বুক রিভিউ

[post-views]

 জীবনের আলোকে মহাজীবনের ধারক – তৈমুর খান

———————————————————————


গীতিকবিতার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, কবি তাঁর ব্যক্তিজীবনের মর্মছায়ায় বিশ্রামের অন্বেষণ করেন। তাঁর সত্তার জাগরণ টের পান সেভাবেই আত্মস্ফুরণের নানা বাঁকগুলিতে। ব্যক্তিজীবনে সঞ্চিত যে মায়া, যে সম্পর্কের টান, যে স্মৃতির ব্যাপ্তি তা তাঁর সামগ্রিক জীবনবোধেরই দরজা খুলে দেয়। এই জীবনবোধের মৃত্যু হয় না, তা সঞ্চারিত হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। তাই গীতিকবির একটা জীবন বহুজীবনেরই অন্বয়। হৃদয়ের স্পন্দনগুলি জন্মান্তরের ক্রিয়ায় উদ্বোধিত, সমোচ্চারিত। এই প্রসঙ্গে বিখ্যাত নোবেলজয়ী বিংশ শতাব্দীর আইরিশ কবি সিমাস হীনি(১৯৩৯-২০১৩) তাঁর দীর্ঘ কবিজীবনের অভিজ্ঞতায় জেনেছিলেন: “In fact, in lyric poetry, truthfulness becomes recognizable as a ring of truth within the medium itself.”(Opened Ground: Selected poems) অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে গীতিকবিতা কবির সত্য মাধ্যমের আংটি হিসেবেই স্বীকৃতি লাভ করে। আজকের বহু তরুণ কবির মধ্যেও এই বোধের প্রতিফলন দেখা যায়। এঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কবি অনিমেষ মণ্ডল। সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘বাকিটুকু চরাচর'(প্রথম প্রকাশ শারদীয়া ১৪২৭) কাব্যের বিয়াল্লিশটি কবিতায় এই recognizable as a ring of truth এর দেখা পেলাম।

   কাব্যের প্রথম কবিতা ‘মৃত্যুহীন’-এ তিনি উল্লেখ করেছেন:

 “যত দূরে আমি যাই

        মনে পড়ে

 গোবরে নিকানো ঘর

 ছাই লাগা আঁশবটি

 ঠাকুমার শিরা ওঠা পা

 যেখানে আমার প্রণাম

 বহুকাল আগেই দেখেছি”

       ‘যত দূরে আমি যাই’ এবং ‘মনে পড়ে’ ক্রিয়াগুলি যেভাবে তাদের কর্ম সম্পাদন করেছে তাতে সমগ্র জীবনের ছায়াকেই অনিমেষ অনুসরণ করেছেন। অতীত থেকে বর্তমান, বর্তমান থেকে ভবিষ্যৎ জুড়ে যে বৃত্ত তিনি রচনা করেছেন তাতে উত্তরাধিকারের শেকড় সন্ধানই বড় হয়ে উঠেছে। জীবনচর্যার গভীরে লুকানো সেইসব জীবনযাপনেরই ছবি এবং তার প্রতি সমীহ ও সম্মোহন। আবার দ্বিতীয় কবিতাতেও বললেন:

 “একা একা যেতে পারি বহুদূর

          তবু ভাবি

 কতদূর যাওয়া যায় একা একা

 হাঁটতে হাঁটতে আলো এসে পড়ে মুখে

 দূর থেকে আলো আসে

           কতদূর জানা নাই

 জোনাকিও সে সময়

 কাছে এসে কুশল শুধায়

 কয়েকটা শুকনো পাতা ঝরে পড়ে

         অরণ্যের নিমগ্ন গভীরে

 ফিসফাস শব্দ শোনা যায়”

                              (আশ্রয়)

 ‘দূর’ এবং ‘বহুদূর’ দুটি দূরত্ব নির্দেশক বিশেষণ যা বহু পথের ভেতর কবিকে জাতিস্মর করে তোলে। ‘তবু’  অব্যয়টির ব্যবহারই ইহজাগতিক দ্বন্দ্বময়তার মধ্যে নিক্ষেপ করে ঠিকই, কিন্তু কবিতার পরবর্তী অংশে জোনাকির কুশল শোধানো, অরণ্যের ফিসফাস কবিকে ইহজাগতিক প্রজ্ঞা থেকে পরাজাগতিক ব্যাপ্তি দান করে। আর রাত্রির জরায়ুতে আশ্রয় অর্থাৎ শাশ্বত আশ্রয়ের মধ্যে দিয়ে সেই ‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলোয়’ নিজেকে আবিষ্কার করেন।

    প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের এই মগ্নচারী অভিনিবেশ কিছুটা শুশ্রূষার আকাঙ্ক্ষা থেকেই প্রাপ্ত বৈকি! কেননা করতলে মুখের বিহ্বল তুলে ধরার ইচ্ছাবৃত্তটি ভাবনার সিদ্ধিতে পৌঁছাতে পেরেছে। কবির প্রিয় শব্দগুলির মধ্যে অন্যতম হলো ‘নিঃসীম’ যা সৃষ্টির মূল ভাবকেন্দ্রে কবিকে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। ‘নিঃসীম’ নীরবতার বা  স্তব্ধতার সঙ্গে তার গভীর ব্যাপ্তিকেও বোঝায়। কবি যখন লেখেন:

