বৈষ্ণব পদাবলীর চতুষ্টয় — পর্ব ১

STORY AND ARTICLE :

বৈষ্ণব পদাবলীর “চতুষ্টয়” — পর্ব ১
=======================
সৌম্য ঘোষ
=======================

বৈষ্ণব মতকে কেন্দ্র করে রচিত সাহিত্য– বৈষ্ণব সাহিত্য। পঞ্চদশ শতকে শ্রীচৈতন্যদেবের ভাব-বিপ্লবকে কেন্দ্র করে গোটা বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব সাহিত্যের জন্ম হয়। স্বয়ং শ্রীচৈতন্যদেব মহাপ্রভু নিজে কোন পুস্তক লিখে যাননি। অথচ তাঁকে ঘিরেই রচিত হয় এই সাহিত্য। বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের সূচনা হয় চতুর্দশ শতকে বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাসের সময়। তবে ষোড়শ শতকে এই সাহিত্য বিকশিত হয়। বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রধান অবলম্বন রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা।
বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাস বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের আদিকবি বলে বিবেচিত হন। চতুর্দশ শতকে বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাস এবং ষোড়শ শতকে জ্ঞানদাস ও গোবিন্দ দাস — এই চারজনকে বৈষ্ণব সাহিত্যের ‘চতুষ্টয়’ বলা হয়। বিদ্যাপতি মূলতঃ ব্রজবুলি ভাষায় বৈষ্ণব পদাবলী রচনা করেছিলেন।
আলোচ্য প্রবন্ধে চতুষ্টয় কবিবরদের সম্বন্ধে
যতটা সম্ভব উপস্থাপন করার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস—

বিদ্যাপতি
~~~~~~~~~~
বিদ্যাপতি প্রাকচৈতন্য যুগের কবি । বিহারের দ্বারভাঙ্গা জেলার মধুবনী পরগনার বিশফী গ্রামে ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেন।
জন্ম ১৩৮০ , মৃত্যু আনুমানিক ১৪৬০ ।
তাঁর পিতার নাম গণপতি ঠাকুর। বিদ্যাপতির কূল পদবী ‘ঠাকুর’। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন শৈব্য ধর্মে বিশ্বাসী।
বিদ্যাপতি বহুভাষাবিদ ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। ভূগোল, ইতিহাস, স্মৃতিশাস্ত্র, সংস্কৃত শাস্ত্রে তিনি পারদর্শী ছিলেন। তাই তাঁকে বলা হত কবি সার্বভৌম। তিনি অনেক রাজা রানীর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। সর্বপ্রথম তিনি রাজা ভোগীশ্বরের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন।
যতদূর জানা যায়, তিনি ছয়জন রাজা এবং একজন রানীর পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন। তিনি মিথিলার কবি। তাঁর উপাধি ছিল — ‘রসিক সভা ভূষণ সুখকন্দ’। তাঁর একাধিক বিশেষণ ছিল।যেমন —– কবি সার্বভৌম, মৈথিল কোকিল, পঞ্চোপাসক।

তাঁর রচিত গ্রন্থাবলী —–
(১) ভূ পরিক্রমা ( ১৪০০ খ্রীঃ)
(২) পুরুষ পরীক্ষা (১৪১০)
(৩) কৃর্তিপতাকা (১৪১০)
(৪) লিখনাবলী ( ১৪১০)
(৫) কীর্তিলতা (১৪১০)
(৬) গঙ্গাবাক্যবলী (১৪৩০– ৪০)
(৭) শৈবসর্বস্বহার (১৪৩০–৪০)
(৮) দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী ( ১৪৪০–৬০)
(৯) বিভাবসার ( ১৪৪০–৬০)
(১০) দানবাক্যবলী (১৪৪০–৬০)
(১১) গোরক্ষবিজয়
(১২) মনি মঞ্জরী ।

বিদ্যাপতিকে দান্তে ও চসারের সাথে তুলনা করা হয়। তিনি চল্লিশ বছর বয়সে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁর রচিত রাধাকৃষ্ণ পদাবলী পদ আছে মোট আনুমানিক পাঁচশো টি। বিদ্যাপতি মৈথিলী ভাষায় পদ রচনা করেছিলেন। প্রকৃত অর্থে ব্রজবুলি হলো — বাংলা ও মৈথিলী ভাষার সংমিশ্রণে একটি মিশ্র ভাষা। অনেকের ধারণা,
ব্রজধামের গোপ-গোপীনীরা এই ভাষায় কথা
বলতেন, তাই ব্রজবুলি। স্বয়ং মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব বিদ্যাপতির পদ আস্বাদন করতেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত “মৃণালিনী” উপন্যাসে যে বৈষ্ণব পদ রচনা করেছেন তার ভাষা ব্রজবুলি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলীতে ব্রজবুলি ভাষা ব্যবহার করেছেন।
শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কাব্য প্রতিভা প্রসঙ্গে “বাংলা সাহিত্যের বিকাশের ধারা”
গ্রন্থে বিদ্যাপতিকে ‘COSMIC IMAGINATION’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
__________________________________________

লেখক — সৌম্য ঘোষ। চুঁচুড়া।
___________________________________________

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top