বোঝাপড়া লেখিকা শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য্য

বোঝাপড়া
শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য্য

রায়বাড়ির একমাত্র ছেলে অর্ঘর সাথে দুমাস হলো বিয়ে হয়েছে অতসীর। মাত্র সাত-আট বছর বয়সেই মা-হারা অতসীকে, বাবা প্রশান্তবাবুই একাধারে মা আর বাবা দুই দায়িত্বই সমান দক্ষতায় পালন করে, যথাযথ ও উচিত শিক্ষায় মানুষ করেছেন। তাই আপাত ভদ্র, নম্র ও রুচিশীলা অতসী কিছুটা প্রতিবাদী। অন্যায়ের সাথে আপোষ ওর স্বভাব বিরুদ্ধ।

শ্বশুরবাড়িতে এসে এই কদিনেই অতসী বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছে, রায় বাড়িতে ওর শ্বশুর মশাই শ্রীযুক্ত অধর রায় মহাশয়, এই বাড়ির সদস্যদের ক্রমিক পদমর্যাদায় একেবারেই উচ্চাসনে আসীন। বাড়ির সদস্যদের ভয়ে, শ্রদ্ধায় তাঁর অবস্থান খানিকটা ওই ভগবানেরই সমতুল্য। তাঁর অকারণ চড়া ও রুক্ষ মেজাজে নিরীহ ও শান্ত প্রকৃতির শাশুড়িমা সুলেখাদেবী সর্বক্ষণই তটস্থ। সুলেখাদেবী কথায়, হাবেভাবে অতসীকে এই ব্যাপারটাই বারবার বোঝাবার চেষ্টা করেন যে এই বাড়িতে সুলেখাদেবী কে সম্মান না করলেও, তিনি কিচ্ছুটি মনে করবেন না। তিনি এই বাড়ির অতি তুচ্ছ বস্তু। তাঁর এই সম্মানের কোন প্রয়োজনই নেই। কিন্তু শ্বশুর মশাইকে সম্মান করতে হবে দেবতা জ্ঞানে। এমনকি তাঁর ভাগের প্রাপ্য সম্মানটুকুও শ্বশুর মশাইকে দিয়ে দিলেই, তিনি খুশি হন। অর্ঘও বাবাকে খানিকটা এড়িয়েই চলে। বাবার কোন কথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবার সাহস সচারাচর দেখায়না। হয়ত সেই সাহসের যথেষ্ট অভাব আছে ওর মধ্যে।

রাতে রান্নাঘরের কাজ সেরে অতসী ঘরে ঢুকে দেখে, অর্ঘ বিছানায় শুয়ে মোবাইলে ইউ টিউবে বেশ মন দিয়ে কিসের একটা ভিডিও দেখছে। কোন কথা না বলে অতসী, অ্যাটাচড বাথরুমে ঢুকে সারাদিনের জামাকাপড়টা বদলে ফ্রেশ হয়ে নিল। আয়নার সামনে বসে নাইট ক্রিমটা লাগাতে লাগাতে, আড়চোখে একবার দেখল অর্ঘকে। মোবাইলটা অফ করে মহাশয় তখন উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে অতসীর দিকে। এই দৃষ্টির মর্মার্থ উপলব্ধি করে, অর্ঘর দিকে একটা ছদ্ম রাগের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, অতসী বডিলোশনটা ড্রয়ার থেকে বার করতে যাবে, পাশে শ্বশুর-শাশুড়ির ঘর থেকে হঠাৎ-ই বেশ জোরে একটা আওয়াজ এল। খানিকটা ওই চপেটাঘাতের মতই শব্দটা। চমকে উঠল অতসী। এই ধরনের শব্দ এর আগে কখনও ও শোনেনি এই বাড়িতে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো অর্ঘর দিকে। আওয়াজটা শোনামাত্রই অর্ঘ একেবারে কুন্ঠিত হয়ে পড়েছে। লজ্জায় অতসীর দিকে চাইতে পারছেনা।
——” আওয়াজটা কিসের অর্ঘ?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো অতসী।
অর্ঘ উত্তর দিতে যাবে, সেইমুহূর্তেই আরও একবার সেই একই শব্দ ভেসে এল পাশের ঘর থেকে।
অতসী এবার উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো—-” অর্ঘ কিসের আওয়াজ এটা?”
অর্ঘ সসংকোচে বলল—” বাবা মনে হয় মায়ের গায়ে হাত তুলেছেন। কোন কারণে হয়তো মায়ের উপরে রেগে গিয়ে চড় মারছেন।“
—–” সেকি! কি সাংঘাতিক? আর এত বড় কথাটা তুমি এত হাল্কাভাবে বলছো কি করে অর্ঘ? তোমার তো বাধা দেওয়া উচিত?”

