বৈষ্ণব পদাবলীর চতুষ্টয় — ৩য় পর্ব

বৈষ্ণব পদাবলীর চতুষ্টয়-৩য় পর্ব
=======================
সৌম্য ঘোষ
“”””””””””””””””””””””””””””””””

আগের পর্বের অংশ:
~~~~~~~~~~~~

বৈষ্ণব মতকে কেন্দ্র করে রচিত সাহিত্য—— বৈষ্ণব সাহিত্য। পঞ্চদশ শতকে শ্রীচৈতন্যদেবের ভাব-বিপ্লবকে কেন্দ্র করে গোটা বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব সাহিত্যের জন্ম হয়। বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের সূচনা হয় চতুর্দশ শতকে বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাসের সময়। তবে ষোড়শ শতকে এই সাহিত্য বিকশিত হয়। বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রধান অবলম্বন রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা।
বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাস বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের আদিকবি বলে বিবেচিত হন। চতুর্দশ শতকে বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাস এবং ষোড়শ শতকে জ্ঞানদাস ও গোবিন্দ দাস — এই চারজনকে বৈষ্ণব সাহিত্যের ‘চতুষ্টয়’ বলা হয়।
প্রথম পর্বে কবি বিদ্যাপতি সম্বন্ধে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি। দ্বিতীয় পর্বে কবি চন্ডীদাস
সম্বন্ধে আলোচিত করা হয়েছে । তৃতীয় ও শেষ পর্বে ‘চতুষ্টয়’ – এর অপর দুই কবি তথা কবি জ্ঞানদাস
এবং কবি গোবিন্দদাস সম্পর্কে আলোকপাত করার প্রয়াস রাখলাম:

~~~~~~~~~~~~
কবি জ্ঞানদাস
~~~~~~~~~~~~~

ষোড়শ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জ্ঞানদাস। ষোড়শ শতাব্দীতে সুবর্ণ যুগ রূপে আখ্যায়িত করা হয়। ১৫৩০ খ্রিঃ বর্ধমান জেলার
কাঁদড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ব্রাহ্মণ পরিবারে। তিনি রাঢ় অঞ্চলের অধিবাসী। স্বয়ং নিত্যানন্দের স্ত্রী জাহ্নবা দেবীর শিষ্য ছিলেন। চৈতন্যচরিতামৃত নিত্যানন্দ শাখায় জ্ঞানদাসের নাম পাওয়া যায়।
পূর্বরাগ, অনুরাগ, রূপানুরাগ, নিবেদন ও আক্ষেপানুরাগ পর্যায়ে তিনি শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় রেখেছেন। রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলী ছাড়াও
গৌরাঙ্গ ও নিত্যানন্দ লীলা বিষয়ক পদ লিখেছেন।
জ্ঞানদাস কে দ্বিতীয় চন্ডীদাস বা চন্ডীদাসের ভাবশিষ্য বলা হয়ে থাকে। তিনি মঞ্জরী ভাবের উপাসক ছিলেন। গীতিকবি জ্ঞানদাসকে পদাবলী সাহিত্যের রোমান্টিক কবি হিসেবে দেখা হয়। বাংলা ও ব্রজবুলি দুই ভাষাতেই তিনি পদ রচনা করেছেন। কাব্য জীবনের প্রথম দিকে তিনি বিদ্যাপতিকে গুরুরূপে বরণ করেছিলেন। ‌ দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে, চন্ডীদাসকে গুরুরূপে বরণ করেন।
ফলে তাঁর প্রথম পর্যায়ের পদগুলিতে বিদ্যাপতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায় এবং পরবর্তী পর্যায়ে পদগুলিতে চন্ডীদাসের ভাবগভীরতা ও ব্যঞ্জন ধর্মীতা অনুসরণ করেন। তিনি বৈষ্ণব পদ সাহিত্যে
বংশীমূলক পদ সংযোজন করেছেন। তিনি মূলতঃ নিত্যানন্দ গোষ্ঠীর কবি ছিলেন। শ্রীজীব গোস্বামী, রঘুনাথ দাস, গোপাল ভট্ট, কৃষ্ণদাস কবিরাজ
প্রভৃতি বৈষ্ণব আচার্যের সংস্পর্শে আসেন। হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় এর মতে, জ্ঞানদাসের পদসংখ্যা — চারশত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একদা বলেছিলেন —
‘জ্ঞানদাসের কবিতা যখন শুনলুম তখন মনে হলো এই যে আধুনিক।’

কবি জ্ঞানদাসের কিছু পদ আলোচ্য প্রবন্ধে
সংযোজিত করলাম ——-

গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদ
~~~~~~~~~~~~~~
*সহচর অঙ্গে গোরা অঙ্গ হেলাইয়া।

পূর্বরাগ ও অনুরাগ
~~~~~~~~~~~~~~
*আ লো মুঞ্চি জানো না।
* রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।
* জাতি কুল শিল মোর সব বুঝি গেল।
* ঘরে যাইতে পথ মোর হইল অফুরান।

রূপোল্লাস
~~~~~~~~~~
* দেখে এলাম তারে সই দেখে এলাম তারে।

অভিসার
~~~~~~~~~
*কানু অনুরাগে হৃদয় ভেল কাতর।
*মেঘ যামিনী অতি ঘন আন্ধিয়ার।

বংশী ও নিত্য শিক্ষা
~~~~~~~~~~~~~~
*ঘর হইতে আইলাম বাঁশি শিখিবারে।
*ধরবা ধরবা ধর মোর পীতবাস পর।

প্রেম বৈচিত্ত্য ও আক্ষেপানুরাগ
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
*সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু।

নিবেদন
~~~~~~
* বঁধু তুমি যে আমার প্রাণ।
* বঁধূ, তোমার গরবে গরবিনী হাম।

~~~~~~~~~~~~~
কবি গোবিন্দ দাস
~~~~~~~~~~~~~
চৈতন্য পরবর্তী কালে বৈষ্ণব কবি গোবিন্দ দাস। ষোড়শ শতাব্দীর চতুর্থ দশকে চৈতন্য তিরোধানের পর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি বর্ধমানের কাটোয়ার কাছে শ্রীখন্ড গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাঁর আদি নিবাস—
কুমার নগর। তাঁর পিতা ছিলেন — চৈতন্য ভক্ত চিরঞ্জীব সেন। ‌ মাতা— সুনন্দা দেবী। কবি গোবিন্দ দাসের মাতামহ ছিলেন — পন্ডিত দামোদর সেন। ‌”সঙ্গীত দামোদর” গ্রন্থের রচয়িতা। ‌
গোবিন্দদাসের পত্নী ছিলেন —- মহামায়া দেবী।
গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন ভাবধারা দ্বারা প্রভাবিত হয় তিনি পদ রচনা করেন। তিনি ভক্ত ও পন্ডিত কবি। রসশাস্ত্রে তার অগাধ পাণ্ডিত্য।
তাঁকে “দ্বিতীয় বিদ্যাপতি” বলে আখ্যায়িত করা হয়। গৌরাঙ্গ বিষয়ক, গৌড়চন্দ্রিকা বিষয়ক এবং
অভিসার পর্যায়ের পদ রচনা তিনি শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় রেখেছেন। ড: বিমানবিহারী মজুমদারের
কথ্য অনুসারে, গোবিন্দ দাসের পদ সংখ্যা–
আটশত। তাঁর পদে যশোর রাজা প্রতাপাদিত্যের নাম পাওয়া যায়। কবি গোবিন্দ দাস মূলত:
ব্রজবুলি ভাষায় পদ লিখেছিলেন। তাঁর পদে
সংস্কৃত শব্দের বাহুল্য দেখা যায়। ‌ শব্দচয়নে নৈপুণ্য, অলংকার বিন্যাস কৌশল, ছন্দ সুষমায়, কাব্যের আঙ্গিক উৎকর্ষ সৃষ্টির ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য স্বাক্ষর রেখেছেন।
কবি গোবিন্দ দাসের বিশেষণ—
অলৌকিক কবি, শাব্দিক কবি, সঙ্গীত প্রধান কবি ইত্যাদি। তিনি তাঁর শেষ জীবন কাটিয়েছেন—- মুর্শিদাবাদের তেলিয়া বুধুরী গ্রামে।
তিনি প্রথম জীবনের শাক্ত ছিলেন। পরে “শ্রীনিবাস
আচার্যের” সংস্পর্শে এসে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন।
গোবিন্দদাসের পবিত্র শক্তিতে মুগ্ধ হয়ে শ্রীজীব গোস্বামী তাঁকে “কবিরাজ” বা “কবীন্দ্র” উপাধি দেন।
কালিদাস রায় তার প্রবন্ধে বলেছেন—-
‘গোবিন্দ দাসের মতো শ্রেষ্ঠ কবি শুধু বাংলায় কেন ভারতবর্ষেও দুর্লভ।’

কবি গোবিন্দ দাসের কিছু পদ নমুনা হিসেবে প্রবন্ধের সঙ্গে সংযোজিত করলাম আগ্রহী পাঠকদের জন্য —–

গৌরাঙ্গ বিষয়ক
~~~~~~~~~~~~
*নীরদ নয়নে নীরঘন সিঞ্চনে
*চম্পক শোন — কুসুম কনকাচল

পূর্বরাগ ও অনুরাগ
~~~~~~~~~~~~~~~
*ঢলঢল কাঁচা অঙ্গে লাবনি
* যাঁহা যাঁহা নিকসয়ে তনু তনু জ্যোতি
*সহচরী মেলি চললি বররঙ্গিনী

অভিসার
~~~~~~~~
*কন্টক গাড়ি কমল সম পদতল
*মাধব কি কহব দৈব বিপাক
*সুন্দরী কৈছে করবি অভিসার
* নিজ কর কমলে চরণ যুগ মোছই

প্রেম বৈচিত্ত্য ও আক্ষেপানুরাগ
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
*নাগর সঙ্গে রঙ্গে যব বিলসই
* আমি তারে ভালোবাসি অস্থিমজ্জা সহ ।

========================
(সমাপ্ত)

লেখক : সৌম্য ঘোষ। চুঁচুড়া।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *