ভাত

শম্পা সাহা

ইংরাজী ভাষায় নিজের নাম লিখুন ।

 17 total views

#ভাত
#শম্পা_সাহা

“সব সময় মুখে মুখে তর্ক করাটা তোমার অভ‍্যাস।বাবা মা কিছু শেখায়নি নাকি?”

“হ‍্যাঁ মা ,নিশ্চয়ই শিখিয়েছে!”

“কি,খালি ঝগড়া করতে?”

“না,অন‍্যায়ের প্রতিবাদ করতে!”

এই রকম খুঁটিনাটি লেগেই থাকে এ সংসারে।পাড়ার লোক জেনে গেছে ঐন্দ্রিলা বড্ড মুখরা।যদিও পাড়ার কারো সঙ্গেই ও খুব একটা মেশে না।কথাবার্তাও বলে না।আসলে শাশুড়ি মোটেও পছন্দ করেন না ,বাড়ির বৌ পাড়ায় পাড়ায় ড‍্যাং ড‍্যাং করে ঘুরে বেড়াক।তবে বিমলার পাড়া বেড়ানোর সুবাদে বাড়ির খবর সহজেই বাইরে।

তাই ঐন্দ্রিলা লক্ষ্মীমন্ত বৌ সেজে বাড়ির বাইরে খুব একটা বেড়োয় না।এমনকি সুশোভনের সময় হয়না বলে খুব একটা বেড়োনোর সময়ও ওরা পায়না।তাতে ঐন্দ্রিলার আপত্তি নেই।কারণ ওর এক ভয়ংকর নেশা বই পড়ার।

তাই সব কাজকর্ম সেরে তাড়াতাড়ি পড়তে বসাটাই ওর লক্ষ।আসলে ও ডব্লু বি সি এস এর জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছে।

এত তাড়াতাড়ি ঐন্দ্রিলা বিয়েটা করতে চায়নি।কিন্তু সুশোভন ওর বাড়ির লোককে কথা দেয় যে ঐন্দ্রিলার পড়াশোনার কোনো অসুবিধা হবে না।

ওকে এক বিয়ে বাড়িতে দেখে সুশোভনের এত পছন্দ হয়ে যায় যে সেই মুহুর্তেই ঠিক করে বিয়ে করলে ওই মেয়েকেই করবে।যদিও মেয়ের বাড়ির লোক একটু না হু , না হু করছিল।কিন্তু সুশোভন ঐন্দ্রিলাকে পাবার জন্য সবকিছু করতে রাজি ছিল।

সুশোভনের মা বিমলার এ বিষয়ে বেশ আপত্তি। সুন্দরী বৌ এর প্রতি ছেলের এই অতি উৎসাহ ব‍্যাপারটাই বিমলার পছন্দ ছিল না। মায়েরা ছেলেদের বিয়ে বিয়ে করেন বটে তবে মন থেকে ছেলের জীবনে একজন মহিলার আগমন,তার সবটুকু জুড়ে থাকা বোধহয় চাইতে পারেন না।

তাই অধিকাংশ পরিবারেই বিয়ের পর শাশুড়ি বৌতে অশান্তি বাঁধে।আবার সব সময় যে বৌরাও ধোয়া তুলসীপাতা এমন নয়।তারাও অনেকসময় মা এর আধিপত্য সহজে মেনে নিতে চায় না ছেলের জীবনে ।তখনই দ্বন্ধ!

কিন্তু ঐন্দ্রিলার ও নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ব‍্যথা নেই।সে ব‍্যস্ত তার স্বপ্ন পূরণে।বাবা মা যখন ভালো ব‍্যাঙ্ক চাকুরে ছেলে পেয়ে ছাড়তে চাইলো না, ঐন্দ্রিলা এক প্রকার বাধ‍্য হয়েই বিয়েতে মত দেয়।তবে ওই এক শর্ত।তাকে অফিসার হতে দিতে হবে।অন্তত বার তিনেক চেষ্টা, সে করতে চায়।

কিছু দিন হলো প্রিলিম এর রেজাল্ট বের হয়েছে।ঐন্দ্রিলা সহজেই ওটা ক্লিয়ার করেছে, এবার মেইন এর প্রস্তুতি।আরো বেশি পড়াশোনা দরকার।তাই বাড়ির কাজের সুবিধার জন্য সুশোভন সুশীলাদিকে রাখে।

বিমলার পায়ে বাত,হাই প্রেসার তিনি তো উনুনের সামনেই যেতে পারেন না, তাই আগে রান্নার লোক ছিল।কিন্তু বৌ থাকতে ছেলে রাঁধুনির হাতে খাবে কেন?তাই আগের রান্নার দিদি বিদায় করেছিলেন বিমলা বেশ উৎসাহ নিয়েই।

তার।পরেও ছেলে বৌ এর পড়ার জন্য টাকা খরচ করছে ! এইসব আদিখ্যেতা আর উনি সহ‍্য করতে পারছেন না।ওই হা-ঘরে রান্নার মেয়েটা সঙ্গে আবার একটা বাচ্চা নিয়ে আসে,সে এসে রান্নাঘরের চৌকাঠের সামনে বসে থাকে।তাদের আবার দুপুরে খেতে দিতে হয়,সকালেও ।

তাই বিমলা কালকের বাসি রুটি একটু চিনি দিয়ে দিয়েছিলেন বাচ্চাটাকে।”তাতেই মহারানীর আপত্তি।রোজগার তো ক‍রতে হয় না, আমার ছেলের রক্ত জল করা পয়সা! ও তো পরের মেয়ে,ওর আর কি?ফুটুনি করতে পারলেই হলো”,গজগজ করেন বিমলা।সোজা জানিয়ে দেন,ওসব দুপুরে খাবার টাবার হবে না,আর সকালে তিনি বাসি রুটিই দেবেন।তাতে যদি সুশীলা রাজি থাকে তো করুক ।না হলে আসতে পারে।তাদের লোকের দরকার নেই।

সুশীলা তাতেই রাজী।সুশীলার বর মদখোর ,মাতাল।বহুকষ্টে, বহুলোক ধরে এই কাজের খোঁজটা পেয়েছে।তিন হাজার টাকা রান্না, আর ও নিজে থেকেই বলেছে, ঘরদোর মুছে দেবে,বাসনটাও মেজে দেবে,তাতে মোট চার হাজার টাকা।বিমলা গাইগুঁই করে রাজী হন।আসলে, কি আর করা সবই পোড়া কপাল! এমন বৌ ন‍্যাওটা ছেলে জুটেছে,ঝাঁটা মার!

কিন্তু দুপুরে উনি ওদের খেতে দেবেন না কিছুতেই!তাই গত দুদিন নিম‍রাজি হয়ে খেতে দিলেও আজ বেঁকে বসেছেন।কোনোমতেই ছেলের বৌ এর কথায় উঠতে বসতে উনি পারবেন না।

ছেলেকে কত বলেছেন,” বৌ কে একটু তাবে রাখ”!কে শোনে কার কথা?তাই আজ দুপুরে বিমলা শুধু ঐন্দ্রিলার জন্য ভাত বাড়েন।সুশীলাকে সোজা বলে দেন,”রান্না হয়ে গেছে যখন, বাড়ি চলে যাও বাপু,কাল সকালে আবার এসো।!

সুশীলা গুটিগুটি পায়ে ছেলের হাত ধরে এগোলে,
ঐন্দ্রিলা বলে,”দাঁড়াও সুশীলা দি”।এরপ‍র নিজের ভাতের থালাটা এনে ধরে সুশীলার সামনে,”এই নাও ,ছেলেকে খাইয়ে দাও!”

“মানে?”রাগে তেড়েফুঁড়ে ওঠে বিমলা। কিন্তু ঐন্দ্রিলা ভীত সুশীলার দিকে তাকায়,”যদি তুমি ছেলে না খাইয়ে যাও তো আমার মরা মুখ দেখবে।আর কালও তুমি কাজে আসবে । না আসলে আমি কিন্তু তোমার বাড়ি যাবো!”

এই বিকট পরিস্থিতিতে সুশীলা কোনোরকমে ছেলেকে খাইয়ে পালায়।এরপর ঐন্দ্রিলা নিজে আর শাশুড়ির ভাত বেড়ে দেবার অপেক্ষা করে না।রান্নাঘরে গিয়ে ভাতের হাঁড়ির দিকে তাকায়,”যা ভাত আছে ,দিব‍্যি দুজনের হয়ে যাবে!”

বিমলা ফুঁসতে থাকেন,”আসুক শুভ,তারপর দেখছি!”

ঐন্দ্রিলা ডাকে,”মা,ভাত বেড়েছি,খেতে আসুন”!

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *