বুক রিভিউ – ৩

– 

[post-views]

নিসর্গ আলোক শয্যায় আমাদের অনিকেত গান –  তৈমুর খান

নিসর্গ আলোক শয্যায় আমাদের অনিকেত গান

সাম্প্রতিককালে তরুণ কবিদের কাছে ছন্দকে অনুসরণ করে কিংবা পরীক্ষামূলক ভাবে ব্যবহার করে কবিতা লিখতে কমই দেখা যায়। কিন্তু এমন কবিও কখনো কখনো পেয়ে যাই যাঁরা ছন্দকে অস্বীকার করতে চান না। তেমনই একজন কবি মনোজিৎ মজুমদার। তিনি স্বরবৃত্ত এবং অক্ষরবৃত্তের চালে কীভাবে বৈচিত্র্য আনা যায় তা দেখাতে পেরেছেন। ছড়ার মধ্যদিয়েও যে সিরিয়াস কবিতা হতে পারে এবং অক্ষরবৃত্তের মধ্যেদিয়েও যে লঘু চাল আনা যায় তা তাঁর কবিতায় লক্ষ করলাম। কবিতার গাম্ভীর্যের মধ্যেও তিনি এক ঝলক ফুরফুরে ঠান্ডা বাতাস বইয়ে দেন। পাঠক অনেকটাই স্বচ্ছন্দ ও হালকা বোধ করেন তখন।

মনোজিৎ মজুমদারের ‘মেঘভাঙা কথকতা'(প্রথম প্রকাশ কার্তিক ১৪২৬) কাব্যগ্রন্থখানি তাই চনমনে উজ্জ্বল সকালের মতো মনে হলো। শব্দের প্রজাপতিগুলি উড়ছে। তাদের কষ্টগুলি রঙিন ডানার নকশা। জীবনপ্রত্যাশী মৌপিয়াসি মনের অনবদ্য নিবেদন আর ফুলেদের কাছে আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত-ই প্রেমের উজ্জীবনকে ধারণ করেছে। কবিতাগুলিতে সেই তারুণ্য উদ্দাম স্ফুটনের সংরাগ বিপুল ঐশ্বর্যে চমৎকৃত। শব্দব্যঞ্জনাকে ছাড়িয়ে গেছে দার্শনিকবোধের সুদুরপ্রসারী ব্যাপ্তি। ফলে কবিতা পাঠের পরও বহুক্ষণ ধরে বাজতে থাকে আমাদের চেতনার তরঙ্গগুলি। জীবনকে মিলিয়ে নিতে থাকি জীবনের অন্তরালের ভাঙন, ক্ষয় ও শূন্যতার দর্শনে। কাব্যের প্রথম কবিতা ‘ফরমান’-এ কবি লিখেছেন:

 “বয়স বেড়ে যায় পালকের মত

 ছেড়ে যায় একে একে সবকটি ট্রেন

 রাত্রির নির্জন প্ল্যাটফর্ম একাকী অপেক্ষায় থাকে

 একটু ভোরের আলো দেখবার”

       এখানে বয়স=সময়ের গতিমানতার হিসাব,

         তার সঙ্গে তুলনীয় পালক।

         ট্রেন= গতির প্রতীক।

         প্ল্যাটফর্ম= হৃদয়।

        ভোরের আলো= সাফল্যের ভাষা।

 জীবন তো এই গুলিরই সমষ্টি। বয়সের গণনায় জীবনকে শুধু বৃদ্ধ হতেই দেখা যায়। কোথাও তার থামার অবসর নেই। সেতো ট্রেনই। সেখানে প্যাসেঞ্জার তো স্বপ্ন। কিন্তু হৃদয় অর্থাৎ প্ল্যাটফর্ম সব সময় ফাঁকা। তার কি কখনো পূর্ণতা আসে? কী তার সাফল্য? মানুষ এই সাফল্য খুঁজতে খুঁজতে দৃষ্টি ক্ষীণ করে ফেলেছেন। তবু তার দেখা পাননি। কবিতার পরবর্তী অংশে কবি বলেছেন, চশমার কোলে জমে চলেছে ক্লেদ। হৃদয় দীঘিতে শ্যাওলার নিশ্চুপ স্তূপ। প্রেমের মৎস্যগুলি বুদবুদ তুলেছে আর রহস্যে মিলিয়ে গেছে। নিরুত্তর কবিও প্রতিটি মানুষের মতোই কবিতার শেষ পংক্তিতে উল্লেখ করেছেন:

 “নীরবতা হাসে সকরুণ আরামকেদারায়…”

       গভীর  তাৎপর্য  নিয়ে নীরবতাই ব্যক্তিচেতনার শূন্যতায় আবর্তিত। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে মার্কিন রোমান্স উপন্যাস এর লেখক ড্যান ব্রাউন(১৯৬৪) তাঁর বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী উপন্যাস ‘দ্য দা ভিঞ্চি কোড'(২০০৩) গ্রন্থে লিখেছেন:”When a question has no correct answer, there is only one honest response.

The gray area between yes and no.

Silence.”

(Dan Brown, The Da Vinci Code :Robert Langdon, #2)

 অর্থাৎ যখন কোনো প্রশ্নের কোনো সঠিক উত্তর নেই, শুধুমাত্র এক  সৎ প্রতিক্রিয়া আছে। হ্যাঁ এবং না এর মধ্যে ধূসর এলাকা। তাই তো নীরব। এই নীরবতার হাসি তো সেই সৎ প্রতিক্রিয়াই। কখনো তা “নীরবতার মেঘলা উপনয়ন।”

       সমগ্র কাব্যে এরকমই কবিতা। ছন্দময় আবেগের দৃঢ় বন্ধনে যে ছবিগুলি ভেসে ওঠে তো আমাদেরই কারুণ্য ও ব্যর্থতাকে ইঙ্গিত করলেও নতুন রূপে নিজেকে আবিষ্কারের খেলাটিও কম মজার নয়। ‘আপন হলাম’ কবিতায় এরকমই একটি স্তবক:

 “আশার ঠোঁটে বাবুইবাসা

 ভালোবাসার আকাশ বুনি

 নীলের ভিড়ে খুঁজতে তোমায়

 তোমার ভেতর আমায় গুনি”

     লঘুচালে সিরিয়াস কথাবার্তা যেমন আছে, তেমনি দেখার ভেতরও এক ভিন্ন দর্শনের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। উপলব্ধির মধ্যেও এক ভিন্ন বোধের তাৎপর্য বহন করে। সহজ করে বলা, সহজ শব্দের ভেতর দুরূহকে চালিত করা এবং ক্রিয়াগুলিকে বহুমুখী ব্যঞ্জনায় উন্মুক্ত করা এই কবির কাছে যেন অনায়াস হয়ে গেছে:

 “বেড়ালের নাকে গন্ধ দুপুর। তরতাজা বাগান বিলাস।

 জানালার ঘুমে বৃষ্টির ছাঁট। বৃষ্টির ঘুমে নীলাচল।

 এখন শরীরে ভরা বর্ষার ডাক।”

      বিড়ালের নাকে গন্ধ দুপুর, তরতাজা বাগান বিলাস, জানালার ঘুমে বৃষ্টির ছাঁট, বৃষ্টির ঘুমে নীলাচল, শরীরে ভরা বর্ষার ডাক খুব চেনা চেনা বিশেষণ এবং ক্রিয়া। বিশেষ্য হলেও ব্যবহারটি একেবারে নতুন। উপলব্ধি আছে, জগৎ বা দৃশ্য আছে, কিন্তু ব্যাখ্যার ভাষা নেই। আমরা এই কবির কাছেই শিখতে পারি সব নঞর্থককে সদর্থক করার কৌশল। বিরহকে স্বপ্নের  আরক দিয়ে সুন্দর করতে যেমন পারি, তেমনি শূন্যতাকে ভরিয়ে তুলতে পারি স্বপ্নলিপির দৃশ্য দিয়ে। কদর্য, ভঙ্গুর, মূল্যবোধহীনতার নিরুৎসাহ থেকে বেরিয়ে কিছুটা সহজ সুন্দর বিজ্ঞাপনের পাশে দাঁড়াই। প্রকৃতির অনাবিল সৌজন্য আমাদের উৎসুক করে। কাব্যের নাম কবিতায় কবি উল্লেখ করেন:

 “বিকেলের কাছে ছিল

 আমাদের উষ্ণতা

 হলুদ দোয়েল

 মেঘভাঙা কথকতা

 ঘিরে ছিল ছায়া ছায়া

 একটি বাসায়,

 অনিকেত গান নিয়ে

 ভাসাই আকাশখানা

 মন উদ্বেল

 তারপর কাছে আসা

 উড্ডীন ভালোবাসা

 স্বপ্নের গায়।”

 নিজেদের তখন আর নিঃস্ব মনে হয় না। প্রেমহীন মনে হয় না। বিকেলের উষ্ণতা থেকে মেঘভাঙা কথকতার মধ্যে নিসর্গ আলোক শয্যায় আমাদের অনিকেত গান জেগে ওঠে। স্বপ্ন আর উড্ডীন ভালোবাসায় ভেসে চলি। তখন শত শত রূপে অরূপ কাহন। স্পর্শের কানে, ঠোঁটের তটে মানেহীন দিন আমাদের সর্বব্যাপী প্রেমের ভারসাম্য নিয়ে আসে।

         সব কবিতাতেই মুগ্ধতার আবেশ। যৌবনের টলটলে শিশির, কিন্তু কোথাও যৌনতা নেই। স্মার্ট এবং নির্মল কবিতাগুলি সব শ্রেণির পাঠকের কাছেই আদরণীয়। কবিতার সঙ্গে চিত্রগুলিও বাড়তি প্রাপ্তি। পাঠকের কল্পনা ও উপলব্ধিকে সুচারু করে দেয়।

 তৈমুর খান

 মেঘভাঙা কথকতা: মনোজিৎ মজুমদার, আমি অনন্যা প্রকাশনী, ধানবাদ:৮২৬০০১, প্রচ্ছদ ও অলংকরণে শ্রী বিপ্লব রায়। মূল্য ১০০ টাকা।

 তৈমুর খান

তৈমুর খান 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top