পরিস্থিতিটাকে স্বাভাবিক করবার জন্য অর্ঘ বলল—-” আসলে বাবা-মায়ের এই ঝামেলা আমি ছোট থেকেই দেখে অভ্যস্ত। বাবা রেগে গেলেই মাকে মারধোর করেন। আমায় ছোট থেকেই শেখানো হয়েছে, বড়দের ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমি যেন কথা না বলি। ‘মা’, বাবার হাতে ঠায় দাঁড়িয়ে মুখ বুজে মার খেতেন, তবুও আমায় কোনদিন বাধা দিতে দেননি। এতে নাকি বাবাকে অসম্মান করা হয়। তাই আমি আর এর মধ্যে যাইনা। তুমিও এই নিয়ে মাথা ঘামিওনা। বাবা-মা কেউই পছন্দ করবেন না। কাল সকালে দেখবে, মা দিব্যি আবার স্বাভাবিক হয়ে গেছেন।“

——” বাহ! কি যুক্তি। খালি বাবা-মা পছন্দ করেননা বলে তোমার সামনে ‘মা’ এইভাবে মার খাবেন, আর তুমি তাকিয়ে তা দেখবে? তারপর আবার বলছো, ‘মা’ এত মার খেয়েও কাল আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবেন? আজ আমি তোমার গালে ঠাঠিয়ে একখানা চড় কষাই তো অর্ঘ? দেখি তো কাল কেমন তুমি স্বাভাবিক হয়ে যেতে পার? তোমার আত্মোসম্মানে লাগে কিনা?”

অর্ঘ এবার বেশ বিরক্ত হয়ে বলল—” এসব কি আজেবাজে কথা বলছো অতসী? বাবা-মায়ের অশান্তিটা আমাদের মধ্যে টেনে আনছো কেন?”

অতসী একটু হেসে বলল—” শুধু চড় খাওয়ার নামেই তোমার গলার স্বর কেমন ভারী হয়ে গেল, দেখলে অর্ঘ? আর পাশের ঘরে যে মানুষটা অন্যায়ভাবে বিনাপ্রতিবাদে চড় খাচ্ছেন, তিনি তোমার ‘মা’ অর্ঘ। এই অনুভূতিটুকু তোমার আছে? কাল ওই নিরীহ মানুষটা মোটেও স্বাভাবিক হবেন না অর্ঘ, শুধু স্বাভাবিক থাকবার অভিনয় করবেন মাত্র। এই সূক্ষ্ম ব্যাপারটা বোঝবার ক্ষমতা বোধহয় তোমার একেবারেই নেই।“

অর্ঘ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, আবার এল সজোরে চপেটাঘাতের সেই শব্দ। এবার অতসী আর একমুহূর্তও অপেক্ষা না করে দৌড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

শাশুড়িমায়ের ঘরের বন্ধ দরজা ঠেলে ঢুকেই সর্বাগ্রে নজর এল, শ্বশুর মশাইয়ের উদ্দত হাতখানা। শাশুড়িমায়ের গালে সেটা আবার পড়বার আগেই দ্রুত গিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল অতসী। এতবছর ধরে চলে আসা এই বাড়ির নিয়ম ভেঙ্গে, ঘটে যাওয়া এই অভাবনীয় কান্ডে অধরবাবু বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁর কোন কাজে যে কেউ এসে সরাসরি বাধা দিতে পারে, তাঁর এই হাতটা যে কেউ এভাবে মুচড়ে শক্ত করে ধরে তাঁর চোখে চোখ রাখতে পারে, এ ওঁনার কল্পনার বাইরে। কিছুক্ষণের বিহ্বলতা কাটিয়ে তিনি অত্যন্ত উগ্রভাবে বললেন—-” এটা কোন ধরনের শিক্ষা তোমার বউমা? শ্বশুর-শাশুড়ির ঘরে এভাবে বিনা অনুমতিতে ঢুকে, আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছো? ‘মা’ মারা গেছেন জানি। কিন্তু বাবা কি কিছুই শিক্ষা দেননি?”

একটু হেসে বেশ দৃঢ়ভাবে বলল অতসী——” বাবার দেওয়া শিক্ষার জোরেই তো আজ আপনার মুখোমুখি হতে পেরেছি আমি। বাবার শেখানো রুচিবোধেই আপনার অন্যায় দেখে চুপ থাকতে পারিনি। আর আপনি দর্প করে কোন শিক্ষার কথা বলছেন? নিজের স্ত্রীর গায়ে এইভাবে হাত তোলাটাই কী আপনার কাছে শিক্ষা, সংস্কার? এই কদর্য শিক্ষার জেরেই কি আপনার এত অহংকার? এত প্রতিপত্তি এই সংসারে? তাহলে সেই শিক্ষাকে আমি ধিক্কার জানাই। এতদিন যে অন্যায় অত্যাচার আপনি মায়ের উপর করে এসেছেন, তা এবার বন্ধ করুন। নাহলে আপনার এই কাজের জন্য আমি পুলিশের সাহায্য নিতে বাধ্য হব। এতদিন আপনার এই কুরুচিকর কাজের কেউ প্রতিবাদ করেনি বলে, ভবিষ্যতেও কেউ করবেনা, এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে এবার সরে আসুন।“

অধরবাবু মুখ দিয়ে যেন কথা সরছেনা। এতদিন এই সংসারে সর্বেসর্বা হয়ে যা খুশি করে এসেছেন। পরিবর্তে উপভোগ করেছেন এই পরিবারের সদস্যদের ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা, ভক্তি। ভগবানের পরবর্তী আসনটাই দখল করে বসে ছিলেন এতগুলো বছর। কিন্তু আজ প্রথম তাঁর এই সিংহাসনে সজোরে পদাঘাত পড়লো। তাই রাগে, ক্ষোভে একেবারে গুম মেরে গেলেন।

অধরবাবুর রিটায়ারমেন্টের আর একবছর বাকি। তিনি ভাত খেয়ে অর্ঘর সাথেই অফিসে বেরিয়ে যান রোজ। আজও গেলেন। কাল রাতের ঘটনার পর আর একটাও কথা এখনো পর্যন্ত বলেননি কারোর সাথে। ঘরে যেন একটা গুমোট পরিবেশ। শাশুড়ি সুলেখাদেবী যথা নিয়মেই অধরবাবুর সেবা যত্ন করছেন। তবে শ্বশুর মশাইয়ের রাগটা যে এখনও পড়েনি, মুখ চোখ দেখে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।

অর্ঘ আর অধরবাবু কাজে বেরিয়ে যেতে, দরজাটা বন্ধ করে শাশুড়িমায়ের কাছে এল অতসী।
একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলো—-” মা, আমার জন্য কাল আপনাদের মধ্যে অশান্তিটা আরও বেড়ে গেল বলুন? বিশ্বাস করুন, আমার ভীষণ খারাপ লাগছে। কিন্তু আমি ওই পরিস্থিতিতে চুপ থাকতে পারিনি। এই অন্যায় আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারবোনা।“

সুলেখাদেবী ম্লান হেসে বললেন—-” তোমার খারাপ লাগার কোনই কারণ নেই মা। তোমার শ্বশুরমশাইয়ের সাথে আমার সম্পর্কটা কোনদিন মধুর ছিল? তিনি তাঁর ঠুনকো মেজাজ আর দাপটে আমায় তো চিরদাসীই বানিয়ে রেখেছেন। ওঁনার স্ত্রীর মর্যাদা তো আজও পাইনি। আসলে খুঁটির জোর না থাকলে যা হয়। বাপের বাড়ির অবস্থা ভালো নয়। লেখাপড়াও সেভাবে নেই। ছোট ছেলেকে নিয়ে আমি কোথায় যেতাম? কি করেই বা মানুষ করতাম অর্ঘকে? তাই ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই, এইভাবেই নিজের অস্তিত্বটা কোনমতে টিকিয়ে রেখেছি।“

