ভারতবর্ষের প্রকৃত স্বরূপ বুঝেছিলেন বীর সুভাষ চন্দ্র – বিশ্বনাথ পাল

আবার একটি অপ্রীতিকর কাজের দিকে আমরা এগিয়ে চলেছি ভারতমায়ের নাড়ি ছেঁড়াধন,শুধু বাঙালির নয় তাবৎ ভারতবাসীর একান্ত আপন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্মোৎসবের বছরভর উদযাপনেের দিকে, আমরা এগিয়ে চলেছি পায়ে পায়ে।

আসমুদ্র হিমাচলের মানুষদের কাছে যিনি নয়নের মনি,স্বাধীনতার যজ্ঞে আত্মত্যাগের উজ্বল খনি,নিখাদ ভালবাসার সমুদ্রে রাজাধিরাজ,মানবদরদী যাঁর মৃত্যু নেই –এই রকম মানুষটির জন্মোৎসবে না মেতে কেন আমি অকারণে এইসব অলক্ষুনে কথাবার্তা লিখছি।

ইতিহাসের দিকে তাকালে অবশ্য এই বক্তব্যর সাথে আপনারাও সহমত পোষণ করবেন।
বিনয়-বাদল-দীনেশ-ক্ষুদিরাম-প্রফুল্লচাকী-ভগতসিং-মাতঙ্গিনী-প্রীতিলতা-দেশবন্ধু-শ্রীঅরবিন্দ, মাস্টারদা,সুভাষচন্দ্রদের গভীর আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছি তা আদতে খণ্ডিত স্বাধীনতা, শুধু খণ্ডিত নয় শর্তসাপেক্ষে ইংরেজের উচ্ছিষ্ট অনুদনন -নইলে স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার অমৃতভোজ গ্রহণের আগেই কেন নিরুদ্দিষ্ট সুভাষকে পেলে বৃটিশের হাতে তুলে দেবার অঙ্গীকার করা হয়েছিল?

কেন ই বা জওহরলাল নেহেরু প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসে আবেগ মথিত কণ্ঠে বলেছিলেন সুভাষ এলে তিনিই সবার আগে তরবারি হাতে এগিয়ে যাবেন?? সেই ট্রাডিশন সমানে আজও চলছে নইলে এই মহান বিপ্লবীর জন্মদিনটাকে জাতীয় ছুটির দিন হিসাবে ঘোষণার জন্য দিল্লীর দরবারে বাটি হাতে ভিখারির মতো ঘুরতে হয়?স্বাধীনতার বাহাত্তর বছর পরেও কেন একজন মহান বিপ্লবীর শেষ জীবন নিয়ে যবনিকার অবসান হল না? আমাদের দুর্ভাগ্য স্বামী বিবেকানন্দের মনেপ্রাণে শিষ্য হওয়া সুভাষকে সেদিন শুধু বৃটিশের রাজশক্তির বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে শক্তি ও সামর্থ সংগ্রহ করে লড়তে হয় নি বড়ং বেশি বেশি করে লড়তে হয়েছিল এদেশের তথাকথিত তাবড় নেতাদের বিরুদ্ধে।

সত্যিই তো সর্বান্তকরণে অখণ্ড ভারতের পূজারী স্বাধীনতা ভিন্ন অন্যকিছু চান নি বলেই তাঁর সঙ্গে বিবাদ বেঁধেছিল বিপ্লবীদের।সপ্তরথীর বিক্রমে পুরাণের অভিমন্যু মারা গেলেও আমাদের পরাণের অভিমন্যু সীতারামায়াকে হেলায় হারিয়ে সগর্বে বেঁচেছিলেন শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে। বাপুজীকে তাই প্রকাশ্যে বলতে শোনা গিয়েছিল, “সীতারামায়ার পরাজয় মানে আমার পরাজয় ।”

১৮৯৭ র ২৩ জানুয়ারি পিতা জানকীনাথ বসু ও মা প্রভাবতীদেবীর ষষ্ঠ পুত্র হিসাবে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন ওড়িষ্যার কটক শহরে ।কটকের রেভন শ’কলেজিয়েট স্কুল থেকে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মেধাবী এই ছাত্র প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব দাসের খুবই স্নেহ -ভালবাসা পেয়েছিলেন।ভালবাসার সঙ্গে আদর্শ মিশে ছিল।মাস্টার মশায়ের দেশপ্রেম মাস্টার মশাইকে বদলির ব্যবস্থা পাকা করলেও এই আদর্শ তাঁর প্রিয় ছাত্রের মনে গেঁথে প্রকৃত দেশপ্রেমিক মানুষ হবার রসদ জুগিয়েছে ।