 “ঐ নিঃসীম চরাচর”

 তখন সমগ্র সৃষ্টিতত্ত্বই মহামহিম ব্রহ্মময় দিগদর্শনের  বিস্তৃতিতে ব্যঞ্জিত। গ্রিক গণিতবিদ ও দার্শনিক

পিথাগোরাস (Pythagoras) বলেছিলেন:”silence is better than unmeaning words” অর্থহীন শব্দের থেকে নীরবতা শ্রেষ্ঠ। অনিমেষ সমগ্র কাব্য জুড়ে সেই নীরবতাকেই লালন করেছেন। পাঠকের জন্য রেখে দিয়েছেন এক বিস্তৃত space যা নিঃসীম, অনন্ত। তিনি বলেছেন ‘সেই এক অনন্তের দিকে চলে যাওয়া’। আমরাতো অনন্তেরই সন্তান। অনন্তই আমাদের ঈশ্বর। পৃথিবীর ধূলি-ধূসর জীবনের চিহ্নগুলি আমরা বয়ে নিয়ে যাই। তখন মনে হয়:

 “পদতলে ঘাস আর শিশিরের ক্ষণস্থায়ী বন্ধুত্ব

 এসব উপলব্ধি পেরিয়ে

                যতদূর চোখ যায়

 নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে

 পৃথিবীর কক্ষপথে রাখি…..”

       নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে বহু ‘আমি’র ভেতর ছড়িয়ে দিয়েই ‘তুমি’কে খোঁজ করেছেন। কে এই ‘তুমি’? কবি বলেছেন:

 “তুমি যেন নিখিলের মাঝখানে থেকো”

 এই ‘তুমি’ তো ব্রহ্মা, প্রত্যেক ‘আমি’র-ই ‘তুমি’ থাকে। তুমি কখনো ঈশ্বর, কখনো নারী, কখনো নিজেরই আরেকটি সত্তা। নিজেরই মুখোমুখি হওয়ার যে সাধনা কবিতায় ও শিল্পে চলে, বাউল সাধকরা তাকেই ‘মনের মানুষ’ হিসেবে জানেন। অনিমেষ এই ‘তুমি’কে খুঁজেছেন। কখনো তা অপার্থিব মায়াময়, কখনো তা আলো, কখনো তা এই জগৎ। নিজের মরচে ধরা ছায়াকে তারমধ্যে চালিত করেই সেই অপার্থিব বিশ্রাম চান কবি। ক্লান্তির মহালগ্নগুলি অপার্থিব সন্ন্যাসে মুগ্ধ জীবনের রৌদ্রছায়ায় কাটাতে চান।

          কিন্তু অপেক্ষা কবিকে ক্লান্ত করেছে। রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের বিষণ্ণতা স্পর্শ করেছে। কবি উপলব্ধি করেছেন:

 “চরাচর ক্রমে নিঃস্ব হয়ে আসে

 চারিদিকে শব্দহীন আলো

 গিলে খাচ্ছে বিমূর্ত আঁধার”

 ‘মহাজাগতিক’ এই আঁধার তো সৃষ্টির জরায়ু। সেখানে পুনরুত্থানের আভাসও পেয়েছেন কবি। পতাকা উড়িয়ে দেবার নির্দেশও এসেছে। কিন্তু কবি যে সেই নিঃসীম অনন্তের দুয়ারে নিজেকে শুধু মিলিয়ে দিতে চান। তাই:

 “বাকিটুকু চরাচর

 আর ধুলোলাগা মানবজীবন

 পড়ে থাকে শূন্যতার কাছাকাছি”

   শূন্যতার কাছেই আত্মসমর্পণ কবির। তখন অন্ধকারও পবিত্র মনে হয়। ‘নিঃসীমে’ কবি ‘নিঝুম’ হয়ে যান। তখন ‘আনন্দবাঁশি’ বাজাতেও পারেন।

        ছোট ছোট কবিতাগুলি অন্তর্মুখীন ভাবনায় মিতবাক দার্শনিকের প্রজ্ঞায় স্থিত ও স্মিত। মগ্নতার সূক্ষ্মপথে অগ্রসর হতে পারলে বোঝা যায় কবি কতখানি আত্মবাহী পর্যটক। জীবনের আলোকে মহাজীবনের ধারক। নিজস্ব এক সহজিয়া কাব্যভাষায় চিরন্তনীর রূপকার। কাব্যের সঙ্গে প্রচ্ছদের অপূর্ব সংযোজন। শিল্পীকে ধন্যবাদ।

 

————————————————————

 

 *বাকিটুকু চরাচর: অনিমেষ মণ্ডল, বার্ণিক প্রকাশন, পূর্ব বর্ধমান, প্রচ্ছদ শিল্পী: সম্পিতা সাহা, মূল্য:৮০ টাকা।

বাকিটুকু চরাচর: অনিমেষ মণ্ডল,

তৈমুর খান 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top