—–” মা, আজ তো আপনার ছেলে স্বাবলম্বী। আপনার পাশে দাঁড়াবার তার সামর্থ হয়েছে। এইবার নাহয় এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন। এতদিন তো মুখ বুজে সহ্য করলেন। মানুষটাকে সম্মান করলেন, যত্ন করলেন। কিন্তু মানুষটার কোন পরিবর্তন হলো কি? নিজের স্বামীর কাছে স্ত্রীর মর্যাদা পেলেন কি? তবে আর কেন? সাহস করে প্রতিবাদ করেই দেখুন না, পরিবর্তন আসে কিনা? ভয় একটুও করবেন না মা। জানবেন আমি সবসময়ই আপনার পাশে থাকবো।“

——” আমি জানি মা, তুমি আমার পাশে থাকবে। কাল দেখেই আমি বুঝেছিলাম। এতদিন আমার ছেলে যে সাহস দেখাতে পারেনি, তা তুমি দেখিয়েছিলে। বিশ্বাস কর, কাল যে কি ভালো লেগেছিল আমার, তোমায় বোঝাতে পারবো না। আমার হয়েও যে কেউ রুখে দাঁড়াতে পারে, সেটা কাল অনুভব করেছিলাম প্রথম। তোমায় কথা দিচ্ছি মা, সঠিক সময় আসলে, ঠিক প্রতিবাদ করবো আমি।“

কেটে গেল আরও বেশ কয়েকটামাস। অধরবাবু সেইভাবে বাড়াবাড়ি কিছু আর করেননি। অতসীর সেই রাতে অমন রুদ্রানী মূর্তি দেখে, তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছেন, তাঁর জুলুম করবার পথটা আর মসৃণ হবেনা। বাধা আসবে প্রতিপদে। তাই কিছুটা সংযম বজায় রেখে চলেছেন এতদিন।

আজ অতসীর ভীষণ আনন্দের দিন। অনেক চেষ্টায়, অনেক প্রতীক্ষায় হাতে এসেছে একটি স্বনামধন্য স্কুলের শিক্ষিকার চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা। দৌড়ে গিয়ে আনন্দে একবার জড়িয়ে ধরলো সুলেখাদেবীকে। তাঁকে সব জানিয়ে, ছুটে গেল অর্ঘর কাছে। তবে খবরটা শোনামাত্রই মনে মনে ভয়ে একেবারে কুঁকড়ে গেছেন সুলেখাদেবী। এই খবর শুনে অধরবাবুর যে কি প্রতিক্রিয়া হবে, তা তিনি ভালোই জানেন। ঘটলোও তাই। অর্ঘ আর অতসী যখন এই আনন্দ সংবাদ অধরবাবুকে দিতে গেল, তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করে অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় ছেলেকে বললেন—–” অতসীর চাকরি করায় আমার একেবারেই মত নেই অর্ঘ। রায় বাড়ির বউরা রাস্তায় ধেই ধেই করে ঘুরে বেরিয়ে চাকরি করেনা।“
এই কথার প্রতিবাদ করে উঠল অর্ঘ—-” কেন বাবা, এত কষ্ট করে অতসী নিজের যোগ্যতায় চাকরিটা পেয়েছে, সেটা করবেনা শুধু রায় বাড়ির বউ বলে? এটা কেমন কথা হল? এখনও এসব নিয়মের গন্ডীর মধ্যে কেন পড়ে রয়েছ বাবা?”

অধরবাবুর বেশ বিরক্ত হয়ে, নিজের স্বপক্ষে যুক্তি খাড়া করলেন—–” অতসী চাকরি করতোনা বলেই, ওকে আমি এই বাড়ির বউ করেছিলাম। ও চাকরি করবে একথা জানলে, আমি কিছুতেই ওকে এই বাড়ির বউ হিসেবে পছন্দ করতাম না। তবে এই বাড়িতে বউ হয়ে যখন এসেই পড়েছে, এই বাড়ির নিয়ম মেনেই ওকে চলতে হবে। ঘরের বউকে কিছুতেই চাকরি করবার অনুমতি দেবোনা আমি।“

অর্ঘ যারপরনাই বিস্মিত হয়ে বলল—-” এটা কোন যুক্তি হল বাবা? কাল চাকরি করতোনা বলে, আজ করতে পারবেনা? অতসীর কি চাকরি করবার বয়স পেরিয়ে গেছে নাকি? চেষ্টা করলে আরও কত চাকরি ও পেতে পারে। তোমায় অনুরোধ করছি, তুমি এই অন্যায় আপত্তি করোনা বাবা।“