আটটি সন্তানের মধ্যে বুদ্ধি স্মৃতিশক্তি আর মেধার তুল্যমূল্য বিচারে সুবি ই ছিল সেরা।মায়ের অসম্ভব ভালবাসায় সুবির ছিল মা অন্ত প্রাণ।সততাকে দৃঢ় ভাবে মেনে জীবনে চলার এই সুশিক্ষার মধ্যেই সুবি মাকে দেশমাতার বিরাট খোলসে আবিষ্কার করলেন।রক্ত মাংসের মানবী মা আর নদী-নালা- জল -কাদার মাটির মা তাঁর চোখে এক হয়ে ধরা দেয় ।

সতীর্থদের হেমন্তকুমার সরকার প্রথম সুভাষের মনের বারুদে দেশপ্রেমের আগুন উস্কে দেন,এই সতীর্থদের জন্যই ছাত্রাবাসে অরন্ধন করে বৃটিশের অনাচারের বিরুদ্ধে না খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন –সেদিনের প্রেক্ষিতে তা এতটাই বড় ঘটনা ছিল যার প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর অপরাধে প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব বাবুকে অনত্র বদলি করা হয়।সতীর্থদের সাহচর্যেই তো ছোট্ট সুবি খবরের কাগজ থেকে বিপ্লবীদের ছবি কেটে ঘরের দেওয়ালে সেঁটে ছিল।বলা বাহুল্য বসু পরিবারে দেশের স্বাধীনতা নিয়ে সেদিন এত মাথা ব্যথা ছিল না।তাই ছবিগুলো দেওয়াল থেকে সরিয়ে ফেলা হলেও তিনি মনের দেওয়ালে তা সযত্নে সারাজীবন ধরে রেখেছিলেন।

মাত্র বারো বছর বয়সে যে শিক্ষক মহাশয়ের সান্নিধ্য সুখে বিভোর হয়েছিলেন হঠাত্ তার এই বদলি সুভাষের মনে শেল বিঁধল।ব্যথাতুর মন একটু সান্ত্বনার প্রলেপ খুঁজতে গিয়ে এক আত্মীয়ের পাশের বাড়িতে হঠাৎ স্বামী বিবেকানন্দের রচনা দেখতে পান ।কৌতূহল বশত তা পড়ে বুঁদ হয়ে যান।স্বামী বিবেকানন্দের রচনার মধ্য দিয়ে তিনি নতুন দৃষ্টি দিয়ে ভারতবর্ষকে দেখতে শিখলেন।

পরবর্তীতে তিনি নিজেই উদ্বোধনের সম্পাদক কে ৬মার্চ১৯৩৬ তারিখে একটি চিঠিতে লিখেছেন,”শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের নিকট আমি যে কত ঋণী,তাহা ভাষায় কি করিয়া প্রকাশ করিব? তাঁহাদের পুণ্য প্রভাবে আমার জীবনের প্রথম উন্মেষ।নিবেদিতার মতো আমিও মনে করি যে,রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দ  একটা অখণ্ড ব্যক্তিত্বের দুই রূপ ।আজ যদি স্বামীজি জীবিত থাকিতেন,তিনি নিশ্চয় আমার গুরু হইতেন অর্থাৎ তাঁকে নিশ্চয়ই আমি গুরু পদে বরণ করিতাম।যাহা হউক,যতদিন জীবিত থাকিব ততদিন রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দের একান্ত অনুগত ও অনুরক্ত থাকিব,একথা বলা বাহুল্য।”

প্রবেশিকা পরীক্ষায় অসামান্য,সাফল্যের পর সর্বধিক প্রিয় বিষয় দর্শন নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেন।দেশ বিদেশের খ্যাতনামা দার্শনিকের মতবাদের সাথে নিজের আগ্রহে যেমন  পরিচিত হলেন তেমনি সাহিত্য ইতিহাস ও এদেশের অতীত ঐতিহ্য নিয়ে কৌতুহল তাঁকে দেশের প্রতি দরদী মরমী নাগরিক করে গড়ে তোলে।নিজের দেশ বলতে কাঠা বিঘের মাপ ছেড়ে দেশের অন্তর আত্মার হদিশ পান।তাই পড়ানোর সময় মি ওটেন সাহেবকে ভারতবাসীর উদ্দেশ্য নোংরা কথা বলার জন্য প্রহার করে কলেজ ছাড়েন।অকুতো ভয় না থাকলে-ওটেন সাহেবের গায়ে হাততোলা এত সহজ ছিল না।প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ সবুজপত্রে প্রবন্ধ লিখলেন। অনান্য বুদ্ধিজীবীদের তুলনায় অনন্যব্যক্তিত্বের অধিকারী রবীন্দ্রনাথের সমর্থন পেয়ে ছাত্রের দল উৎফুল্ল হলেন।

সুভাষচন্দ্র বুঝেছিলেন রামকৃষ্ণের শরীর চলে যাওয়ার পর নরেনদত্তের দল যেমন করে ত্যাগব্রতের পথে নিজেদের উজাড় করে দিয়ে সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন,তিনিও তেমনি সন্ন্যাস ধর্মে নিয়ে আধ্যাত্মিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে দেশমাকে বৃটিশের নাগপাশ থেকে রক্ষা করবেন।

কয়েকজন সতীর্থ বন্ধু জুটিয়ে শান্তিপুরে চলে যান।বাবা মা কেঁদে আকুল।সন্ন্যাস নেওয়া হল না।ঘরের ছেলে সুভাষ ঘরে ফিরলেন ।মমতাময়ী মায়ের স্নেহের আঁচলে ধরা দিলেও বাঁধা পড়লেন না।যে ছেলেটা কলকাতার বাড়ির সামনে বৃদ্ধাবুড়ির সাহায্যের জন্য ট্রামভাড়া বাঁচিয়ে দান করতেন তিনি তো ধরা দিতে পারেন না।

১৯০১ স্বামীজির শরীর চলে গেছে তখন তিনি নিতান্ত শিশুই।স্বামীজির অভিন্ন হৃদয়ের বন্ধু রাখাল মহারাজ তথা স্বামী ব্রহ্মানন্দজী মহারাজের সান্নিধ্যে মন অনেকটা হাল্কা হয়,স্বামীজির দর্শনের নির্যাস যে ঠাকুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেব তাও তিনি বুঝতে পারেন।স্বামীজির শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা তাঁর কাছে ভারতমায়ের এক অনন্যসাধারণ কন্যা হিসাবে চিহ্নিত হন।

এই সময় তিনি তার সহপাঠী সতীর্থদের কাছে যে ভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তাও স্মরণ যোগ্য এদের মধ্যে ছিলেন কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সঙ্গীত বিশারদ পুত্র দিলীপ কুমার রায়। হেমন্তকুমার সরকার আর বয়সে একটু বড় দাদা সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যয় ,এই সুরেশচন্দ্র ছাত্রদের মধ্যে বিপ্লবের বহ্নিশিখা জাগিয়েছিলেন।

বেলুড় মঠে যোগদান করার প্রবল বাসনা নিয়ে তিনি হাজির হয়েছিলেন কিন্তু সন্ন্যাস গ্রহণ করলে স্বাধীনতার আন্দোলনে যোগ দেওয়া যাবে না এই একটি মাত্র কারণে তিনি পিছিয়ে আসেন।এবং “ব্রাদারহুড” নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তৈরী করেন।সমাজ সেবা,রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের ভাবাদর্শ ছাত্র-যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।দেশ গঠনের এই রকম সংগঠন সুভাষচন্দ্রকে বেশ শক্ত ভিতের ওপর এনে দিয়েছিল। বাড়ির পরিবেশ তাকে যা দিতে পারে নি সুরেশদার সান্নিধ্যে তা তিনি পেয়েছেন । এই সুরেশচন্দ্র স্বদেশী করতেন সেই সঙ্গে কংগ্রেস ও করতেন আবার কেশবচন্দ্র সেনের ওপরে ছিল বিশেষ টান।সব মিলিয়ে মানুষটাকে বেশ শ্রদ্ধা করতেন।

প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে উৎখাত হয়ে তিনি পরবর্তীতে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে দর্শনে সাম্মানিক সহ বিএ পাশ করেন।এরপর তিনি বিলেতে সিভিল সার্ভিস পড়বার সময় কেমজ সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর প্রিয় দর্শনশাস্ত্রে ট্রাইপস্ ডিগ্রি পেয়ে অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।আই সি এস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান দখল করেও বৃটিশের গোলামি না করার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।দেশবাসীর দুর্দশা মোচনে তিনি দেশপ্রেমের জোয়ারে জয় মা বলে নিজের জীবন তরীটিকে ভাসিয়ে দেন।জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন।যুক্তিবাদী ও সুবক্তা এবং দক্ষ সংগঠক হিসাবে স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রিয় পাত্র হয়েওঠেন।১৯২৪দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ কলকাতার মেয়র নির্বাচিত হলে তাঁর অধীনে সুভাষচন্দ্র কাজে মেতে ওঠেন।স্বরাজ পত্রিকায় তিনি এই সময় স্বাধীন মতামত জানিয়ে লেখালেখি শুরু করেন।

১৯২৫ তিনি গ্রেপ্তার হন।মান্দালয়ে তাঁকে আনা হয়।এই সময় তিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন।১৯৩০ এ তিনি কলকাতার মেয়র নির্বাচিত হন।বৃটিশ সরকার তাঁকে একবার আধবার নয় এগার বার গ্রেপ্তার করে। তাঁকে এ দেশে রাখলে বিপদ বাড়বে এই আশঙ্কায় রেঙ্গুনে রাখা হয় । ,কিন্তু কথায় আছে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে তাই বিজাতীয় সরকার ১৯৩৩ এ তাঁকে ইউরোপে নির্বাসিত করে ।

১৯৩৪ এমেলি শেঙ্কলের সাথে পরিচয়, ১৯৩৭ পরিণয়।১৯৩৮ এ ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হন এবং ত্রিপুরা অধিবেশনে ১৯৩৯ এ গান্ধীর মনোনীত পট্টভি সীতারামায়াকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের জন্য সভাপতি হন। কিন্তু কার্যকরী সভার সদস্যগণের চূড়ান্ত অসহযোগিতায় কংগ্রেস ছেড়ে অল ইণ্ডিয়া ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করেন।দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে ভারতের অংশ নেওয়া ঠিক হবে না বলে তিনি দৃঢ় মত প্রকাশ করেন।এই সময় বৃটিশ সরকার তাঁকে গৃহ বন্দী করে রাখেন।ছত্রপতি শিবাজীর মতো তিনি সুকৌশলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আফগানিস্তান ও সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে জার্মানি পৌঁছন।

আফগানিস্তানের ভাষা পশতু না জানার জন্য তিনি উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতা মিঞা আকবর শাহকে সঙ্গে নেন এবং তাঁর বোবা -কালা চাচা সেজে জার্মানির  এডলফ হিটলারের সাথে দেখা করেন।হিটলারের কাছে তেমন সাহায্য না পেয়ে তিনি বিদেশে থেকেই ভারতবর্ষের শৃঙ্খল মোচনের চেষ্টা চালান।যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ,রাসবিহারী বসু প্রমুখের পথে হেঁটে সশস্ত্র আন্দোলনের পথে হাঁটেন।সেই সময় জাপানে বিপ্লবী রাসবিহারী বসু প্রবাসী ভারতীয় ও জাপানের হাতে বন্দী ভারতীয়দের নিয়ে গড়ে তুলেছেন আজাদ হিন্দ বাহিনী।

গঠন করেছেন আজাদ হিন্দ সরকার ।সুভাষচন্দ্র হলেন ঐ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ।শুধু পুরুষ নয় নারীদের ও তিনি স্বাধীনতার যজ্ঞে ব্রাত্য কর রাখেন নি।ঝাঁসির লক্ষ্মী বাহিনী গঠন করে সামরিক সজ্জায় সু সজ্জিত করেছেন কোমল মতি নারীদের। সুশৃঙ্খল সৈন্যবাহিনীর অদম্য সাহসে ভর দিয়ে তিনি এগিয়ে গেছেন বীর বিক্রমে ।আবিদ হোসেন,লক্ষ্মীসাইগল কে না সেদিন তার সঙ্গে সেদিন সহযোগিতা করেছেন।

সুভাষচন্দ্রের দাদা শরৎচন্দ্র বসুও ইতিমধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন।সুভাষ চন্দ্র নিজেও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও তার স্ত্রী বাসন্তী দেবীর সান্নিধ্যে যেমন পেয়েছেন তেমনি পথেরদাবী র লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাকে উৎসাহিত করেছেন।রবীন্দ্রনাথ তাকে মহানায়ক হিসাবে ঘোষণা করেছেন।একজন তরুণ বিপ্লবীর উদ্যোমে গড়া “মহাজাতি সদন “নামকরণ ও তিনি করেন।

ভারত ও ভারতবাসীর সার্বিক উন্নয়নের জন্য পূর্ণ স্বাধীনতাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল।তাই তিনি দিল্লীচলো বলে ডাক দিয়েছিলেন।দিল্লির মসনদে ভারতবাসীর কর্তৃত্ব কায়েম না করা অবধি তাঁর চির চঞ্চল মন যেন কিছুতেই বাগে আসতে চাইছে না।তবে ভারতবাসীর আগামী দিন যাতে ভাল যায় সেজন্য তিনি কৃষি শিল্প ক্ষেত্রে এ দেশকে এগিয়ে দেওয়ার কথা বার ভেবেছেন।এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যাতে উন্নত হয় সে ব্যাপারে খুবই আশাবাদী তিনি।বহুত্ববাদের দেশ এই ভারত বর্ষ,বৈচিত্র্যপূর্ণ ঐক্যে সম্পৃক্ত প্রাণকে রক্ষার জন্য তিনি কত যে আশাবাদী ছিলেন তা তাঁর আজাদ হিন্দ বাহিনীর সংগঠন থেকে আমাদের চোখে স্পষ্ট হয়।সেখানে পুরুষ নারী,হিন্দু মুসলমান,শিখ,জৈন,বৃদ্ধ,ধর্মের প্রতিনিধিত্ব যেমন ছিল তেমনি নানা ভাষা-ভাষি মানুষ এই বাহিনীতে একাকার হয়ে গিয়ে ভারতবর্ষের প্রকৃত রূপটিকে জনসমক্ষে আর একবার তুলে ধরেছিল।

পরিকল্পনা কমিশন গঠন,স্বাধীনরাষ্ট্র্ গঠন,সরকারের নিজস্ব বেতার কেন্দ্র স্থাপন সর্বোপরি সরকারের নিজস্ব সৈন্যবাহিনী গঠনের স্বপন তিনি দেখেন। কৃষি,শিল্প, শিক্ষায় মূল্যবোধ,রাজনীতির সঙ্গে হৃদয়ের যোগ তিনিই চেয়েছিলেন, বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে নিজেকে রক্ষা করার পাশাপাশি মহান ভারতবর্ষ রক্ষার ক্ষেত্রে বারে বারে আঘাত এসেছে।প্রতিবন্ধকতার ঘেরাটোপ থেকে কঠিন কাজ যা তিনি করতে চেয়ে ছিলেন ইম্ফলের কাছে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়।

প্রটানা প্রবল বৃষ্টিপাতে শেষ পর্যন্ত আজাদ হিন্দ বাহিনীকে পিছু হটতে হয়। পদাতিক বাহিনী ও প্রাকৃতিক প্রতিকূল শক্তির সঙ্গে লড়াইয়ে সক্ষম হলেও আকাশ পথে বৃটিশের গোলাগুলি মোকাবিলার সামর্থ্য ছিল না। বিশ্বরণাঙ্গনে ওই দিকে জাপানের পরাজয়ের পর।পরাজিত জাপানের আত্মসমর্পণের মধ্যে যেন সব আলো নিভে গেল। ইম্ফলে ২৬০০০ সেনার প্রবল আত্মত্যাগ বৃটিশেের বিরুদ্ধে যে ঝাঁকুনি দেয় তাতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার কোদালিয়া গ্রামের (বর্তমানে সুভাষ গ্রাম )এই দেশনাায়ক সমগ্র ভারতবাসীর হৃদয়ের আসনে আসীন ।ঝড় ঝঞ্ঝা আর দুর্যোগের দিনে আমরা তাঁকে হারিয়ে আজো সাশ্রু নয়নে বলেই যাচ্ছি ,”তোমার আসন শূন্য আজি, হে বীর সুভাষ পূর্ণ করো।”

 

Biswanath pal

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top