুধার হিল্লোলে দুর্বার করে তুলেছেন।ভিন্ন দিগন্তের অনুসন্ধানও করেছেন। আসুন আমরা পরিচিত হই তাঁদের সাথে।

বুক রিভিউ -২

‘লাস্ট সিন'(অক্টোবর ২০২০) লিখেছেন কবি অর্পণ। অর্পণ কি ছদ্মনাম? না হলে নিশ্চিত কবি নিজেকে আড়ালে রেখেছেন। কাব্যটি উৎসর্গ করেছেন “যারা ‘ব্যথা’ বানান ভুল লেখে/ যে সেই বানান ঠিক করে দেয়” তাদের। এরকম উৎসর্গ কখনো দেখিনি। সাম্প্রতিক ভাঙাগড়া উত্থান-পতনের ভেতর দাঁড়িয়ে নিজের ছায়ার মাপ দিয়েছেন কবি। যা “গোপনে কবিতা ছাড়ানোর বই”। “ভালোবাসার ক্যাশ অন ডেলিভারি।” দ্রুতগামী বাজারী উল্লাসে সর্বদা এক অভিশাপ গ্রাস করেছে। কিন্তু কবির তো নো পরোয়া। জীবন এক রসিকতা ও ব্যঙ্গের শিকার। সাহসী কলম তখন লিখতে পারে: “দুঃখের মতো অ্যাফর্ডেবল্ আনন্দ আর নেই। একটা প্রিয় কাঁধ বা কোল থাকলেই হল। অন্ততপক্ষে একটা ছাদ। ছাদ না হোক, খোলা মাঠ। অভাব যত বেশি, ততোই প্রকাণ্ড আয়োজন।” সত্য কথাটি নির্ভিকভাবেই উচ্চারিত হতে পারে:”বুদ্ধিজীবীরা পরজীবীর প্রকৃষ্টতম উদাহরণ।” দার্শনিক কথা ও বাস্তবতাও বোধের জারক তৈরি করে। আর অভিজ্ঞতা লেখায় কবিতা:”আমরাই দ্রব্য, আমরাই দোকানদার। আমরাই বিজ্ঞান। আমরাই গিনিপিগ। ডুবতে গিয়েও ভেসে ওঠা কেরামের গুটি।” কবিতা মিশে গেছে জীবনের দ্রবণে। সম্পৃক্ত হয়েছে বেঁচে থাকা। মৃত্যু সেখানে স্থান পায়নি। রতি নীতির সম্মোহন কেটে গেলে কবি দেখিয়ে দিয়েছেন: “বিস্ময়ের পাশে আর কোনও সূচক নেই।” তখন দুঃখই জীবনানন্দ, দুঃখই লালন ফকির হয়ে গেছে। গদ্য ঢঙের চালে বিদ্রুত কবির অগ্রসর মুগ্ধ করে।

পোষা পিচুটির সৎকার

  ২

‘দুঃখ বলে ডাকো'(অক্টোবর ২০২০) কবির নাম বিদিশা দে। “সময় বাঁধে না যাকে, বুকে তার কুমারী রঙ” এই কুমারী রঙের ব্যাপ্তির আত্মপরতায় তার রতি সমগ্র কাব্যেই রূপ সঞ্চার করেছে। লাজুক বিনম্রতা কখনো ধূসর, কখনো ব্যর্থতা, কখনো বিচ্ছিন্নতার মর্মর আবেগে সমর্পিত হয়েছে। একাকিত্ব নিজের কাঁধেই বহন করেছেন। সময় গড়িয়ে দিয়ে ভগ্ন সময়ের স্বর শুনতে পেয়েছেন: “লেখার খাতার পাশে হাতঘড়ি ফেলে রাখি,/ এ পাতা ও পাতা শব্দ গড়িয়ে যায়,/ যতি চিহ্ন—/ ইনসমনিয়া, কিছু আদর, আর স্বপ্ন বিলাস।” তারপর যখন:”দু’হাতে নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে/ এখন আমি তোমার গল্পে অস্পষ্ট অক্ষর।” তখন বুঝতে পারেন শব্দেরা ঋতু বদল করে নিল। শব্দের ঋতুবদল এক দুঃখময় পৃথিবীর দিকে ধাবিত। গাছের পাতায় পাতায় নূপুর পরে নেয়। নিজের ছায়া গা ধুয়ে নেয় মেঘের মায়ায়। আত্মিক দুঃখের কাছে স্বপ্নের দহন বিরামহীন হয়ে যায়।

বুক রিভিউ -২
বুক রিভিউ -২

 ‘দেবদারু কিংবা ঈশ্বরী'(অক্টোবর ২০২০) কবির নাম সুদেব রায়। কাব্য উৎসর্গে আরও এক সাহসী ঘোষণা:”পবিত্র বেশ্যালয়ের সমস্ত ঈশ্বরীর উদ্দেশ্যে/ যাদের আঙিনার মাটিতে আমার মায়ের/ মূর্তি স্থাপিত হয়।” ‘পবিত্র বেশ্যালয়’ বলতে পারার ভেতর দিয়েই বিদ্রোহের অমোঘ বার্তাটি প্রদীপ্ত। ঈশ্বরী সিরিজ কবিতাগুলিতে প্রত্নসম্পর্কের আত্তীকরণটি চেতনাপ্রবাহে বাহিত হয়। কবি তাই নির্দ্বিধায় লিখতে পারেন: “জেরুজালেমের সেই নগ্ন ঈশ্বর আর মন্দিরের উলঙ্গী।” একদিকে প্রকৃতি এবং নারী মিলে ঈশ্বরী, তেমনি সম্মোহনের আরতি মেঘ-বৃষ্টি গুল্মের পাহাড়ের নদীর বিন্যাসে জাগরুক হয়ে ওঠে। এখানেই মহাপ্রাণ অথবা মানব প্রাণের জন্ম হয়। কবি লেখেন: “আমি ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ি পবিত্র বেশ্যালয়ে।”

বেশ্যালয়= পৃথিবী;

দেবদারু = সচকিত ঘোষণা।

 জন্মান্তর চলতেই থাকে। “প্রত্যেকটি শিকড়ের পাশে দাঁড়িয়ে সংসারী।” শেকড় অন্বেষণই আদি জীবনের অন্বয়। সময়ের প্রচলিত অন্তর্ঘাতকেও কবি উপেক্ষা করতে পারেননি। তাই দেখেছেন ভারতবর্ষের অলিতে গলিতে লাশ ঘোরাফেরা করে। শুধু দেবদারুই সবকিছু মিলিয়ে দিতে পারে। কবিও আপেল গাছ হয়ে যেতে  পারেন। কবিতার ফ্রম ভেঙে অর্থ ব্যঞ্জনা পাল্টে দিয়ে এক শুষ্কতা এবং নিরুদ্যম বৈপরীত্য আমদানি করেছেন।

book

 ‘নিরাভরণ'(অক্টোবর ২০২০) কবির নাম রণজিৎ মাইতি। দুধ সাদা রঙে মৃত্যু রচনা করার মধ্য দিয়েই জীবন শুরু করেছেন কবি। আমরা জন্মাই মৃত্যুবরণের জন্যই। কবি তা বিলক্ষণ জানেন বলেই জয় গোস্বামীর মতন “মৃত্যুটি রচনা করি” কথাটি এভাবে লিখেন: “এবার মৃত্যু রচনা করি দুধ সাদা রঙে”।

 মরণেই শুরু হোক জীবন। এই প্রেক্ষিত থেকেই কবি জেনেছেন “দীনতা আসলে এক গভীর অসুখ”। কবি তুলনা বাচক শব্দ ব্যবহার করেননি। অলংকার ব্যবহার না করার মধ্যদিয়েই কবিতার একটা নতুন ঘোষণা নব্বই দশকেই আমরা পেয়েছি। এই কবিকেও পেলাম। নির্মেদ ও স্পষ্ট উচ্চারণগুলি শব্দমুদ্রায় দৃঢ়তার কাঙ্ক্ষিত ঐশ্বর্য দান করেছে। যেমন:

“জানি, অনেকের অনেককিছু থেকে তবুও নির্ধন

 হেম, হর্ম্য, দম্ভ, আমানত।

 জানি, দীনতা আসলে এক গভীর অসুখ, মনোবিকলন

তেমন সরোবরে কখনোও কি ফোটে কোকনদ,

চারু,কহ্লার?

তাই মূল্যায়নে ঢুকে পড়ে কুয়াশার অন্তরালে ঢাকা মুখ ও মুখোশ

চ্যুতি, দ্যুতি, নির্মোহ মৌলিক দ্যোতনা—

চাঁদমুখ, কিংবা কলঙ্ক চাঁদের অলংকার কিনা”

 শব্দ ব্যবহারের সাহসী পদক্ষেপ সমগ্র কাব্য জুড়ে এক  দৃপ্ত পদচারণা মুগ্ধ করে। জলনূপুর থেকে জলজ শ্যাওলা, কদর থেকে জামাই আদর, চাঁদ চাঁদপানা মুখ, অশ্বডিম্ব থেকে আপন কুলায়, কালমেঘ থেকে বিশল্যকরণী, প্রেম থেকে প্রেমিকও অরূপরতন, জল্লাদের রক্তিম হাত পদ্মকোরক, কালশিটে দাগ চকচকে উজ্জ্বল সবগুলির মধ্যেই রীতি বৈপরীত্যে নিজস্ব এক ভাষাবৈভব গড়ে ওঠে। বোঝা যায় এই কবির ক্ষমতা। নিরাভরণ কবি অলংকার ত্যাগ করে অস্তিত্বকেই চোখের সামনে পরিমাপ করেন। তাই ছিন্ন করেন আবিল আবিষ্টতা। বলে দেন: “আমি নিরাভরণ রূপে মুগ্ধ, মুক্তকণ্ঠে বলে যাই।/ যতো খুশি গালি দাও ‘শালা’।”

 ‘পোষা পিচুটির সৎকার'(অক্টোবর ২০২০) কবির নাম সৌরভ বর্ধন। কবিতার স্বাভাবিক পথ পরিহার করে যাঁরা ভিন্ন পথের সন্ধান করেছেন তাঁদেরই উত্তরসূরী সৌরভ বর্ধন। প্রথম থেকেই বাংলা কবিতায় অধুনান্তিক ধারাকে অনুসরণ করেছেন। তাই তাঁর কবিতায় বিশেষ্য বিশেষণ ক্রিয়ার ব্যবহার পাল্টে গেছে। বিষয়হীন বিষয়, প্রসঙ্গচ্যুতি, অস্বাভাবিকতা, বহুমুখী উৎস ও বিন্যাস, পাঠকের প্রত্যাশাকে ভেঙে দেয় বা উলংঘন করে। ব্যঙ্গাত্মক বা বিদ্রূপাত্মক বিচ্ছিন্নতায় পৌঁছে দেয়। কবিতার কিছুটা  অংশ উদ্ধৃতি হিসেবে উল্লেখ করলে বিষয়টি খোলাসা হয়:

 “পায়ের নূপুর খুলে এসো মদ

 হাতের মরা পাখিটিকে আপাতত বালিয়াড়ি।

 ছল ছল নিতম্ব-তালে দোলা দেয় জ্যোতিষ্ক

 তার রূপ আকিঞ্চনে ঝরে যায়  দুঃস্মৃতি।

 বঁড়শি হাতে পেলে সে

 জলাঞ্জলি সংসার—”

 আগাগোড়া একটি অস্থির বিষয় কবিতার অন্তর্ভুক্ত যা themes of restlessness  অর্থাৎ মুক্ত ফর্ম। শেষদিকে কবিতার লাইন ভাঙা। গঠনও বিশৃঙ্খল এবং সামঞ্জস্যবিহীন। ইতিহাসের মিথ বা চিরাচরিত ধারণা এই কবিতায় পাল্টে যায়। কবিতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠানবিরোধী। অস্তিবাদকে সমর্থন না করলেও মাঝে মাঝে তা কবিতায় দেখা যায়। কবিতার আরেকটি অংশে লিখেছেন:

 “দুর্বার ক্যানোপি মাথায়

 তুমি জেনারের বসন্তকাল। সেরে ওঠো ক্ষয়।

 ক্ষয়: আত্মার অভ্যন্তরে অনেকক্ষণ সংবিৎ”

 বসন্তরোগের প্রতিষেধক আবিষ্কারক জেনারের উল্লেখ থাকলেও তা পাঠকের প্রত্যাশাকে ছিন্ন করেছে। বসন্তরোগ বসন্তকাল। দেহের অভ্যন্তরে আত্মা না থেকে আত্মার অভ্যন্তরে সংবিৎ। কবিতার শেষ অংশে লিখেছেন:

 “আমার নাবালক মিইয়ে যাচ্ছে

 আমি মৈথুন খুলে খুলে দেখছি, দেখছি প্রস্তুত

 পোষা পিচুটির সৎকার। এবং

 পরাশ্রয়ী ডেটা ব্যাংক: এই দুটো অস্তিত্বে

 আমাদের মখমল ঘিলুর হনহন—”

 সব কবিতার মধ্যেই আছে open ended বা মুক্ত ফর্ম। জাদুবাস্তবতার প্রভাব। শূন্যবাদী অস্তিত্বের সংলাপ। সাধারণ কবিতার বিপরীতে বা প্রতিষ্ঠান বিরোধী কবিতার পক্ষে এই কবিদের শিল্প সাধনা। সৌরভ  বর্ধন কবিতা পাঠককে নতুন অভিজ্ঞতা দান করেছেন।

*১।লাস্ট সিন:অর্পণ, কচিপাতা প্রকাশন, পানাগড় বাজার, পশ্চিম বর্ধমান, মূল্য ৫০ টাকা।

*২। দুঃখ বলে ডাকো:  বিদিশা দে, ঐ

*৩।দেবদারু কিংবা ঈশ্বরী: সুদেব দে, ঐ

*৪।নিরাভরণ: রণজিৎ মাইতি, ঐ

*৫।পোষা পিচুটির সৎকার:সৌরভ বর্ধন, ঐ

 

তৈমুর খান 

 

 

0 - 0

Thank You For Your Vote!

Sorry You have Already Voted!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top