অধরবাবু এবার সুলেখাদেবী দিকে চেয়ে ব্যাঙ্গ করে বললেন—-” শুনলে, তোমার স্ত্রৈণ ছেলের কথা? বিয়ের একবছরও ঘুরলোনা, কেমন এখন থেকেই বউয়ের হয়ে নিজের বাবার সাথেই তর্ক করছে? ধীরে ধীরে বউয়ের শিক্ষাতেই শিক্ষিত হয়ে উঠছে তোমার ছেলে। অর্ঘ তোমায় এখন পুরুষ ভাবতেও আমার দ্বিধা বোধ হচ্ছে।“

বাবার বিদ্রুপাত্মক কথাগুলো শুনে, লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে অর্ঘর। এতক্ষণ বাবা আর ছেলের মাঝে একটাও কথা না বললেও, এবার মুখ খুলল অতসী—-” আচ্ছা বাবা, আপনার মতে পুরুষের সংজ্ঞাটা ঠিক কী? এইভাবে দিনের পর দিন নিজের স্ত্রীকে হেনস্থা করা, লাঞ্ছিত করা, তার গায়ে হাত তোলা এইসবেতেই বুঝি পুরুষের গরিমা, মহিমা বৃদ্ধি পায় বহুগুণ? সারাদিন পায়ের ওপর পা তুলে, নিজের স্ত্রীকে দিয়ে দাসী বৃত্তি করিয়ে পৌরষত্বের অভিমান বুঝি আকাশচুম্বী হয়? একজন নিঃসহায়, নিরীহ মহিলাকে দিনের পর দিন ভয় দেখিয়ে অনর্থক সেবা আদায় করাকে যদি আপনি পুরুষের সংজ্ঞাভেবে বসে থাকেন, তাহলে শুনে রাখুন আদপেই আপনি পুরুষ নন। একজন কাপুরুষ আপনি।“

অতসীর কথাগুলো শুনে রাগে সারাশরীর যেন কাঁপছে অধরবাবুর। তিনি পারিপার্শ্বিক জ্ঞান হারিয়ে, সপাটে একখানা চড় কষাতে উদ্দত হলেন অতসীকে। কিন্তু এইবার বিফল হলেন। অতসীর গাল লক্ষ করে তার উদ্দত হাতখানা শক্ত করে চেপে ধরলেন সুলেখাদেবী। অধরবাবুর দিকে চোখে চোখ রেখে বললেন—–” আর নয়। অনেক অন্যায় অত্যাচার করেছো তুমি। এবার বন্ধ করো। তোমার অত্যাচার আর সহ্য করবোনা কিছুতেই। নিজেকে বদলাও, নাহলে ফল ভালো হবেনা। আমি থাকতে দেখি, বউমার চাকরি করবার পথে তুমি কেমন অন্তরায় হতে পারো?”

অতসী আর অর্ঘ বিহ্বল দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে মায়ের দিকে। এই সুলেখাদেবীকে যেন চিনতেই পারছেনা ওরা। অতসীর দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে অনবরত। মা কথা রেখেছেন। সঠিক সময় প্রতিবাদ করবার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা আজ তিনি রেখেছেন।

কিছু মানুষ থাকেন, যারা হন ওই ‘শক্তের ভক্ত আর নরমের যম’। অধরবাবুর চরিত্রটাও খানিকটা সেই ধরনের। অধরবাবু নিজের স্ত্রীর এই পরিবর্তন স্বচক্ষে দেখে, ভালো ভাবেই বুঝতে পারছেন, এতদিন নরম মাটিতে আঁচড়ে যে সুখ তিনি পেয়েছিলেন, আর সেটা তাঁর কপালে জুটবেনা। মাটি এখন শক্ত হয়েছে। এই মাটিতে আঁচড়ালে ক্ষতবিক্ষত হবেন তিনি নিজেই। বুদ্ধিমান মানুষ অধরবাবু, ঠিকই অনুভব করছেন তাঁর রাজসিংহাসন এবার টলায়মান। পুনরুদ্ধারের কোনই আশা নেই। তাই তাঁর এই রাজকীয় মেজাজ এবার বর্জন করাই শ্রেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *